|
বিলাতের সমকালিন বাংলা কবিতা
বিলাতের সমকালিন বাংলা কবিতা ফরীদ আহমদ রেজা
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ঘরকুনো হিসেবে পরিচিত বাঙালি আর ঘরকুনো নয়। লেখাপড়া এবং রুজি-রোজগারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তারা স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করছেন। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি, বিশেষ করে কবিতাচর্চা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা কবিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে লন্ডন, নিউইয়র্ক, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠী এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছেন। যাদের ত্যাগ, পরিশ্রম, কবিতার প্রতি ভালবাসা এবং অঙ্গীকারের কারণে বাংলা কাব্যচর্চা আজ বিশ্বব্যাপী সমপ্রসারিত হয়েছে তাদের অভিনন্দন। বিলাতে বাংলা সাহিত্যচর্চা কখন থেকে শুরু হয়েছে এ নিয়ে এখনো একক কোন গবেষণা হয়নি। তবে অনুমান করা যায়, বিলাতে বাঙালির আগমন এবং বাংলা কাব্যচর্চা একই সাথে অগ্রসর হয়েছে। ফারুক আহমদ লিখিত 'বিলাতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা' গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, যুক্তরাজ্য থেকে ১৯১৬ সালে প্রথম বাংলা পাক্ষিক 'সত্যবানী' এবং ১৯৪০ সালে প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক 'জগৎ-বার্তা' প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক 'জগৎ-বার্তা' পত্রিকার কোন কোন সংখ্যায় দু'একটি ছড়া ও কবিতা প্রকাশিত হতো। সে সময় থেকে নিয়ে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলা কাব্যচর্চা বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আজকের লেখায় প্রথমে বর্তমান সময়ে বিলাতে যারা বাংলা ভাষায় কবিতা চর্চা করেন তাদের একটি তালিকা দিতে চেষ্টা করবো। বোধগম্য কারণে এ তালিকা সম্পূর্ণ হবেনা । তবে এর পর যারা এ রকম একটা তালিকা তৈরি করতে প্রয়াসী হবেন তারা এখান থেকে উপাত্ত পাবেন। ইতোপূর্বে আতাউর রহমান মিলাদ 'তৃতীয় বাংলার কবিতা', কাদের মাহমুদ 'বিলাতের বাংলা কবিতা', ডাঃ মাসুদ আহমদ ‘বাংলা কবিতা’, তাবেদার রসুল বকুল 'বৃটেনের কবি ও কবিতা', রব্বানী চৌধুরী 'বিলেতে বিশ শতকের বাংলা কবিতা' এবং কাজল রশীদ-পুলক কানত্দি ধর 'কাব্যস্নান'-এর মাধ্যমে বৃটেনের বাঙালি কবিদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। সাপ্তাহিক সুরমা খুবই শোভন ও সমৃদ্ধ একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করে। এ সাময়িকীকে কেন্দ্র করে এক ঝাঁক তরুণ সাহিত্যকমর্ী বেড়ে উঠছেন। বিলাত থেকে প্রকাশিত অন্যান্য বাংলা পত্রিকায়ও মাঝে মধ্যে সাহিত্যপাতা দেখা যায়। এর বাইরে রয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন। বিলাতের কবিকমর্ীদের তালিকা প্রণয়ন করতে গিয়ে এ সকল পত্রিকা এবং লিটল ম্যাগাজিনের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছি। তারা সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কবিদের তালিকায় আমি তাদেরও অনত্দর্ভূক্ত করেছি যারা ছড়া লিখছেন। আমার মতে ছড়া কবিতারই একটি শাখা। ইংরেজী সাহিত্যে যারা লিরিক লিখেন তাদের কবি বলে গন্য করা হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল প্রতিভাবান কবি ছড়া লিখেছেন। বড় মাপের কবি না হলে কখনো কালজয়ী ছড়া লেখা সম্ভব নয়। আমাদের সৌভাগ্য যে অসংখ্য প্রতিভাবান কবি তাদের কালজয়ী ছড়া দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং করছেন। বিলাতের কবিরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বিলাতের কাব্য সাহিত্যকে যারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে সরব রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন অনিন্দ্য রায়, অমরনাথ চক্রবতর্ী, আজম ফারুক, আতাউর রহমান মিলাদ, আনিসুর রহমান আনিস, আনোয়ারুল ইসলাম অভি, আফরোজা আলী, আবুল বশর আনসারী, আবু বকর আহমদ হারুন, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আবদুল কাইয়ুম, আব্দুল আজিজ তকি, আব্দুল মুকিত অপি, আবু মকসুদ, আবু তাহের, আমান সেখ, আহমদ ময়েজ, আহমদ হোসেন হেলাল, আশেকুর রহমান আশিস, আমানউল্লাহ অশ্রু, আব্দুল মুমিন, আব্দুর রউফ মিলন, আবু সুফিয়ান চৌধুরী, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল মুকিত মুকতার, আব্দুর রকিব, আবু সাইয়িদ আনসারী, আব্দুস শহীদ চৌধুরী, আপেল মাহবুব, আলিফ উদ্দিন, আলাদিন চৌধুরী, ইমামুজ্জামান মহি, ইকবাল হোসেন বুলবুল, ইকবাল বাহার সোহেল, উদয় শংকর দাস দুর্জয়, উর্মিলা আফরোজ, এমদাদ তালুকদার, এস এম তাজুল ইসলাম, এস আর লকনু চৌধুরী, এহসান কলিন্স, এস আই চৌধুরী বাবলু, ওয়ালি মাহমুদ, ওয়ালি রহমান, ওবায়দুর রহমান, কাদের মাহমুদ, কাজল রশীদ, খাদিজা শাহজাহান, খাতুনে জান্নাত, গোলাম কবির, জাফরি জোবায়েদ, জামিল সুলতান, জমির হোসেইন, জুনেদ শাহ্, ডঃ কুদরত-উল-ইসলাম, ডাঃ ফয়জুল ইসলাম, দিনার হোসেন, তাবাস্সুম ফেরদৌস, তাবেদার রসুল বকুল, তোফায়েল হোসেন রাসেল, তমাল ফেরদৌস, তারেক হোসেন লিটন, দিলু নাসের, দীনুজ্জামান চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, নজরুল ইসলাম নাজ, নজরুল ইসলাম বাসন, নজরুল ইসলাম আছলমী, নুরুন্নাহার শিরীন, নূরুজ্জামান মনি, পাপিয়া রহমান শিখা, ফারুক আহমদ রনি, ফয়জুর রহমান ফয়েজ, ফয়জুল আলম বেলাল, ফারুক যোশি, ফরীদ আহমদ রেজা, ফারহানা হক, বদরুজ্জামান, মুজিব ইরম, ময়নুর রহমান বাবলু, মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল হেলাল, মো: আব্দুল মুনিম ক্যারল, মোহাম্মদ মারুফ, মোহাম্মদ নুরুল হুদা, মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, মোসত্দফা আহমদ মোশতাক, মাসুদ আহমদ, মাসুম রহমান আকাশ, মারুফ রেজওয়ান, মুকুল ইকবাল, মাজেদ বিশ্বাস, মোহাম্মদ শামসুল হক, মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ ইকবাল, মুজিবুর রহমান বাবলু, মাহমুদ হাসান, মাহফুজা তালুকদার, মুকিদ চৌধুরী, মনজুরুল আজিম পলাশ, মাসুদা ভাট্টি, মালেক ইমতিয়াজ, মাসুক ইবনে আনিস, মির্জা জুয়েল আমীন, মিল্টন রহমান, মঞ্জুলিকা জামালী, রব দেওয়ান সৈয়দ, রাসেল, রেণু লুৎফা, রকিব আলী, রব্বানী চৌধুরী, রহমত আলী পাতনী, লোকমান আহমদ, শফি আহমদ, শাহ্ শামীম আহমেদ, শাহ সোহেল, শরীফুজ্জামান, শাহনাজ সুলতানা, শামীনা চৌধুরী মুনি্ন, শামসুল জাকি স্বপন, শামীম শাহান, শেখ তোয়াহিদ, শুয়েব আহমদ শওকতি, শামীম আজাদ, শিশির মজুমদার, শিহাবুজ্জামান কামাল, শরীফা মান্নান, শাহাদত করিম, সিপ্রা চৌধুরী, সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মান, সালেহা চৌধুরী, সাইফ উদ্দিন আহমদ বাবর, সৈয়দ বেলাল আহমদ, সাফিয়া জাহির, সেলিম আহমদ নান্নু, সালমা নাসির ডলি, সওদা মুমিন, সৈয়দ এনাম, সৈয়দ মাহবুব আলম, সৈয়দ আফসার, সৈয়দ নেসার, সৈয়দ হিলাল সাইফুর, সৈয়দ মবনু, সিকদার কামাল, সৈয়দ শাহীন, সৈয়দ শরীফ আহমদ, সৈয়দ আকামত আলী রুবেল, সুমন সুপান্থ, সুলতানা সাদিক রোজি, হোসনে আরা, হাসনাত মুহাঃ আনোয়ার প্রমুখ। আমি ইচ্ছে করে এখানে কারো নাম বাদ দেইনি। বিলাতে যারা কবিতাচর্চা করেন তাদের সকলের কথা উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো নাম বাদ পড়ে যেতে পারে। হয়তো দেখা যাবে এমন এক জনের কথা বলা হয়নি যাকে আমি ভালো করে জানি। আশা করি এ ধরণের অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিকে সকল পাঠক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিত দেখবেন।
