![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
স্মরণ শীরু ভাই : এক ঝলক পিছন ফিরে দেখা
স্মরণ শীরু ভাই : এক ঝলক পিছন ফিরে দেখা ফরীদ আহমদ রেজা এক. কবি এবং সাংবাদিক বন্ধুদের প্রিয় বন্ধু মহিউদ্দিন শীরু চিরবিদায় নিয়েছেন। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। তার স্বজনদের প্রতি রইলো বুকভরা সহানুভূতি। দিনটা ছিল ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। সারা দিন খুব ব্যস্ত সময় কেটেছে। স্কুলের ওপেন ইভনিং ছিল। চারটা থেকে সাতটা পর্যন্ত অভিভাবকদের সাথে কথা বলে দেহ এবং মন দুটোই ছিল ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই অন্য দিনের চেয়ে একটু আগেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপিত এবং সুরমার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ ফোন করে দুঃসংবাদটি জানান। বললেন, খবরের সত্যতার ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই, গল্পকার সাঈম চৌধুরী নিশ্চিত হয়েই তাকে খবরটি দিয়েছেন। সাথে সাথে ফোন করলাম ড. রেনু লুৎফার কাছে। তার বেদনা ভারাক্রান্ত কন্ঠ শুনে বুঝলাম, ইতোমধ্যে তার কাছেও খবর পৌঁছে গেছে। তিনি বললেন, খবর পেয়েই শীরু ভাইয়ের বাসায় ফোন করেছেন। গত কয়েক দিন থেকে দেশ থেকে ঘন ঘন মৃত্যুর সংবাদ আসছে। জন্মের পর একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে নিশ্চিত সংবাদ হচ্ছে মৃত্যু। পরিণত বয়সে পৌঁছার পর কেউ মারা গেলে মানুষ তা সহজে গ্রহণ করে নিতে পারে, ব্যাপরটা সহনীয় পর্যায় থাকে। স¡জন এবং বন্ধুরা তার জন্য আহাজারি করলেও বয়সের কথা বিবেচনা করে সান্ত¡না খুঁজে পায়। সম্প্রতি দু জন জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং সিলেটের গৌরব সাইফুর রহমান এবং শাহ আব্দুল করিম ইন্তেকাল করেছেন। সাইফুর রহমানের মৃত্যু অস্বাভাবিক হলেও তার বয়স কম ছিল না। দেশের জন্য এবং সিলেটের জন্য তিনি অনেক কিছু করেছেন। বয়স, অসুস্থতা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার কর্মতৎপরতাকে অনেকটা সীমিত করে ফেলেছিল। বাউল কবি হিসেবে চিহ্নিত শাহ আব্দুল করিমেরও বয়স হয়েছিল। খুব সাধারণ অবস্থা থেকে সন্মানের শীর্ষে উঠার পর পরিণত বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এ দু জনের মুত্যু আমাদের শোকাহত করলেও সেখানে সান্ত¡না পাওয়ার পথ রয়েছে। পক্ষান্তরে শীরু ভাই পরিণত বয়সে ইন্তেকাল করেছেন বলার উপায় নেই। তার বয়স ছিল চুয়ান্ন বছর মাত্র। এ বয়সে মানুষ দেশ ও জাতির জন্য স্থায়ী কাজ করার সুযোগ লাভ করে। তাঁকে নিয়ে তাঁর বন্ধু এবং স¡জনদের সে স¡প্নই ছিল। কিন্তু মরণ এসে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। আমরা জানতাম শীরু ভাই অসুস্থ। কিন্তু তার মৃত্যু যে এতটা কাছে চলে এসেছে তা ভাবিনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি আবুল মাল আবদুল মোহিতের নির্বাচনী যুদ্ধে অনেক খেটেছেন। নতুন সরকার তাকে বাসস-এর সিলেট ব্যুরো-প্রধান হিসেবে আবার নিয়োগ দিয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন, অফিস গোছানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন - এ সকল খবর আমরা পাচ্ছিলাম। তাই তিনি পূর্ণ কর্মক্ষম ভেবে স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু কে জানতো বাইরে সক্ষম দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার আয়ূ ফুরিয়ে এসেছে। শীরু ভাই সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি নুরুজ্জামান মনি সাপ্তাহিক সুরমায় লিখেছেন, আমার বন্ধু মহিউদ্দিন শীরু । হ্যাঁ, তিনি এটা বলতে পারেন। সত্তর দশকে সিলেটে যারা ছিলেন তাদের কাছে মহিউদ্দিন শীরু এবং নুরুজ্জামান মনির বন্ধুত্ব প্রবাদতুল্য ছিল। আমরা তারা দু জনের নাম একই সাথে উচারণ করতাম শীরু-মনি বলে। আজকের প্রজন্ম শীরু ভাইকে সাংবাদিক হিসেবে জানে, আমরা তাকে জানতাম প্রথমে কবি হিসেবে। যতটুকু মনে পড়ে কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীর মাধ্যমে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। সেটা সত্তর দশকের কথা। সে সময় সিলেটের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আকসার বকসের ছাপাখানা ছিল সিলেটের তরুণ কবি-সাহিত্যকদের মিলন-কেন্দ্র। তারপর কবি দিলওয়ারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সমস্বর সাহিত্য গোষ্ঠী। এ সকল আড্ডার সদস্য না হলেও তাদের অনেককে জানতাম, অনেকের সাথে যোগাযোগ ছিল। কবি দিলওয়ার ঢাকায় চলে যাওয়ায় সমস্বরের তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়ে। পরে আমরা অধ্যাপক আসাদ্দর আলী এবং অধ্যাপক আফজাল চৌধুরীকে নিয়ে আরেকটি সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলি। এই তিনটি সাহিত্যগোষ্ঠীর প্রতিটিতে শীরু ভাইয়ের যাতায়াত ছিল। এ সকল সাহিত্য আড্ডায় শীরু ভাই কবিতা পড়তেন এবং কাব্যসমালোচনায় অংশ নিতেন। সবচেয়ে বড় কথা হাস্যরস ও কৌতুকের মাধ্যমে আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে রাখতেন। আমি চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় কিছুদিন অবস্থান করে আশির দশকে আবার সিলেটে ফিরে আসি। রাজনীতি ইস্তেফা দিয়ে এ ফিরে আসাটা ছিল আমার জন্য বিরাট বাঁকবদল। তখন লেখালেখি আমার শুধু নেশা নয়, পেশা হয়ে যায়। সিলেট ফিরে এসে দেখলাম সবার প্রিয় শীরু ভাই কোথাও স্থায়ীভাবে না থেকেও সর্বত্র রয়েছেন। তখন তিনি বাংলার বানীর সিলেট প্রতিনিধি। আমীনুর রশীদ চৌধুরীর যুগভেরী, আব্দুল ওয়াহিদ খানের সমাচার, মুকতাবিস-উন-নূরের সিলেট কন্ঠ - কোথাও শীরু ভাই চাকরি করেননি। কিন্তু তিনি এ সকল পত্রিকার অফিসে গেলে নতুন কারো পক্ষে এটা বোঝা কঠিন ছিল যে তিনি পত্রিকা অফিসের কেউ নন। পত্রিকা অফিসের বাইরে সিলেট বেতার, সাহিত্য সংসদ, শিশু একাডেমী, প্রেসক্লাব - যেখানে গিয়েছি সেখানেই তাকে পেয়েছি। সিলেট বেতারে আব্দুল হামিদ মানিক এবং শামসুল করীম কয়েসের অফিসরুমে বসে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। কিছুদিন পর সিলেট থেকে আরো দুটি প্রত্রিকা প্রকাশিত হয়। জাহিরুল হক চৌধুরী বের করেন সিলেট বানী এবং মুহিবুর রহমান বের করেন সিলেট সংবাদ। ভেতরের কথা জানি না, বাইর থেকে দেখে মনে হতো এ দুটো পত্রিকা শীরু ভাইয়ের ব্রেইন-চাইল্ড। কিছুদিন আমি সিলেট সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। সিলেট সংবাদের অফিসে পত্রিকার মালিক বিশ্বনাথ উপজেলার চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান না এলেও শীরু ভাই নিয়মিত হাজিরা দিতেন। পত্রিকা যে-দিন প্রকাশিত হতো এর আগের দিন এসে সংবাদ বাছাই, লিড নিউজ ঠিক করা, সংবাদ লেখা, সম্পাদনা করা ইত্যাদি কাজে স্বপ্রনোদিত হয়ে তিনি সাহায্য করতেন। দেখে মনে হতো তিনি-ই বুঝি পত্রিকার মালিক সম্পাদক। শীরু ভাইয়ের আরেক বন্ধু হারুনুজ্জামান চৌধুরীর কারণে শীরু ভাইয়ের সাথে আমার হার্দিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। হারুন ভাই যখন সাপ্তাহিক জালালাবাদ বের করলেন সেখানেও তাকে দেখেছি একই অবস্থায়। জালালাবাদের প্রকাশনা ও ব্যবস্থাপনায় তার অবদান ছিল অপরিসীম। প্রধানতঃ শীরু ভাইয়ের কারণেই আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা মরহুম সিরাজউদ্দিন আহমদ কিছু দিন সাপ্তাহিক জালালাবাদের সাথে জড়িত থেকেছেন। জালালাবাদের অফিস ছিল বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিতদের বাসার সামনের ঘরটি। আমি থাকতাম কুমার পাড়ার হোসেন ম্যানশনে। তাজপুর কলেজে ক্লাস শেষ করে ফিরে আসার পথে জালালাবাদ অফিসে যাত্রা বিরতি নিতাম। শীরু ভাই সেখানে আসতেন, আসতেন অনেক লেখক, রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিক। ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা এবং বিতর্ক চলতো। হারুন ভাইয়ের মধ্যে আড্ডাপ্রিয়তার সাথে সাথে ভোজনরসিকতাও রয়েছে। তাই আড্ডার সাথে খাওয়া-দাওয়াও হতো। একদিন শীরু ভাই বিয়ে করলেন এবং নিজের পত্রিকা সাপ্তাহিক গ্রাম-সুরমা বের করলেন। এতদিন সকল পত্রিকার অফিস যার অফিস ছিল, এখন তার নিজস্ব একটি পত্রিকা এবং অফিস হলো। গ্রাম-সুরমার অফিস আলোকিত করার জন্য লোকের অভাব ছিল না। সাংবাদিক এবং লেখক-কবিদের বাইরে সাধারণ কিছু মানুষকেও সেখানে দেখা যেতো। তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। তার প্যানেলের অন্যান্যরা পরাজিত হলেও শীরু ভাই বিজয়ী হলেন। শীরু ভাই যেহেতু রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, আমাদের আশা ছিল একদিন তিনি মন্ত্রি-এমপি হবেন। সে সম্ভাবনা তার মধ্যে অবশ্যই ছিল। তিনি মানুষের সুখ-দুঃখে অংশ গ্রহণ করতেন, জনগণের জন্য কাজ করতে হলে যে সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন তা তার মধ্যে ছিল, গণসংযোগের ব্যাপারে তার দক্ষতা ছিল এবং তার মধ্যে সততা ছিল। আমরা জানি, বর্তমান প্রজন্ম এ রকম গুণাবলী সম্পন্ন মানুষকেই মন্ত্রি-এমপি হিসেবে দেখতে চায়। আজ তিনি সব কিছুর উর্ধে চলে গেছেন। যাবার সময় তিনি একটি কথা জানান দিয়ে গেলেন, একদিন আমাদের সবাইকে এ পথে যেতে হবে এবং দিনটি আসার আগে আমরা কেউ সে দিনের সঠিক দিন-ক্ষণ জানতে পারবো না। আমি বৃটেন আসার আগেই শীরু ভাই একবার বৃটেন ঘুরে গেছেন। এখানে আসার পর তিনি দ্বিতীয়বার আসেন ৯৩ সালে। লন্ডনে থাকতেন হিউজেস ম্যানশন, হামিদ ভাইয়ের বাড়িতে। আমি থাকতাম কিংওয়ার্ড হাউসে। একদিন তিনি ফোন করে আমার বাসায় আসেন, বললেন জরুরী একটা বিষয়ে আমার পরামর্শ দরকার। আসার পর এ কথা সে কথার পর বললেন, লন্ডনের একটি পত্রিকা তাকে স্পনসর করতে আগ্রহী। জিজ্ঞেস করলেন, তিনি যদি লন্ডনে স্থায়ীভাবে আসার চেষ্টা করেন তা হলে ব্যাপারটাকে আমি কীভাবে নেব। জবাবে বললাম, দিল্লীর লাড্ডু আমি খেয়েছি, আপনি খাননি; কিন্তু দু জনই সমান ভাবে আফসোস করছি। আমার মতে আপনি দেশে থাকাই ভালো, আপনার সেখানে প্রয়োজন রয়েছে। পরে জেনেছি, শীরু ভাইকে আলোচ্য পত্রিকা স্পনসর করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এ দেশে আসতে রাজি হননি। দেশে থেকে দেশের সেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। আমরা অনেকে বিদেশের আরাম-আয়েশের প্রলোভন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারিনি। তিনি