![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
বাংলাদেশের দিপু ও তানি এবং বিলাতের বিপন্ন তারুণ্য
বাংলাদেশের দিপু ও তানি এবং বিলাতের বিপন্ন তারুণ্য ফরীদ আহমদ রেজা আমরা জানি কিছু লোক ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করে নিছক সংবাদ শিরোনাম হওয়ার জন্যে। আবার কিছু লোক বিকৃত মানসিকতার কারণে ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করে। দিপু এবং তানি কি জন্যে লেসবিয়ান জীবন বেছে নিয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে নিছক সংবাদ শিরোনাম হবার জন্যে তারা এমনটি করেছে বলে ভাবার অবকাশ কম। আমার মনে হয় তাদের চিন্তাধারায় বিকৃতি প্রবেশ করেছে বলেই তারা ঘোষণা দিয়ে একে অপরকে বিয়ে করার দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে। এ থেকে বাংলাদেশী মানুষের শিৰা নেয়া দরকার। মেয়ের সাথে মেয়ের এবং ছেলের সাথে ছেলের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠানের ধারা ইউরোপ আমেরিকায় বেশ কিছু দিন থেকে চালু হয়েছে। কোন কোন দেশ তাদের পারস্পরিক বিবাহকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কোন কোন দেশে তারা নিছক গে বা লেসবিয়ান হিসেবে লিভটুগেদার করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কতিপয় ইউরোপীয় দেশে গে এবং লেসবিয়ান সম্প্রদায় অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিলাতেও তারা বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের প্রভাব দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ দেশের প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া লেসবিয়ান ও গে সমাজের সংবাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। তারা যাতে এ দেশের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পায় এবং কোন কারণে যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। বৃটিশ টেলিভিশন গে এবং লেসবিয়ান জীবন যাপন সম্পর্কে ইতিবাচক প্রোগ্রাম ও আলোচনা প্রায়ই সম্প্রচার করে থাকে। বিলাতে তাদের অধিকার আইনের মাধ্যমে সংরক্ষিত। যৌন জীবনধারার কারণে তাদের প্রতি কেউ বৈষম্যমূলক আচরণ করলে তাকে সরকার ঘোষিত ইকুয়াল অপরচুনিটি পলিসি লংঘনের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি কিছুটা গে ভোটারদের চাপে এবং কিছুটা হয়তো নীতিগত পরিবর্তনের কারণে গে সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের চেষ্টা করছে। লেবার পার্টি এর আগে কয়েকবার সেকশন ২৮ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেকশন ২৮-এর বাধ্য-বাধকতার কারণে বৃটেনের স্কুলগুলো গে বা হোমো-সেক্সুয়াল জীবন ধারার পক্ষে মতামত প্রকাশ করতে পারতো না। এক সময় লেবার পার্টির সে উদ্যোগ লর্ডসভা বাতিল করে দিয়েছিল। সরকার গে জীবন যাপনের ব্যাপারে ছেলেমেয়েদের স্বাধীন মতামত গ্রহণের বয়স-সীমা কমানোর চেষ্টাও করেছে। একটি ছেলে বা মেয়ে তার যৌন জীবন কি ভাবে যাপন করবে তা নির্ধারণের বর্তমান বয়স-সীমা ১৮ বছর। সরকার এ বয়স সীমা কমিয়ে ১৬ বছরে নিয়ে আসতে চায়। কয়েক বছর আগে সরকার গে এবং অবিবাহিত দম্পতিদের পালক ছেলেমেয়ে গ্রহণের অধিকার প্রদান সংক্রান্ত আরেকটি বিল লর্ড সভায় প্রেরণ করেছিল। বৃটেনের লর্ডসভা তাও প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল। লর্ড সভায় এ সকল বিল বার বার প্রত্যাখ্যাত হলেও গে এবং লেসবিয়ানরা বসে নেই। সমাজে তাদের প্রতিপত্তি ও প্রভাব রয়েছে এবং তাদের প্রচেষ্টায় সেকশন ২৮ বাতিলের বিল আবার পার্লামেন্ট উত্তাপিত হবে। টরিদলের গত কনফারেন্সে গে ও লেসবিয়ানদের ব্যাপারে দলীয় প্রধানের ইতবাচক বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায় যে নতুন করে বিলটি পার্লামেন্টে গেলে কনজারভেটিভ পার্টি এর