দুই. কবিতা একটি কষ্টসাধ্য শিল্প হলেও এর প্রতি মানুষের অত্যনত্দ নিষ্পাপ সম্পর্ক। বাংলাভাষায় কবিতা লিখে কেউ অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন বলে আমি জানিনা। তবে কবিদের আর্থিক দৈন্যতার খবর আমাদের কারো অজানা নয়। বিলাতের ইংরেজী সাহিত্যের কবিদেরও জীবনধারণের জন্যে কবিতা লেখার পাশাপাশি অন্যান্য পেশার অন্বেষণ করতে হয়। কিন্তু এর পরও অসংখ্য বাঙালিকে কবিতা চর্চার মাধমে মানসিক তৃপ্তি অন্বেষণ করতে দেখা যায়। প্রশ্ন জাগে, কী এমন রয়েছে কবিতার মধ্যে যার কারণে অর্থবিত্তের মোহ উপেক্ষা করে বাঙালি এর পেছনে পড়ে থাকে? কবিতা আসলে কি? ব্যক্তিগত অনুভূতিকে কল্পণার রং মিশিয়ে ছন্দোবদ্ধ ভাবে প্রকাশের নাম কি কবিতা? গদ্যের লাইনকে ভেঙে ভেঙে লিখে দিলেই কি কবিতা হয়ে যায়? কবিতা কি শুধুমাত্র আবেগের প্রকাশ? রাসত্দায় দাড়িয়ে কেউ চিৎকার বা বিলাপ করলে তাকে কি আমরা কবিতা বলবো? প্রেমিক বা প্রেমিকার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত প্রতিটি উচ্চারণই কি কবিতা? কবিতাকে এক কথায় নন্দনচর্চা বলে শেষ করে দিলে কেউ হয়তো আপত্তি তুলবেন না। কিন্তু এর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে কোন সংজ্ঞা দিতে গেলে অবশ্যই গোল বেঁধে যাবে। যারা কবিতা চর্চা থেকে দূরে তারা কেউ কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে গোল বাঁধাতে আসবেনা। এ নিয়ে সকল বিরোধ ও বাক-বিতন্ডা কবি ও কবি-কমর্ীদের মধ্যেই হবে। কবিতার সংজ্ঞার ব্যাপারে কোন কালে কবিদের মধ্যে ঐকমত্য ছিলনা, এখনো নেই। প্রত্যেকে যার যার মতো করে এর সংজ্ঞা দেন এবং অন্যদের সংজ্ঞাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান। কবিতাপাঠক অ-কবিরা কবিদের নিকট থেকে প্রাপ্ত কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে ভাবেন, আলোচনা করেন। কিন্তু কবিতা পড়ার সময় এ সকল সংজ্ঞাকে তারা শিকেয় তুলে রাখেন। যে কবিতা পড়ে তারা আনন্দ পান, যে কবিতা তাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়, যে কবিতা তাদের চেতনাকে জাগ্রত করে, যে কবিতায় তারা নিজের মনের আবেগ প্রত্যক্ষ করেন - সে কবিতা তারা পড়েন, বার বার পড়েন। এ কবিতা পড়তে পড়তে তাদের মুখস্থ হয়ে যায়। এর মানে কি যে কবিতা পাঠকের মুখস্থ হয়ে যায় সেটাই কি ভালো কবিতা? এটা নিঃসন্দেহে পাঠক নন্দিত কবিতা, কিন্তু তা ভালো কবিতার চূড়ানত্দ মানদন্ড নয়। যারা পুরানো নিয়ম-নীতির অনুসারী তাদের মতে পাঠকের মেধা ও মননকে নাড়া দিতে পারে এমন ছন্দোবদ্ধ ও বুদ্ধিজাত উচ্চারণই কবিতা অভিধা পাওয়ার যোগ্য। অপর দিকে উত্তর আধুনিকদের মতে প্রতিটি মার্জিত উচ্চারণই কবিতা। কবি একটি বিশেষ ভাষা ও কাঠামো ব্যবহার করে তার মনের সাথে কথা বলেন। এ কথাগুলো তার একানত্দই নিজস্ব। নিজের মনের সাথে সকল মানুষই কথা বলেন। কিন্তু এগুলো কবিতার আকার ধারণ করেনা। কবির ব্যক্তিগত কথা ভাষার জামা পরিধান করে কবিতায় রূপানত্দরিত হয়। এখানে পার্থক্যটা কোথায়? পার্থক্যটা হচ্ছে ভাষা এবং বাকবিন্যাসের। সাধারণ কথা এবং কবিতার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে আমাদের কান এবং মনকে জাগ্রত করতে হয়। কান এবং মনই কবিতার আসল বিচারক। আবেগ-উচ্ছ্বাস সকলের মধ্যেই আছে। কিন্তু সকল আবেগ কবিতা হয়ে যায় না। কবির হাতে আবেগ একটি ভাষা পায় এবং ভাষাকে আশ্রয় করে কবি বাক্প্রতিমা নির্মাণ করেন। সুতরাং কবিতা হচ্ছে আবেগ ও ভাষাকে আশ্রয় করে বাক্প্রতিমা নির্মাণের সাধনা। এখানে সাধনা শব্দটির উপর আমি জোর দিতে চাই। যেন তেন প্রকারে দু লাইন লিখে ফেললেই তা কবিতা হয়ে যায়না। কবিতা একটি কঠিন শিল্প এবং তা আয়ত্বে আনতে হলে অধ্যবসায় করতে হয়। খুব সহজে কবি খ্যাতি অর্জনের আকাংখা থেকে যারা কবিতা লেখা শুরু করেছেন তাদের বিষয়টা পূনর্বিবেচনা করা দরকার। নিছক ভাষার উপর দখল এবং কবিতা লেখার আকাঙ্খা থাকলেই কবিতা লেখা যায়না। এর জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। যে কোন শিল্পের জন্যে এই প্রস্তুতির ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা লিখতে হলে কবিতা পড়তে হয়। শুধু নিজের লেখা পড়লে চলবেনা। প্রতিষ্ঠিত কবিদের লেখা তো অবশ্যই, যারা মোটামুটি ভালো লেখেন তাদের সকলের লেখা পড়তে হবে। কবিকে অবশ্যই তার সময়কে জানতে হবে। যুগযন্ত্রণা, বিশ্বায়ন, বৈজ্ঞানিক সাফল্য, আত্মোপলব্ধি, দর্শন ও মনোবিজ্ঞান, নান্দনিক উদ্ভাবনা ইত্যাদি বর্তমান যুগে কবিতার আবিশ্যিক অনুষঙ্গ। আবার বাংলা সাহিত্যে গদ্য কবিতার প্রচুর ছড়াছড়ি দেখে অনেকে মনে করেন ছন্দ সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলেও সার্থক কবিতা লেখা যায়। কথাটা আসলে ঠিক নয়। কবিতার মধ্যে কাব্যিক ঝংকার সৃষ্টি করতে হলে ছন্দজ্ঞান অপরিহার্য। আমাদের প্রবীণ ও চৌকস লেখকদের যোগ্যতার প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তাদের উপদেশ দেয়ার প্রয়োজন নেই, সে দুঃসাহসও আমি করিনা। তবে বিলাতের তরুণ শিক্ষানবীশ কবিতা-কমর্ীরা কথাগুলো মনে রাখবেন বলে আমি আশা করছি। আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো বর্তমান সময়ের কবিরা ভাষা এবং কবিতার শরীর নিয়ে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছেন। পাশ্চাত্য সাহিত্য আধুনিকতা পেরিয়ে এখন আধুনিকোত্তর মহাপ্রানত্দরে দাঁড়িয়ে ব্যক্তি, সমাজ এবং চতুর্পাশ্বে বিরাজমান যাবতীয় বস্তুসামগ্রীকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করছে। বাংলা ভাষার আধুনিকতা সম্পর্কে অনেকের মধ্যে এক সময় উন্নাসিকতা ছিল। আধুনিকোত্তর সাহিত্যের ব্যাপারেও একই প্রক্রিয়ায় উন্নাসিকতা থাকবে। কিন্তু সময় কারো জন্যে অপেক্ষা করবেনা। সাহিত্য, চিত্রকলা প্রভৃতি শিল্পে কোন বিশেষ একটি প্রকাশরীতি বা আঙ্গিক অনেক দিন পর্যনত্দ ব্যবহৃত হলে এর আবেদন ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যেতে বাধ্য। সে আঙ্গিক ও প্রকাশরীতি তখন নতুন চৈতন্য বহন করার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। বহুল ব্যবহারের ফলে পাঠকদের কাছে তা গতানুগতিক হয়ে পড়ে। পুরাতন ভাবের অনুষঙ্গে ভারাক্রানত্দ প্রকাশরীতি ও দৈহিক অবয়ব পাঠকদের কাছে দুর্লভ সামগ্রী বলে বিবেচিত হয়না। তাই শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে যারা অমরত্বের সাধনা করেন তারা পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের চৈতন্য ও অনুভবকে প্রকাশ করার জন্যে অভিনবত্বের অন্বেষণ করেন। বিশ্ব সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে যে ঝড় উঠেছে এর প্রভাবে আমাদের কাব্য ও শিল্প আন্দোলিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের কবিতার ভাষা, আঙ্গিক বা প্রকাশভঙ্গিতে অবশ্যই পরিবর্তন আসবে। বিলাতের তরুণ কবিদের লেখায় এ পরিবর্তনের লক্ষণ সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। উদারতার সাথে আমাদের সে পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো দরকার। হোমার, দানত্দে, ভার্জিল, শেঙ্পিয়র, কিট্স, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ সকলেই অভিনবত্বের সাধনা করেছেন। সবাই জীবনবোধের কথা বলেছেন, অনুভবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। একই কথাকে যুগে যুগে নানা কবি নতুন ব্যঞ্জনায় এবং নতুন ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেছেন। নতুনত্বের সাধনাকে কখনো আধুনিকতা এবং কখনো উত্তর আধুনিকতা বললেও মূল কথা কিন্তু একই অভিনবত্বের সাধনা। কামনা করি, সে অভিনবত্বের সাধনায় বিলাতের কবিদের জয় হোক।
