![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
স্মৃতি বিজড়িত সৈয়দ পুর মাদ্রাসা
স্মৃতি বিজড়িত সৈয়দ পুর মাদ্রাসা ফরীদ আহমদ রেজা এক. দু হাজার তিন সালে গরমের ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার তরুণ প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা রেজওয়ানের সাথে দেখা হলো। বাংলাদেশে থাকতে তাঁর সাথে কোনদিন দেখা হয়েছে কিনা মনে করতে পারছিনা। দেখলেও তিনি হয়তো তখন খুব ছোট ছিলেন। তাঁর আব্বা মরহুম হাফিজ বশারত আলী সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করতেন, সাথে সাথে মর্যাদাও দিতেন। তাঁর আব্বার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ৯১ সালে, আমার দ্বিতীয় বার বিলাতে আসার ঠিক আগে আগে। সে সময় তিনি আমাকে নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে স্বপ্নের তাবির আবার আমার কাছেই জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য সন্তান হাফেজ রেজওয়ান মাদ্রাসার দায়িত্ব নেয়ার পর বিদেশে বসে বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে তাঁর ব্যাপারে জানতে পেরেছি। এবারই সরাসরি তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হলো। মাদ্রাসা বোর্ডের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেয়ার পর তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। বর্তমানে এমফিল করার জন্যে রিসার্চ করছেন। বয়স অল্প হলেও সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে যে ধরণের মেধা, যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন তা তাঁর আছে বলে শুনেছি। সাক্ষাতের পর মনে হলো মানুষের নিকট থেকে যা শুনেছি তা মিথ্যা নয়। আমার প্রতীতি জন্মেছে যে ইনশাআল্লাহ্ সময় ও সহযোগিতা পেলে তিনি মৃতপ্রায় হাতি সদৃশ এ মাদ্রাসাকে নব জীবন দান করতে সক্ষম হবেন। ২৭ জুলাই আমি এবং আমার বড় ছেলে নাফে আনাম লন্ডন হিথরো থেকে গালফ এয়ারে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পরদিন ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে বাড়ি পৌঁছুতে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের রাত বারোটা বেজে যায়। তাই রাতের বেলা গ্রামের কারো সাথে যোগাযোগ হয়নি। ফজরের নামাজ পড়ে পারিবারিক গোরস্থানে গিয়েছি কবর জেয়ারত করতে। নাগরী হরফে লেখা ঐতিহাসিক মহাকাব্য 'শাহাদতে বুজুর্গান'-এর রচয়িতা আমার দাদাজান মরমী কবি পীর মজিরের মাজার সেখানে। একই কবরস্থানে দাদী এবং ছোট চাচার পাশে অন্তিম শয়নে শুয়ে আছেন আমার আব্বাও। মৃতদের জন্যে দোয়া-দুরুদ পাঠ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের পুরানো বাড়িতে যাওয়া আমার অনেক দিনের অভ্যাস। পুরান বাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার পথে অনেকের সাথে দেখা হলো। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ লাল মিয়ার সাথে দেখা হলে তিনি গ্রামের অন্যান্য প্রসঙ্গ আলোচনার সাথে সাথে মাদ্রাসার হাল-অবস্থা সম্পর্কে আমাকে কিছুটা অবহিত করেন। তিনি আমাকে একবার মাদ্রাসায় যাওয়ার অনুরোধও জানান। পরে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল খবর পেয়ে আমার সাথে এসে দেখা করেন। প্রথম সাক্ষাতেই মনে হলো তাঁর সৌজন্যবোধ আছে। আমার সাথে তিনি খুব অমায়িক ও হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করেন। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের অনুরোধকে আরো জোরদার করে বললেন, আমি যেন অবশ্যই একদিন মাদ্রাসা দেখতে আসি। এটা আমার উপর মাদ্রাসার অধিকার বা হক্ব। দুয়েক দিন পর একদিন সুযোগ করে মাদ্রাসা দেখতে গেলাম। প্রিন্সিপালসহ সকল শিক্ষক আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। মাদ্রাসার বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যত পরিকল্পনা, গ্রামের বা অভিভাবকদের সহযোগিতা, সরকারী সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে প্রিন্সিপাল ক্লাসগুলো ঘুরে দেখতে বললেন। তাঁর প্রস্তাবে আমি সানন্দে রাজি হয়ে প্রতিটি ক্লাস ঘুরে দেখলাম। ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকদের সাথে কথা বলে খুব আনন্দ পেলাম। এ মাদ্রাসায় আমি পড়েছি এবং আমার বাপ-চাচারা পড়েছেন। আমি এক সময় মাদ্রাসার ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লীর দায়িত্বও পালন করেছি। একশ বছর পুরানো এ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা, আর্থিক সমৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ইত্যাদিতে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের গৌরবময় অবদান রয়েছে। মাদ্রাসাটি আমাদের বাড়ি থেকে এতো কাছে যে শিক্ষকরা কি ভাবে পাঠদান করেন, ছাত্ররা কি ভাবে পাঠগ্রহণ করে, ছাত্ররা বা শিক্ষকরা ক্লাসে কখন আসেন ইত্যাদি বিষয় জানা বা বোঝার জন্যে আমাদের মাদ্রাসায় আসতে হয়না, শোবার ঘরে বসেই আমরা তা বুঝতে পারি। অনেক দিন পর সে মাদ্রাসা ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়ে খুব প্রীত হলাম। যারা এর সুযোগ করে দিয়েছেন মুক্তকন্ঠে তাদের কৃতজ্ঞতা জানালাম। বিদায় নিয়ে চলে আসার আগে প্রিন্সিপাল আমাকে আরো দুটো অনুরোধ জানালেন। এক, বিলাতের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে মত বিনিময় করার উদ্দেশ্যে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে আমার সাথে একদিন বসতে চান। দুই, তারা মাদ্রাসার শতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে আমার পরামর্শ ও সহযোগিতা দরকার। বিশেষ করে এ উপলক্ষে প্রকাশিতব্য স্মরণিকার জন্যে আমাকে লেখা দিতে হবে। তাঁর দুটো প্রস্তাবই আমার কাছে ভালো লাগলো। প্রবাসীরা দেশে গেলে মানুষ সাধারণতঃ তাদের কাছে আর্থিক অনুদানের দাবি নিয়ে আসে। বুদ্ধি পরামর্শ নিতে বা লেখা চাইতে কেউ খুব একটা আসেনা। জ্ঞান গ্রহণ নয়, জ্ঞান দান করতেই দেশের মানুষকে বেশি আগ্রহী বলে দেখা যায়। এমনি অবস্থায় সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং শিক্ষকরা আমার কাছে আর্থিক সহযোগিতা না চেয়ে বৃটেনের শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যে বুদ্ধি-পরামর্শ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, এটা অবশ্যই আনন্দের কথা। তাই উৎফুল্লচিত্তে দুটো ব্যাপারেই ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করে সে দিনের মতো মাদ্রাসা থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। কথামত কয়েক দিন পর মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে মত বিনিময় করার উদ্দেশ্যে আবার মাদ্রাসায় গেলাম। বৃটেনের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে আমি প্রায় আধ ঘন্টা কথা বললাম। সেখানে আমি প্রধানতঃ দুটো বিষয়ের উপর জোর দিয়েছি। এক, বিলাতের ছেলেমেয়েরা সাধারণতঃ স্কুল পালাতে চায় না। ছেলেমেয়েরা সেখানে স্কুলে না যাওয়ার জন্যে নয়, বরং যাওয়ার জন্যে কান্না-কাটি করে। এর কারণ হচ্ছে বৃটেনে শিক্ষকরা পাঠদানকে আনন্দঘন ও উপভোগ্য করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে তাদের বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। সে ট্রেনিং জীবনে একবার নয়, প্রতি বছর বার বার তাদের নিতে হয়। এ জন্যে তাদের যোগ্যতা থেমে থাকেনা, ক্রমাগত উন্নত থেকে উন্নততর হয়। দুই, প্রতিটি লেসনের একটা টার্গেট বা লার্নিং অবজেকটিভ থাকে এবং সে অবজেকটিভ যাতে অর্জিত হয় সে জন্যে সবাই আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করেন। বৃটেনের স্কুল-কলেজে কেউ ঢুকলে মুর্খ হয়ে বেরিয়ে আসার খুব একটা উপায় নেই। শিক্ষকরা যে বিষয় শিক্ষা দিতে চান তা শিখিয়ে দিতে পারেন, এটা তাদের বাড়তি একটা যোগ্যতা। আলোচনার পর শিক্ষকরা এ ব্যাপারে আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। শিক্ষকদের নিকট থেকে অনেক অনুসন্ধিৎসু ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন আসার কারণে আলোচনাপর্বের তুলনায় প্রশ্নোত্তর সেশন আমি অধিকতর উপভোগ করি। এ জন্যে আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। দুই. সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে প্রথমেই আমি মরহুম মাওলানা রফিকুল হক সাহেবের কথা বলতে চাই। গ্রামের লোকেরা তাঁকে রফুমিয়া হিসেবে জানেন। তাঁর কাছে আমি শিক্ষা গ্রহণ করেছি শুধু এ কথা বললে আসলে কিছুই বলা হবেনা। মাওলানা সাহেব ছিলেন এক নিরব সাহিত্য সাধক। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া না করলে তাঁর এ পরিচয় হয়তো আরো অনেকের মতো আমারও জানা হতোনা। ডাকযোগে তাঁর কাছে নিয়মিত দৈনিক আজাদ পত্রিকা আসতো এবং নিজেও মাঝে মাঝে আজাদে লিখতেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং আমি আমার সাহিত্য সাধনার পথে তাঁর নিকট থেকে প্রভূত প্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়েছি। এ সময় তাঁর বড় ভাই কাজী মাওলানা আশরাফুল হক আকীকের বড় ছেলে সৈয়দ আমীর খসরুও সৈয়দ পুর মাদ্রাসায় এসে ভর্তি হন। আমীর খুসরু আমার নিচের ক্লাসে পড়লেও তাঁর সাথে আমার খুব ঘনিষ্টতা ছিল। আমীর খুসরুর আব্বা-আম্মা দিরাই বসবাস করার কারণে তিনি মাওলানা রফিকুল হক সাহেবের পরিবারের সাথে বাস করতেন। আমীর খুসরুর সাথে প্রায়ই কাজী বাড়ি যেতাম। তখন মাওলানা সাহেবের সাথে দেখা হওয়া অবধারিত ছিল। খাওয়ার সময় হলে মাওলানা সাহেবের গৃহিনী খুব আদর করে আমাকেও খাবারের টেবিলে আহ্বান জানাতেন। মাওলানা রফিকুল হক নিজে কবিতা না লিখলেও কবিতার উৎসাহী পাঠক ছিলেন। আজাদ এবং অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত লেখার কাটিং খুব আগ্রহ ভরে আমাকে পড়তে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমার অপরিণত বয়সের মতামত উৎসাহের সাথে জানতে চেয়েছেন। আমার লেখা গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতা তিনি আগ্রহের সাথে পাঠ করতেন, প্রয়োজনে পরামর্শ দিতেন। একবার নজরুলের উপর লেখা এক প্রবন্ধে আমি 'দয়াময় মদনমোহনের নিকট প্রার্থনা' কথাটা ব্যবহার করেছিলাম। লেখাটি তাঁকে দেখতে দিলে তিনি লাল কালি দিয়ে চট করে এ লাইনটা কেটে দিয়ে 'দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা' লিখে দেন। তাঁর উৎসাহে ও প্রেরণায় আমরা মাদ্রাসায় নবীদিবস, স্বাধীনতা দিবস, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন করেছি, সাপ্তাহিক সভা করেছি, বিতর্ক সভা করেছি। পত্রিকার জন্যে সংবাদ তৈরি এবং সাজানোর কায়দা সম্পর্কে তাঁর কাছেই আমি প্রথম সবক পাই। সম্ভবতঃ আমি তখন দাখিল চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র। মাদ্রাসায় নজরুল জয়ন্তী পালনের পর মাওলানা সাহেব আমাকে অনুষ্ঠান সম্পর্কে পত্রিকার জন্য একটি খবর তৈরি করতে বলেন। পরে আমার তৈরি করা সংবাদ নিজ হাতে সংশোধন করে দেন, এবং নতুন করে লেখে তা আজাদ এবং যুগভেরীতে পাঠিয়ে দিতে বলেন। আমি খুব আনন্দের সাথে জীবনের প্রথম তৈরি সংবাদটি খবরের কাগজের জন্য পাঠিয়ে দেই। আমার পাঠানো সংবাদ আজাদ ও যুগভেরীতে প্রকাশের পর তিনি নিজে পত্রিকা দুটো নিয়ে আসেন এবং বলেন,- দেখো, তোমার পাঠানো সংবাদ তারা হুবহু ছেপে দিয়েছে। নেপথ্যে থেকে সকল কাজ করে এ ভাবে তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। সংগ্রামী জননেতা মাওলানা জমিলুল হকের সন্তান হিসেবে রাজনীতি তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য হলেও তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। গ্রাম্য পলিটিক্সেও তিনি জড়িত হতেন না। তবে তিনি ছিলেন পুরোপুরি রাজনীতি সচেতন। আমার সাথে তাঁর রাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম - সকল বিষয় নিয়েই ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ হতো। তবে বেশি আলোচনা হতো সাহিত্য ও ইতিহাস নিয়ে। ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে উলামায়ে দেওবন্দের গৌরবোজ্জল ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞান রাখতেন। বই-পুস্তক না দেখে এ সব ব্যাপারে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করতে পারতেন এবং সন-তারিখসহ ঘটনা বলতে পারতেন। মাওলানা সৈয়দ রফিকুল হক এবং তাঁর পরিবারের নিকট থেকে আমি যে স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছি তা আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি। দোয়া করি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদৌসে স্থান দিন। তিন. মাওলানা রফিকুল হক সাহেব কি ভাবে সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন এর পেছনেও ইতিহাস রয়েছে। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার সাথে সৈয়দ পুর কাজীবাড়ির ঘনিষ্ট সম্পর্ক নিয়ে গ্রামের লোকদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা চালু রয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় মাদ্রাসার ওয়াক্ফ এস্টেটের নাম ছিল আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং এর ওয়াক্ফ এস্টেটে বিপুল পরিমান ভূসম্পত্তির পেছনে গ্রামের প্রায় সকল গোষ্ঠীর অবদান রয়েছে। মাদ্রসার বিল্ডিং যেখানে আছে সেটা কাজী বাড়ির জমির উপর নয়, এ জমির মালিক ছিলেন নদীর পূর্বপারের ধনাঢ্য ব্যক্তি জনাব আবাদ উল্লাহ। বলা হয়, ওয়াক্ফ এস্টেটে বার হাল সম্পত্তি রয়েছে। আমার মতে বার হাল কথাটা একটা কথার কথা মাত্র। হতে পারে এক সময় হয়তো সম্পতির পরিমান বার হাল ছিল। আবার অনেক জমি পতিত বা অনাবাদী অবস্থায়ও আছে। যে সকল আবাদী জমি থেকে উপসত্ব পাওয়া যায় এর পরিমান নয়-দশ হাল হতে পারে। এগুলো বোর এবং আমন ফসলের জমি। এ বিপুল পরিমান ভূসম্পত্তির দাতা একা কাজী সৈয়দ শরাফত আলী সাহেব বা তাঁর পূর্ব-পুরুষ নয়। গ্রামের উল্লেখযোগ্য সকল গোষ্ঠীর পূর্ব-পুরুষগণ এ সকল জমি মাদ্রাসার নামে দান করেছেন। প্রশ্ন ছিল, তা হলে কি কারণে ওয়াকফ এস্টেটের নাম মরহুম মাওলানা জমিলুল হক সাহেবের পিতার নামানুসারে 'কাজী শরাফত আলী এন্ড আদার্স ওয়াকফ এস্টেট' রাখা হলো? আমি যখন ছোট ছিলাম তখন গ্রামে এ নিয়ে বাদ-বিসম্বাদ এবং ঝগড়া-বিবাদ লেগেই ছিল। সে সময় গ্রামের সরদার বা মাতব্বরদের মধ্যে মাওলানা জমিলুল হক সাহেব ছিলেন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বয়সের বিচারে সবচেয়ে অগ্রগামী। তাঁর সমসাময়িক মাতব্বরদের অনেকেই তখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। গ্রামের সালিশ-পঞ্চায়েতসহ সকল ব্যাপারে তাঁর ধার এবং ভার দুটোই ছিল। বিশেষ করে আলীয়া মাদ্রাসার ব্যাপারে বলতে গেলে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। তাঁর ঘনিষ্ট আত্মীয় মরহুম মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ, যাকে সবাই বড় মৌলবী সাব বলে সম্মান করে, ছিলেন ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী। মাওলানা জমিলুল হকের ছেলে মাওলানা সৈয়দ ছাদিকুল হক মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক-কাম হেডক্লার্ক। এ নিয়ে আড়ালে-আবডালে হাজারো কথা থাকলেও গ্রামের পঞ্চায়েতে কথা তুলে কেউ সুবিধা করতে পারতেন না। এর একটা কারণ ছিল মাওলানা জমিলুল হক সাহেবের প্রভাব এবং প্রজ্ঞা। কিন্তু প্রধান কারণ ছিল ওয়াকফনামার শর্তাবলী। ওয়াকফনামা অনুযায়ী যিনি মোতাওয়াল্লী হিসেবে মনোনীত হন ওয়াকফ এস্টেটের ব্যাপারে তাঁর মতামতই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। তাই মোতাওয়াল্লী যদি কারো পক্ষে থাকেন তা হলে অন্যান্য লোকদের তেমন কিছু করার ক্ষমতা থাকেনা। গ্রামের এমনি পরিস্থিতিতে কাজী বাড়ির আরেকজন লোককে মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া সহজ ছিলনা। শুধুমাত্র আমরা ছাত্রদের আন্দোলনের কারণেই তা সম্ভব হয়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালে আমি সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হই। তখন মাদ্রাসার অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। মাদ্রাসার পুরানো বিল্ডিংটির পড়ো পড়ো অবস্থা। দেয়াল বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়েছে। দরজা-জানালা নেই। মাদ্রাসার পুরাতন ভবনের তিনটি রুমের কোনটাতেই পার্টিশন নেই। ঘরের মেঝের চুন-সুরকি উঠে পড়েছে। টিনের চাল দিয়ে স্থানে স্থানে পানি পড়ে। প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিল নেই। প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত শিক্ষক নেই। যারা ছিলেন তাদের কেউ টাইটেল পাশ অথবা গ্র্যাজুয়েট ছিলেন না। মরহুম মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহেব ছিলেন ফাজিল পাশ। মাওলানা সাদিকুল হক সাহেবও তখন ফাজিল পাশ ছিলেন। পরে তিনি এক মাদ্রাসা থেকে কামিল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন বলে শুনেছি। অথচ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র মাদ্রাসার জন্যে টাইটেল পাশ মাওলানা এবং অংক ও বিজ্ঞানের জন্যে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল। সুপারের দায়িত্বে ছিলেন মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহেব। তিনি অবশ্য ঠিক সময় মাদ্রাসায় আসতেন এবং অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ধৈর্যের সাথে ছাত্রদের পড়াতেন। কিন্তু শিক্ষকদের মধ্যে অনেকের মাদ্রাসায় আসা-যাওয়ার কোন নির্দিষ্ট টাইম টেবিল ছিলনা। যার যখন ইচ্ছা আসতেন এবং যখন ইচ্ছা চলে যেতেন। মাদ্রাসায় খাবার পানি এবং প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা ছিলনা। ছাত্ররা আমাদের বাড়ির করচ গাছ বা মুর্তাগাছের আড়ালে বসে প্রাকৃতিক কর্ম নিস্পন্ন করতো। শিক্ষকদের প্রয়োজন দেখা দিলে তারা যেতেন আমাদের বাড়িতে, না হয় চৌধুরী বাড়িতে। ছাত্রসংখ্যাও ছিল খুব কম। মাঝে মাঝে নতুন ছাত্র এসে ভর্তি হলেও কয়েকদিন পর চলে যেতো। মক্তব শ্রেনীতে কিছু ছাত্র ছিল। কিন্তু উপরের শ্রেনীগুলোর কোথাও দু'তিন জনের বেশি ছাত্র ছিলনা। কোন কোন ক্লাস একেবারে শূন্য ছিল। হাইস্কুল থেকে এসে আমি প্রথমে দাখিল দ্বিতীয় শ্রেনীতে ভর্তি হই। তখন সে ক্লাসে আমরা ছিলাম মাত্র দু'জন ছাত্র। কিছুদিন পর অপর ছাত্রটি অন্য মাদ্রাসায় চলে যান এবং আমি সেখানে একাকী হয়ে পড়ি। মাদ্রাসার এমনি অবস্থায় আমার নিজেরও পড়াশোনায় মন বসতোনা। আমি আব্বার চাপে নয়, নিজের ইচ্ছায় মাদ্রাসায় পড়তে এসেছি। সুনামগঞ্জ এইচএমপি হাই স্কুলে আমি পড়তাম। খুব ভালো ছাত্র ছিলাম বলে সে স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ক্লাস সিক্স থেকে যখন ক্লাস সেভেনে উঠি তখন যে ছাত্রটি আমার সাথে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে তার সাথে আমার নম্বরের ব্যবধান ছিল একশ'র চেয়ে বেশি। এ জন্যে এইচএমপি হাইস্কুলের শিক্ষকরা চাননি আমি সে স্কুল ছেড়ে চলে আসি। আমার মাদ্রাসায় পড়ার আগ্রহের কারণে আব্বা জোর করে সেখান থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আসেন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে আমার মরহুম আব্বাজান এক ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করতেন। ছেলেমেয়েরা কি পড়বে, কোথায় পড়বে এ নিয়ে তিনি তাদের উপর চাপ দেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না। ছেলেমেয়ের আগ্রহ ও ইচ্ছাকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। শুধু তাই নয়, আমাকে তিনি কখনো বলেননি যে 'এ বই পড়োনা' বা 'ও বই পড়ো'। প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি আসার পর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের চাবি আমার হাতে দিয়ে বলেন, যে বই পড়তে ভাল লাগে তাই নিয়ে পড়তে চেষ্টা করো। সেই ছোট বয়সেই আমি কি পড়বো, কোন লাইনে পড়বো তা নিয়ে তিনি আমার সাথে পরামর্শ করতেন। একদিন আব্বা আমার সামনে কওমী মাদ্রাসা, আলীয়া মাদ্রাসা এবং হাইস্কুল - আমাদের দেশের এ তিনটি শিক্ষাপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে দিয়ে বলেন, 'এখন তুমি-ই ঠিক করো, কোন্ লাইনে পড়বে।' আমি স্বেচ্ছায় আলীয়া মাদ্রাসাকে বাছাই করে নেই। এর কারণ ছিল সুস্পষ্ট। কওমী মাদ্রাসায় পড়লে কুরআন-হাদীস জানা যাবে কিন্তু সেখানে আধুনিক জ্ঞানের কিছুই সেখানে শিক্ষা দেয়া হয়না। স্কুলে পড়লে দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্বে আসবে, তবে দ্বীন সম্পর্কে একেবারে মুর্খ হয়ে থাকতে হবে। একমাত্র আলীয়া মাদ্রাসায়-ই কুরআন-হাদীসের সাথে সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়। এ জন্যেই আমি আলীয়া মাদ্রাসায় পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সে সময় আমার পড়ার মতো একমাত্র মাদ্রাসা ছিল সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা। কিন্তু আমার বয়স এক বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। কারণ তখন আমার বয়স মাত্র বারো বছর। আব্বা-আম্মার মত ছিল, এতো কম বয়সে হোস্টেলে থাকা ঠিক নয়। তাই থাকতে হবে কারো বাসায়। দেখা গেল, সিলেটে আমাদের এমন কোন ঘনিষ্ট আত্মীয় নেই যাদের বাসায় থেকে আমি সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় পড়তে পারি। তাই শেষ অবলম্বন হিসেবে বাড়ির পাশে অবস্থিত সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসাকে আমি বাছাই করে নেই। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসায় এসে আমার মন খুব ভেঙে পড়ে। আমার মন-মানসিকতা বুঝে এবং আমি ভাববিনিময় করতে পারি এমন কেউ সেখানে ছিলনা। সেখানে পড়াশোনার কোন পরিবেশও ছিলনা। তাই বছর খানেক সময় আমার খুব কষ্টে কেটেছে। মনের কষ্ট লাঘব করার জন্যে মাদ্রাসায় পড়াশোনার চেয়ে বাইরের কাজ নিয়ে আমি নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। বন্ধুত্ব করেছি মাদ্রাসার বাইরের ছাত্রদের সাথে। লেখালেখি করা, গল্প-উপন্যাস পাঠ করা, দাবা-ক্রিকেট-ব্যাডমিন্টন খেলা, রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং -এ অংশ নেয়া ইত্যাদি কাজে আমার পুরো সময় ব্যয় হয়েছে। মাদ্রাসার সময় দৈহিক ভাবে মাদ্রাসায় হাজির হতাম, কিন্তু আমার মন সব সময় পড়ে থাকতো বাইরে। বয়স কম হলেও আমি মনে হয় কিছুটা ইঁচড়ে পাকা ছিলাম। তাই মাদ্রাসা এবং নিজের ভবিষ্যত নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবতাম। একদিন ছাত্রদের মধ্যে যারা একটু বয়স্ক এবং বোঝেশোনে তাদের আমাদের বাংলা ঘরে দাওয়াত করলাম। অনেক আলোচনার পর ঠিক হলো, বর্তমানে মাদ্রাসা যে ভাবে চলছে এ অবস্থা চলতে দেয়া যায়না। এর পরিবর্তন আনতে হবে এবং এ জন্যে ছাত্রদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে আমাদের আন্দোলনে নামতে হবে। এ উদ্দেশ্যে আমরা আরো কয়েকবার বসলাম। সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকদফা দাবি তৈরি করা হলো। দাবিগুলো আমিই মুসাবিদা করলাম। সেখানে কি কি দাবি ছিল আজ এতো বছর পর সবগুলো মনে পড়ছেনা। তবে সেখানে অন্যান্য দাবির মধ্যে একজন টাইটেল পাশ শিক্ষক, একজন বিএসসি শিক্ষক, বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্যে মাদ্রাসায় একটি টিউবওয়েল স্থাপন, মাদ্রাসার বিল্ডিং সংস্কার, পেশাবখানা-পায়খানা নির্মাণ ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত ছিল। আমরা লিখিত ভাবে আমাদের দাবি-দাওয়া তদানীন্তন সুপার মাওলানা সৈয়দ আব্দুল ওয়াহিদ সাহেবের মাধ্যমে মাওলানা জমিলুল হক সাহেবের কাছে পৌঁছে দিলাম। আমাদের দাবিনামায় বলা হয়, এ সকল দাবি পূরণ না হলে ছাত্রদের কেউ ক্লাসে আসবেনা। এ ভাবে কোন আলটিমেটাম না দিয়েই অনির্দিষ্ট কালের জন্যে ধর্মঘট শুরু হয়। প্রতিদিন সময় মতো আমরা মাদ্রাসার বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, ছাত্রদের নিয়ে চৌধুরী বাড়ির মাঠে অথবা আমাদের বাড়িতে চলে আসি। কোন দিন মিছিল নিয়ে গোটা গ্রাম প্রদক্ষিণ করি। এ ভাবে কয়েকদিন চলার পর একদিন মাওলানা জমিলুল হক সাহেব তাঁর বাড়িতে আমাদের ডাকেন। আমরা আট-দশজন ছাত্র গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করি। যাওয়ার সময় আমরা খুব ভয়ে ভয়ে যাই । আমরা ভেবেছি, তিনি হয়তো আমাদের সবাইকে খুব বকাবকি করবেন। কিন্তু যাওয়ার পর দেখলাম তিনি আমাদের সাথে অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করলেন। আমাদের সকলের কথা খুব ধৈর্যের সাথে শুনলেন। তারপর বললেন,'তোমাদের সকল দাবিই ন্যায় সঙ্গত। আমি বুঝতে পেরেছি, মাদ্রাসার উন্নতির জন্যেই তোমরা এ সকল দাবি পেশ করেছো। আমাকে কমিটির সাথে কথা বলতে দাও। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, তোমাদের সকল দাবি পূরণের জন্যে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। কাল থেকে ক্লাসে যোগ দাও। ক্লাসে না গেলে তোমাদেরই ক্ষতি হবে।' কথা মতো পরদিনই মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি বৈঠকে বসে। মাওলানা রফিকুল হক সাহেব তখন দুর্গাপাশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তাঁকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে কমিটি আমাদের টাইটেল পাশ শিক্ষকের দাবি সাথে সাথে পূরণ করে দেয়। এ ভাবেই মরহুম মাওলানা সাহেব সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। একই সাথে বিএসসি বা গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকের পরিবর্তে আইএসসি পাশ এবং আন্ডার গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। টিউবওয়েল স্থাপন, স্যানেটারী টয়লেট নির্মাণ, বিল্ডিং সংস্কার প্রভৃতি দাবিও ক্রমান্বয়ে পূরণ হবে বলে কমিটি আমাদের আশ্বাস দেয়। সে অনুযায়ী মাস খানেকের মধ্যেই বিল্ডিং সংস্কারের কাজ শুরু হয়ে যায়। কয়েক মাস পরে আমাদের বাড়ি ও মাদ্রাসার মধ্যখানে মাদ্রাসার প্রথম স্যানেটারী টয়লেট স্থাপন করা হয়। আমার আব্বার কাছ থেকে শুনেছি, মাওলানা জমিলুল হক সাহেব গ্রামের অন্যান্য মুরব্বীদের উপস্থিতিতে সে টয়লেটের পানির ট্যাঙ্ক মাদ্রাসার শেষ সীমায় নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, এ ট্যাঙ্ক-ই এ বাড়ির সাথে মাদ্রাসার সীমানা হিসেবে বিবেচিত হবে। চার. আমি মাদ্রাসায় আর যাদের উস্তাদ হিসেবে পেয়েছিলাম তাদের মধ্যে রানাপিং-এর ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেব ছিলেন এক বতিক্রমধর্মী উস্তাদ। তাঁর কাছে আমি তাজবিদ পড়তাম। আমার ক্লাসে প্রথমে আরেক জন ছাত্র ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে সে ছাত্র অন্যত্র চলে যাওয়ায় আমিই ছিলাম সে ক্লাসে তাঁর একমাত্র ছাত্র। ক্লাসে তিনি তাজবিদ নিয়ে যতটুকু আলোচনা করতেন তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতেন রাজনৈতিক বিষয় আলোচনায়। বলতে গেলে তাঁর কাছেই আমি প্রথম রাজনৈতিক সবক হাসিল করি। তাঁর সংস্পর্শে আসার কারণে আমি মার্কসবাদ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেছি, মেহনতি মানুষের কথা ভাবতে শিখেছি এবং আমার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়েছে। তাঁর সাথে পরিচয় হবার আগে আমি নিজেকে নিছক একজন লেখক হিসেবেই কল্পণা করতাম। রাজনৈতিক কোন চেতনা তখন আমার মধ্যে ছিলনা। এটা ঠিক যে সবাই প্রত্যক্ষ রাজনীতি করেনা। তবে রাজনীতি যেহেতু মানব জীবনের সর্বস্তরে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে সেহেতু কোন বুদ্ধিমান এবং সচেতন লোক কখনো রাজনীতি নিরপেক্ষ থাকতে পারেনা। ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেবের কাছ থেকে আমি এ সবক পেয়েছি এবং এ জন্যে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। ক্বারী সাহেব গল্প করতে ভালবাসতেন। তিনি আমার সাথে ইতিহাসের গল্প বলতেন। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তন, উলামায়ে দেওবন্দের রাজনৈতিক আন্দোলন, রাশিয়ায় জার বিরোধী আন্দোলন, মেহনতি মানুষের অধিকারের ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য ইত্যাদি ছিল তাঁর আলোচ্য বিষয়। তিনি রাজনৈতিক বই-পত্র নিয়ে ক্লাসে চলে আসতেন। কিছু সময় তাজবিদ আলোচনা ও মশক করার পর আমার সামনে বই খুলে ধরতেন। অধিকাংশ বই ছিল বাংলায় এবং কোন কোন বই ভারত থেকে প্রকাশিত। আমার মনে আছে অন্যান্য লেখকদের মধ্যে আসামের মাওলানা তাহেরের কয়েকটি বই আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। কোন সময় তিনি কোন বইয়ের বিশেষ পৃষ্ঠা খুলে দিয়ে আমাকে পড়তে বলতেন। আবার কোন কোন সময় নিজেই জোরে জোরে পড়তেন। মাঝে মাঝে আমি তার দেয়া বই বাড়িতেও নিয়ে যেতাম। পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে অন্যান্য বই পড়ার প্রতি এমনিতেই আমার অধিক আকর্ষণ ছিল। বাড়িতে আব্বার ব্যক্তিগত পাঠাগার আমার জন্যে উন্মূক্ত ছিল। এ ছাড়া আব্বা প্রায়ই সিলেট থেকে বই নিয়ে আসতেন। আব্বা সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদের জীবন সদস্য ছিলেন। কোন সময় তিনি বই কিনে আনতেন এবং কোন সময় আনতেন মুসলিম সাহিত্য সংসদ থেকে। ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেবের নিকট থেকে আমি আয়ুব সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের লেখা 'ভাসানী যখন ইউরোপে' বইয়ের কথা জানতে পারি। বাড়িতে গিয়ে আব্বার সাথে আলাপ করলে তিনি আমাকে বিশেষ ভাবে রক্ষিত গোপন স্থান থেকে বের করে বইটি পড়তে দেন। ব্যক্তিগতভাবে ক্বারী সাহেব ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সিলেট জেলা শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তখনো মস্কো বা পিকিং পন্থী হিসেবে ন্যাপ বিভক্ত হয়নি। তাই তিনি ছিলেন অখন্ড ন্যাপের ভাইস প্রেসিডেন্ট। সৈয়দ পুরে তিনি থাকতেন সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল সাহেবের বাড়িতে। আমার ফুফুর বাড়ি এবং খালার বাড়ি হিসেবে এমনিতেই আমি তাদের বাড়ি যেতাম। সেখানে গেলে ক্বারী সাহেবকেও দেখতে যেতাম। প্রায়ই দেখতাম সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল এবং ক্বারী সাহেব বসে গল্প করছেন। তারা ন্যাপ-এর সাথে জড়িত ছিলেন সে সংবাদ আমার জানা ছিলনা। আমার মত মুগ্ধ শ্রোতা পেয়ে তাদের মুখে আলোচনার খৈ ফুটতো। ক্বারী সাহেবের প্রভাবে এ সময় আমার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়। সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল তখন বলতে গেলে বেকার অবস্থায় বাড়িতে থাকতেন। আমার মতো সৈয়দ পুরের আরো কিছু তরুণ তাঁর বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দিতেন। তাদের মধ্যে সৈয়দ মশহুর আলী ও নোয়া পাড়ার মরহুম ফখরুল ইসলাম খানের কথা এ মুহুর্তে মনে পড়ছে। এ আড্ডার ফলে আমরা সবাই না হলেও অনেকে নিজেদের ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য বলে ভাবতে শুরু করি। পরবর্তীতে ২১ ফ্রেব্রয়ারীতে আমরা কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাত ফেরিতে অংশ নেই এবং ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হকের লেখা প্রসিদ্ধ গান 'ভুলবোনা ভুলবোনা একুশে ফেব্রুয়ারী মোরা ভুলবোনা' গেয়ে গেয়ে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করি। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জগন্নাথপুরে একটি ছাত্রসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সিলেট জেলা সভাপতি এবং বর্তমান বিএনপি নেতা গোলজার আহমদ। সৈয়দ পুর থেকে আমরা অনেকে সেখানে উপস্থিত হই এবং সৈয়দ পুরের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে সেখানে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সেটাই ছিল আমার প্রথম বক্তৃতা। ছাত্র ইউনিয়নের সাথে আমার এ ধরণের ঘনিষ্ট সংযোগের ব্যাপারে আব্বা অথবা মাদ্রাসার কোন শিক্ষক কোন প্রশ্ন তুলেননি। একজন তৃতীয় ব্যক্তিকে বিষয়টা চিন্তিত করে তোলে এবং সে ব্যক্তি শহীদ শাহ্ জামাল চৌধুরী। পরে এক সময় অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার মুহুর্তে সৈয়দ শাহ্ জামাল চৌধুরী নিজেই আমাকে তা বলেছেন। আমি বইয়ের পাগল ছিলাম এবং যেখানে বইয়ের খবর পেতাম সেখানে গিয়েই হাজির হতাম। বড়বাড়ির সৈয়দ মুরছালিন আহমদের একটা ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল। সে পাঠাগার দেখাশোনা করতেন সৈযদা আফিয়া খাতুন। সৈয়দা আফিয়া খাতুন বর্তমানে সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার উস্তাদ মাওলানা সৈয়দ আব্দুন্নুর সাহেবের সহধর্মিণী। বই আনার জন্যে সপ্তাহে অন্ততঃ দু'বার আমি তাঁদের বাড়িতে যেতাম। সৈয়দ শাহ নুর চৌধুরী তখন সুনামগঞ্জ এবং শহীদ শাহ্ জামাল চৌধুরী ঢাকায় লেখাপড়া করতেন। তারা বাড়ি এলে আমি তাদের কাছে যেতাম শুধু বইয়ের জন্যে। শাহ্ নুর চৌধুরীর নিকট থেকে আনতাম গল্প-উপন্যাস এবং শাহ জামাল চৌধুরী আমাকে দিতেন ইসলামী সাহিত্য। শাহ্ জামাল চৌধুরী বাড়িতে এলে তিনি আমাকে নিয়ে বেড়াতে বের হতেন। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যেতেন, ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রায় সকল প্রাথমিক বই আমি তাঁর নিকট থেকেই পড়েছি। লেখালেখির প্রতি আমার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনি আমাকে জাহানে নও পত্রিকার শাহিন শিবিরে ভর্তি হবার আহবান জানান। তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা এবং তাঁর নিকট থেকে প্রাপ্ত বই-পুস্তক অধ্যয়নের ফলে আমার সামনে চিন্তার এক নতুন জগত উন্মোচিত হতে থাকে। শহীদ শাহ জামাল চৌধুরীর সাহচর্যে আমি বুঝতে শুরু করি ইসলাম আল্লাহর দেয়া পরিপূর্ণ জীবন বিধান এবং সে বিধান অনুযায়ী মানুষের সার্বিক জীবন পরিচালনার মধ্যেই রয়েছে দুনিয়ায় শান্তি ও আখেরাতে মুক্তির গ্যারান্টি। এক সময় ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেব ব্যক্তিগত কারণে সৈয়দ পুর থেকে চলে যান। সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল সাহেবের সাথে তখনো আমার যোগাযোগ ছিল। তার সাথে মাঝে মাঝে সভা-সমিতিতে যেতাম। কিন্তু আমার চিন্তার রাজ্যে তখন পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এ সময় একটি ঘটনা আমার মনকে ছাত্রইউনিয়নের উপর বিতৃষ্ণ করে তুলে। ফখরুল ভাইয়ের সাথে সিলেট গিয়েছি। তখন জিন্দাবাজারে রমনা হোটেল নামে একটা হোটেল ছিল। কয়েকজন ছাত্রের সাথে হোটেলে বসে গল্প করছি। সেখানে ছাত্রইউনিয়নের দুয়েক জন নেতাও ছিলেন। হঠাৎ করে এক নেতা আমাকে হাসতে হাসতে প্রশ্ন করেন, তোমাদের মুহাম্মদ ১৪ বিবাহ কেন করেছিলেন? আমার বয়স কম হলেও এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল। কিন্তু তার প্রশ্নের কোন জবাব আমি দেইনি। প্রশ্নটি আমাকে হতবাক করে দেয়। বামপন্থী রাজনীতির সাথে আমার পরিচয় ঘটে ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেবের মাধ্যমে। সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে মেহনতী মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে ইসলামকে পরিত্যাগ করতে হবে, এমন কথা তার কথা বা কাজ থেকে আমি বুঝতে পারিনি। আমার মনে তাই প্রশ্ন জাগে, তা হলে এরা কি ইসলামকে অস্বীকার করতে চায়? বলতে গেলে এ প্রশ্নের জের ধরেই শেষ পর্যন্ত ছাত্রইউনিয়নের সাথে আমার সম্পর্কের ইতি ঘটে। ৭১ সালে শাহ্ জামাল চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং তিনি সৈয়দ পুরের একমাত্র ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে নিহত হন। আল্লাহ্ শহীদ শাহ্ জামাল চৌধুরীকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন এবং ক্বারী মঈনুদ্দীন সাহেবকে জান্নাতবাসী করুন। পাঁচ. সৈয়দ পুরের আভিজাত্য নিয়ে কারো প্রশ্ন নেই। শুধু আশে পাশের গ্রাম নয়, বাংলাদেশের সর্বত্র এ গ্রামের সুনাম রয়েছে। সবাই জানেন বীর শাহ্ জালাল এবং পীর শাহ্জালাল-এর সঙ্গী হযরত শাহ্ শামসুদ্দীন (রাঃ)-এর বংশধরদের গ্রাম সৈয়দ পুর। আলেম-উলামা এবং বিদ্বানদের গ্রাম হিসেবেও গ্রামটির পরিচিতি রয়েছে। মাওলানা সৈয়দ জমিলুল হক, সৈয়দ মন্তেশর আলী, সৈয়দ মাহফুজ আলী, সৈয়দ অওলাদ হোসেন, কাজী মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা হাবিবুর রহমান, মুন্সী মনিরুদ্দীন আহমদ, মরমী কবি আহশর আলী, মরমী কবি পীর মজির, মাস্টার হাফিজুর রহমান প্রমুখের কারণে গ্রামের পরিচিতি ও সুনাম আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সৈয়দ পুর কি এর পুরানো ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে? আজকের প্রজন্মের সামনে গর্বের সাথে তুলে ধরার মতো কোন ব্যক্তিত্ব কি সৈয়দ পুর গ্রাম থেকে সৃষ্টি হচ্ছে? সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মাদ্রাসা। সৈয়দ পুর গ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এ দু' প্রাচীনত্ব মিলে অভিনব বা বিস্ময়কর কোন কিছুর জন্ম হবে - সেটাই ছিল অনেকের প্রত্যাশা। আমাদের সম্মানিত পূর্বপুরুষরা একশ' বছর আগে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে তাদের বিদ্যোৎসাহী মানসিকতা, ইসলামের প্রতি তাদের অনুরাগ এবং ভবিষ্যত বংশধরদের জন্যে তাদের কর্তব্যনিষ্ঠার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে অতীতে সৈয়দ পুর থেকে যে সকল জ্ঞানী-গুণী তৈরি হয়েছেন তাদের অধিকাংশ-ই সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার সৃষ্টি। এ মাদ্রাসাকে আরো এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব ছিল পরবর্তী বংশধরদের। আমরা সে দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পেরেছি তা বোঝার জন্যে কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়না। মাদ্রাসাটি দেখে এ কথা ভাবা কঠিন যে এটা একশ' বছরের পুরানো একটি মাদ্রাসা। গত একশ' বছরে এর গায়ে তেমন কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। বাংলাদেশে এর পর আরো অসংখ্য মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাহ্যিক কাঠামো, নাম-ডাক, ছাত্রসংখ্যা, শিক্ষকদের মান, বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ইত্যাদির আলোকে সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সৈয়দ পুর আলীয়ার তুলনা করলে সৈয়দ পুর আলীয়ার অবস্থান কোথায় হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বাইরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে সৈয়দ পুর হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং সৈয়দ পুর হাইস্কুলের সাথে আলীয়া মাদ্রাসার তুলনা করলেই ব্যাপারটা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলীয়া মাদ্রাসা দেখলেই মনে হয় এর কোন অভিভাবক নেই। যারা এর পেছনে খেয়ে না খেয়ে কাজ করছেন তারা এর উন্নয়ন নয়, টিকিয়ে রাখার জন্যেই হিমশিম খাচ্ছেন। কেন এই অবস্থা? সত্যি-ই কি এর কোন অভিভাবক নেই? এ মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, কমিটির সদস্য - সকলের মধ্যে যেন একটা মনমরা ভাব। কারো মধ্যেই তেমন উদ্দীপনা বা প্রেরণা লক্ষ্য করা যায়না। আমার মনে হয় একশ' বছর পুর্তি উপলক্ষে উৎসব করার সাথে সাথে এর কারণ অন্বেষণ করে দেখা দরকার। এ মাদ্রাসা কেন এখন অতীতের মত আশাব্যঞ্জক ভূমিকা পালন করতে পারছেনা, কি কারণে এর উন্নতি হচ্ছেনা, কি কারণে অভিভাবকরা এখানে নিজেদের ছেলেদের প্রেরণ করতে উৎসাহ পাননা, কেন ছাত্ররা ভালো রেজাল্ট করতে পারেনা, কেন শিক্ষকদের বেতন বকেয়া থাকে, কেন শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা যায়না ইত্যাদি প্রশ্নের সঠিক জবাব খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এখানে আমি এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত কিছু চিনত্দা-ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কাউকে আঘাত দেয়া বা হেয় করার উদ্দেশ্যে নয়, নিছক মাদ্রাসার উন্নতির কথা বিবেচনা করেই কথাগুলো তুলে ধরছি। আমার বক্তব্যের সাথে দ্বিমত করার অধিকার যে কোন ব্যক্তির রয়েছে এবং তাঁর সে অধিকারের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাবোধ রেখেই আমি আমার বক্তব্য পেশ করছি। আমার মতে সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে গ্রামের দলাদলি এবং কোন্দল। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, মাদ্রাসার উন্নতি বা কোন সমস্যা সমাধানের সময় সংকীর্ণ গোষ্ঠীপ্রীতি সেখানে প্রবল হয়ে ওঠে এবং গ্রাম বা এলাকার প্রয়োজনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান বড় হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠনের উন্নতির জন্যে যে ধরণের আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও উৎসাহ দরকার তা অনেক সময় সেখানে পাওয়া যায়না। বিজ্ঞজনেরা আমার সাথে দ্বিমত করতে পারেন। তবে মাদ্রাসার পুরাতন ছাত্র হিসেবে, গ্রামের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং কিছুদিন মোতাওয়ালস্নীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মধ্যে এ উপলব্ধি এসেছে। আমার এ উপলব্ধি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আমার আনন্দের সীমা থাকবেনা। কিন্তু আমার এ উপলব্ধিকে কি কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবেন? আমরা সৈয়দ পুরের আভিজাত্য নিয়ে গর্ব করি এবং বাস্তবিকই তা গর্ব করার বিষয়। কিন্তু আমাদের স্বার্থচিন্তা, গোষ্ঠীপ্রীতি, কোন্দল, মারামারি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা কি আমরা ভেবে দেখছি? আমাদের তৎপরতার মাধ্যমে আমাদের আভিজাত্যকে আমরা কতটুকু বজায় বা সমুন্নত রাখতে পারছি? আমরা কেউ কেউ আমাদের সংকীর্ণ মনোভাবকে জন্মভূমি গ্রাম থেকে টেনে এনে সুদূর লন্ডন পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে দিচ্ছি। লন্ডন হচ্ছে বহু ভাষা, বহু রঙ, বহু ধর্ম এবং বহু জাতির মিলনকেন্দ্র। অসংখ্য ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের লোক এখানে মিলে মিশে কাজ করছে। অন্যান্য জায়গায় আমরা ঠিকই মিলেমিশে কাজ করি। কিন্তু গ্রামের প্রসঙ্গ এলেই যেন আমাদের মেজাজ অন্য রকম হয়ে যায়। আমরা এক গ্রামের লোকেরা সবাই মিলে এক সাথে কাজ করতে পারিনা, এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কি হতে পারে? কারো কারো কাছে আপত্তিজনক মনে হলেও আমি বলতে বাধ্য যে মাদ্রাসা সম্পর্কে আমার স্মৃতিতে সবচেয়ে পুরাতন যে দৃশ্যটি রয়েছে সেটা হচ্ছে ঝগড়া-বিবাদের দৃশ্য। আমি তখন পাঠশালায় পড়ি। এক শুক্রবারে মাদ্রাসায় গ্রামের জমায়েত হচ্ছে। চট্রগ্রাম থেকে বিভাগীয় শিক্ষা অফিসার এবং সিলেট থেকে জেলা শিক্ষা অফিসার এসেছেন। তখন সিলেট জেলা শিক্ষা অফিসার ছিলেন জগদীশ পুরের মরহুম আকীকুর রাজা চৌধুরী। আমাদের পরিবারের সাথে জগদীশ পুরের চৌধুরী পরিবারের বিশেষ সম্পর্কের কারণে তারা আমাদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। এক সময় শোনা গেল মাদ্রাসায় খুব উচ্চগ্রামে কথাবার্তা চলছে। গরম গরম কথাবার্তার এক পর্যায়ে মারামারি লেগে গেলো। কিছু লোক আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিলেন। সে দিন ঝগড়ার কেন্দ্রবিন্দু কি ছিল তা আমার মনে নেই। তবে যারা আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত্র এবং কারো কারো উত্তেজিত চেহারা এখনো আমার মানসপটে উজ্জল হয়ে আছে। এখানে এ কথা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে এ মারামারিতে আমার আব্বা কোন পক্ষ ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সব সময় নিজেকে গ্রাম্য কোন্দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। তাঁকে আমরা কোনদিন গ্রামের কোন ঝগড়া বা বিবাদে জড়িত হতে দেখিনি। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি সর্বত্র শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। এর মানে এ নয় যে তিনি ভিলেজ পলিটিক্স বুঝতেন না। তিনি ভিলেজ পলিটিক্স অবশ্যই বুঝতেন এবং এক সময় গ্রামের সরপঞ্চের দায়িত্বও পালন করেছেন। নির্বাচনে অংশ নিয়ে নয়, গ্রামের সকলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তিনি এ দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং এতে কোন সন্দেহ নেই যে দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে তিনি অত্যন্ত সফল সরপঞ্চ ছিলেন। অন্যান্য বিবাদের মত মাদ্রাসা নিয়ে আলোচ্য বিবাদেও আব্বা জড়িত হননি, যদিও অতিথিরা ছিলেন আমাদের বাড়ির মেহমান। মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ, মতানৈক্য ও ঝগড়ার আসল কারণ কি? এর পেছনে কি সঙ্গত কারণ আছে? আমার মতে মতানৈক্য ও বিরোধের কিছু স্পষ্ট এবং কিছু অস্পষ্ট কারণ রয়েছে। আমি এটা বলছিনা যে সকল কারণ অসঙ্গত। হতে পারে কিছু কারণ বাস্তবিকই যথার্থ এবং সেগুলোর আশু নিস্পত্তি দরকার। নিছক মতানৈক্যকে কখনো নিন্দা করা যায়না। যেখানে মেধা ও যোগ্যতা থাকে সেখানে মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক। যাদের মেধা ও যোগ্যতা আছে তারা যেমন ভিন্নমত পোষণ বা বিকল্প পরামর্শ দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তেমনি যে কোন বিরোধ সুন্দর ভাবে নিস্পত্তি করার কৌশলও জানেন। আমরা গ্রামের ব্যাপারে এ কৌশল প্রয়োগ করতে পারিনা কেন? আমরা কেন আমাদের নিজেদের বিরোধপূর্ণ বিষয়ের সুন্দর মীমাংসা করতে পারিনা? কোন বিরোধ যখন যুগের পর যুগ চলতে থাকে এবং মতানৈক্য যখন শেষ পর্যন্ত ঝগড়া-বিবাদে রূপান্তরিত হয় এবং তা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলে তখন এ মতানৈক্যকে কোনভাবেই সমর্থন করা যায়না। এটা কোন এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্যে গৌরবের বিষয় হতে পারেনা। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসা নিয়ে আমরা সৈয়দ পুরবাসী যা করছি তা যে নিছক মতানৈক্য নয় তা কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়েনা। আমি পাঠশালায় পড়ার সময় যে ঝগড়া দেখেছি, মাদ্রাসায় পড়ার সময় সে ঝগড়া আরো প্রবল ভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এ জেড এম শামসুল আলম এক সময় সুনামগঞ্জ মহকুমার এসডিও ছিলেন। তখন তিনি সৈয়দ পুরবাসীর বিরোধ নিস্পত্তির জন্যে গ্রাম পর্যন্ত ছুটে এসেছেন। কিন্তু তিনিও আমাদের বিরোধ শেষ করতে পারেননি। আমি সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসায় পড়ার সময় গ্রাম্য বিরোধের এক পর্যায়ে ছাত্রদের শ্রেনীকক্ষ থেকে বের করে দিয়ে মাদ্রাসার দরজায় তালা পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। মাদ্রাসার দরজা তালাবদ্ধ রেখে এ নিয়ে অনেক দিন মামলা-মোকদ্দমা চলেছে। অবশ্য আমার জানামতে পরে তা কোর্টের মাধ্যমে নয়, আপোসে নিস্পত্তি হয়েছে। আমার উপর যখন মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তখনও মাদ্রাসা নিয়ে একটি মোকদ্দমা কোর্টে ছিল। মোকদ্দমাটি করেছিলেন মাওলানা সৈয়দ ছাদিকুল হক সাহেব। এ মোকদ্দমা নিয়ে আমি খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম। মাওলানা ছাদিকুল হক সাহেব আমার সরাসরি উস্তাদ। আমি সৈয়দ পুর মাদ্রাসায় অধ্যয়ন কালে তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। হযরত আলী (রাঃ)-এর বক্তব্য অনুযায়ী কারো কাছে একটি হরফ শিখলেও তিনি আপনাকে গোলাম বানিয়ে রাখার অধিকার অর্জন করেন। এমনি পরিস্থিতিতে উস্তাদের সাথে মামলার বিষয়টি নিয়ে আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। পরে একটি হাদীসের কথা চিন্তা করে আমি নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার অজুহাত খুঁজে পাই। আল্লাহর নাফরমানী করে কোন মানুষের আনুগত্য করতে সেখানে নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যদি মাদ্রাসার ক্ষতি করার চেষ্টা করে তা হলে তাকে তা করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা আমার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মোতাওয়াল্লী হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব ছিল। মাদ্রাসা মামলা করেনি, মামলা করেছেন মাওলানা সাহেব। মাদ্রাসার কমিটি মাওলানা সাহেবকে মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। মাওলানা সাহেব তা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি কোর্টের আশ্রয় নেন। আমার আগের মোতাওয়াল্লী মরহুম সৈয়দ নুরুল ইসলাম সে মামলায় কনটেস্ট করেছেন। মোতাওয়াল্লী হওয়ার আগে এ মামলার ব্যাপারে আমার জানা ছিলনা। দায়িত্ব নেয়ার পর যখন এ ব্যাপারে জানলাম তখন মাদ্রাসার তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে দেখলাম যে তারা মামলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তখন কমিটির পরামর্শে এবং মাদ্রাসার স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে আমাকে আগের মোতাওয়াল্লীর কাজকে সমর্থন করা ছাড়া গত্যন্তর ছিলনা। আমাকে তাই বাধ্য হয়ে আমার উস্তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়েছে। এ জন্যে আমার মনে দুঃখবোধ আছে, তবে কোন অপরাধবোধ বা অনুশোচনা নেই। এর আগে বা পরে বাংলাদেশের কোন আদালতে আমার বাদী বা আসামী হিসেবে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। আল্লাহর কাছে কামনা করছি, তিনি যেন আমাকে আগামীতেও বাদী বা আসামী হিসেবে বাংলাদেশের কোন আদালতে যাওয়া থেকে হেফাজতে রাখেন। ছয়. এ পর্যন্ত যারা সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মূখীন হয়েছেন এবং কি ভাবে তা মোকাবেলা করেছেন তা আমার সঠিক ভাবে জানা নেই। এক সময় মরহুম মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ সাহেব এ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব এবং গ্রামে তিনি বড় মৌলবী সাব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আমি কখনো গ্রামের কারো নিকট থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কোন কথা শুনিনি। হতে পারে তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও পরহেজগারী এবং তাঁর পেছনে মাওলানা সৈয়দ জমিলুল হক সাহেবের মত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আলেমের সমর্থনের কারণে তিনি সকল গ্রামবাসীর পরিপূর্ণ আস্থা সহকারে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পেরেছেন। বড় মৌলবী সাহেবের পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র মরহুম মাওলানা মুশতাক আহমদ মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসে স্থান দিন। মোতাওয়াল্লী নিযুক্তির সময় মাওলানা মুশতাক আহমদ বানিয়াচং-এ কর্মরত ছিলেন। গ্রামের সবাই একবাক্যে তাঁর নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মোতাওয়াল্লী হিসেবে কাজ শুরুর পর তিনি সকলের নিরঙ্কুশ আস্থা ধরে রাখতে পারেননি। আমার মতে এ জন্যে তিনি মোটেই দায়ী ছিলেন না। এর কারণ ছিল গ্রামের ভিলেজ পলিটিক্স এবং তিনি ছিলেন এর অসহায় শিকার। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা। রাজনৈতিক ভাবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ছিলেন। অন্যান্য কারণে যারা তাঁর সমালোচক তারা তাঁর এ রাজনৈতিক পরিচয়কে কৌশলে ব্যবহার করে জনমনে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। আদর্শের প্রশ্নে তিনি আপোসহীন ও অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। হয়তো এ কারণে মরহুম মাওলানা জামিলুল হকের পরিবার থেকেও তিনি সে সহযোগিতা পাননি যে সহযোগিতা উপভোগ করেছিলেন তাঁর পিতা মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ সাহেব। মাওলানা মুশতাক আহমদের পর মরহুম সৈয়দ নুরুল ইসলাম মোতাওয়াল্লী হন। তিনি উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী হিসেবে সব সময় ঢাকায় থাকতেন এবং সেখানে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নিয়োগ এবং কর্মতৎপরতার ব্যাপারে গ্রামে কোন প্রশ্ন ওঠেনি। শুধু মাওলানা ছাদিকুল হক সাহেবের দায়েরকৃত মামলা প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা সমালোচিত হয়েছেন। কারণ সৈয়দ নুরুল ইসলামের পক্ষ থেকেই এ মামলায় কনটেস্ট করা হয়। সৈয়দ নুরুল ইসলামের হঠাৎ করে ইন্তেকালের কারণেই বলতে গেলে আমার মতো একজন দুর্বল লোকের ঘাড়ে মোতাওয়াল্লীর গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। আল্লাহ্ সৈয়দ নুরুল ইসলামকে জান্নাতবাসী করুন। এক দিন মাদ্রাসার তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত সুপার মাস্টার আব্দুল মতিন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম সৈয়দ আলী আহমদ মেম্বার সাহেব সিলেটে আমার বাসায় গিয়ে আমাকে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। আমি তখন তাজপুর কলেজে পড়াই এবং সিলেটের একটি দৈনিকে খন্ডকালীন কাজ করি। আমি ব্যক্তিগত ব্যস্ততা এবং ভিলেজ পলিটিক্সের প্রতি আমার ভীতির দোহাই দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করি। পরে এক সময় বাড়িতে এলে গ্রামের আরো কতিপয় মুরব্বী আমার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেন। সবাই একটা ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রয়োজনে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব নেয়ার জন্যে আমাকে চাপ দেন। তাঁদের চাপের কারণে আমি আব্বার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। আব্বার অনুমতি পাওয়ার পর আমি অনিচ্ছার সাথে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করি। মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমে আমি গ্রামের একটি জমায়েত আহ্বান করি। সে জমায়েতে গ্রামের কোন মুরব্বী সরাসরি আমার বিরোধিতা করেননি দেখে আমার মনে আশা জাগে যে আমি হয়তো মাদ্রাসার উন্নতির জন্যে কিছুটা কাজ করতে পারবো। এ প্রসঙ্গে আমি মরহুম সৈয়দ আলী আহমদ মেম্বার সাহেব এবং ভারপ্রাপ্ত সুপার মাস্টার আব্দুল মতিন সাহেবের অবদান অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। সৈয়দ আলী আহমদ মেম্বার সাহেব বৃদ্ধ বয়সে একজন যুবকের মতো মাদ্রাসার জন্যে খেটেছেন এবং বিনাবাক্যে আমাকে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে কর্মরত মাস্টার আব্দুল মতিন সাহেব খুবই দক্ষ লোক ছিলেন। তাঁর প্রশাসনিক ও শিক্ষা প্রদানের