পেরেছেন, এ জন্য তাকে অভিবাদন। দুই. শীরু ভাই তার বন্ধুদের মাঝে বেঁচে থাকবেন সজ্জন বন্ধু হিসেবে এবং সাধারণ মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকবেন গীতিকার এবং কবি হিসেবে। বন্ধু রাগিব হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত ভিলেজ ডাইজেস্টকে দেয়া জীবনের শেষ সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, সংবাদপত্র, কবিতা বা অন্য মাধ্যমে যে ব্যক্তিগত বানী বলা যায় না সুরের মাধ্যমে সে বানী সকলের মাঝে পৌঁছে দেয়ার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ রয়েছে। তার লেখা আধুনিক গানের দুটো লাইন হচ্ছে, - 'মনে যে পড়ে না এমন তো নয় নিশিদিন তোমারেই মনে পড়ে তোমার স্মৃতিই হৃদয়ে আমার ভালবাসার এক প্রাসাদ গড়ে।' শীরু ভাই তার গানের বই 'ক্লান্ত রাতের ধ্রুবতারা' উৎসর্গ করেছেন বাউল কবি শাহ আব্দুল করিমকে। গত বছরগুলোতে শাহ আব্দুল করিমের সাথে তার একটি অত্যন্ত হার্দিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি প্রথম গানের গ্রন্থটি শাহ আব্দুল করিমকে উৎসর্গ করে দিয়ে শাহ আব্দুল করিমের প্রতি নিজের ভালবাসার প্রমাণ রেখে গেলেন। ক্লান্তরাতের ধ্রুবতারা গ্রন্থে আধুনিক, দেশাত্মবোধক, ঈদ ইত্যাদি বিষয়ক বেশ কয়েকটি গান সন্নিবেশিত হয়েছে। সিলেট রেডিওর গীতিকার হিসেবে তিনি আরো অনেক গান লিখেছেন। আমরা আশা করি তার সিলেটের স্বজনরা এ সকল গান সংগ্রহ করে স্বরলিপিসহ প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। মহিউদ্দিন শীরু ১৯৭২ সাল থেকে কবিতার জগতে আছেন। তার প্রচুর কবিতা বিভিন্ন পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে ছড়িয়ে রয়েছে। শীরু ভাইয়ের উৎসাহ এবং সহযোগিতায় অনেক নতুন লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছে। এটা লজ্জার বিষয় যে তার বইগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করতে আমরা কেউ উদ্যোগী হইনি। ২০০৮ সালে লন্ডনপ্রবাসী বিশিষ্ট সাহিত্যানুরাগী এবং বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব মোঃ মফিজুর রহমান ফারুকের বদান্যতায় শীরু ভাইয়ের গানের বই ‘ক্লান্তরাতের ধ্রুবতারা’ এবং কাব্যগ্রন্থ ‘পাখির স¡জন নেই’ প্রকাশিত হয়। আমরা তাঁর বন্ধুরা এ জন্য মোঃ মফিজুর রহমান ফারুকের কাছে কৃতজ্ঞ। অনেকে লক্ষ্য করে থাকবেন, ইদানীং লন্ডন-বাংলাদেশ প্রকাশনা-বানিজ্য একটা লাভজনক এন্টারপ্রাইজে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেকে লন্ডন নিয়ে বই প্রকাশ করছেন এবং অনেক বিলাত প্রবাসী বাংলাদেশী কবি-লেখকদের উৎসাহে নিজেদের নাম ছাপার অক্ষরে দেখে ধন্য(?) হচ্ছেন। শীরু ভাই একটু ইশারা করলে তার বই প্রকাশকের অভাব হতো না এবং লন্ডন প্রবাসীদের জড়িত করে অনেক কিছু তিনি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এ ধরণের প্রকাশনা বানিজ্যের পথে যাননি। এমন কি তার গানের বই বা কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবও হয়নি। এ কারণে সাধারণ পাঠকদের কাছে এর কোন খবরই পৌঁছেনি। এ লজ্জার দায় শীরু ভাইয়ের নয়, এ দায় আমরা যারা তার বন্ধু - তাদের। আমরা জেনেছি, মৃত্যুর পূর্বে শীরু ভাই কয়েকটি পান্ডুলিপি প্রকাশের জন্য তৈরি করেছেন। ড. রেনু লুৎফার মাধ্যমে জেনেছি, সিলেটের এক বিশিষ্ট ব্যক্তি শীরু ভাইয়ের অপ্রকাশিত বইগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিবেন বলে অঙ্গীকার দিয়েছেন। আমরা আশা করবো, অনতিবিলম্বে তিনি সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন। শীরু ভাই তার পাখির স্বজন নেই' গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা চৌধুরীকে। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার শিরোনাম ‘শিশিরের বিন্দু এসে’। তিনি সেখানে বলেন, - 'মধ্যরাতের আকাশ দেখেছো কখনো? দেখোনি। বাতাসের ঢেউ এসে খুলেনি জানালা তোমার দমকা হাওয়ায় শাড়ির আঁচল দোলেনি আচমকা ছোঁয়ায় শরীরে শিহরণ জাগেনি।' গ্রন্থের সর্বশেষ কবিতায় সিতারা, মুক্তি, সঞ্জীব এবং মউজদীন - এ চারজন প্রয়াত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কবি মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। সিতারা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অকাল প্রয়াত কন্যা। তার সম্পর্কে কবি বলেন, - 'লাইট মোর লাইট আরো আলো চাই, আলো আলোকিত একজন অধ্যাপক সিতারাকে ঘিরে ফেলে বীভৎস আঁধার অথচ চারিদিকে ছিল আলোর সব যাত্রী সে ছিল বন্ধু সবার।' কবি মুমিনুল মউজদীন আরেক অকাল প্রয়াত কবি।তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে মহিউদ্দিন শীরু বলেন, - 'সে ছিল বন্ধু সবার এই তালিকার চতুর্থ ও শেষ নাম সে এক ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোর সাথে মিতালী করতো পূর্ণিমার রাতে রাস্তার লাইট নিভিয়ে দিতো আজ প‚র্ণিমার চাঁদ দেখি আমরা সবাই আঁধার তাকে ছিনিয়ে নিল প্রকাশ্য দিবলোকে একগুচ্ছ আঁধার সে আঁধারের রূপ আমিও দেখেছি।' আমরা জানি সর্বশেষ চরণটির মাধ্যমে শীরু ভাই নিজের হার্ট এটাকের খবরটি পাঠকদের অবহিত করছেন। মৃত্যুকে তিনি এখানে 'বীভৎস আঁধার' এবং 'একগুচ্ছ আঁধার' হিসেবে অভিহিত করেছেন। মৃত্যুর ব্যাপারে অন্যত্র শীরু ভাই গদ্যে কথা বলেছেন। সিলেটের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সিরাজউদ্দিন আহমদ স্মারক গ্রন্থের প্রসঙ্গকথায় তিনি বলেন, 'নশ্বর এই পৃথিবীতে মৃত্যু বেদনাদায়ক হলেও মৃত্যুকে এড়ানোর পথ নেই। মৃত্যু মানুষকে ছিনিয়ে নেয়। মহাকালের গর্ভে মানুষ হারিয়ে গেলেও তাঁর কীর্তি ম্লান হয় না। কীর্তির মাঝেই মানুষ বেঁচে থাকে। কখনো কখনো ব্যক্তির কীর্তি তাঁকে অমরত্বের আসন দান করে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের কর্ম আর কীর্তি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে আগামীর মাঝে।' মানুষ তার কর্মের মাঝে বেঁচে থাকে - এই অমর বানীর সাথে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। মৃত্যু নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথমে মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান বললেও শেষে এসে বলেছেন, 'মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে মানুষেরই মাঝে বাঁচিবারে চাই। এই স‚র্যকরে এই পুস্পিত কানেন জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই।' অবশ্য খলিল জিবরানের কাছ থেকে আমরা শুনি ভিন্ন রকম উচারণ, 'এসো হে মোহনীয় মরন, এসো। আমার হৃদয় তোমার প্রত্যাশায় প্রহর গুনেছে। এসো আমার কাছে এবং জীবনের শিকল খুলে দাও, আমি এতো দুর্বল যে এটা খোলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। হে মোহনীয় মৃত্যু, এসো, আমার পাড়া-প্রতিবেশীর হাত থেকে আমাকে আমাকে মুক্ত করো। তাদের দৃষ্টিতে আমি এক অপরিচিত ব্যক্তি, ফেরেশতার ভাষায় কথা বলি। জলদি এসো, হে শান্তির মৃত্যু।' 