তিন. বিলাতের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবীণ কবিদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী, মাহমুদ হাসান, সালেহা চৌধুরী, কাদের মাহমুদ, মাসুদ আহমদ, অমরনাথ চক্রবতর্ী প্রমুখ। তারা কবি হিসেবে শক্তিশালী হলেও বর্তমানে কবিতার অঙ্গনে সবাই সমান তৎপর নয়। আব্দুল গাফফার চৌধুরী মূলতঃ একজন কবি। বাংলা সাহিত্যের জন্যে এটা দুঃখজনক যে সাহিত্য বা কবিতার ব্যাপারে তাকে অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে মনে হয় না। তিনি সাহিত্য প্রতিভাকে রাজনৈতিক কলাম লেখায় ব্যয় করে কালজয়ী সাহিত্য থেকে জাতিকে বঞ্চিত করছেন। তিনি কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক লেখা উপহার দিয়ে বাংলাদেশ এবং বিলাতের তরুণ লেখকদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিলে আমরা আনন্দিত হবো। মাহমুদ হাসান ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষায় লিখতে অভ্যস্থ। কবিতার পাশাপাশি নাটক, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনায়ও তিনি সমান পারদশর্ী। বয়সের ভারে নত হলেও মনের দিক দিয়ে তিনি এখনো তরুণ। শক্তিমান লেখক কাদের মাহমুদ উভয় বাংলায় কবি হিসেবে নন্দিত ও স্বীকৃত। আশি এবং নব্বই দশকে তিনি এ দেশে কবিকমর্ীদের প্রাণপুরুষ হিসেবে অবদান রেখেছেন। মাসুদ আহমদ পেশায় চিকিৎসক, কবিতার সাথে সাথে ছোটগল্পেও তিনি সিদ্ধহসত্দ। এক সময় তিনি বাংলা সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমে বিলাতের সাহিত্য অঙ্গন আলোড়িত করেছেন। নন্দিত কবি ও কথাশিল্পী সালেহা চৌধুরী লেখালেখির জগতে তুলনামূলক ভাবে অধিকতর সক্রিয়। অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় সাহিত্যের সাথে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ব্যক্তি সালেহা চৌধুরীর মতো তার কবিতাও রুচি এবং নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে। প্রচার বিমুখ অমরনাথ চক্রবতর্ী বিলাতের প্রবীণ কবিদের মধ্যে খুব কম আলোচিত। সংবেদনশীল মনের অধিকারী এই দার্শনিক কবির লেখায় মননশীলতার ছাপ সুস্পষ্ট। মনের দিক দিয়ে যুবকদের মতো তিনি এখনো প্রাণবনত্দ। এ ছাড়া ডাঃ কুদরত-উল-ইসলাম, এস এম তাজুর ইসলাম, ডঃ আমান উল্লাহ অশ্রু প্রমুখ এক সময় কবিতার অঙ্গনে অত্যনত্দ সক্রিয় ছিলেন। ডঃ আমান উল্লাহ অশ্রুর শতাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং কুদরত-উল-ইসলাম ও এস এম তাজুল ইসলামের বেশ কিছু বই বাজারে রয়েছে। পরবতর্ী সময়ের কবিদের মধ্যে রয়েছেন সালমা নাসির ডলি, ফরীদ আহমদ রেজা, মোহাম্মদ শামসুল হক, সিকদার কামাল, শামীম আজাদ, রেণু লুৎফা, মাজেদ বিশ্বাস, নুরুজ্জামান মনি প্রমুখ। রেণু লুৎফা কবিতা ও গল্প লেখার সাথে সাথে এ দেশের বাঙালি কমিউনিটির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কলাম লিখে সুনাম অর্জন করেছেন। 'হে ঈশ্বর তোমার যবনিকা'র পর তার আর কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সিকদার কামাল একজন সচেতন কবি। দুঃখের বিষয় তিনি খুব কম লেখেন এবং তার কোন কাব্যগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়নি। শামীম আজাদ ইংরেজী-বাংলা উভয় ভাষায় লেখেন এবং প্রচুর লেখেন। তার সামপ্রতিক কবিতায় বাঁক বদলের চিহ্ন সুস্পষ্ট। মাজেদ বিশ্বাস ফুল টাইম কবি এবং আপাদমসত্দক কবি। শিক্ষকতার বাইরে কবিতা ছাড়া তার অন্য কোন 'ধানাই-ফানাই' নেই। তার বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মাজেদ বিশ্বাসের কবিতায় স্বদেশ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার গান গীত হয়েছে। তার উচ্চারণ, - 'আমার মৃতু্য হলে/ ইংল্যান্ডের স্বপ্নময় মাটিতে/ আমার কবর দিও, ইংল্যান্ডের কিছু জায়গা/ চিরকালের জন্যে বাংলাদেশ হয়ে যাবে।' নুরুজ্জামান মনি আশি দশকের মৃদুভাষী কবি। গত কয়েক বছর যাবত তিনি বিলাতে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। কবিতার শরীর ও আভ্যনত্দরীন ছন্দের ব্যাপারে সচেতন এ কবি জীবন ও জগতের সাথে কবিমনের হার্দিক সম্পর্ক স্থাপনে যত্নশীল। 'প্রেমের চকচকে ছুরি হাতে' ঘুরে বেড়ালেও সহজাত বিনম্র স্বভাবের কারণেই তাকে 'প্রার্থনায় লীন' হতে হয়। লালন-হাছনের প্রতি বিমুগ্ধ কবির গনত্দব্য 'স্রোতের উৎসের' দিকে এবং প্লাবনের মধ্যেও তিনি 'জলবতী জলের সুঘ্রাণ' প্রত্যক্ষ করেন। 'জলের সবকে' তিনি উচ্চারণ করেন, 'আমার গনত্দব্য জানি স্রোতের উৎসের দিকে, তাই/ ক্লানত্দ স্বেদসিক্ত - নিরনত্দর প্রাণপণ বৈঠা বাই/ আমাকে যেতেই হবে যতই আসুক ঝড়-বান/ আমি শুঁকে পাই জলবতী জলের সুঘ্রাণ।' তিনি বিশ্বাস করেন, 'মনের মানুষ .. মানুষের অনত্দরেই থাকে' এবং বাউলদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে 'লালন-হাসনের পাশে' নিজের অবস্থান চিহ্নিত করেন।
চার. বিলাতের বর্তমান সাহিত্যাঙ্গন এক ঝাঁক উদীয়মান কবি-কমর্ীর পদচারণায় মুখরিত। আমি তাদের কবিতার উৎসাহী পাঠক এবং অনেকের লেখায় অফুরনত্দ সম্ভাবনা লক্ষ্য করে বিমুগ্ধ। আমার বিবেচনায় তাদের মধ্যে বেশ কিছু কবি অগ্রজদের অতিক্রম করে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। এদের অনেকেই এখনো তরতাজা তরুণ। ইতিবাচক পরিবেশ ও যথার্থ দিক নির্দেশনা পেলে তারা হিমালয় জয় করার দুর্জয় সাহস রাখেন। তাদের সম্পর্কে আলোচনার আগে যারা এ সকল কবিকমর্ীকে সুযোগ ও উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছেন তাদের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমি এখানে একই বাক্যের মধ্যে শব্দপাঠ গোষ্ঠী এবং সুরমা সাহিত্য সাময়িকীর কথা বলতে চাই। শব্দপাঠ গোষ্ঠীর পছনে রয়েছেন তিনজন নিবেদিতপ্রাণ কবি - আতাউর রহমান মিলাদ, আবু মকসুদ এবং কাজল রশীদ। অপর দিকে সুরমা সাহিত্য সাময়িকীতে রয়েছেন কবি আহমদ ময়েজ। এ উভয় গোষ্ঠীর সহযোগিতা ও পরিচর্যায় বিলাতের সাহিত্য পেয়েছে নতুন গতি, উদীয়মান পেয়েছেন আশ্রয় এবং নির্ভরতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক নগন্য সেবক হিসেবে তাদের প্রতি রয়েছে আমার বুক ভরা ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। বিলাতের বাংলা কবিতায় পদচিহ্ন রেখে যারা অগ্রসর হচ্ছেন তারা হলেন_ নজরুল ইসলাম নাজ, সৈয়দ শাহীন, আতাউর রহমান মিলাদ, সফিয়া জাহির, ফারুক আহমদ রনি, আহমদ ময়েজ, আবু মকসুদ, কাজল রশীদ, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, মুজিব ইরম, শাহ সোহেল, শামীম শাহান, সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মান, শাহ্ শামীম আহমদ, সুমন সুপান্থ, ওয়ালি মাহমুদ, সৈয়দ মবনু, আব্দুল কাইয়ুম, দিলু নাসের, মারুফ রেজওয়ান, মোহাম্মদ মারুফ, সৈয়দ আফসার, আনোয়ারুল ইসলাম অভি, ইকবাল হোসেন বুলবুল, শরীফুজ্জামান, মাসুক ইবনে আনিস, শাহনাজ সুলতানা, মঞ্জুলিকা জামালী, উদয় শংকর দাস দুর্জয়, ফয়জুল আলম বেলাল, দীনুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখ। তারা প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনার দাবি রাখেন। আজকের এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাদের কয়েকজন সম্পর্কে দুয়েকটি কথা পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।
সৈয়দ শাহীন : সৈয়দ শাহীন বিলাতের একজন নীরব কবি। বিলাতের বাংলা সাহিত্য পরিষদকে কেন্দ্র করে এক সময় অত্যনত্দ ব্যসত্দ সময় কাটিয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত থাকলেও তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র একটি এবং তাও উপন্যাস। কারো কারো মতে তার উপন্যাসে কবিতার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। নস্টালজিয়া, আত্মজিজ্ঞাসা, দুঃখবোধ এবং স্বপনচারিতা তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র সৈয়দ শাহীন তার কবিতায় ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে পাঠকের মনকে বহুদূর টেনে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেন, - 'বানালাম কত ঘর - খেলাঘর/ এবং হারালাম - / ভাঙনে ভাঙনে শেষ হলো/ শৈশবের শ্যামলী খেলাঘর/ কৈশোরের আধোমুখি ভালবাসার ঘর/ যৌবনের উচ্ছল আবেগের ঘর/ কখনো যাত্রার জলস্রোত, কখনো ট্রয়ের অশ্ব/ কখনো বিত্তবাসনার পোকামাকড়/ ভাসিয়ে নিয়ে যায়, উড়িয়ে নিয়ে যায়/ কুড়ে কুড়ে খায় সাধের 'খেলাঘর, সাজঘর, মণিঘর।' কিন্তু এর পরও তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখান, - 'আমরা পাহাড় ভেঙে ভেঙে নদী গড়বো/ নদী গড়িয়ে গড়িয়ে মোহনায় মিলবে। .. তুমি স্বপ্ন খুলবে/ আমি ছন্দ তুলবো।'
