![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
হোমলেসদের নিয়ে ইফতার ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
- ফরীদ আহমদ রেজা বতর্মানে বিলাতে মসজিদ এবং ইসলাম অনুরাগী ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অভাব নেই। তাদের কল্যাণে আমরা রোজা কেন রাখতে হবে এবং কি ভাবে রাখতে হবে, রোজার আত্মিক-দৈহিক ও সামাজিক তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের জ্ঞানকে তাজা ও সময়োপযোগী করতে পারছি। তাই এখানে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কোন আলোচনা না করে শুধু নামাজি ও রোজাদার মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মাত্র দুটো কথা এখানে নিবেদন করবো। এক. আমরা অনেকে অনেক বছর থেকে থেকে রোজা রাখছি। যাদের বয়স চল্লিশ-পঞ্চাশ বা ষাটের কোঠায় তারা কমপক্ষে দশ-পনেরো বছর বয়স থেকে রোজা রাখা শুরু করেছি এবং এখনো তা অব্যাহত রেখেছি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, রোজা রাখার ফলে আমাদের মধ্যে কি কোন পরিবতর্ন আসছে? গত ত্রিশ-চল্লিশ বছর রোজা রাখার ফলে আমরা বোঝা বা অনুধাবন করার মতো কি সুফল পেয়েছি? কুরআন-হাদীসে রোজার ফজিলত সম্পর্কে অনেক কথা আছে। মৃত্যুর পর সে ফজিলত আমরা দেখতে পাবো। কিন্তু রোজার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু বিষয় আছে যা আমাদের পার্থিব জীবনের সাথে জড়িত। আমাদের সমাজ এবং আশপাশের মানুষ তা দেখবে এবং আমরা ব্যিক্তগত ভাবে তা অনুভব করবো। যেমন, মহানবী (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা অথবা মিথ্যার উপর আমল করা পরিত্যাগ করেনি আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই যে সে পানাহার পরিত্যাগ করবে। এ হাদীসের আলোকে ইমাম গাজ্জালি বলেন, মিথ্যাচার, প্রতারণা, গিবত, ইত্যাদি কাজ রোজাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়। আমরা যারা বছরের পর বছর যাবৎ রোজা রাখছি এবং তরাবিহ আদায় করছি তাদের উচিত নিজের জীবনকে মহানবী (সঃ) প্রদত্ত এ কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখা। রোজা আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে চায়, বিশুদ্ধ ও পরিশুদ্ধ করতে চায়। রোজার দৈহিক বা সামাজিক উপকার হচ্ছে এর বাই-প্রডাক্ট এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিশুদ্ধি এর আসল উদ্দেশ্য। আমরা যদি দেখি, রোজা আমাদের জীবন ও সমাজকে সুন্দর করছে; মিথ্যা, প্রতারণা, ঘুষ, গিবত, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্ত করছে তা হলেই আমরা বলতে পারি রোজা আমাদের জীবনে বাঞ্ছিত পরিবর্তন আনতে পারছে, রোজার উদ্দেশ্য সার্থক হয়েছে। অতীতকে অতীত করে দিয়ে এবারের মাহে রমজানকে আমরা কি ভাবে পালন করবো সে ব্যাপারে এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোজা রেখে অন্যান্য লোক কি করছে সে চিন্তা বাদ দিয়ে আমি কি করবো সেটাই হতে হবে আমাদের পরিকল্পণার মূল টার্গেট। দুই. আমরা বিলাতের মুসলমানরা এমন একটি দেশে রমজান উদযাপন করছি যে দেশের অধিকাংশ মানুষ অমুসলমান। এটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় যে আমরা এখানে স্বাধীন ভাবে নামাজ-রোজা করতে পারছি। যে দেশ আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নামাজ-রোজা করার নিশ্চয়তা বিধান করেছে সে দেশের প্রতি মুসলমান হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। অনেকে এ দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার ফলে আমাদের উপর এক সাথে দুটি দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, একটি মুসলমান হিসেবে এবং ওপরটি নাগরিক হিসেবে। নীতিগত ভাবে মুসলমানরা যে দেশে যাবে সে দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করবে। ভিজিটর হিসেবে গেলেও তাকে সে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু একজন মুসলমান কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে তিনি সে দেশকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। সে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি কাজ করবেন এবং কেউ সে দেশের ক্ষতি করতে উদ্যত হলে তিনি তাকে প্রতিহত করবেন। রমজান মাসে মুসলমানরা সৎকর্মের ব্যাপারে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে অগ্রসর হন। দেশের এবং দেশের মানুষের উপকার করা একটি বড় সৎকর্ম। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে এ দেশের মানুষের উপকারকে আমাদের প্রধান্য দিতে হবে। আমরা যে এলাকায় বাস করি সেখানে অভাগ্রস্থ, বিপদগ্রস্থ মানুষের অভাব নেই। অমুসলমানদের মধ্যেও অনেক অভাগ্রস্থ এবং বিপদগ্রস্থ মানুষ রয়েছেন। বাংলাদেশ, প্যালেস্টাইন, সোমালিয়া, পাকিস্তান, ইরাক প্রভৃতি দেশের কথা আমরা ভাবি; মুসলমান হিসেবে এটা ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু এর সাথে সাথে আমাদের প্রতিবেশীদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। আমরা যাদের সাথে জীবন-যাপন করছি, যারা আমাদের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের অংশীদার তাদের কথা আমাদের ভুলে থাকলে চলবে না। আমাদের জানা আছে, প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে মহানবী(সঃ)আমাদের বার বার সাবধান করে দিয়েছেন। এমন কি তিনি এটাও বলেছেন যে, তাকে প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে এতো বেশী তাগিদ দেয়া হয়েছে যে তিনি ভয় করছেন হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার করে দেয়া হবে। প্রতিবেশী অমুসলিম হলেও তার অধিকার সম্পর্কে আমাদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে। মানবতার এ মহান বার্তা কি আমরা দুই মিলিয়ন মুসলমান এ দেশের ৬৫ মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি? আমরা কেন রোজা রাখি, কেন তারাবিহ পড়ি, কেন ইফতার করি এবং কেন খাওয়াই - এ সকল বিষয়ে অমুসলমানরা কিছুই জানে না। যারা কিছুটা জানে তাদের জানার উৎস হচ্ছে ইসলাম বিদ্বেষী লেখকদের বই-পুস্তক। তাই এ দেশের খুব কম লোকই ইসলাম সম্পর্কে সুধারণা নেই। তারা কেউ কেউ মিডিয়া সন্ত্রাস এবং ইসলাম-বিদ্বেষী বুদ্ধিজীবীদের প্রচারণার সাথে বাস্তবতার মিল এবং অমিল খোঁজে দেখতে চায়। তাদের দেশে বসে আমরা যে সকল আচার-অনুষ্ঠান পালন করি তা তারা পরখ করে দেখতে চায়। আমরা কেন এ সব করছি, তাদের কি এটা জানার অধিকার নেই? তাদের অবশ্যই সেটা জানার অধিকার রয়েছে এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের এ ব্যাপারে অবহিত করা। কিন্তু আমাদের কারো সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ইফতার করানোর প্রতিদান কি তা আমরা জানি। আমাদের সমাজে ফজিলত আর কালচার এখন এক হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল, কমিউনিটি সংগঠন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেউ এ কালচারের বাইরে নয়। এতে কোন দোষ নেই, যদি প্রদর্শনীর ইচ্ছা না থাকে এবং অপচয় না হয়। বরং এতে প্রভূত কল্যাণ রয়েছে। কোনটা প্রদর্শনী সেটা আমরা জানি না। তবে কোনটা অপচয় সেটা বোঝার জন্য কাউকে পন্ডিত হতে হয় না। ছোট বাচ্চারাও তা বুঝতে পারে। কিন্তু একটা ব্যাপর আমার মাথা ঢুকে না। আমরা কেন ইফতার পার্টিতে আমাদের প্রতিবেশী অমুসলমানদের শরিক করি না? ইফতার পার্টিতে অমুসলমানদের দাওয়াত দিলে কি আল্রাহ অসন্তুষ্ট হবেন? না কি আমাদের রোজা নষ্ট হয়ে যাবে? আমাদের প্রতিবেশী অমুসলমানদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের এ রকম একটা চমৎকার সুযোগকে আমরা বছরের পর বছর যাবৎ অবহেলা করে চলেছি। আমাদের উলামায়ে কেরামও এ ব্যাপারে কোন কিছু বলছেন না। তারা এ ব্যাপারে মুখ খুললে অনেক মানুষ এগিয়ে আসবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা আশা করি বিলাতের উলামায়ে কেরাম, বিশেষ করে বড় বড় মসজিদের সম্মানিত খতিবগণ ইফতারে এবং ইফতার পার্টিতে অমুসলমানদের শরিক করার ব্যাপারে মুসলামানদের উৎসাহিত করবেন। গত বছর এক দল সাহসী তরুণ বিলাতের হোমলেস লোকদের নিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল। যতটুকু মনে পড়ে তারা দুটি পার্কে এ রকম একটি ব্যতিক্রমধর্মী ইফতার পার্টির ব্যবস্থা করেছিল। তাদের এ আয়োজনের খবর একটি মেইনস্ট্রিম দৈনিক খুব ফলাও করে প্রকাশ করেছে। আমরাও এই কলামে তাদের প্রশংসা করেছি এবং অন্যান্যদের তাদের মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণের আহবান জানিয়েছি। আমরা আশা করছি, এ সকল তরুণের দৃষ্টান্তে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ বছর বিলাতের বিভিন্ন শহরের তরুণরা হোমলেসদের নিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজনে এগিয়ে আসবেন। এর মাধ্যমে আমরা ইসলামের সাম্য, মৈত্রী এবং মানবতার বানী এ দেশের সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ লাভ করবো। লন্ডন ২০ আগস্ট ২০০৯
|
|