![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
ক্রিসমাস ও বৃটেনের মুসলিম সম্প্রদায়
ক্রিসমাস ও বৃটেনের মুসলিম সম্প্রদায় ফরীদ আহমদ রেজা পৃথিবীর অনেক স্থানে খৃষ্টান এবং মুসলমানরা পাশাপাশি বসবাস করেন। কোথাও খৃষ্টানরা সংখ্যালঘু এবং কোথাও মুসলমানরা সংখ্যালঘু। ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলমানরা সংখ্যালঘু এবং বাংলাদেশসহ এশিয়ার সর্বত্র খৃষ্টান সম্প্রদায় সংখ্যালঘু। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া প্রভৃতি মুসলিম প্রধান দেশেও ক্রিসমাস উদযাপিত হতে দেখা যায়। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ক্রিসমাস জাতীয় উৎসবের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে চলেছে। ধর্মীয় আমেজ সেখানে খুব কমই অনুভুত হয়। ক্রিসমাস উপলক্ষে নিয়মিত চার্চ সার্ভিস অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে যারা উপস্থিত হন তাদের মধ্যে বুড়ো এবং শিশুরাই বেশি থাকে। তরুণরা এর ধারে কাছেও যায়না। কিন্তু ক্রিসমাসের সামাজিক কাজের প্রতি ছেলে-বুড়ো সবাই যত্নশীল। ক্রিসমাসের সামাজিক কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর সাজানো, নতুন কাপড় ক্রয় করা, ক্রিসমাস কার্ড ও ক্রিসমাস উপলক্ষে উপহার আদান প্রদান করা। বৃটেনের সকল শ্রেনীর এবং সকল বয়সের লোকেরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে এতে অংশ গ্রহণ করেন। এটা বৃটেনবাসীর সাফল্য যে বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে তারা ক্রিসমাস উৎসবের সাথে জড়িত করতে সফল হয়েছেন। ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রিসমাস একটি লাভজনক উৎসব হওয়ার কারণে হয়তো ব্যবসায়ীরা এটাকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বৃটেনের সবাই তো আর ব্যবসায়ী নয়। তারা একটা সামাজিক উৎসব হিসেবে ক্রিসমাস উদযাপন করে এবং পরস্পরের মধ্যে উপহার ও ক্রিসমাস কার্ড আদান প্রদান করে। বৃটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন অতিমাত্রায় যান্ত্রিকতায় ভরা। তাদের বৃত্তাবদ্ধ জীবনে ক্রিসমাস একটা ভিন্ন ধরণের আমেজ নিয়ে আসে। ক্রিসমাসকে কেন্দ্র করে কয়েকদিনে জন্যে হলেও তারা বৈষয়িক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে হৃদয়বৃত্তির আলোকে পরস্পরকে উপলব্ধি করার একটা সুযোগ লাভ করে। তা ছাড়া ক্রিসমাস যেহেতু মৌলিক ভাবে একটা ধর্মীয় উৎসব, তাই ক্রিসমাসকে কেন্দ্র করে ধর্ম নিয়ে আলোচনার একটা উপলক্ষ সৃষ্টি হয়। ধর্ম মানব জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হলেও আজকের যুগে অনেকে ধর্মীয় আলোচনাকে পশ্চাতগামিতার লক্ষণ মনে করে। যাদের সাথে কোনদিন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয় অথবা যারা ধর্ম নিয়ে আলোচনাকে মোটেই পসন্দ করেনা তাদের সবার সাথে ক্রিসমাসের সময় নিশ্চিতে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ সকল কারণে আমি ব্যক্তিগত ভাবে ক্রিসমাসকে পজিটিভ ভাবে দেখি। বৃটেনের মুসলমানদের মধ্যে ক্রিসমাস নিয়ে মিশ্র মনোভাব রয়েছে। একদল এটাকে খৃষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব বিবেচনা করে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলেন। ওপর দল নিজেরা বাড়িঘর না সাজালেও বা নিজ বাড়িতে ক্রিসমাস ট্রি স্থাপন না করলেও ক্রিসমাস উপলক্ষে সহকর্মী বা বন্ধুদের ক্রিসমাস কার্ড ও ক্রিসমাস গিফ্ট প্রদান করেন। আমাদের স্কুল বা কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা উৎসাহের সাথে ক্রিসমাস কার্ড আদান-প্রদান করে। বড়দের অনেকের এটা ভাল না লাগলেও ছেলেমেয়ের চাপের মুখে এ জন্যে পয়সা খরচ করতে বাধ্য হন। বিস্ময়ের বিষয় যে আমাদের কোন কোন পন্ডিতকে ক্রিসমাস উপলক্ষে ফতোয়া নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। গত বছর ক্রিসমাসের সময় আমার হাতে একটি লিফলেট আসে। লিফলেটটি একটি ইসলামী গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রচার হয়েছিল বলে স্পষ্ট মনে আছে এবং তা ছিল ইংরেজী ভাষায়। দু’ পৃষ্ঠার সে লিফলেটে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে ২৫ ডিসেম্বর যীশুখৃষ্টের জন্মদিন নয়। সেখানে নানা ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়ে এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে খৃষ্টানরা নিজেদের প্রয়োজনে বা সুবিধার জন্যে ২৫ ডিসেম্বরকে যীশুখৃষ্টের জন্মদিন হিসেবে বানিয়ে ফেলেছে। এর পেছনে কোন ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। সে লিফলেট আমাদের কিছু লোকের নির্বুদ্ধিতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২৫ ডিসেম্বর খৃষ্টানদের উৎসব, এটা মুসলমানদের নাক গলাবার বিষয় নয়। খৃষ্টানরা যদি ২৫ ডিসেম্বরের