পক্ষে মতামত দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশে আমাদের যে সকল ছেলেমেয়ে বেড়ে ওঠছে তারা এ পরিবেশেই বড় হচ্ছে। পরিবেশের প্রভাব তাদের উপর অনবরত পড়ছে। সমাজ, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা এবং স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি থেকে তারা হোমো-সেক্সুয়াল যৌন জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা লাভ করছে। সেকশন ২৮ বাতিলের বিল পর্লামেন্টে পাস না হলেও স্কুল কলেজে এটা অকার্যকর হয়ে আছ। তাই বিলাতের বাঙালী সমাজে বহু তানি এবং দিপু বেড়ে যে ওঠছেনা তা আমরা হলফ করে বলতে পারিনা। তবে হ্যাঁ, ওভাবে কেউ সংবাদ শিরোনাম হয়নি। সংবাদ শিরোনাম না হওয়ার অর্থ এ নয় যে তাদের অস্তিত্ব এখানে নেই। আমরা জানি বিলাতের মা-বাবারা ছেলেমেয়ের খবরা-খবর খুব কমই নেন। তাদের মনের গহীনে যে সকল কথা লুক্কায়িত আছে তা তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, কিন্তু কখনো অভিভাকদের জানতে দেয়না। তারপর যখন কোন ঘটনা ঘটে যায় তখন আমরা হা-হুতাশ শুরু করি। বিস্ময়ের বিষয় যে তখনও আমরা নিজেদের বা নিজেদের ছেলেমেয়ের দোষ না দেখে দোষ দেয়ার চেষ্টা করি পরের ছেলেময়েকে। অথচ এ জন্যে আমাদের ছেলেমেয়ে বা পরের ছেলেমেয়েকে দোষ দেয়ার কিছু নেই। এর জন্যে শতকরা একশ' ভাগ দায়ী আমরা মা-বাবারা। আমরা অভিভাবকরাই তাদের এ দেশে এনেছি, এ দেশের সমাজের সাথে মিশতে দিয়েছি। কিন্তু আমরা তাদের ভালো-মন্দ শিক্ষা দেয়ার আসল কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি। চোখ বন্ধ করে প্রলয় রোধ করা যায়না। প্রলয় রোধ করতে হলে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকাতে হবে এবং তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশের দিপু এবং তানি ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়েছে। সেখানে এখনো গে এবং লেসবিয়ানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং প্রচারণা নেই। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশেও কতিপয় বিকৃতমনা কবি-সাহিত্যিক আছেন যারা হোমো-সেকসুয়াল জীবন-যাপনের পক্ষে ওকালতি করে বই-পত্র লিখেছেন। তাদের গল্প-উপন্যাসে গে বা লেসবিয়ান পাত্র-পাত্রীর জীবন কাহিনী ইতিবাচক ভাবে আসছে। আমরা জানি বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তারা ধিকৃত ও নিন্দিত। কিন্তু বাংলাদেশরে তরুণ-তরুণীর উপর তাদের প্রভাব আছে কিনা এবং থাকলে তা কতটুকু তা আমাদের জানা ছিলনা। এখন দেখা যাচ্ছে দিপু এবং তানির মতো কিছু ছেলেমেয়ের উপর তাদের প্রভাব পড়ে গেছে। দিপু এবং তানির সংবাদ শিরোনাম হবার মতো সাহস আছে বলেই আমরা তা জানতে পেরেছি। যাদের সে সাহস নেই তারা গোপনে গোপনে সে সব বিকৃত রুচিসম্পন্ন লেখকদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে পাশ্চাত্যের সকল কুরুচি ও বিকৃত চিন্তাধারা বাংলাদেশে যাচ্ছে। এর প্রভাব দিপু এবং তানিদের উপর অবশ্যই পড়ছে। বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন উন্নয়নগামী দেশের অনেকের মানসিকতা হচ্ছে পাশ্চাত্যের সব কিছুই উন্নত ও মহৎ । পাশ্চাত্যের মুর্খতা ও বিকৃতি অনেক সময় তাদের কাছে মনে হয় সুন্দর ও অনুকরণীয়। অন্ধভাবে পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করতে গিয়ে তারা নিজেদের স্বকীয়তা বিলীন করে দেয়। অবিবাহিত জীবন যাপন বা লিভটুগেদার এক সময় ভারতীয় উপমহাদেশের লোকদের কাছে ছিল বন্য পশুদের জীবনের মতো। কিন্তু ইদানীং শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অনেক ছেলে-বুড়ো অবিবাহিত অবস্থায় একত্রে জীবন যাপন করছে। এটা সেখানেও নাকি কোন নতুন খবর নয়। এমনি ভাবে আরো অনেক অনাচার ও কদাচার বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাই বাংলাদেশের অভিভাবকদের লাজ-লজ্জা ভেঙে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে যে বিবাহপ্রথা আবহমান কাল থেকে চলে আসা একটা নিয়ম। বিবাহ শুধু একটা প্রথা নয়, এটা একটা পবিত্র ও প্রয়োজনীয় বন্ধন। লিভটুগেদার বা সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহ বন্ধনের নাম বিবাহ নয়, এর নাম স্বেচ্ছাচারিতা। স্বেচ্ছাচারিতার নাম আচার নয়, অনাচার। কোন সমাজ যদি তার পারিবারিক জীবনকে মূল্যবান মনে করে তা হলে তাকে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে প্রচলিত বিবাহ প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং লিভটুগেদারকে প্রতিহত করতে হবে। লিভ টুগেদার বা গে-লেসবিয়ানদের জীবন তারাই পসন্দ করে যারা উপভোগ করতে চায়, কিন্তু দায়িত্ব নিতে চায়না। সামাজিক বিচারে এটা একটা জঘন্য স্বার্থপরতা। বিবাহের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ভেঙে ফেলার অর্থ হচ্ছে পারিবারিক জীবনকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া। যারা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করে, যাদের মনে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ আছে এবং সে দায়িত্ব পালনে যারা ভীত নয় তারা বিবাহপ্রথাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার চিন্তাও করতে পারেনা। পাশ্চাত্যের বিকৃত চিন্তাধারার প্রভাবে কেউ কেউ বিবাহকে নিছক একটা সামাজিক প্রথা মনে করে থুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চায়। তারা এটা ভাবতে পারেনা যে বিবাহ যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটা বন্ধন এবং এ বন্ধন একটি সমাজের প্রাথমিক ইউনিট পরিবারের মৌলিক ভিত্তি। বিবাহ প্রথা ভেঙে দিলে পরিবার গঠিত হবেনা। পরিবার না থাকলে সমাজ থাকবেনা, সমাজ না থাকলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির সম্মূখীন হতে বাধ্য। পাশ্চাত্যে বিবাহের প্রতি উন্নাসিকতার কারণে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তা অবলোকন করে সমাজ বিজ্ঞানীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাই তারা বর্তমানে পরিবার প্রথার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছেন। পাশ্চাত্য যেটা ঠেকে শিখছে আমরা মুসলমান বা বাংলাদেশীরাও কি তা ঠেকে শিখতে হবে? আমাদের পরিবার আছে, সমাজ আছে, আছে ধর্মীয় বিধান। এটা ভাঙার মধ্যে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্যে কোন কল্যাণ নেই, বরং তা একটা ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এ সকল কথা বোঝাতে যদি আমরা ব্যর্থ হই তা হলে পাশ্চাত্যের অনুকরণে আমাদের পারিবারিক জীবনও ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে তা কে বোঝাবে? বিলাতের আলেমদের সে সময় নেই। কেউ মান্দাতা আমলের ওয়াজ-নসিহত এবং কেউ তাবিজ ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। আবার আরেকদল পাউন্ড-রুজির ধান্দায় রাতকে দিন এবং দিনকে রাত করছেন। কমিউনিটি নেতাদের কেউ বাংলাদেশ উদ্ধারের জন্যে জীবন দিচ্ছেন এবং কেউ নিজেকে উদ্ধার করছেন। আমাদের তরুণ-তরুণী কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে? ঘরে-বাইরে কোথাও তাদের শান্তি নেই। নিজের সমাজের লোক বা অভিভাবকদের সাথে তারা মন খুলে কথা বলতে পারেনা। 'এটা করোনা' 'ওটা করোনা' শুনতে শুনতে তাদের কান ঝালাপালা। মসজিদের দরজাও তাদের জন্যে অনেক সময় খোলা থাকেনা। যারা তাদের সাথে মধুর ভাষায় কথা বলে তারা তাদের পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির পথে আহ্বান জানায়। আবেগ এবং যুক্তি দিয়ে তারা তরুণদের ভাষায়-ই কথা বলে। এমতাবস্থায় তারা যদি বিপদগামী হয় তা হলে এ জন্যে তারা কতটুকু দায়ী? আমরা কি এ ব্যাপারে আমাদের দায় এড়াতে পারবো? |
|