'তুমি মরণের গূঢ় রহস্য তখনই জানতে পারবে যখন জীবন থেকে তা অনে¡ষণ করবে। রাতের অন্ধকারে আবদ্ধ পেচক আলোকোজ্জল দিনের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনা। মৃত্যুর প্রাণ-শক্তি ধারণ করতে হলে মনের দরোজাকে জীবনের সামনে উন্মূক্ত করে দিতে হবে। নদী এবং সমুদ্রের মতোই জীবন এবং মৃত্যু একই জিনিসের নাম।' খলিল জিবরানের মৃত্যু ও জীবনকে নদী ও সমুদ্রের সাথে তুলনা বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবী শব্দ ইন্তেকাল-এর দিকে ইঙ্গিত দেয়। খলিল জিবরান ইংরেজি ভাষায় কাব্য রচনা করলেও তিনি লেবাননের লোক এবং তার মাতৃভাষা ছিল আরবী। ইন্তেকাল শব্দের সঠিক অর্থ হচ্ছে স্থানান্তর। নদীর শেষ ঠিকানা সমুদ্র এবং মানুষের শেষ ঠিকানা পরকাল। পরকালে বিশ্বাসী সৎকর্মশীল লোকদের দৃষ্টিতে মৃত্যু আসলে পরকালে উপস্থিত হবার প্রবেশদ্বারমাত্র। এ জন্যে কারো যখন দুনিয়ার জীবন থেকে পরকালীন জীবনে স্থানান্তর ঘটে তখন আমরা বলি তার ইন্তেকাল হয়েছে। শীরু ভাই পরকালে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে তার পরকাল বিশ্বাস দুনিয়াকে পরিত্যাগ করে নয়। তিনি মানুষের সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। তার কর্মের মাধ্যমে তিনি অবশ্যই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। শীরু ভাইয়ের স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী অনুরোধ করেছেন, আমরা যেন দোয়া করি - আল্লাহ যেন তাকে অনুগ্রহ করেন মাফ করে দেন। হাসিনা চৌধুরী আরো বলেছেন, তিনি জীবনে কারো অনিষ্ট করেননি। মৃত্যুর একটু আগেও জনৈক অভাবগ্রস্থ ব্যক্তির জন্য একটা চাকরির বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। নিজের স্ত্রীর এই সাক্ষ্য একজন মানুষের জন্য অনেক বড় একটা পাওনা। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ শীরু ভাইকে এবং আমাদের সবাইকে মাফ করুন। লন্ডন ২ অক্টোবর ২০০৯ সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ মহিউদ্দিন শীরু ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুলাই বালাগঞ্জ থানার জামালপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আজির উদ্দিন আহমদ এবং মাতা মরহুমা কমরুন্নেসা খাতুন। মহিউদ্দিন শীরু গ্রামের স্কুল জামালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি, দেওয়ান আব্দুর রহিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি, মদন মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং সিলেট এম.সি কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। তিনি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে এম.এ পাশ করেন। সাপ্তাহিক যুগভেরীর মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন সময় সিলেট বাণী, দৈনিক বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক জালালাবাদ, সিলেট সংবাদ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা দৈনিক গণজাগরণ প্রভৃতি কাগজে কাজ করেন। সিলেট থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গ্রামসুরমা ও ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত দৈনিক সুদিন সম্পাদনা করে আসছেন। সর্বশেষ তিনি 'দি নিউজ টুডেতে সিলেট বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। |
|