আতাউর রহমান মিলাদ : আতাউর রহমান মিলাদ কবি অভিধা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিলাতে এসেছেন, সাথে নিয়ে এসেছেন জন্মভূমির জন্যে আবেগ আশ্রিত ভালোবাসা, অভিমান এবং অঙ্গীকার। এ পর্যনত্দ তার দুঃসময়ের চিৎকার, হৃদয়ের জানালা খুলে, আর যদি একটা গুলি চলে, কবিতার চেক বই, স্মৃতিহীন অচিন অাঁধার _ এ পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। স্মৃতিকাতর বা নস্টালজিয়ায় আক্রানত্দ মিলাদ কবিতার মাধ্যমে স্বদেশের মধুময় স্মৃতির প্রতি তার ভালবাসার অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন। 'স্মৃতির পাখিরা উড়ে যায় দূরে। মুছে যায় পালকের শেষ চিহ্ন। .. স্মৃতি কর্তিত হয় ভরহীনতায়। দু'হাতে সাঁতার কাটে অচিন অাঁধার। যুবক, অভিমানে ভুলে যায় চেনা আল, ধূলোভরা সমূহ পথ। মনুর জলে জমা কৈশোরের স্রোত, বালিকার বুকে অাঁকা শপথ।' (শিরোনাম কবিতা : স্মৃতিহীন অচিন অাঁধার) স্বদেশের প্রতি মিলাদের ভালোবাসা নিছক মানবিক আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার কবিতায় এর সাথে সর্বত্র একটি বলিষ্ঠ অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। আধুনিক কবির ইতিহাস সচেনতাকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অব্যবস্থা স্বপ্নপীড়িত মিলাদের প্রবাস জীবনকে বিপর্যসত্দ করে দেয়। 'আমি বুঝতে পারছি কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে, বন্ধ্যা রমণীর মলিন দুঃখ নিয়ে কাঁদছে বুকের শীর্ণ নদী/ বিরহের চাঁদর গায়ে কাঁদছে জীবনের প্রেমপত্র, নিশীত রাত/ নগ্নবুটের লাথি খেয়ে কাঁদছে স্বাধীনতা, ত্রিশ লাখ করোটি/ চবি্বশে জানুয়ারীর রক্তাক্ত দাগ নিয়ে জ্বলছে চট্টলা, সুস্থ বিবেক/ নুর হোসেন, বাবুলের তরতাজা লাশ বুকে কাঁদছে বাংলাদেশ/এ সমসত্দটাই আমার ভুল, ভুলের একেকটা উৎকৃষ্ট উহার।' (কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে : আর যদি একটা গুলি চলে) মিলাদ স্বপ্ন দেখেন একটি সুখী-সুন্দর বাংলাদেশের যেখানে মানুষ স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করবে এবং কোনো প্রকার শোষণ ও বঞ্চণা থাকবে না। একাত্তরের চেতনা ধারণ করে যারা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায় তাদের সাথে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করেন। তিনি উচ্চারণ করেন, 'মিলাদ তবুও তোমাকে একবার যেতে হবে/ আকাংখার বর্ণাঢ্য নদীর কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে/ জমায়েত মানুষের মাঝে, খোলা ময়দানে/ অনত্দতঃ আরো একবার/ নিজেকে বিপ্লবী করে তোল _ সশস্ত্র আয়োজনে। (মিলাদের মুখোমুখি : আর যদি একটা গুলি চলে)
ফারুক আহমদ রনি : ফারুক আহমদ রনি লিখছেন দীর্ঘ দিন থেকে এবং এক সময় প্রচুর লিখেছেন। ৯৩ সালে তার প্রথম গ্রন্থ 'আমি এক নষ্ট যুবক' প্রকাশিত হয় এবং পাঠক মহলে সাড়া জাগায়। 'আমাকে ফাঁসির বদলে নির্বাসন দেয়া হয়েছে/ আমি আজ নির্বাসিত এক অজানা দ্বীপে।/ সারাৰণ আকাশ ও সমুদ্রের গর্জন শুনি,/ পাখিদের সাথে কথা বলি। আমার ঘুম আসেনা;/গভীর অন্ধকারে পশু হয়ে পশুর সাথে খেলা করি।' রনি'র দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ 'জ্বলছি অলিক অনলে' এ ভাবেই শুরু হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন যাবত বিলাতে বসবাস করলেও তার সমগ্র স্বত্তা পড়ে রয়েছে বাংলাদেশে। 'আমি আমার পাঁচটি আঙুল লাটিমের সুতোর বৃত্তে পেছিয়ে/ দ্রুত লাটিম দিয়ে মাটির বুকে আঁচড় দিয়েছি,/ আর কলমের নিভ জিহ্বায় চেটে চেটে কাগজে/ মানচিত্র এঁকেছি, শব্দের পর শব্দ দিয়ে লিখেছি একটি নাম/ বাংলাদেশ।' (মাটি ও মানুষের কাছাকাছি ঃ জ্বলছি অলিক অনলে) এদেশের আঙুর-আপেল তার কাছে বিস্বাদ লাগে, তার মন পড়ে আছে ভাইয়ার হাওর আর কুশিয়ারার স্রোতে ভাসমান আছিরগঞ্জ নামক এক বাজারে। বুভুক্ষ ফেরারী বাউলের মত অজস্র তালি দেয়া স্মৃতির ঝুলি নিয়ে তার স্বদেশের স্মৃতিকে অন্বেষণ করেন। এটা কোন বানানো গল্প নয়, এটা তার 'আত্মার পঞ্চতন্ত্রে প্রলোভিত বেগবান স্মৃতির আড়ত।' আরাম-আয়েশের বিলাতী জীবন পেছনে রেখে তিনি ফিরে যেতে চান 'কলমির নিকুঞ্জে'। তিনি পপলার, ডকল্যান্ড আর ব্রিকলেনের বৈষম্য থেকে পালিয়ে গিয়ে ঢাকাদক্ষিণের সবুজাভ নির্জন মাঠে হারিয়ে যেতে চান। 'ফের আমাকে আকর্ষণ করে/ দুধ-ভাত, চিড়ে-কলা আর চোঙা পিঠার স্বাদ।/ দক্ষিণা বায়, হেমনত্দের বাড়ায় তাগিদ - / আঙুর-আপেল তেতো ঠেকে, রোচেনা স্বাদে/ আমলকির ঘ্রাণ দুরনত্দ করে।/ হিসেব কষে মেলেনা হিসেব/ দায়বদ্ধতা ফেলে থমকে যায় উড়োউড়ি মন। (নষ্টালজিয়া ঃ জ্বলছি অলিক অনলে) নস্টালজিয়া আক্রানত্দ রনি শুধু নিজের এবং দেশ ও জাতির অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে ক্ষানত্দ হননি, ভবিষ্যতের সুখ-স্বপ্ন নিয়েও তিনি উচ্চকন্ঠ। ক্যানারি ওয়ার্ফের পাদদেশে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছেন তিনি 'আতুড় ঘরে বিধবা রমনীর ভবিষ্যৎ অন্বেষা'। তিনি 'আড়াই শত বছরের গোলামীর নষ্ট বীর্যের ভাইরাস ছুড়ে' দিয়ে সবকিছুকে গুড়িয়ে দিতে চান।
আহমদ ময়েজ : আহমদ ময়েজ একজন ধ্রুপদী ধারার কবি - বোদ্ধা সমালোচকদের এ মনত্দব্যের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। ছড়ার জগত মাতিয়ে সমপ্রতি তিনি কবিতার জগতে পা দিয়েছেন। সসত্দা বাহ্বা বা নগদ প্রাপ্তির আকাঙ্খায় নয়, নিজের আনন্দ এবং নিজেকে জানার জন্যে তিনি কবিতা লিখছেন বলে মনে হয়। আত্মজিজ্ঞাসা ও গীতিময়তা তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। শব্দপ্রয়োগ এবং ছন্দের ব্যাপারে অত্যনত্দ সচেতন এ কবি লিখেন কম, কিন্তু যা লিখেন তা সোনার চেয়ে দামি। ফার্সি সাহিত্যের রুমি-হাফিজের কাব্যের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা ময়েজের কবিতায় এর ছায়া দেখতে পাবেন, - 'বুকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ায় সে নদী/ ছলকে/ছলকে/ওঠে ঢেউ। প্রতিটি শব্দ আজও জপে কার নাম/ হিংসায় কাতর বেলাভূমি। মরমী মজির লেখে নাগরি হরফে - আমিও তাহার মাঝে নিরনত্দর ছিলাম/নগরবাসীরে .. .. .. / (আমি) নগরে নগরে ঘুরিলাম। বুকের দেয়াল ঘেঁষে/ যে নদী দাঁড়ায় এসে/ তাকে আর ধরে রাখে কে?' এক হিসেবে আহমদ ময়েজের কবিতাকে উত্তর আধুনিক মরমী সঙ্গীত হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
মুজিব ইরম : মুজিব ইরমের কবিতা তার সমসাময়িকদের মধ্যে সবচে অধিক পঠিত। 'মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান'র জন্যে তিনি বাংলা একাডেমীর 'তরুণ লেখক প্রকল্প' পুরস্কার পেয়েছেন। সহজ সরল আটপৌরে গ্রামীন শব্দ তার হাতে পড়ে সতেজ ও উজ্জল হয়ে ওঠেছে। তার ভাষা আমাদের বাউল ও মরমী কবিদের ভাষা। মুজিব ইরম সে ভাষায় গণ-সঙ্গীত বা মরমী গান লিখেননি, লিখছেন কবিতা। তার অধিকাংশ কবিতাই টানা গদ্যে লেখা। সে গদ্যের কোন কোন সত্দবকের প্রতিটি পংক্তিই এক একটি উজ্জল কবিতা। 'আমার সকালগুলো এইরূপ রোদরাঙা মুখ হয়ে ছিলো। সে মুখে এখনো আমি চন্দন মাখাই।' (ইরমকথার পরের কথাঃ উৎসর্গ পত্র) 'আমার বুবুরা যেনো স্নেহবতী মেঘ, প্রচন্ড গরমে যারা ঝরায় শীতল। তারা সব নৃত্যরত মায়াবী ময়ূর, রঙিন পালকে পরায় ঘুমের চন্দন।' (ইরমকথার পরেরকথাঃ হুরুকাল নির্ণয় অথবা জন্মগীতির বর্ধিত কলেবর) তিনি যখন উচ্চারণ করেন,'এ ইরমের ইচ্ছে ছিলো ঘরছাড়া এক সনত্দ বাউল হবার' তখন সাথে আমাদের মনে হয় আমরা আধুনিক যুগের এক মারফতি গান শুনছি। আমাদের মনে পড়ে যায় সে-ই গান যেখানে এক বাউল বলেন, 'আমি ফকির হইয়া যাব গো নামের মালা লইয়া গলে।'