যোগ্যতা প্রশ্নের উর্ধে ছিল। মাস্টার আব্দুল মতিন সাহেব এক সময় মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেলে মাওলানা হাফিজ উদ্দীন সাহেব ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব পালন করেন। মাস্টার আব্দুল মতিন, মাওলানা হাফিজ উদ্দীন এবং মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মচারী সব সময় উৎসাহের সাথে আমার কাজে সহযোগিতা করেছেন। সকলের স্বতঃস্ফুর্ত সাহায্য ও সহযোগিতার কারণে কাজ চালাতে আমার তেমন বেগ পেতে হয়নি। তখন মাদ্রাসার ছাত্রসংখ্যা মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। আমার মতে তখন মাদ্রাসার প্রধান সমস্যা ছিল দুটো। প্রথমতঃ মাওলানা ছাদিকুল হক সাহেবের মামলার কারণে মাদ্রাসার জন্যে স্থায়ী সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়োগ করা যাচ্ছিল না। দ্বিতীয়তঃ জমির খাজনা থেকে মাদ্রাসার যে আয় হতো সে তুলনায় ব্যয় ছিল অনেক বেশি। বিভিন্ন অব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর যে পরিমান আয় হবার কথা ছিল তাও কোন কোন সময় হয়নি। ফলে শিক্ষকদের অনেক বেতন বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া পরিশোধের সাথে সাথে চলতি দিনগুলোর বেতনও আদায় করতে হবে। সাথে সাথে মাদ্রাসার অন্যান্য উন্নয়ন খাতেও প্রচুর টাকার দরকার। বিল্ডিং মেরামত, আসবাবপত্র খরিদ, নতুন ভবন নির্মাণ, টিউবওয়েল ও টয়লেট মেরামত, লাইব্রেরীসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি আশু কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মাওলানা ছাদিকুল হক সাহেবের মামলার ব্যাপারে আপোসে কিছু করা যায় কি না এর সম্ভাবনা যাচাই ও এ ব্যাপারে দর-কষাকষি করার জন্যে আমি মাস্টার আব্দুল মতিন সাহেবকে দায়িত্ব প্রদান করি। মাদ্রাসার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থায়ী একটা আয়ের ব্যবস্থার জন্যে আমি কমিটির কাছে একটা প্রস্তাব রাখি। মাদ্রাসার বেশ কিছু জমি বিভিন্ন লোকের বাড়ির কাছাকাছি আছে। এ সকল জমিতে ভাল ফলন হয়না। অনেকে বেশি দাম দিয়ে এ ধরনের জমি কিনে নিতে আগ্রহী রয়েছেন। দলুয়ার বন্দের কিছু জমি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সেখানকার ছয় কেদার জমির পরিবর্তে একটি পরিবার অন্য জায়গায় ছয় কেদার জমি এবং এর সাথে আরো বিশ লাখ টাকা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আমি ওয়াকফনামা ভাল করে পড়ে দেখলাম যে, এ রকম অজ-বদল করতে আইনতঃ কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তাই আমার প্রস্তাব ছিল, এ রকম কিছু জমি চিহ্নিত করে আমরা খোলাখুলি নিলাম দেব। যে বা যারা বেশি পয়সা দিবেন তাদের সাথে আমরা চুক্তিবদ্ধ হবো। এ ভাবে ব্যবস্থা করতে পারলে ওয়াক্ফ এস্টেটের জমির পরিমান অক্ষত রেখেই আমাদের ফান্ডে লাখ পঞ্চাশেক টাকা চলে আসবে। এ টাকা ইসলামী ব্যাংকে জমা রাখলে এর লভ্যাংশ দিয়ে অনেক কাজ করা সম্ভব হবে। অপর দিকে মাদ্রাসার ভিটা ভরাট করে এর পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে আমরা কিছু দোকান কোঠা তৈরি করে দিতে পারি। এর মাধ্যমেও মাদ্রাসার জন্যে আরেকটা স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। মাদ্রাসার কমিটি আমার প্রস্তাবে এক মত হলেও কিছু লোক দাবি করেন যে বিষয়টা গ্রামের সভায় আলোচনা হওয়া দরকার। তাই আমি বাজারে ঢোল পিটিয়ে গ্রাম্য জমায়েতের ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু গ্রাম্য জমায়েতে আমাকে খুব প্রতিকুল পরিবেশের সম্মূখীন হতে হলো। মনে হলো সে দিন কিছুলোক কসম খেয়ে এসেছেন যে তারা আমাকে এটা করতে দেবেন না। তাদের মধ্যে আমার খুব ঘনিষ্ট কিছু ব্যক্তিও ছিলেন। তারা মনগড়া ফতোয়া ও যুক্তি দিয়ে বার বার সিদ্ধান্তের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলেন। এক সময় আমি বিরক্ত হয়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়া-ই বৈঠক শেষ করে দিলাম। এর পর ঘরোয়া বৈঠকে ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হক, সৈয়দ আলী আহমদ মেম্বার, মাস্টার আব্দুল মতিন, মাওলানা হাফিজ উদ্দীন, হাফিজ আয়ুব আলী প্রমুখের উপস্থিতিতে আমি ঘোষণা দিলাম যে ওয়াকফনামার শর্ত অনুযায়ী গ্রামের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে মোতাওয়াল্লী বাধ্য নহেন। আমি জমি অজ-বদল করতে চাইলে কেউ আমাকে আটকাতে পারবেনা। এ নিয়ে মামলা হলে মামলায় আমার জয় হবে। এর পরও আমি জমি অজ-বদলের পথে যাবনা। মাদ্রাসা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করার সময় বা মানসিকতা কোনটাই আমার নেই। আপনাদের চাপের কারণে আমি এ দায়িত্ব নিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম মাদ্রাসার উন্নতির উদ্দেশ্যে স্থায়ী কিছু কাজ করতে পারবো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নিরিবিলি ভাবে কাজের সুযোগ এখানে নেই। আমি নোংরা ভিলেজ পলিটিক্সে অংশ নিতে পারবোনা। তাই আপনারা আমাকে বাদ দিয়ে নতুন একজন মোতাওয়াল্লী অন্বেষণ করুন। এ সময় কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি একটি বিদেশী মিশনে কাজ করতাম। আমার কর্মস্থল ছিল ঢাকায়। আলোচ্য সভার পরদিন আমি ঢাকায় চলে যাই। পরবর্তী ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে জানলাম নতুন মোতাওয়াল্লী নিয়োগের ব্যাপারে কিছুই করা হয়নি। তখন আমি মাদ্রাসার ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আলী আহমদ মেম্বার সাব, কমিটির অন্যতম সদস্য ও সৈয়দ পুর শাহার পাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান সৈয়দ আফরোজ হোসেন এবং অপর এক সদস্য ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হক সাহেবের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে সাফ জানিয়ে দিলাম যে অনতিবিলম্বে ওয়াকফ এস্টেটের নতুন মোতাওয়াল্লী নিয়োগ করা না হলে আমি মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে হস্তান্তর করে দেব। এ সময় সৈয়দ আফরোজ হোসেন সাহেব আমাকে বললেন, 'আমরা তোমার মামা ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হককে মোতাওয়াল্লী করতে চাই। এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি?' জবাবে আমি বললাম, 'আমার মামা মোতাওয়াল্লী হওয়ার যোগ্য কি না এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই, আমি চাইনা তাঁকে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব দেয়া হোক। তবে আপনারা গ্রামের পাঁচজন মিলে যাকে ঠিক করবেন তাঁর কাছেই আমি দায়িত্ব হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। আমার দাবি একটাই এবং তা হচ্ছে আমার এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি।' এ আলোচনার মাস ছয়েক পরে একদিন খবর পেলাম ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হক, সৈয়দ আফরোজ হোসেন চেয়ারম্যান এবং সৈয়দ লাল মিয়া মেম্বার সাহেব ঢাকার একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। তারা হোটেলের ঠিকানা দিয়ে খবর পাঠিয়েছেন, আমি যেন তাদের সাথে দেখা করি। ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে যাওয়ার পর তারা আমাকে একটা কাগজ দেখালেন। সেখানে বলা হয়েছে, ওয়াকফনামার শর্ত অনুযায়ী গ্রামের পাঁচজনের পক্ষ থেকে ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হককে মাদ্রাসার মোতাওয়াল্লী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমি যখন নিশ্চিত হলাম যে গ্রামের পক্ষ থেকে ঠিকই ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হককে মোতাওয়াল্লী নিয়োগ করা হয়েছে তখন আমি তাঁর পক্ষে সুপারিশ করে দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করছি বলে একটি কাগজে দস্তখত করে কাগজটি তাদের হাতে তুলে দিলাম। তারা আমাকে এ কাগজ নিয়ে ওয়াক্ফ কমিশনারের অফিসে যাওয়ার অনুরোধ করেন। আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বললাম, আমি সেখানে যেতে চাইনা এবং আমার যাওয়ার কোন প্রয়োজনও নেই। ওয়াকফ কমিশনারের অফিসে আমার দস্তখতের নমুনা সংরক্ষিত আছে। ওরা নিজেরা তা মিলিয়ে দেখে সে অনুযায়ী আপনাদের অবহিত করবে। পরবর্তীতে একবার বাড়িতে গেলে ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হক সাহেব আমাকে মোতাওয়াল্লী হিসেবে নিয়োগপত্র দেখিয়ে মাদ্রাসার হিসাবপত্র বুঝিয়ে দেয়ার কথা বলেন। সে অনুযায়ী আমি আমার আব্বাকে সামনে রেখে তাঁকে হিসাবপত্র বুঝিয়ে দেই এবং আমার কাছে গচ্ছিত মাদ্রাসার সমুদয় টাকা রূপালী ব্যাংক সৈয়দ পুর বাজার ব্রাঞ্চের একটি চেকের মাধ্যমে তাঁর হাতে পৌছে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব থেকে আমার অব্যাহতি এবং সে স্থানে আমার মামা ডাঃ সৈয়দ আব্দুল হক সাহেবের নিয়োগ এ ভাবেই সম্পন্ন হয়। সাত. আমার মতে দলাদলি এবং কোন্দলের সাথে সাথে আরো কয়েকটি বিষয় সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার উন্নতির পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আলীয়া মাদ্রাসাকে হাইস্কুলে রূপান্তরিত করার একটা দাবি খুব প্রবল হয়ে ওঠেছিল। সে সময় যারা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ছিলেন তারা এ দাবি সামনে রেখেই দেন-দরবার করেছেন। তখন মরহুম মাওলানা জমিলুল হক সাহেব এবং তাঁর সমর্থক ও সাহায্যকারী ব্যক্তিবর্গ তাদের এ জবাব দিয়েছেন যে ওয়াকফনামার শর্ত অনুযায়ী এ প্রতিষ্ঠান চালাতে হবে। সেখানে পরিষ্কার ভাষায় দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখিত হয়েছে। স্কুলে রূপান্তরিত করলে এটা আর দ্বীনি প্রতিষ্ঠান থাকবেনা। কিন্তু বিরোধীরা এ জবাবে কখনো সন্তুষ্ট হননি। তারা আলাদা ভাবে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে আলীয়া মাদ্রাসাকে হাইস্কুলে রূপান্তরিত করার পক্ষে তাদের সকল শক্তি নিয়োগ করে এসেছেন। আনন্দের বিষয় যে এক সময় গ্রামের একদল সাহসী যুবক মুরব্বীদের 'এ টাগ অব ওয়ার'কে উপেক্ষা করে আলাদা ভাবে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আমি তখন সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার ছাত্র হলেও যুবকদের এ উদ্যোগের সাথে সব সময় ছিলাম। তাদের প্রায় সকল সভা-সমাবেশে আমি উপস্থিত থেকেছি এবং সম্ভাব্য সহযোগিতা করেছি। যুবকদের উদ্যোগের পেছনে অন্যান্যদের সহযোগিতা ও পরামর্শ থাকলেও এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি কিন্তু যুবকরাই ছিলেন। এ সকল যুবক তখন বিভিন্ন স্কুল-কলেজে অধ্যয়ন করছিলেন। তবে সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল, মরহুম সৈয়দ তৈমুছ আলী মাস্টার সাহেব এবং সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল খালিক হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। তারা বিনা বেতনে সেখানে দু'বছর শিক্ষকতা করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ প্রসঙ্গে চৌধুরী বাড়ির অবদানও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাদের বাংলাঘর থেকেই সৈয়দ পুর হাইস্কুলের যাত্রা শুরু হয়। হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর আলীয়া মাদ্রাসাকে স্কুলে রূপান্তরিত করার দাবি আর কেউ উত্তাপন করেছেন বলে আমার জানা নেই। আমার মনে হয় সৈয়দ পুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাও সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার উন্নয়নের পথে একটা নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। আলীয়া ও কওমী মাদ্রাসার মধ্যে কারিকুলামের দিক দিয়ে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি রয়েছে নীতিগত কিছু পার্থক্য। শুরুতে এ পার্থক্য তেমন সুস্পষ্ট না থাকলেও সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে তা তীব্র হয়েছে। কওমী মাদ্রাসার মতে আলীয়া হচ্ছে গবর্নমেন্ট বা সরকারী এবং সরকারী মাত্রই পরিত্যাজ্য। যদিও বাংলাদেশে সর্বসাকুল্যে দুটি মাত্র সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা রয়েছে। একটি ঢাকা আলীয়া এবং অপরটি সিলেট আলীয়া। এ দুটি ছাড়া বাংলাদেশে আর কোন সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা নেই। এর পরও কওমী মাদ্রাসার পক্ষ থেকে সকল আলীয়া মাদ্রাসাকে ঢালাও ভাবে সরকারী মাদ্রাসা বলা হয়। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার আমাদের সরকার। সরকারের নিকট থেকে আমরা সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করি। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা সবাই আগ্রহী। কিন্তু শিক্ষা গ্রহণের প্রশ্নে বিষয়টা ভিন্নভাবে আলোচিত হয়। তখন অত্যন্ত কৌশলের সাথে এবং খুব আবেগপূর্ণ ভাষায় এর নেতিবাচক দিকটি জনগনের সামনে উপস্থাপিত হয়। এর ফলে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে সৈয়দ পুরের অধিকাংশ মানুষের কাছে দ্বীনদারী ও পরকালে প্রতিফল পাওয়ার প্রশ্নে হাফিজিয়া বা কওমী মাদ্রাসা সব সময় অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। কওমী মাদ্রাসা এবং এর ছাত্র-শিক্ষকরা সৈয়দ পুরবাসীর দান-খয়রাত ও সদকা-লিল্লাহর সিংহভাগ লাভ করে। অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতাও তাদের জন্যে সব সময় উন্মূক্ত থাকে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও কওমী মাদ্রাসার জন্যে লিল্লাহ্-সদকার বাইরে বিশেষ চাঁদা সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এবারই প্রথম বারের মতো আলীয়া মাদ্রাসাকে সহযোগিতা করার জন্যে বিলাতে পীর আহমদ কুতুবের নেতৃত্বে আলীয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্রদের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে এবং সামান্য কিছু অর্থ সংগৃহীত হয়েছে। মাওলানা জমিলুল হক সাহেবের হাতে যখন গ্রামের ধর্মীয় নেতৃত্ব ছিল তখন অবস্থা এ রকম ছিল না। মাওলানা জমিলুল হক সাহেব আলীয়া মাদ্রাসার সর্বেসর্বা হবার সাথে সাথে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের রাজনৈতিক উত্তরসুরী হিসেবে কওমী মাদ্রাসার প্রতিও তাঁর পূর্ণ সমর্থন ছিল। আমি ছোটবেলায় কওমী মাদ্রাসার বার্ষিক জলসায় তাঁকে সভাপতিত্ব করতে দেখেছি। কিন্তু মাওলানা জামিলুল হক সাহেবের ইন্তেকালের পর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। বর্তমানে সৈয়দ পুরবাসী কওমী মাদ্রাসার প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েছেন এবং আলীয়া মাদ্রাসাকে উপেক্ষা করছেন। এখন গ্রামে আলীয়া মাদ্রাসাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থনকারী লোকের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। ফলে আলীয়া মাদ্রাসার জন্যে গ্রামের ছাত্র পাওয়া এবং গ্রাম থেকে অন্যান্য সহযোগিতা লাভের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। আলীয়া মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা নিজেদের কর্মতৎপরতার মাধ্যমে যদি গ্রামের ধর্মীয় নেতৃত্বে পুনর্বাসিত হতে পারেন তাহলে-ই এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আজকের যুগে গোটা পৃথিবী জুড়ে কোয়ালিটি এডুকেশন অনেকটা পণ্যের মতো হয়ে গেছে। এর ছোঁয়া আমাদের দেশেও এসে লেগেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে অসংখ্য প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। নিছক ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেখানে নার্সারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নানারকম সীমাবদ্ধতার কারণেই এ সকল প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান কায়েম হয়েছে এবং বহু প্রতিষ্ঠান সুনামের সাথে চলতে পারছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সুনামের সাথে সাথে ব্যবসায়ী দিক দিয়েও লাভবান হচ্ছে। এক দিক থেকে বিচার করলে সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসা একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারী অনুমোদন বজায় রেখে নিজস্ব কারিকুলামের ভিত্তিতে এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি মানুষের আকাঙ্খা ও জাতির প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারে এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করতে সক্ষম হয় তা হলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সে প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং তারা এর পেছনে প্রয়োজনীয় পয়সা খরচ করতেও পিছপা হননা। সৈয়দ পুরবাসী বিশেষ করে আলীয়া মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি চাইলে এ মাদ্রাসাকে একটি যুগোপযোগী আদর্শ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে মা-বাবারা তাদের সন্তনকে প্রেরণ করে নিশ্চিত হতে পারেন যে সে এখানে অধ্যয়ন করে সঠিক ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, আদর্শ চরিত্রবান হিসেবে গড়ে ওঠবে এবং বর্তমান যুগের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে নিজেদের জন্যে যোগ্য আসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা এ রকম হলেই তাদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারবো এবং মাদ্রাসাও গোটা গ্রাম তথা এলাকাবাসীর পূর্ণ সমর্থন লাভ করতে সৰম হবে। এ জন্যে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব এবং সাহসী উদ্যোগের। যারা বর্তমানে আলীয়া মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন তারা এ দিকটির দিকে দৃষ্টি দিবেন বলে আমি আশা করছি। পরিশেষে আমি প্রথম দিন থেকে যারা সৈয়দ পুর আলীয়া মাদ্রাসার পেছনে মেধা, শ্রম এবং অর্থ প্রদান করেছেন তাঁদের সকলের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। যারা জীবিত আছেন, দোয়া করি আল্লাহ্ তাদের দীর্ঘ জীবন, সুন্দর স্বাস্থ্য এবং মাদ্রাসাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা প্রদান করুন। লন্ডন ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৪ |
|