স্থলে ২৫ জুন ক্রিসমাস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় তা হলেও আমার বা মুসলমানদের আপত্তি করার কিছু নেই। ক্রিসমাস বা যীশুখৃষ্টের জন্মদিনের সাথে ইসলামের কোন কিছু যায় আসেনা। তবে হ্যাঁ, যীশুকে মুসলমানরা ঈসা (আঃ) বলেন এবং নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন। কোন মুসলমান তাঁকে নবী হিসেবে না মানলে তিনি নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করতে পারেন না। আমরা যাকে নবী হিসেবে সম্মান করি তাঁর জন্মদিবস সামনে রেখে বিশ্বের কোটি কোটি লোক আনন্দ-উৎসব করছে, এটা আমার কাছেও আনন্দের। তাদের আনন্দ-উৎসবের সাথে আমি ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, সে উৎসবে অংশ না নেয়ার অধিকারও আমার রয়েছে। কিন্তু উৎসবের তারিখ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। এ ব্যাপারে যারা কথা বলেন তারা ইসলাম বা মুসলমানের কোন কল্যাণ করছেন না, বরং অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় একটি বিতর্ক সৃষ্টি করে মুসলমানদের জন্যে বদনাম অর্জন করছেন বলে আমি মনে করি। এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। মুসলমানরা যখন গোটা দুনিয়ায় সম্মান ও ক্ষমতার সাথে অধিষ্ঠিত ছিলেন তখন তারা খৃষ্টানসহ সকল ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের পরিপূর্ণ সুযোগ দিয়েছেন। নাজরান বা ইয়ামেনের খৃষ্টান অধিবাসীদের সাথে মহানবী (সঃ) যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন সে চুক্তিতে বলা হয়েছে যে রাসুল(সঃ)এর পক্ষ থেকে নাজরানের খৃষ্টান অধিবাসীদের জীবন, সম্পদ এবং ধর্মবিশ্বাসের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। তাদের অতীত রীতিনীতির কোন কিছু-ই পরিবর্তন করতে হবেনা। কোন বিশপ, মঙ্ক বা কোন চার্চের নিরাপত্তা রক্ষীকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হবেনা। মহানবী(সঃ) এ ধরণের নিরাপত্তা শুধু নাজরানের খৃষ্টানদের দেননি, এর মাধ্যমে ইহুদী, সূর্যের উপাসক এবং হিন্দুরাও নিরাপত্তা লাভ করেছে। ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম এবং ইবনে সা'দের বরাতে কেউ কেউ বলেন যে মহানবী এক খৃষ্টান প্রতিনিধিদলকে মসজিদে নববীতে বসে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ পর্যন্ত করে দিয়েছেন। তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সকল ধর্মের লোকেরা স্বাধীন ভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দিতে হবে। কেউ যদি এতে বাঁধার সৃষ্টি করে তা হলে সে মহানবী(সঃ)এর নাফরমানী করবে। ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার ব্যাপারে ইসলাম এ দৃষ্টিকোণ পোষণ করে থাকে। এ থেকে মুসলমানরা যেখানে সংখ্যালঘু সে এলাকার ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিকোণ কি হওয়া দরকার তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই ক্রিসমাসের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে ইসলামের কোন খেদমত হচ্ছে বলে আমি মনে করতে পারছিনা। আমার মতে মহানবী(সঃ)-এর সত্যিকার অনুসারী মুসলমানের দায়িত্ব শুধু এ নয় যে তিনি অন্য ধর্মের অনুসারী একজন মানুষের নিজ ধর্মপালনের অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করবেন, বরং সে অধিকারকে তিনি সম্মান ও সংরক্ষণ করবেন। আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধি ও সামান্য জ্ঞান দ্বারা ইসলামকে এ ভাবেই বুঝেছি। মহানবী (সঃ) সাফ বলে দিয়েছেন, 'ইসলামী সমাজে যে ব্যক্তি একজন অমুসলমানকে কষ্ট দেবে সে আমাকে কষ্ট দেবে।' মুসলমানরা যেখানে সংখ্যালঘু সেখানে মুসলমানদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা, ফালতু বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে পানি ঘোলা করা নয়। আমরা মুসলমানরা বৃটেনে ঈদুল ফিতরের, ঈদুল আজহার ছুটিও ভোগ করি। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মুসলমান সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে ঈদ উপলৰক্ষ বিশেষ বাণী প্রদান করা হয়। বৃটেনের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ সরকারী ভাবে খৃষ্টধর্মের অনুসারী। মুসলিম সম্প্রদায়ের এটা দায়িত্ব যে ক্রিসমাস উপলৰক্ষ তারা তাদের হোষ্ট কমিউনিটিকে ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানাবেন। কোন মুসলিম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খৃষ্টান কর্মচারী থাকলে এ উপলক্ষে তাকে কয়েকদিন ছুটি প্রদান করা দরকার এবং তা করতে হবে আনন্দের সাথে। ধর্মের দিক দিয়ে আমরা মুসলিম হলেও নাগরিকত্বের দিক দিয়ে আমরা বৃটিশ। যে দেশের আমরা নাগরিক সে দেশের জাতীয় উৎসবের ব্যাপারে নিস্পৃহ বা নিরাসক্ত থাকা বিচারবুদ্ধির দাবি হতে পারেনা। লন্ডন ১১ ডিসে'র ২০০৪ |
|