![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
ফিতরার টাকা গরীবের হক, মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য নয়
রাজপথ জনপদ ফরীদ আহমদ রেজা ফিতরার টাকা গরীবের হক, মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য নয় সাভার মডেল টাউন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাতটি খাসি জবাই করে ইফতার পার্টির আয়োজন করে বাংলাদেশে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। তার ইফতার পার্টিতে সাংবাদিক ও সরকারী কর্মকর্তাসহ সমাজের অনেক গন্যমান্য ব্যক্তি যে উপস্থিত ছিলেন সে খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে। মাহে রমজানের শেষ লগ্নে এসে বিলাতের মুসলিম কমিউনিটিতেও বাংলাদেশের অনুকরনে ইফতার পার্টি আয়োজনের ধুম চলছে। মনে হচ্ছে গণসংযোগের মোক্ষম এ সুযোগকে কমিউনিটি সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান - কেউ হাত ছাড়া করতে চান না। আমি যতটুকু বুঝি, ইফতার পার্টির মূল টার্গেট গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাদের সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় দুটো অন্ন মুখে দেয়ার সামর্থ্য নেই। কিন্তু আমাদের ইফতার সংস্কৃতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বরাবরই উপেক্ষিত। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মেহনতি মানুষ অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত থেকে রোজা রাখছে। কিন্তু তাদের নিয়ে সেখানে কেউ ইফতার পার্টির আয়োজন করেনা। রবাহুত হয়ে এই খেটে খাওয়া মানুষের কেউ সেখানে এলে দূর দূর বলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। ইসলামের অন্যান্য চমৎকার সামাজিক রীতিনীতির মতো রোজাদারকে ইফতার দিয়ে আপ্যায়ন করার মতো মহৎ একটি ঐতিহ্যেক এ ভাবেই আমরা বিনষ্ট করছি। গত লেখায় বিলাতে হোমলেসদের নিয়ে ইফতার পার্টি আয়োজনের পক্ষে কথা রেখেছিলাম। কয়েকজন পাঠক তা পাঠ করে ব্যক্তিগত ভাবে তাদের সপ্রশংস প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করেছেন। জানতে পেরেছি, তরুণদের কয়েকটি সংগঠনের মিলিত উদ্যোগে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার আলতাব আলী পার্কে ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, গৃহহীন বা হোমলেসদের নিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছে। কামনা করি, তাদের এ উদ্যোগ সফল হোক এবং লন্ডনের অন্যান্য এলাকার তরুণরা এ মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরন করতে এগিয়ে আসুক। রেজা শুরুর সাথে সাথে বিলাতের বিভিন্ন বিপনী বিতানে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে এবং এখন তা প্রায় তুঙ্গে। প্রতিবারের মতো এবারও আমি বিলাতের মুসলমানদের একটি অনুরোধ জানাব। দয়া করে আপনাদের ঈদের আনন্দে প্রতিবেশী অমুসলমান জনগোষ্ঠীকে শরিক করার চেষ্টা করবেন। ঈদের দিন আমাদের সকলের বাড়িতে মজাদার খাবার তৈরি হয়। আমাদের প্রতিবেশী অমুসলানদের সে খাবারে শরিক করার মাধ্যমে আমরা তাদের কাছে ইসলামের সাম্য-মৈত্রী এবং ভ্রাতৃত্বের বানী পৌঁছে দিতে পারি। এ রকম একটা চমৎকার সুযোগকে শুধু আহাম্মকরাই উপেক্ষা করতে পারে। আমি এ সুযোগে রমজানের ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। রমজানের ঈদের সাথে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরানার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। আমরা বিলাতের মুসলমানরা ফিতরা আদায় করি ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় গরীবের পেটে লাথি মেরে সেটা আদায় করি। দুঃখজনক হচ্ছে, সে লাথিটা আমরা গরীবের পেটে মারছি আলেমদের নিকট থেকে ছাড়পত্র নিয়ে। । ঈদের নামাজ পড়ার আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমান তার পরিবারের সকল সদস্যদের পক্ষে একটা নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ গরীবদের প্রদান করেন। এ অর্থকে ফিতরা বলা হয়। ফিতরার উদ্দেশ্য হচ্ছে গরীব বা নিরন্ন জনগোষ্ঠীকে ঈদের আনন্দের সাথে শরিক করা। ইসলামের নবী ফিতরার আর্থিক পরিমাণ নির্ধারিত করে দেননি। এক সা পরিমান খেজুর, বার্লি, পনির, কিসমিস, আংগুর, আটা ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রীর অনুপাতে তা আদায়ের বিধান রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন কেজি থেকে চার কেজি ওজনের সমপরিমাণকে এক সা বলা হয়। উলামায়ে কেরাম এর আলোকে প্রতি বছর বিলাতের মুসলমানদের জন্যে ফিতরার একটি পরিমান ঠিক করে দেন। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছি, খাদ্যসামগ্রীর মূল্য প্রতি বছর বৃদ্ধি পেলেও গত কয়েক বছর যাবৎ বিলাতে ফিতরার পরিমান তিন পাউন্ডে এসে আটকে আছে। ঈদের দিন খাবারের পেছনে আমরা জনপ্রতি যে খাদ্যসমাগ্রী ভক্ষন এবং অপচয় করি এর পরিমান কি মাত্র তিন পাউন্ড? ইফতারের পেছনে আমরা জনপ্রতি কত পাউন্ড ব্যয় করি? সত্যিকার অর্থে আমাদের ব্যয়-ক্ষমতার আলোকেই ঠিক করতে হবে আমাদের ফিতরার পরিমান। বিলাতের বাঙালি মুসলমানদের কয়জন আটা খান? আমরা কি খেজুর, পনির, কিসমিস ইত্যাদি খাই না? গোটা রমজান মাস বিলাতের প্রতিটি পরিবারে খাওয়া-দাওয়ার জাকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকে। ঈদের দিন সে আয়োজন কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আমাদের জনপ্রতি ব্যয়ের আলোকেই ফিতরার পরিমাণ আমরা নির্ধারণ করবো। কিন্তু আমরা নিজের জন্য কোরমা-পোলাও-এর আয়োজন করি এবং গরীবের হক বন্টনের সময় গম বা আটা দিয়ে হিসাব করি। এটা কি ধরণের ইনসাফ? বিলাতের বিশিষ্ট আলেম এবং মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মুমিনুল ইসলাম ফারুকী অনেক কষ্ট করে ফিতরা হিসেবে দেয় বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর বর্তমান বাজারমূল্যের একটি তালিকা আমাকে দিয়েছেন। বাঙালি কবি নজরুল ঈদ নিয়ে বেশ কটি কবিতা লিখেছেনে। এর একটিতে তিনি ভুখা-নাঙ্গা এবং মেহনতি মানুষের পক্ষে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, 'জীবনে যাদের হর-রোজ রোজা ৰুধায় আসে না নিদ' - তাদের জন্যে আনন্দের বার্তা নিয়ে মুসলমানদের সমাজে ঈদ এসে হাজির হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের অধিকাংশই প্রাচুর্যের মধ্যে রোজা এবং ঈদ উদযাপন করেন। বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশে কোটি কোটি মুসলমান মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাদের কথা যদি আমরা না ভাবি তা হলে আমরা কিসের মুসলমান? নীতিগত ভাবে পুঁজির শোষনের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান ব্যাখ্যার অপেৰা রাখে না। আমাদের গৌরব কবি নজরুল সেটাকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু মুসলমানদের জীবন থেকে এর দৃষ্টান্ত আমরা খুব কমই দেখতে পাই। বিলাতের মুসলিম সমাজে বিত্তশালীর সংখ্যা তুলনামুলক ভাবে কম হলেও সংখ্যার বিচারে তা নগন্য নয়। তবে মুসলিম বিশ্বে এর পরিমাণ মোটেই কম নয়। মুসলিম বিত্তশালী এবং অমুসলিম বিত্তশালীর মধ্যে দৃষ্টিকোণগত দিক দিয়ে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকার কথা। সেটা না থাকার কারণে অনেকে ইসলামকে পুঁজিবাদের সমর্থক হিসেবে দেখেন। ইসলামী রাজনীতির সাথে জড়িত অধিকাংশ ব্যক্তির কথা-বার্তা এবং আচার-আচরণও সে ধারণা পাকাপোক্ত করার পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে ফরাসী বিপ্লবের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বানী অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত। ফরাসী বিপ্লবের হাজার বছর আগে ইসলাম মানুষে মানুষে সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের বানী প্রচার করেছে, এর আলোকে একটি উন্নত ও গতিশীল সমাজ বিনির্মান করেছে। একই ভাবে মার্টিন লুথার কিং-এর মার্কিন সমাজে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমাদের অনেকের কাছে অনুকরনীয় আদর্শ। কিন্তু খৃষ্টীয় সপ্তম শতকে মদীনায় যে সমাজ বিপ্লব সাধিত হয় সেখানে কুরাইশ বংশের অভিজাত আবু বকর, রোমান সুহাইব এবং কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস বেলালের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সকল কথা এখন ইতিহাসের বিষয় এবং একটি ভুলে যাওয়া ইতিহাস। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বানী এবং এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত শোষনহীন সমাজব্যবস্থা আজকের যুগে আমাদের চোখে না পড়লেও ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধানে এর রেশ এখনো আমরা প্রত্যক্ষ করি। ইসলামের জাকাত, ফিতরা, ওশর, উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদির কারণে ধন-সম্পদ এক শ্রেনীর হাতে কুক্ষিগত না থেকে জনগণের মধ্যে আবর্তিত হয়। রোজা, ফিতরা, জাকাত, ঈদ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণহীন সমাজ বিনির্মানের প্রেরণা বিদ্যমান রয়েছে। পরিতাপের বিষয়, যারা এ সকল আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে বেশি হৈ চৈ করেন তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে-ই এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত নয়। এ কারণে ইসলামী বিধি-বিধান অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব হয়ে পড়ে এবং সমাজ বা রাষ্ট্র এর সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। আমরা এ দিকে সচেতন মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। লন্ডন ১০ সেপ্টে'র ২০০৯ faridahmedreza@hotmail.com |
|