সফিয়া জাহির : স্বদেশের স্মৃতিমুগ্ধতা নিয়ে সফিয়া জহির বুনন করে চলেছেন কবিতার নকশী কাঁথা। দীর্ঘদিন বিলাতে অবস্থান করার পরও সংবেদনশীল শৈল্পিক চেতনা তাকে স্বদেশের দিকে বার বার টেনে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের অঙ্গীকার, সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা ইত্যাদি তার কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। সফিয়া কম লেখেন, তবে তার লেখার মধ্যে পরিচ্ছন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট। তার কোনো কাব্যগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়নি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, আইনশৃংখলার অবনতি এবং নিম্নবিত্তের জীবনযন্ত্রণার পাশপাশি উপর তলায় বসবাসকারী একশ্রেণীর মানুষের ঘৃণ্য চরিত্র উঠে এসেছে তার 'ওরা কাদের প্রেতাত্মা' কবিতায়। 'যে কিশোরী বই-খাতা-কলম হাতে/ পা বাড়ায় বিদ্যার্জনে/ তার শরীরের মাংস ছিড়ে খায় উল্লাসে/ উন্মাদ বুনো শূয়োর। যে শিশু ওম খুঁজে মার বুকে/ খুঁজে ভালোবাসা, খুঁজে স্বাধীনতা/ আর সুনাগরিকেত্বের ন্যায্য অধিকার/ তার লাশ পঁচে গলে মিশে যায়/ ডোবা পুকুর জলাশয়ে ... ।' 'চিয়ার্স আপ' ঠিক একই মেজাজের ভিন্ন একটি কবিতা। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার একটি নিখুঁত চিত্র অত্যনত্দ আবেগময় ভাষায় অংকন করেছেন। এক দিকে ক্ষুধার্ত মানুষ না খেয়ে মারা যায়, অপুষ্টিতে ভোগে, ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া খাদ্য নিয়ে কুকুর ও মানুষ কাড়াকাড়ি করে, কবরে শায়িত হয় কাফনহীন গুলিবিদ্ধ লাশ; অপর দিকে ধনিক-বনিকেরা রঙ্গশালা সাজায় এবং মদ আর নারী নিয়ে নৃত্য করে। এখানে সফিয়াকে পাই আমরা এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে। পুজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গুটি কয়েক মানুষ নিজেদের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অসহায় অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেয় _ বৈষম্যমূলক এ অব্যবস্থাকে সফিয়া তীব্রভাবে কষাঘাত করেছেন তার কবিতার মাধ্যমে।
আবু মকসুদ : বিলাতের সাহিত্য প্রেমিকদের আবু মকসুদ একটি সুপ্রিয় নাম। কবিরা সংগঠন বুঝেন না আবু মকসুদ এর জীবনত্দ প্রতিবাদ। এক সময় তিনি ছড়া লিখে সুনাম অর্জন করেছেন। তার ছড়া-কবিতা নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ 'নটার ট্রেন কটায় ছাড়ে' পাঠকদের বেশ সমাদর পেয়েছে। ইদানীং আবু মকসুদ কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। এখনো তার কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। আবু মকসুদ কবিতার মাধ্যমে চিত্র অঙ্কন করেন, গল্প লিখেন। তার অঙ্কিত ছবির মধ্যে আমাদের চারপাশের মানুষদের দেখতে পাই, দেখতে পাই নিসর্গ, তির্যক মনত্দব্য পাই সমাজ এবং রাষ্ট্রে প্রচলিত ভন্ডামীর বিরুদ্ধে। তিনি নিজের মনে নিজের কথা বলে যান। নিজের কথার ভেতর দিয়ে আমাদের সকলের কথা হয়ে ওঠে। আবু মকসুদ অত্যনত্দ সচেতন ভাবে মননের চর্চা করেন এবং এ কারণে তার কবিতায় নানা ভাবে উন্নত জীবনবোধ ও মানবতাবোধের গান ধ্বনিত হয়েছে। মূল্যবোধের বিপর্যয়, বিপন্ন মনন এবং রাজনৈতিক অনাচার তাকে ব্যথিত, এবং কখনো ক্ষুব্ধ করে। তবে অসুয়া-অসুস্থতা তাকে বিক্ষুব্ধ করলেও হতাশা গ্রাস করতে পারেনি। অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ক্ষোভকে তিনি শিল্পের মোড়কে উপস্থাপন করতে সক্ষম। মানবচরিত্রের অন্ধকার দিক প্রত্যক্ষ করে তিনি এ বলে আমাদের প্রবোধ দেন, 'মানুষ জন্ম নেয় মহারৌদ্রে পেঁৗছাতে তীরে/ অমানুষ বাঁদরেরা সব কালেই মুখ রাখে বিষ্টার ভীড়ে'। (কবির বেদনা) তাঁর আহ্বান, 'হে আলোকের সাথী ফিরে আসো, এখন পাথর সময়/ নতুন অধ্যায়ের শুরুতে শেষবার করে নাও ফাতেহা পাঠ।' (পাথর সময়)
দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু : উত্তর আধুনিক কবিতার ইতিহাস চেতনা এবং যুগযন্ত্রণার উপস্থিতি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিতায় চোখে পড়ার মত। 'উজাড় আমাদের বাগান বাড়ি/ ঘাসফুল; অদ্যকায় মিলিয়েছে/ গৃহস্থ সংসার, সুনসান সানের ঘাট। / আমাদের বাঁধনে বাঁধা আছে/ বোধির ব্যবধান মানুষে পশুতে/ ব্যবধান মানুষে মানুষে। / ফের আমরা গুহাবদ্ধ হবো, তাই/ ফুলের বাগানে ঝগড়া লেগেছে। (পশ্চাদপসরণ ঃ ইস্পাতের গোলাপ) মঞ্জুর কবিতায় বাংলা সাহিত্যের মরমী কবিদের প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। বাউল বন্দনা' কবিতায় তিনি বলেন 'ও ভাই, দিওনারে আমারে রক্তজবা দা/ নক্ষত্র রোদে/ হালিচারা নাচে, বাঁধাকপি বন মিশে পৌর বিতানে/ নাচে সৈয়দ শাহনূরের নাও।/ ও ভাই ফোরাতের জলে আমি কেন ধুব সীমারের হাত/ আমি নাচে, সুরম্নজ নাচে/ মজির উদ্দীনের 'ভেদজহুর' নাচে তারেক নদীতে।/ সবাই উঠিলা কাঙ্খে, আমি থাকি ধূলায়/ নিমাই নিমাই বলে করা বাঁধে ঘর; নাচিল পাকনা ধান/ শিতালং দেশের ধূলা।/ ও ভাই, দিওনারে আমারে রক্তজবা দা/ এ হাত ভিজাবোনা গাছের লউয়ে; নাচে/ গাছের গুঁড়িতে লতায় পাতায় রাধারমনের গান।' শব্দ নিয়ে খেলা করা কবিদের বৈশিষ্ট্য এবং মুজিব ইরমের মতো আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ নিয়ে খেলা করতে মঞ্জু আনন্দ পান। 'ইতা আমার কপালের লেখা/ এতো পথ হাঁটা ধাতব পা জোড়া অবশ হল ঘুমের ভেতরে/ আমার পায়ে কি গেঁথেছে মরা শামুকের খোলস/ আমার পায়ে কি লেগে আছে পৃথিবীর যকৃতের পুঁজ?/ ইতা আমার কপালের লেখা/ ইতাতো ইডিপাসের নিয়তি।'
দিলু নাসের : অনেকটা আড়াল থেকেই দিলু নাসের কবিতা লিখেন। কিন্তু বিলাতের সাহিত্য অঙ্গনে একজন দক্ষ ছড়াকার হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। ছড়ার মতো তার কবিতাও ঝরঝরে, উচ্চকন্ঠে আবৃত্তি করে আনন্দ পাওয়া যায়। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে তিনি আধুনিক মানসের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও হার্দিক রক্তক্ষরণ চিত্রিত করতে পারেন। 'নদীরা সমুদ্রে যায়/ নেই শুধু ঠিকানা আমার/ আমি তো চৈত্রে ফাটা/ কোন এক আকাল খামার। এখানে বৃষ্টি নেই/ নেই ছায়া নেই চরাচর? এ যেন বিজন ভূমি/ সাহারার ধু-ধু প্রানত্দর।' অন্যান্য প্রবাসী বাঙালির মতো পরবাসে থেকে দিলুর মন 'আনচান' করে মাটির টানে, - 'পিছনে মাটির টান/ করে আনচান, কাঁকনের অলীক গীতি/ এই দূর পরবাসে মনের মুকুরে ভাসে/ ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। মনে পড়ে প্রিয়জন প্রিয়তমা স্বদেশের মুখ/ আমি ঘুরি পরবাসে/ বেদনায় ভারী হয় বুক।' আমাদের সকলের বেদনাবোধ দিলু নাসেরের কবিতায় এ ভাবেই বাঙময় হয়ে ওঠে।
সুমন সুপান্থ : সুমন সুপানত্দ লিখছেন অনেক দিন থেকে, এদেশে এসেছেন বেশীদিন হয়নি। তিনি কম লিখেন, কিন্তু ভালো লিখেন। তার লেখায় পরিশ্রমের চিহ্ন সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তার উচ্চারণ, - 'আরো দূরে, চম্পক নগরে দ্রৌপদী কথার বধূ/ একা একেলা রাত্রির গভীরতা মাপে.../ আহা নাগর! কেতকী ফুল পুড়ে সূর্য তাপে/ এবার এসো শ্রাবণের নদী ... পদ্মাচরের ধূ ধূ ...।' (এবার এসো শ্রাবণের নদী ঃ সুমন সুপান্থ) সুমন সুপান্থ এভাবেই তার আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করেন। চম্পক নগর, দ্রৌপদী বধূ, নাগর, কেতকী ফুল, সূর্য তাপ, শ্রাবণের নদী, পদ্মাচর ইত্যাদি বলে তিনি একটা বিশেষ আবহ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। চম্পক নগর রূপকথার চম্পক নগর না হলেও পাঠককে কবি রূপকথার দিকে টেনে নিয়ে যান। 'চম্পক নগর' চম্পকমালা হিসেবে পরিচিত বিশেষ একটা ছন্দকেও বোঝাতে পারে এবং তা হলে এর মাধ্যমে ব্যাপক অর্থে কাব্যকথার দিকে ইঙ্গিতটা চলে যায়। চাঁপা, কেতকী প্রভৃতি বর্ষা মওসুম, আরো বিশেষ ভাবে মধুমাস হিসেবে চিহ্নিত জৈষ্ঠ-আষাঢ়ের ফুল। দ্রপদ কন্যা দ্রৌপদী মহাভারতের গল্পে পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী। কিন্তু সুমন সে দ্রৌপদীর কথা বলেননি, তিনি বলছেন 'দ্রৌপদী কথার বধূ' সম্পর্কে। তার দ্রৌপদী কথার বধূ পঞ্চপান্ডবকে নিয়ে রাত্রি যাপন করছেনা, সে একাকী রাত্রির গভীরতা মাপছে। প্রখর সূর্যতাপে মধুমাসের কেতকী ফুল পুড়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বাস বা আস্থার পৃথিবীতে পদ্মানদীর মতো ধূ ধূ চর পড়ে গেছে। এমনি প্রাণহীন অবস্থায় কবি অঝোর বর্ষণে প্রকৃতিকে সিক্ত করে দেয়ার জন্যে শ্রাবণের নদীর প্রতি আকুতি জানাচ্ছেন। সুমন তার কবিতার শরীর নির্মাণ এবং শব্দপ্রয়োগের সচেতন এবং হিসাবী। তার কবিতা শৈল্পিক দিক দিয়ে সুষমা মন্ডিত এবং ভাষা বা বাক-ভঙিমা ধীর ও শানত্দ।
