![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
মুজিব-জিয়া বিতর্কঃ সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয়
সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয় গতকাল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে যা ঘটে গেলো তা টেলিভিশন এবং ঢাকার পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা সবাই জেনেছি। এ লজ্জা আমাদের সকলের। লাখ লাখ মানুষের যারা জনপ্রতিনিধি তাদের নিকট থেকে এ ধরণের অশোভন আচরণ আমরা মোটেই প্রত্যাশা করি না। পরবর্তীতে অবশ্য সংসদের স্পিকার এডভোকেট আব্দুল হামিদ সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তারা রেসলিং বা মলস্নযুদ্ধ করতে চাইলে গায়ে তেল মালিশ করে এবং গেঞ্জি পরে মাঠে চলে চলে যেতে পারেন। আনন্দের বিষয় যে বিএনপির মওদুদ আহমদ এবং আওয়ামী লীগের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্পিকারের কঠোর অবস্থানকে স্বাগতঃ জানিয়েছেন। আমরাও প্রবীন এ দু রাজনীতিবিদের ভূমিকাকে সাধুবাদ জানাই। রাজনীতিতে মতবিরোধ বা মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে পরমত সহিষ্ণুতা এবং মতপার্থক্যকে শ্রদ্ধার সাথে দেখা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমরা গণতন্ত্রের জন্য চিৎকার করি বটে, কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে মোটেই লালন বা চর্চা করি না। আমরা গায়ের জোরে নিজের মতামতকে অপরের উপর চাপিয়ে দিতে চাই। এ ধরণের ফ্যাসিবাদী মানসিকতা থেকে আমাদের রাজনীতিবিদরা মুক্ত হতে না পারলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি বিকশিত হবে না। সম্মান ও মর্যাদার খুব সাদামাটা ফর্মুলা হচ্ছে, অপরের নিকট থেকে সম্মান পেতে হলে অপরকে সম্মান দিতে হয়। একটি শিশুর নিকট থেকে আপনি যদি সম্মান পেতে চান তা হলে তাকেও মর্যাদা দিতে হবে। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সম্মানের কাঙ্গাল। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা জাতীয় নেতাদের নিয়ে রাজনৈতিক বানিজ্য করতে চাই, সম্মান দিতে চাই না। সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মুজিব-জিয়া বিতর্কের খবর পাঠ করে কবি কাজল রশীদের সম্পাদনায় প্রকাশিত বাংলাদেশের আকাশ নামক বঙ্গবন্ধু বিষয়ক একটি কবিতা সংকলনটির কথা মনে পড়ে গেলো। সংকলনটি ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে। সংকলনটির সম্পাদক-কথনও একটি চমৎকার কবিতা। এর একটি লাইন হচ্ছে, রাজনীতির ক্ষুদ্র চাদরে আমরা ঢাকি না মুজিবের পরিচয়ের বিশালতা। বাংলাদেশ এবং বৃটেনের নবীন ও প্রবীন কবিদের অনেক উজ্জল ও প্রাণবন্ত কবিতা সেখানে স্থান পেয়েছে। এ সুযোগে আমি রাজনৈতিক বানিজ্যের উর্ধে উঠে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরার জন্য কাজল রশীদকে ধন্যবাদ জানাই। লন্ডন ভিত্তিক জনপ্রিয় সাহিত্য সংগঠন শব্দপাঠের এক অনুষ্ঠানে আলোচ্য সংকলনের কয়েকটি কবিতা পাঠ করে শোনানো হয়েছে। পাঠক নন্দিত কলামিস্ট রেণু লু”ফার লেখা কবিতাটিও সেখানে পাঠ করা হয় এবং তা করেন মনজুরুল আজিম পলাশ। রেণু লুৎফার কবিতার শেষ লাইন ছিল, তোমার নাম, তোমার আদর্শ পুঁজি করে; জঘন্য মার্জারবৃত্তি, কপটতা, কুটিল ক্ষুদ্রতা চাটুকারদের হাতে এখন তোমার মৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যারা মুজিবকে নিয়ে বানিজ্য করতে চান তারা কবিদের এ উচ্চারণ থেকে শেখার অনেক কিছু রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান - দু জনই এখন সকল নিন্দাবাদ বা জীঘাংসার উর্ধে। তারা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাদের নাম মুছে ফেলার ক্ষমতা কারো নেই। আওয়ামী লীগের কেউ যদি বঙ্গবন্ধুর নাম না নেয়, অথবা বিএনপির সবাই যদি জিয়াউর রহমানকে ভুলে যায়, তা হলেও এ দু নেতার কোন লাভ-ক্ষতি হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতি-সচেতন গোটা জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ এখনো এ দু নেতার অনুসারী। তারা মানুষের মনে বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন। জেনারেল ওসমানীকে কি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা স্মরণ করেন? তাঁকে নিয়ে বানিজ্য করা যাবে না, তাই বোধহয় তাঁর নাম রাজনীতিবিদদের মুখে শোনা যায় না। তাই বলে বাংলাদেশের জনগণ জেনারেল ওসমানীকে ভুলে যায়নি। শেখ মুজিব এবং জিয়াউর রহমানের ভক্ত যেমন আছে তেমনি তাদের সমালোচকদের সংখ্যাও বাংলাদেশে কম নয়। তারা মানুষ ছিলেন এবং ভুল-ত্রুটির উর্ধে ছিলেন না। তাদের অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর ছিল না। সেটা নিয়ে একাডেমিক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এখন দেশে যেটা চলছে সেটা একাডেমিক আলোচনা নয়, এর নাম চরিত্র হনন। পার্বত্য চট্রগামের সাম্প্রতিক অশান্ত পরিবেশের জন্য পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জিয়াউর রহমানকে দায়ী করছেন। এর নাম জীঘাংসা। পার্বত্য চট্টগামে অশান্তি শুরুর ইতিহাস কারো অজানা নয়। তবে সেটা আলোচনা করে সেখানে শান্তি আসবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এবং এ ধরণের জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে মোকাবেলার প্রয়োজন। সেটা না করে আমরা দোষারোপের রাজনীতি করছি। জাতির সামগ্রিক স্বার্থে জাতীয় নেতাদের চরিত্র হননের এ অশুভ প্রতিযোগিতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি, বাংলাদেশকে সমস্যামুক্ত করে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী একটি দেশ হিসেবে এগিয়ে নেয়ার সাথে এ দু নেতার নিন্দা বা বন্দনার কোন সম্পর্ক নেই। তবু কেন জানি না, আমাদের রাজনীতিবিদরা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে এটাকে খুব মুখরোচক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। এর মাধ্যমে তারা জাতির কোন্ কল্যাণ সাধন করছেন তা তারাই বলতে পারেন। গত নির্বাচনের সময় অবশ্য আওয়ামী লীগ মুজিব-বন্দনার চেয়ে দিনবদলের কথা বেশি বলেছে। আমাদের মতে নির্বাচনী ফলাফলে এর একটা বিরাট প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনোত্তর কালে তাদের তৎপরতা দেখে মনে হয় তারা দিলবদলের অঙ্গীকার ভুলে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার চেয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিতেই তারা অধিকতর কৌশলী এবং চৌকস। গত এক বছরে সরকার পরিচালনায় আওয়ামী লীগ তেমন সাফল্য দেখাতে না পারলেও তাদের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামেনি। প্রধানতঃ বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির সঠিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার কারণেই এমনটি হয়েছে। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পক্ষে দেশি-বিদেশি মিডিয়ার সোচ্চার ভূমিকাও খাটো করে দেখার উপায় নেই। গত নির্বাচনে মহাজোট সরকারকে দেশবাসী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বিজয়ী করেছে। আওয়ামী লীগের ৭০ সালের বিজয়ের সাথেই শুধু এর তুলনা চলে। যারা বলেন নীল-নকশা বা কারচুপির মাধ্যমে মহাজোট ক্ষমতায় গিয়েছে, আমাদের মতে তারা সঠিক বলেন না। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী কৌশলের মাধ্যমে জনগণকে নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছে, এটা তাদের সাফল্য। বিএনপি-জামাত জোট সেটা পারেননি, এটা তাদের ব্যর্থতা। মহাজোটের অন্যান্য ব্যর্থতার চেয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি জনগণকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করছে। মানুষ একই ভাবে হতাশ হয়েছে বিরোধী দলের ভুমিকায়। নামবদলের ঝগড়া, বেগম জিয়ার বাড়ি, বেগম জিয়ার নিরাপত্তা, সংসদের আসন ইত্যাদির সাথে জনগণের সম্পর্ক খুবই সীমিত। আশ্চর্যের বিষয়, প্রধান বিরোধী দলকে জনগণের সমস্যার চেয়ে এ সকল দলীয় বিষয় নিয়েই অধিকতর সোচ্চার হতে দেখা যায়। জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনস্বার্থের সাথে জড়িত বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে, এ সহজ কথাটি একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির এ ধরণের ভূমিকা জাতির জন্য তো বটেই, দল হিসেবে বিএনপির জন্যেও কল্যাণকর নয়। পত্র-পত্রিকার খবর থেকে দখো যায় - সারা দেশে খুন, ছিনতাই, দখলবাজি, ব্যাংকের অর্থ লুট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, নারী অপহরণ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ইত্যাদি নিরুদ্বেগে চলছে। এর সাথে সাথে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে গ্রেফতার, হামলা এবং মামলা তো আছেই। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ সত্ত্বেও সরকার ছাত্রলীগের দুষ্কৃতিকারীদের দমন করতে পারছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর নিহত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে ছিল এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ দিকে একুশে ফেব্রুয়ারীতে দেশব্যাপী যা হয়েছে সে খবর পাঠ করে বিদেশে বসে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। শহীদ মিনারে ফুল দেয়াকে কেন্দ্র করে নোয়াখালী, পিরোজপুর, গাইবান্ধা, লক্ষীপুর, ফেনী, ভোলা, লালমনিরহাট, চাঁদপুর প্রভৃতি এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী ঢাকায় শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসে ঢাকার এক কলেজ ছাত্রী এবং তার অভিভাবকরা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। এ সকল ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের দমন এবং শাস্তিবিধান না করে মুখস্থ আপ্তবাক্য, বঙ্গবন্ধুর দোহাই, স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র, বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি বলে কি সরকার জন-অসন্তোষ রোধ করতে পারবে? জনগণ বাস্তব কাজ চায়, এ সকল আপ্তবাক্য বার বার শুনতে চায় না। পরিশেষে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর একটি কথার উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের লেখা শেষ করতে চাই। কথাটা আমি শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের ডিপুটি চিফ অব ষ্টাফ কর্নেল (অবঃ) এ আর চৌধুরীর নিকট থেকে। এ আর চৌধুরীর বাসায় বসে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, জেনারেল ওসমানীকে আমি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা লেখার অনুরোধ করলে জবাবে তিনি বলেন, আমি এমন কোন কথা লেখতে চাই না যাতে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে মানুষের মনে খারাপ ধারনা তৈরি হয়। অথচ স্মৃতিকথা লিখলে প্রাসঙ্গিক ভাবে অনেক কথা এসে যাবে। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের সংখ্যা খুব বেশি নয়। যারাই আছেন তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস। ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে দেশপ্রেম সৃষ্টি এবং দেশসেবার প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। তাদের চরিত্র হনন করলে আমাদের ছেলেমেয়েরা হতাশ হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি হবে না। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় দলের নেতৃবৃন্দের কাছে আমাদের অনুরোধ, দয়া করে কোন জাতীয় নেতার বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় কথা বলবেন না। বিএনপির কেউ শেখ মুজিবকে পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু দেশের কোটি কোটি মানুষ শেখ মুজিবকে শ্রদ্ধা করে। একই ভাবে আওয়ামী লীগের কেউ কেউ জিয়াউর রহমানকে পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধা করে। যারা তাদের শ্রদ্ধা করে তাদের মতামতকে অন্তত শ্রদ্ধা করতে শিখুন। কেউ চাইলে এ দু নেতার অবদান এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে একাডেমিক সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু সেটা হতে হবে শালীনতা এবং শ্রদ্ধার সাথে। তাদের জীবনের অনেক ভালো ভালো দিক রয়েছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে তাদের ভালো দিক তুলে ধরুন। তখন জাতীয় নেতাদের মহৎদৃষ্টান্ত আমাদের ছেলেমেয়েদের দেশসেবার কাজে ব্রতী হতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। অপরকে শ্রদ্ধা করুন, মানুষও আপনাদের শ্রদ্ধা করবে। শেখ মুজিব আর জিয়াউর রহমান, কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না, রাজনীতিবিদ হিসেবে তারা সমসাময়িকও ছিলেন না। জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলতেন এবং তাঁর প্রতি কখনো অশ্রদ্ধা দেখান নি। কোন্ প্রেক্ষাপটে সৈনিক জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে পদার্পন করেন তা দেশবাসীর অজানা নয়। মনে রাখবেন, দেশ সেবার মহান কাজ ব্যাহত করে নেতাদের নিয়ে বাক-বিতন্ডা জাতির জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না। লন্ডন ৪ মার্চ ২০১০ |
|