![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর কাছে আমাদের ঋণ
- ফরীদ আহমদ রেজা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উজ্জল রত্ন সিলেটের অহংকার অধ্যাপক আসাদ্দর আলী গত ১২ এপ্রিল ২০০৫ ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুজনিত শোকের গভীরতা ও তীব্রতা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। ব্যক্তিগত ভাবে তাঁকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিছুটা নিজের উদাসীনতা এবং কিছুটা পরিপার্শিক অবস্থার কারণে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। আসদ্দর আলী এখন স্বপ্ন দেখার আনেক উর্ধে চলে গেছেন। দোয়া করি আল্লাহ্ যেন তার সাধনাকে কবুল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। অধ্যাপক আসাদ্দর আলী এক শিকড় সন্ধানী নিরব সাধকের নাম। গোটা বাংলাদেশে তাঁর মত গবেষক খুব কমই ছিলেন এবং বৃহত্তর সিলেটে দ্বিতীয় আসাদ্দর আলীর জন্ম হয়নি। তিনি খ্যাতির মোহে অথবা অর্থের লোভে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেননি। সাহিত্যের কিছু বিষয় আছে যা নিয়ে লেখালেখি করলে সহজেই খ্যাতি বা অর্থ আসে। গান, গল্প, কবিতা প্রভৃতি যারা লিখেন তাদের ব্যাপারে কথাটা অনেক সময় খাটে। কিন্তু ভাষা তত্ত্ব বা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সে ধরণের বিষয় নয়। ড· মুহাম্মদ শহীদুলস্নাহর কথা আমরা জানি। তিনি পন্ডিত ও গবেষক ছিলেন, কিন্তু বিত্ত বা জনপ্রিয়তা যাকে বলে তা তাঁর ছিলনা। অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর অবস্থাও সে রকম। তিনি যে বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছেন তা পন্ডিতদের বিষয়। ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনে তিনি হাজার হাজার লোকের সাথে সাক্ষাত করেছেন, হাজার হাজার পৃষ্ঠার প্রাচীন বই-পুস্তক ও পান্ডুলিপি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের জন্যে তিনি যা করেছেন এর বিনিময়ে লক্ষকোটি টাকা দিলেও আমরা তাঁর ঋণ শোধ করতে পারবোনা। এই ক্ষণজন্মা গবেষকের জন্ম বৃহত্তর সিলেটের জগন্নাথপুর থানার লুদরপুর গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ এবং বি এড ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কিছূ দিন মদনমোহন কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার জন্যে ব্যবসা ও নেশা হিসেবে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। এ পর্যন্ত তাঁর ২৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা গেছে এবং আরো বেশ কিছু বই পান্ডুলিপি আকারে পড়ে রয়েছে। তাঁর সকল বই উন্নতমানের গবেষণা কর্ম হিসেবে দেশ-বিদেশের পন্ডিত মহলে সমাদৃত। এ সকল বইয়ের মধ্যে রয়েছে সিলেটের মরমী সাহিত্যের অব্যাহত ধারা, মহাকবি সৈয়দ সুলতান, চর্যাপদে সিলেটী ভাষা, লোকসাহিত্যে জালালাবাদ, সিলেটী নাগরী হরফে সিলেট বিভাগের মুসলমানদের সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা, সিলেটের মহাকবি শেখ চান্দ, বাংলা একাডেমীর প্রকাশনাসহ কিছু গবেষণাগ্রন্থ প্রসঙ্গে, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদ, ময়মনসিংহ গীতিকা বনাম সিলেটী গীতিকা, পুঁথি শহর চরিত এবং আগাজ পুঁথি এবাদতে মগজ(সম্পাদনা), সিলেট বিভাগ সম্পর্কে কিছু কথা, সুফীশাস্ত্র গ্রন্থ রচনায় জালালাবাদ, সুফীশাস্ত্র গ্রন্থ রচনায় রকীব শাহ্, সিলেটী ভাষা, জালালাবাদ ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ, সিলেটী প্রবাদ প্রবচন, সিলেটের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, সিলেট ধন্য যাদের গুণে, গৌরবময় সিলেট বিভাগ, আরবী ফার্সী উর্দুতে সিলেটের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, সিলেট বিভাগে প্রচলিত শব্দ সম্ভার প্রভৃতি। আনন্দের বিষয় যে লন্ডনের এথনিক মাইনোরিটিজ অরিজিনাল হিস্ট্রি এন্ড রিসার্চ সেন্টার সংক্ষেপে ‘এমোহার্ক’ আসাদ্দর আলীর রচনাবলী প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ পর্যন্ত রচনাবলীর তিনটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছে এবং চতুর্থ খন্ড যন্ত্রস্থ রয়েছে। এ সুযোগে আমি এ ধরণের মহতি উদ্যোগের জন্যে এমোহার্কের প্রধান ড· রেণু লু”ফাকে বাংলাভাষা প্রেমিক সকলের পক্ষ থেকে আন্তরিক মোবারকবাদ জ্ঞাপন করছি। এ সকল বইয়ের মাধ্যমে আসাদ্দর আলী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বলতে অনেকটা পাল্টে দিয়েছেন। তিনি ঢাকা ও কোলকাতার গবেষকদের স্তম্ভিত করে দিয়ে সাহিত্যের ইতিহাসে সিলেটকে চিরস্থায়ী এক মর্যাদার আসনে সমাসীন করে দিয়েছেন। গবেষণা কর্ম ছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও সমাজকর্মের সাথে জড়িত ছিলেন। সিলেটের ঐতিহ্য সৃষ্টিকারী সাহিত্য সংগঠন সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন এবং দীর্ঘ এক যুগ এ দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংলাপ এক সময় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। সে সময় আসাদ্দর আলী নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সংলাপের পক্ষ থেকে মরহুম কবি আফজাল চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘হে পৃথিবী নিরাময় হও’ এবং কবি মঈনুল হোসেন চৌধুরীর শিশু-কিশোর কাব্যগ্রন্থ ‘ধান সবুজের দেশে’ প্রকাশ করেন। আমরা জানি বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বঙ্গ মিলিয়ে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য নিদর্শন হচ্ছে চর্যাপদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বাংলাবিভাগের প্রধান হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল থেকে তা সংগ্রহ করেন। পন্ডিতদের কাছে শুধু বাংলা ভাষা নয় সমগ্র পূর্ব ভারতের নতুন ভাষার ইতিহাসে চর্যাপদ প্রথম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। চর্যাপদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর কবিকুল বাংলাদেশের কোন্ অঞ্চলের লোক তা নিয়ে পন্ডিতগণ গবেষণা শুরু করেন। অধ্যাপক আসাদ্দর আলী দীর্ঘদিন থেকে এ বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন। ‘সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদ’ এবং ‘চর্যাপদে সিলেটী ভাষা’ - এ দুটি গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন চর্যাপদের কবিগণ সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি শুধু কথার কথা হিসেবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেননি। বরং চর্যাপদের কবিদের ভাষার সাথে কোন্ কোন্ শব্দ কি ভাবে সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত ভাষার মিল রয়েছে তা তিনি যুক্তি-প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এ দু’টি গ্রন্থ প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ নিয়ে অনেক সংশয়ের নিরসন হয়েছে। চর্যাপদের কবিকুল বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার লোক বলে পন্ডিতদের মধ্যে যারা দাবি করছিলেন তারা আসাদ্দর আলীর বলিষ্ঠ যুক্তির সামনে নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। অধ্যাপক আসাদ্দর আলী দু’টি পি এইচ ডি থিসিস, একটি এম ফিল থিসিস এবং চারখানা গবেষণামূলক বইয়ে বর্ণিত বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁর ‘বাংলা একাডেমীর প্রকাশনাসহ কিছু গবেষণা গ্রন্থ প্রসঙ্গে’ বইখানা লিখেছেন । এ বই সম্পর্কে ড. মযহারুল ইসলামের একটি বক্তব্য বিশেষ প্রনিধানযোগ্য। বইখানা পড়ে ড. মযহারম্নল ইসলাম ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেন,····আপনি তথাকথিত জাঁদরেল গবেষকদের কেউ নন। কিন্ত তথাপি আপনার গবেষণার দৃষ্টি এই সব গবেষকদের চেয়ে অনেক স্বচ্ছ, প্রখর এবং সত্যসন্ধ। আপনি উলেস্নখিত গ্রন্থে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে সব অভিযোগ উত্তাপন করেছেন তার প্রত্যেকটি সত্য এবং অভ্রান্ত। আপনার এই গ্রন্থ নিরপেক্ষ পন্ডিতদের দ্বারা যে ভাবে সমাদৃত, আলোচিত এবং প্রশংসিত হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। কোনদিন হবে বলে মনে করিনা। কেননা গবেষণা ও পান্ডিত্যের বাজার এখন········প্রভৃতি মূর্খ পন্ডিতদের দখলে আছে।······আপনি নিভৃতে ঘরের কোনে বসে যে সব উচ্চমানের গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তার জন্য আপনাকে সাধুবাদ দিই।·····’ মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতানকে চট্রগ্রামের অধিবাসী হিসেবে দাবি করে ড. আহমদ শরীফ তার পি এইচ ডি থিসিস তৈরি করেন। অধ্যাপক আসাদ্দর আলী ‘মহাকবি সৈয়দ সুলতান’ নামক বই লিখে ড. আহমদ শরীফের দাবি যে ডাহা মিথ্যা তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। শুধু ভাষা বা শব্দের কচকচানি দিয়ে নয়, সৈয়দ সুলতানের লেখা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন সৈয়দ সুলতান সিলেটের লোক ছিলেন। সৈয়দ সুলতান তার বইয়ে নিজের ব্যাপারে বলেন, ‘লস্করের পুরখানি আলিম বসতি/ মুই মূর্খ আছি এক সৈয়দ সন্ততি।’ মধ্য যুগের আরো কতিপয় সিলেটী কবিকে এতদিন যাবত অযৌক্তিক ভাবে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার লোক বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। সত্যানুসন্ধানী গবেষকের অভাবে এ সম্পর্কে কেউ খুব একটা উচ্চবাচ্য করেননি। আসাদ্দর আলী তার বলিষ্ঠ কলমের মাধ্যমে এ সকল কবিকে স্বার্থান্বেষী গবেষকদের খপ্পর থেকে উদ্ধার করেছেন। মধ্যযুগের এ সকল কবিদের মধ্যে রয়েছেন শেখ চান্দ, মোহাম্মদ কবীর, কোরেশী মাগন, দৌলত কাজী এবং শাহ মুহাম্মদ সগীর। আসাদ্দর আলী এ কবিদের কাব্যে ব্যবহৃত শব্দ ও বাকধারা বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত শব্দ ও বাকধারার সাথে এর গভীর সাযুজ্য রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে বহুল আলোচিত ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পর্কেও আসাদ্দর আলী কলম ধরেছেন। তিনি ময়মনসিংহ গীতিকার ভাষা বিশ্লেষণ, স্থানাদির নাম এবং পারিপার্শিক অবস্থা আলোচনা করে প্রমাণ করেছেন গীতিকাগুলোর জন্মস্থান ময়মনসিংহ নয়, সিলেট। এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট লোকসাহিত্য গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম বই বলা হয়। সপ্তম শতাব্দী থেকে অষ্টম শতাব্দীর ভেতর এটা রচিত হয়েছিলো। আসদ্দর আলী সাহেব গবেষণা করে দেখিয়েছেন চর্যাপদের তিন শ’র মতো শব্দ হলো সিলেটী শব্দ এবং তিনি বলেছেন প্রাচীন বৌদ্ধাচার্য তারা সিলেটবাসী ছিলেন। ····· । বিখ্যাত ময়মনসিংহ গীতিকা পূর্ব বঙ্গ গীতিকা। আসদ্দর আলী সাহেব দেখিয়েছেন এর নয়টি গীতিকা - যা এ পর্যন্ত আঠারোটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে - সিলেট অঞ্চলের। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ড· দীনেশচন্দ্র সেন অথবা কোন গবেষকই সিলেটের এই যে ঐতিহ্য - এই ঐতিহ্যকে তুলে ধরেননি। সৈয়দ সুলতানের কথা আমরা এতদিন পর্যন্ত শুনে আসতাম তার বাড়ি হলো চট্রগ্রাম। কিন্তু আজকে আমরা প্রমাণ পেয়েছি, আসাদ্দর আলী সাহেবও লিখেছেন - তার বাড়ি হলো সিলেট। কাজেই সিলেট নিয়ে আরো বিস্তৃত গবেষণা হওয়া দরকার। আমরা আশাকরি এখানকার শিক্ষিত সম্প্রদায় ও গবেষকগণ এদিকে এগিয়ে আসবেন।’ (ড· আশরাফ সিদ্দিকী - ২১·০৭·৮৭ তারিখে সিলেট বেতার থেকে প্রচারিত সাড়্গাতকার।) অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর ‘সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদ’ গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক নন্দলাল শর্মা লিখেন, ‘···সংস্কৃত ভাষায় সিলেট বিভাগে হিন্দু সম্প্রদায়ের সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা অংশে লেখক হাজার বছর ধরে সিলেটে সংস্কৃত সাহিত্যের লুপ্তপ্রায় গৌরবকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়টিতে লেখকের নিরপেক্ষ, নিরাবেগ ও উদার অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর যুক্তিবাদী গবেষণা সংকীর্ণতা, হীনমন্যতা, পক্ষপাতিত্ব প্রভৃতি দোষ-ত্রুটির অনেক উর্ধে। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক সিলেট বিভাগের হিন্দু পন্ডিতদের রচিত সহস্রাধিক গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে এ ব্যাপারে উচ্চতর গবেষণার জন্য গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।’ সিলেটী ভাষা নিয়ে আমরা অনেকেই অনেক কথা বলি। এ সকল কথা অনেক সময় হাওয়াই বোমার মত মনে হয়। কেননা কথার কচকচানি ছাড়া সারগর্ভ কিছু সেখানে পাওয়া যায়না। ব্রজদয়াল বিদ্যাবিনোদ সিলেটী ভাষা সম্পর্কে প্রথম গ্রন্থ লিখেন বলে অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা তাঁর এক প্রবন্ধে দাবি করেছেন। আর যারা এ ব্যাপারে কলম ধরেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন তারিনী চরণ দাস, সৈয়দ মুর্তজা আলী, সৈয়দ মুজতবা আলী, ড” গোলাম কাদির প্রমুখ। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার অধ্যাপক আসাদ্দর আলী। তিনি এ ব্যাপারে বিচার বিশ্লেষণ করে ‘ছিলটী ভাষা’ নামক একখানা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে সিলেট অঞ্চলের দীর্ঘদিনের একটি আকাঙ্খা পূরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে নন্দলাল শর্মা বলেন, ভাষাতত্ত্বের পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার জন্যে যে গভীর অধ্যয়ন, অনুশীলন প্রয়োজন অধ্যাপক আলী তা ষোলকলায় পূর্ণ করেছেন। সিলেটের শব্দভান্ডার ও তার সুচারু ব্যবহার সম্পর্কে তিনি নিজেই এক জীবন্ত অভিধান। কাজেই ‘ছিলটী ভাষা’ প্রণয়নের জন্যে তিনিই হলেন যোগ্যতম ব্যক্তি। আলোচ্য গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি যে তা প্রমাণ করেছেন তা তার গুণগ্রাহীরাই নন, যদি কেউ তার নিন্দুক থাকেন তা হলে তিনিও তা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। এই গ্রন্থটির মাধ্যমে শুধু বাংলা ধ্বনি বিজ্ঞানিগণই নন বিশ্বের ধ্বনি বিজ্ঞানীরাও সিলেটী ভাষার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারবেন না। ব্যক্তিগত জীবনে আসাদ্দর আলী অত্যন্ত সৎ, প্রচারবিমুখ, খোদাভীরু, বন্ধু-বৎসল ও নিরহঙ্কারী ব্যক্তি ছিলেন। আমরা অনেক জ্ঞানীকে জানি যাদের কাছাকাছি একবার গেলে দ্বিতীয়বার যেতে ইচ্ছে করেনা। বক্তৃতায় এবং লেখালেখিতে তারা সততা-ন্যায়পরায়নতার পক্ষে বড় বড় কথা বললেও তাদের ব্যক্তিগত জীবন অসংখ্য স্ববিরোধিতায় ভরপুর। কিন্তু আসাদ্দর আলীর জীবনে কোন স্ববিরোধিতা ছিলোনা। জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে -এ আপ্তবাক্যের তিনি ছিলেন মুর্ত প্রতীক। যারা তাঁর সাথে চলাফেরা করেছেন তারা কেউ এর সাথে একটুও দ্বিমত পোষণ করবেন না। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে বামিংহামের সিলেটী ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভলাপমেন্ট প্রজেক্টের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়ে জনাব আসাদ্দর আলী বিলাত এসেছিলেন। সে সময় নতুন দিনে প্রকাশিত একটি লেখায় আমি বলেছিলাম, ‘তাঁর জন্ম যদি ইউরোপের কোথাও হত তা হলে তিনি জীবিত থাকা অবস্থায়ই তাঁর নামে রাস্তাঘাটের নাম হতো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতো। দুয়েকটা বেসরকারী পদক ছাড়া তিনি এ যাবত বাংলাদেশের কোন রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত হননি। ········ দেশ কি একচোখা দৈত্য-দানবে ভরে গেছে? দেশে সৎ ও নিরপেক্ষ লোকের কি এতই অকাল দেখা দিয়েছে? নিরপেক্ষ ভাবে তাঁকে মূল্যায়ন করা হলে তিনি অনেক আগেই বাংলা একাডেমী পদক বা একুশের পদক লাভ করতেন। তাঁর নিকট থেকে সবক নিয়ে এবং তাঁর লেখা নিয়ে গবেষণা করে মানুষ পি এইচ ডি অর্জন করে, কিন্তু তাঁর ভাগ্যে একটা সম্মান সূচক পিএইচডিও জোটেনি। যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশকে মানসিক ভাবে দেউলিয়া বলা ছাড়া উপায় নেই। জ্ঞানীকে সম্মান দিলে প্রকারান্তরে আমরা নিজেরাই সম্মানিত হবো। কেবলমাত্র মুর্খরাই জ্ঞানীদের অবহেলা করে। আসাদ্দর আলী আমাদের কাছ থেকে অর্থ বা সম্মান পাওয়ার লোভে গবেষণাকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেননি। তাঁর সত্যনিষ্ঠা, দেশপ্রেম, বাংলা ভাষার প্রতি ভালবাসা এবং সিলেটের মাটি ও মানুষের প্রতি প্রেমই তাকে এ কাজে নিয়োজিত করেছে। আমরা যদি তাকে মর্যাদা দেই তা হলে মানুষ হিসেবে যে আমরা অকৃতজ্ঞ নই সে প্রমাণই আমরা উপস্থাপিত করবো।’ আনন্দের বিষয় তিনি যে বছর ইন্তেকাল করেন সে বছর বাংলা একাডেমি তাকে একুশ পদক দিয়ে সন্মানিত করেছে। আমাদের গর্ব ও অহঙ্কারের এ সাধক পুরুষ আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তবে তিনি যে সম্পদ রেখে গেছেন তা নিয়ে আমরা কমপক্ষে আগামী একশ’ বছর গর্ব করতে পারবো। তাই দৈহিক ভাবে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও কাজের মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে জীবন্ত হয়ে থাকবেন। লন্ডন ৩০ এপ্রিল ২০০৫ |
|