শাহ্ সোহেল : শাহ্ সোহেল এ প্রজন্মের এক সম্ভাবনাময় তরুণ কবির নাম। শামসুর রাহমান লিখেছেন 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে' এবং শাহ্ সোহেল ঘোষণা দিয়েছেন,'কবে যেন দেশদ্রোহী হয়ে যাই।' একটি নয়, বহুবিধ কারণ এর পেছনে কাজ করছে। তার মত আমরা যারা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছি তাদের মনে স্বদেশের জন্যে ঘৃণা না ভালোবাসা প্রবল তা আমাদের কারো অজানা নেই। বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে সোহেল তার অনুভূতিকে এ ভাবে প্রকাশ করেন- আমি এখন উড়ো পাখি/ নীল খামেতে বন্দী/ উড়ছি আমি ঘুরছি ওগো/ জীবন গড়ার সন্ধি।/ ছাড়ছি তোমায়; ছাড়ছি ওগো/ মন-মাধবী বাংলা/ একি তোমার ভালোবাসা/ কিংবা দ্রোহ মামলা। (আমি এখন উড়ো পাখি) আমাদের জানা পৃথিবীর চারপাশে ঘটমান বিভিন্ন বিষয় একজন সংবেদনশীল কবিতা কমর্ী হিসেবে সোহেলকে বিচলিত করে। মানবিক সুখ-দুঃখের গল্প তিনি বলেন। সে গল্প কোন কোন সময় বিলাপের মতো তার কবিতায় ফুটে ওঠতে দেখা যায়। এ সকল বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন প্রেৰাপটে এবং নিজের অনুভবের রঙ মিশ্রিত করে তিনি বর্ণনা করেছেন- 'আমার / অসময়ে সাপের সাথে নেউল খেলা করে....../ মহিষ মাঠে বাঘের সাধে/ বেলাজ/ নাগর/ রঙ-রূপে কুঁচ বরণ কন্যা খোঁজে/ আমার বড় দুঃসময়/ একলা/ কাটে; পিয়াইন নদীর পাথর চেপে।' (দুঃসময় ২১ শ্রাবণ, এমসি কলেজ হোস্টেলে প্রথম রাত) অন্যত্র তিনি সব হারিয়ে বেপরোয়া হয়ে বলেন- গেলো কাল; ব্যক্তিগত ঝর্ণা ছিলো, ঝর্ণার স্রোত ছিল/ বারান্দায় লুবনা ছিল, লুবনার লাবণ্য ছিল/ মনে প্রেম ছিলো- প্রেমে ঢেউ ছিলো/ ঢেউয়ে ছন্দ ছিলো - ঝুমুর ছিলো/ গুণ ও ভাগের জটিলতায় তাও গেলো;/ অতঃপর কিছুই আসে যায়না আমার। (আশার ভেতর ঘর ছিলো) হ্যাঁ, বুঝতে পারলে এতে কারো কিছু যায় আসেনা, বরং তা আরো কিছু মহৎ কবিতার জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর অধিকাংশ মহৎ সৃষ্টি-ই দুঃখ-বেদনার ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে এসেছে।
দীনুজ্জামান চেনধুরী : বিলাতে যারা বাংলা সাহিত্যচর্চার সাথে জড়িত তারা প্রায় সবাই বাংলাদেশ থেকে বড় হয়ে এসেছেন এবং সেখানে লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম দীনুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বিলাতে জন্ম গ্রহণ করেছেন, বড় হয়েছেন এবং লেখাপড়া করেছেন। পারিবারিক প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই দীনুজ্জামান কবিতার প্রতি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তার ভাষায়, 'ছেলেটা বিলেতে বড় হলো/ লিখে বাংলা কবিতা-গান/ বলছে আজো সে ভাষাতেই/ বাবা-মা যা দিয়েছেন দান।' এ পর্যনত্দ দীনুজ্জামান চৌধুরীর ৩টি বাংলা এবং ২টি ইংরেজী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ড. রেণু লুৎফা তার লেখা সম্পর্কে মনত্দব্য করতে গিয়ে বলেন, 'তরুণ কবি দীনুজ্জামান চৌধুরী আমাদের আশার আলো দেখালেন। বৃটেনে জন্ম নিয়ে, বৃটেনে বেড়ে উঠে বাংলা ভাষায় কবিতা লিখছেন। প্রবন্ধ লিখছেন। বাংলা ভাষার জন্য এ প্রচেষ্টা ভারী গৌরবের। অন্যান্যদের জন্য আশার দিশা।' দীনুজ্জামান চৌধুরীর কবিতায় এ দেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মানসচিত্র ও টানাপেড়েন মূর্ত হয়ে উঠেছে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে আরো অনেকের মতো তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের শেকড়ের প্রতি আকর্ষণ, দেশপ্রেম এবং মানবপ্রেম তাকে উদ্দীপ্ত ও সাহসী করে তুলেছে। তিনি উচ্চারণ করেন, 'ভারতের ভাওয়াল সম্রাটের ত্রয়োদশ বংশধর/ জন্মের পর থেকেই সাদা চামড়ার ভিড়ে/ ঠিক গাংচিলের ভিড়ে পলাতক দোয়েলের ন্যায় আমিও খুঁজে আসছি/ পূর্বপুরুষদের ঠোঁটের ভাষা।' দীনুজ্জামানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি নিজের বিশ্বাস, ভালবাসা এবং ঘৃণার কথা স্পষ্ট করে - সাহসিকতার সাথে বলতে পারেন। আবার ব্যক্তিগত জীবনে তা মেনে চলারও চেষ্টা করেন।
শাহ্ শামীম আহমদ : শাহ্ শামীম আহমদ 'অজ্ঞতার গহীন অন্ধকার' থেকে 'আলোর টানেল' ধরে যাত্রা শুরু করেছেন 'হীরকে'র সন্ধানে। 'ঝিনুকে'র সবটুকু যন্ত্রণা বুকের গভীরে পোষে তিন আনন্দের 'শুভ্র-ভ্রূণ স্বপ্ন-রেণু' নির্মাণ করছেন 'শিল্পের শহরে'। শব্দচাষের ব্যাপারে শাহ্ শামীম অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং 'ত্যাগের আতর-সুবাসে' তিনি নিজেকে বিমোহিত করে রাখতে সচেষ্ট। তার ভাষায়, 'এজিন পেয়েছি আমি করে যেতে শব্দের চাষ/ বিশ্বাসের বর্ম হাতে ভেঙেছি অবিশ্বাসের কাঁচ/ নেমেছি শিল্পের শহরে। বোধের বাতি ঘরে জ্বালি আশার প্রদীপ/ একটি বার আলোকিত হবো ইহকালে। ভেতরে অন্ধকার _ অন্ধ আতঙ্ক ও ভয়, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার দাস এই নশ্বর শরীর, ত্যাগের আতর-সুবাসে কি করে মোহিত হবো?' (এজিন পেয়েছি : জলরঙা দিন) শব্দের চাষাবাদে শাহ্ শামীম একজন অক্লানত্দ কৃষক। প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে তিনি বোধের সমুদ্রে সাঁতার কাটেন। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি মহাশূন্যের পথে যাত্রা করেন, কোনো সময় আলোকের অন্বেষণে সৌরচুলি্লতে নিজেকে পুড়িয়ে ছারখার করেন। 'শূন্য থেকে শূন্যে ভেসে যাই, চাঁদের শরীর থেকে পান করি জ্যোৎস্নার মদ/ কল্পলোক থেকে তুলে আনি মুঠোমুঠো স্বপ্নের কথা/ ... শব্দে শব্দে ভাঙাগড়া _ কল্পনায় হয়ে ওঠে রাঙা/ শব্দের নদীতে আমি এক মুগ্ধ মাছরাঙা।' (আত্মপরিচয়-১) এ চরণ পাঠ শেষে আমাদের মন চলে যায় শৈশবের স্মৃতিঘেরা গ্রামীণ জনপদে। আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে বর্ষাকালে গাছের ডালে বসে থাকা বাংলার সৌন্দর্য মাছরাঙা পাখি, এর রঙিন ঠোঁট ও পালক এবং সর্বোপরি এর ধ্যানমগ্নতা। শামীমের স্বপ্ন সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন, একটি আলোকিত সময়ের স্বপ্ন। অনুচ্চ উচ্চারণে তিনি তার স্বপ্নের আলোকিত ভোরের দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চান, 'আলোকিত ভোর, উজ্জল দুপুর _ চাই জীবনের সব সমাধান; বুকের রক্তে লিখেছি জীবনের গান _ উড়িয়েছি বিজয় নিশান।' (অন্ধকার নেমে আসে) বলাবাহুল্য তিনি এখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করছেন। তিনি মানুষের কল্যাণে কলম হাতে হয়েছেন 'তীর্থের সহযাত্রী'। তার ঘোষণা, 'আজন্ম বিপ্লবী আমি _ বিপ্লবের বীজ ছড়াবোই _ মানুষের দিকে মুখ ফেরাবোই/ ... আকাশের দিকে তুলে ধরো মাথা _ অফুরনত্দ আলোর দিকে, দূরনত্দ দুপুরের দিকে। (দূরনত্দ দুপুরের দিকে) শাহ্ শামীমের মতো মানবতার কল্যাণে অফুরনত্দ আলো আর রৌদ্রোজ্জল দুপুর আমাদের সকলেরই কাম্য।
ওয়ালি মাহমুদ : আবেগঘন কবি ওয়ালি মাহমুদ স্বপ্ন দেখেন, মোহনার খোঁজে হাঁটেন কবিতার পথে। মোহনার অন্বেষায় তিনি 'পুলছড়া'র পানি ভেঙে অগ্রসর হন। 'তবুও স্বপ্ন দেখে মানুষ। সমাজের ধরন পাল্টাবার। অর্জিত সকল তুলে হাত হতে হাতে।' এক সময় তার এ স্বাপি্নক অন্বেষণ সকলের হয়ে যায়, কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছে দাদা বদিখা'র আমল থেকে। তিনি জানেন, শুধু সাঁতার জানলেই মোহনায় পেঁৗছা যায়না, নদীর গভীর তলদেশে থেকে মনিমুক্তা আহরন করতে হলে ডুবুরী হতে হয়, 'নয় তো নাসত্দি।' ভালোবাসার বিমূর্ত আবেগ নিয়ে ওয়ালি মাহমুদ নারী ও নদীকে উপস্থাপন করেন শৈল্পিক উপমায়। বৈরাগ্য এবং ভালবাসার টানাপোড়েন অতিক্রম করে তিনি পেঁৗছে যেতে চান 'শতাব্দীর হাত ধরে অতীন্দ্রিয় লালিত প্রফুল্ল সনত্দোষ।' পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার উচ্চারণ, - 'ভালোবাসার নিকুঞ্জে বাস করেও যদি একজন সুখী ভাবতে না পার, দুখের কষ্টিপাথরে উত্তর খোঁজ।' ওয়ালি মাহমুদ কবিতার গতানুগতিক বৃত্ত অতিক্রম করে সতত এগিয়ে যেতে আগ্রহী। তার শব্দচয়ন এবং কবিতার অবকাঠামোতে সে পরিচয় ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করে, ' শিল্পের সঙ্গে হৃদয়সত্তা যখন মোহনায় এসে নোঙর করে, তখন মনোনৌকা পাল তুলে দেয়। এবং সেই একই সময় কবিতা তার আলোকিত রশ্মি সকাশে একবিংশ-তে পা রাখে। .. ' তখন তিনি 'অপরিচিত সিঁড়ি বেয়ে কবিতা-কে পাঁজাকোলা করে বয়ে নিয়ে' যান 'ডাঙার দিকে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।' ওয়ালি মাহমুদ কোলাহল পছন্দ করেন না। তার কবিতা শানত্দ স্বভাবের, স্বল্পগভীর নির্ঝরিণীর মতো। পড়তে গেলে মনে হয় তিনি কারো সাথে কানে কানে কথা বলছেন। তবে তার কবিতা ঋজু এবং দৃঢ়, কবিতাকে নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবার স্বপ্ন তিনি লালন করেন।
সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মান : কবি সৈয়দ রুম্মানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'টেক্কার তালে দুলি ... যখন আকাশ ডানাবৎ হিরণ্য মেয়ে বোরখা পরে' প্রকাশিত হয় দু' হাজার সালে। গ্রন্থটির ব্যতিক্রমধমর্ী নামকরনের মাধ্যমে তিনি সহজেই পাঠকদের দৃষ্টি কেড়ে নেন। পাঁচ বছর পর ৫৬টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় 'চলে গেলে নিয়ে যায় সব'। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের মোড়কে প্রদত্ত বক্তব্যটি বিবেচনার দাবি রাখে। সেখানে বলা হয়েছে, 'সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রুম্মান, নব্বইয়ের জ্যোতির্ময় আবির্ভাব, শক্তিমান আধুনিক তুখোড় মেধাবী তরুণ কবি, মাটি ও নিসর্গ যার উপাদান, অতীত পুঁজি, সমকাল উজ্জল অভিধান, প্রেম ও নারী বিশ্বজনীন অনুভূতি। আনন্দ ও বেদনার শৈল্পিক মিশ্রণে নির্মান করেন কবিতা যেখানে তার ক্ষোভ ও দ্রোহ মূর্ত হয়ে ওঠে সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে।' এখানে সৈয়দ রুম্মানকে যে সকল বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে এর সবগুলোর সাথে আমাদের একমত না হলেও চলে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে তার কাব্যের মৌল উপাদান মানুষ ও নিসর্গ এবং তিনি আনন্দ ও বেদনার শৈল্পিক মিশ্রণে কবিতা নির্মান করেন বিধায় পাঠকরা তাকে অবশ্যই মনে রাখবে। কবিতাকে সাথে নিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করার সম্ভাবনা নিয়ে বিলাতে যারা কবিতা চর্চা করছেন তাদের মধ্যে সৈয়দ রুম্মান অন্যতম। কম কথায়, ইঙ্গিত বা চিত্রকল্পের মাধ্যমে অনেক না বলা কথাকে বলিষ্ঠভাবে তিনি বলতে পারেন। 'বহুত মানুষ ঘুরে, দেখিনা মানুষ তবু - এ কি বিষ্ময়! নেকড়ে আমার মিত্র; জগৎ শাসন করে - শৃগাল হৃদয়।' বক্তব্যের প্রয়োজনে বাড়তি শব্দের ভার দিয়ে তিনি কবিতার শরীরকে বেঢপ বা স্থূল করে তুলেন না। 'মঞ্চে ক্লানত্দ কুশীলব, বাতিঘর দূরে দোলে' পোহায় না সরীসৃপ রাত; এ কী দিলে প্রমিথু্যস! শূন্য সমাচার মেখে কতকাল উর্ধে রাখি হাত?' অভিজ্ঞ চাষীর মতো তিনি কবিতার জমিন লাঙ্গল দিয়ে খুঁড়েন, নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করেন, বাছাই করে ভালো জাতের বীজ বপন করেন এবং তারপর সার ও পানির আদর-যত্ন দিয়ে চারাগাছকে আসত্দে আসত্দে বড় করে তুলেন। এ ভাবে যত্নের সাথে লালনের কারণে সৈয়দ রুম্মানের সাবধানী হাতে অতি তুচ্ছ এবং অকিঞ্চিতকর বিষয়ও কবিতার উপভোগ্য উপকরণে পরিণত হয়। কুশলী শব্দচাষী রুম্মানের কবিতার দৃষ্টিকাড়া বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার অধিকাংশ কবিতা উচ্চকন্ঠে পাঠ করা যায়। ছন্দোপতন বা অপরিমিত শব্দ প্রয়োগের দোষে দুষ্ট হবার কারণে পাঠককে বারবার হোঁচট খেতে হয়না। কবিতাকে মানুষের কাছাকাছি নিতে হলে তা হতে হবে সহজ আবৃত্তিযোগ্য। অধুনা অনেক কবির কবিতা বক্তব্যের বিচারে উত্তীর্ণ হলেও ছন্দোপতনের কারণে তা পাঠক-নন্দিত হতে ব্যর্থ হয়। রুম্মানের কবিতার শরীর নির্মানে শ্রবণেন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে শব্দ এবং ধ্বনির মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করার মতো।
সৈয়দ আফসার : সৌন্দর্যকে স্পর্শ করেই সকল শিল্পের যাত্রা শুরম্ন। সৈয়দ আফসার সেই সুন্দরকে ধারণ করে কবিতা লিখছেন। তার কবিতা আমাদের সেই অনুভভূতির কথা বলে। তিনি যে পথে হাঁটেন, স্পর্শ করেন, ঘ্রাণ নেন সে পথ কাব্যময় হয়ে ওঠে। সৈয়দ আফসার তার দৃষ্টি কবিতায় উচ্চারণ করেন_ 'চেয়ে থাকলে চোখের সৌন্দর্য বাড়ে না/ দৃষ্টির অধীরতা নিয়ে কাঁপছে ভুরম্ন/ দৈনন্দিন চোখে লুকিয়ে থাকে অশ্রম্ন/ সনত্দাপ; অর্থহীন উন্মাদনা/ চোখ তোলে দেকবে না কেউ _ / জল গলে গলে কেন বাড়ছে জলের ফেনা/ না-দেখার উত্তাপে কতটা বাড়ছে পরস্পর কল্পনা'
সৈয়দ মবনু : এই লেখক ক্রমশঃ বহুমাত্রিক হয়ে ওঠছেন। প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা-ইতিহাস তাকে টানছে। সর্বোতভাবে তার ভেতর বাউল স্বভাবটিও ঘুমটা টেনে বসে আছে। সময়ের ৰরণ ও আলোর উল্কাপাত তাকে মাঝেমধ্যে ঝলসে দেয়। তিনি উচ্চারণ করেন_ 'আলো-আঁধার, দীর্ঘ হাওয়া/ বালিশে লবনাক্ত সমুদ্রের জল/ বাতাসে বাতাস ভাঙার প্রতিধ্বনি/ বাকলের নিচে উঁই-পাহাড়।'
মোহাম্মদ মারুফ : মোহাম্মদ মারম্নফ মূলত প্রাবন্ধিক। কবিতা-চিনত্দাার সূক্ষ্ম বোধকে তিনি সনি্নবেশিত করেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধ্বনির মাধ্যমে। কাব্যের আঁধার তৈরি করেন না _ ভেতর থেকে সকল অসঙ্গতির প্রতি তীব্র কাব্য-বান ছুড়ে দেন। মারুফ যখন লিখেন_ 'চিরায়ত বোধহীন আর/ সংকীর্ণ পাঠ, সংকীর্ণ বোধে/ কর্মযজ্ঞ, সাহিত্য, কলা, চর্চা/ একী অকালকুষ্মাণ্ড/ পণ্ডিতপ্রবর আমাদের।'
ইকবাল হোসেন বুলবুল : আত্মজিজ্ঞাসা, রাজনৈতিক ভন্ডামি, মননের বিপন্নতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ ধারণ করে চিত্রিত হয়েছে ইকবাল হোসেন বুলবুলের কাব্য। মানব মনের সহজাত জিজ্ঞাসা তার মনকে আলোড়িত করে এবং এর উত্তর তিনি অন্বেষণ করেন চারপাশে দৃশ্যমান জগত থেকে, - 'উদয়রত এবং উদিত সূর্যপানে তাকিয়ে/ নতশিরে অনত্দর বলে/ আমার ধর্ম হবে কি? তারপর-/ চন্দ্র, তারা, বাতাস, মাটি, জল/ ফুটনত্দ ফুল আর ফসল/ সবার সামনে নতশিরে অনত্দর বলে/ আমার ধর্ম কি হবে? তারা সবাই বললো/ আমাদের যা তাই-ই।' এখানে বুলবুল যে সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তা নতুন কিছু নয়, কিন্তু তিনি তা উপস্থাপনা করেছেন নিজস্ব ভঙিমায়। এ পর্যনত্দ ইকবাল হোসেন বুলবুলের 'সুখহীন এই সুখের সাথে' 'বাতিহীন তিমির নিশি' এবং 'তোমার সীমানার বাইরে নরক' এ তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার কবিতায় আমরা পাই সুন্দর ও মানবিকতার পক্ষে জয়গান এবং যাবতীয় অশুভ শক্তি, সংকীর্ণতা ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা। তিনি জীবন বাজি রেখে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখেন, - বানের জল নিয়ে আসেনা এখানে কোন ফসল/ চাষ করে তা শত পরিশ্রমে এখানের চাষীরাই/ মৃতু্যর সম্মুখে দাঁড়িয়ে/ জীবন দিয়ে আমরা জয়ের গান গাই। শত্রুর মোকাবেলা করি, বন্ধুকে করি আপন/ এ মাটি, পতাকা, সংবিধান, স্বাধীনতা আমাদের দেহ-মন।'
ফয়জুল আলম বেলাল : ফয়জুল আলম বেলাল তার ছড়ার বই 'পঙ্খিরাজে চাঁদের দেশে' প্রকাশিত হবার পর আধুনিক পঙ্খিরাজ বাংলাদেশ বিমানে চড়ে লন্ডনে আসেন। এখানে এসে প্রকাশ করেছেন প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বৃটেনের বৈরী বাতাস'। আবহমান বাংলার সৌন্দর্যে অবগাহন করে তিনি গ্রাম বাংলায় লালিত-পালিত হয়েছেন এবং সেই সৌন্দর্য এখনো তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। প্রবাস জীবনের ব্যসত্দতা ও অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানবিক প্রেম-বিরহ, স্মৃতিকাতরতা, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ইত্যাদি তার কবিতার প্রধান উপজীব্য। বেলাল 'কৃষ্ণচূড়ায়' পা রেখে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে সত্য ও সুন্দরের আরাধনা শুরু করেন। আকাঙ্খা ছিল একদিন তার 'আশার সাম্পান' পেঁৗছে যাবে সঠিক গনত্দব্যে। কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সংঘাত আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা তাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তার ভালোবাসা ভেসে যায় টেম্স নদীর নীল স্রোতে। তবু বেলাল স্বপ্ন দেখেন, - আজ সাধ জাগে ভালবাসার গেরাস্থলি সাজাব বারোমাস/ স্বপি্নল নীড় গড়ে তোমার অনত্দরে আজন্ম করব বাস। কোকিলের মধুর কলতানে অহরহ একানত্দ সানি্নধ্যে ডাকি/ পৃথিবীর বুকে দুঃখ বেদনায় শুধু তোমার হাতে হাত রাখি।'
মাসুক ইবনে আনিস: মাসুক ইবনে আনিস 'যদি বিদ্রোহ করি' এবং 'অবশিষ্ট শূন্য এক' এ দুটি কাব্যগ্রন্থ আমাদের উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তার আক্ষেপ, - 'কি কথা যেনো এখনো বলা হয়নি/ কী যেনো বলবো? কী যেনো বাকী/ বলবো বলবো বলে এখনো বলা হয়নি।' মাসুক দ্রোহ, প্রেম, জন্মভূমির কথা বলেছেন। বেহুলা, লখিন্দর, বাঁশি ও কৃষ্ণের গান গেয়েছেন। কবিতার নামে জন্মউৎসব বা উদ্বোধনী সংগীত গেয়ে 'ম্লান আসমানের বুকভেদী সূর্যোদয়' প্রার্থনা করেছেন। তার 'নিমাই মন' কবিতার হাত ধরে আরো দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে আগ্রহী।
আব্দুল কাইয়ূম : প্রচার বিমুখ হৃদয়জ কবি আবদুল কাইয়ূম তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বিশুদ্ধ ছোঁয়া' হাতে নিয়ে বিলাতের মাটিতে পা রাখেন। তার কবিতার পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন, নিজ স্বভাবের মতো তার কাব্যভাষাও অত্যনত্দ নম্র এবং বিনয়াবনত, - 'ফুল পাখি আর পাতার ফাঁকে/ চলন নদীর ভরাট বাঁকে/ মুগ্ধ হয়ে তোমায় দেখি। উর্মি-ঊষার মধুর ক্ষণে/ তোমার রূপে ভাবুক সেজে/ ছন্দ-তালে কাব্য লেখি। পাহাড়ি ঐ সবুজ ঘাসে/ ঝোঁপ বনানীর সরু পথে/ হৃদয় ফ্রেমে তোমায় আঁকি।' প্রশ্ন জাগে, কার জন্যে এ কবি ভালোবাসার অর্ঘ্য নিবেদন করছেন? পাঠককে বিভ্রানত্দির মধ্যে না রেখে কবি নিজেই ঝরঝরে ছোট্ট এ কবিতার শেষ তিন লাইনে এর জবাব দিয়েছেন, - 'ক্ষণিক সুখের এই কাননে/ নিত্য সময় চিত্ত নেড়ে/ তোমার ছোঁয়ায় শুদ্ধ থাকি।' শুদ্ধ বা বিশুদ্ধতার প্রতি আমাদের সকলেরই আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু তা অর্জনের পথ সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। কবি প্রদর্শিত পথ আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, কবিতার ছন্দমাধুর্য আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। আব্দুল কাইয়ূমের কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সহজ-সরল শব্দ এবং ছন্দমাধুর্য। আটপৌরে শব্দকে ছোট কাঠামোর কবিতার মোড়কে তিনি উপস্থাপন করেন। তার কবিতা আবৃত্তি করতে ভালো লাগে এবং সাধারণ পাঠকও এর মর্মবানী বুঝতে পারে, - 'অপেক্ষাতে/ অনেকটা ভোর/ সন্ধ্যা-দুপুর/ কেটেই গেলো/ ফিরলো না কেউ। নীল সাগরের/ প্রচন্ড ঢেউ/ লাগলো এসে/ আমার বুকে/ দেখলো না কেউ। এমন কি সে .. / এমন কি সে ..।'
কাজল রশিদ : কাজল রশিদ বিলাতের ব্যসত্দতম কবিদের একজন। তিনি একই সাথে কবি, সম্পাদক এবং প্রকাশক। তিনি জনপ্রিয় লিটল ম্যাগাজিন 'শব্দপাঠে'র প্রকাশক এবং 'কাব্যস্নান' ও 'বাংলাদেশের আকাশ' কবিতা সংকলনের সম্পাদক। কাজল রশিদের কবিতা লেখার সময়কাল বেশিদিন বলা যাবে না। কিন্তু অল্প সময়েই তিনি কবিতার মূলসুরে নিজেকে উনি্নত করেছেন। মানবিক মূল্যবোধ, যাপিত জীবনের দুঃখ-বেদনা এবং বিশ্ব প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য তার কবিতার প্রধান উপজীব্য। সামপ্রতিক কালে তার কবিতায় একটা আশ্চর্য রকম পরিবর্তন অনেকেই লক্ষ্য করে থাকবেন। তিনি আগেও ভালো লিখেছেন, তবে ইদানীং তিনি শব্দচয়ন, বাকপ্রতিমা নিমর্াণ এবং ছন্দের ব্যাপারে সতর্কতার পরিচয় দিচ্ছেন। কবিতার শরীর নির্মান নিয়েও তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। দৃষ্টানত্দ হিসেবে তার বর্তমান সময়ে লেখা একটি ছোট্র কবিতা 'ক্রমশঃ হারাচ্ছি বিশ্বাস' উল্লেখ করা যায়, - 'দিঘীর ঘোলা জলে/ শুদ্ধতার নীলভোর/ ডুবে শ্যাওলার ভিড়ে/ তৃষাতুর বাজখাই আকাশ/ বর্ষাতীসোপান ভাঙে/ অহোরাত্র অলীক ঝড়ে/ ফ্রিজের শুকনো বরফে/ বিবর্ণ রক্তোৎপল দাগ/ দুর্ভেদ্য যন্ত্রণার নিঃশ্বাস/ নীলিমার অদৃশ্য ডাকে/ বলাকারা উড়ে শূন্যতায়/ ক্রমশঃ হারাচ্ছি বিশ্বাস।' এখানে মানবিক আস্থা-বিশ্বাসকে প্রকৃতি থেকে লব্ধ উপমা দিয়ে সাজিয়ে কাব্যিক সুষমায় উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘ লাইনের পরিবর্তে বর্ণনা পরম্পরাকে ভেঙে ভেঙে বিবৃত করে লেখক এখানে একটা গীতিময় আবহ তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন। কাজল রশীদের এ উত্তরণ প্রমাণ করে, তিনি কবিতার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং কবিতার হাত ধরে তার আরো সামনে এগিয়ে যাবার সাহস ও শক্তি রয়েছে। 'অমৃতপাড়ায়' কাজল রশীদের আরেকটি সামপ্রতিক কবিতা। প্রতীকধমর্ী এ কবিতার শব্দচয়ন এবং ব্যবহৃত উপমা-উৎপ্রেক্ষা তার রুচি ও মননশীলতার সাক্ষ্য বহন করছে, - 'যে ফুলে গন্ধ ছড়ায় কবির বাগানে/ কবি তাকে ধরতে চায় কলমের ফাঁদে, তার দু-পায়ে ছিল কবির নগ্ন নুপুর/ .. .. লোভাতুর বকুল বন্যছায়া খোঁজে রূপসী টবে/ ওৎ পেতে থাকা ছোঁড়া কল্পনায়/ দুখের খাঁচায় ডানা ঝাপটায় অপযশে/ হেয়ালী হাওয়ায় ললাটে পড়ে আঁধার তিলক/ রিক্ত সায়াহ্নে ছুটে উন্মাতাল কাটাবনে। বাতিল কবি শরমে মুখ লুকায় অমৃতপাড়ায়।'
আনোয়ারুল ইসলাম অভি : বিলাতের বিভিন্ন বাংলা কাগজ এবং সাহিত্য সাময়িকীতে নতুন প্রজন্মের তরুণ কবিকমর্ী আনোয়ারুল ইসলাম অভি'র কবিতা প্রায়ই চেখে পড়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেন কবিতার, কবিতার মাধ্যমে উন্নত ও মননশীল জীবনের। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন - কবিতা লেখেন। তার 'আদর সোহাগে ভরা আমার নেরাঘর' এ রকম একটি কবিতা। সেখানে তিনি চাষীজীবনের জয়গান গেয়েছেন। বিলাতের রঙপলিশ করা কৃত্রিম জীবনের চেয়ে স্বদেশের মাটিতে খড়ের ঘর এবং লাঙল-জোয়ালের জীবন তার কাছে অনেক বেশী আকর্ষণীয়। একজন চাষীর জীবন তার কাছে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক জীবন। কেননা সকল দিক দিয়ে একজন চাষী প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করেন। তার আলোচ্য কবিতা অন্যভাবেও পাঠ করা যায়। কবিরা এক অর্থে শব্দচাষী। শব্দের চাষ করে তারা কবিতার ফসল ফলান। কবিতার ফসল উৎপাদনে তারা-ই সফল চাষী যারা কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত এবং প্রকৃতির কাছাকাছি। অভির কবিতায় মননশীলতা, সমাজসচেতনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তির ছাপ রয়েছে। একজন সফল কবির মতো দুঃখ, কষ্ট এবং বিরহের মধ্যে তিনি সৃজনশীলতার উপলক্ষ্য খোঁজে পান। তার মতে, - 'দুঃখ আছে বলেই চৌচির মন ফটিকজলে শুদ্ধ হয়। .. কষ্ট আছে বলেই সুখ সংসার দুধে-ভাতে থাকে অমলিন। বিরহ আছে বলেই শেওলা ধরা মন ফাগুন উৎসবে মজে সময় অসময়।'
লন্ডন ৫ আগস্ট ২০০৮
|