|
সালেহা চৌধুরী এবং তার কাব্যভাবনা
সালেহা চৌধুরী এবং তার কাব্যভাবনা ফরীদ আহমদ রেজা সবাই স্বপ্ন স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সকল মানুষই স্বপ্ন বিলাসী। বিত্তশালী ব্যবসায়ী, চৌকস রাজনীতিবিদ বা নিম্ন আয়ের দিনমজুর - কেউ এর বাইরে নয়। অবশ্য কবিদের স্বপ্নের মধ্যে একটা ভিন্ন মাত্রা থাকে। তারা নিজেরা শুধু স্বপ্ন দেখেন না, নিজের স্বপ্নকে পাঠকদের মনে সার্থক ভাবে জাগ্রত করতে পারেন। বিলাত প্রবাসী বাংলা ভাষার কবি সালেহা চৌধুরীর তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের সুপ্ত চৈতন্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে স্বপ্নবিলাসী করে তুলেন। তার স্বপ্নের সাথে জড়িয়ে আছে হরিণটানা শ্লেজ গাড়ি, জ্যোৎস্নালোকে অনন্তô বিহার, ধূমায়িত রূপালি সামোভার, আলোর ট্রেন, জাপানি চেরিগাছ, পুষ্পিত সংবাদ, অন্য এক নক্ষত্রলোক, টিয়ে পাখির পুচ্ছ বিলাস, চন্দ্রের প্রপাত ইত্যাদি চিত্রকল্প। কবির হার্দিক অনুভব, - ‘রাতভর ঘুমেই নয়/ স্বপ্ন ভিড় করে চলন্তô ট্রেনে/ খোলা জানালায়/ কখনো পার্কে, বাসের শেষ সিট/ উদাসী হাওয়ায়। আয়, দু পাখা মেলে স্বপ্নেরা আয়।’ বিলাতে যাদের কবিতার সাথে বসবাস তাদের সকলের কাছে সালেহা চৌধুরী একটি প্রিয় নাম। সাহিত্যের সকল শাখায় অবাধ বিচরণ হলেও পাঠকদের কাছে কবি হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। এ দেশের মাটিতে পা দেয়ার পর পরই তার কবিতার সাথে আমার পরিচয় হয়। তবে ব্যক্তি সালেহা চৌধুরীর সাথে পরিচয় হয় অনেক পরে। তার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ের পর একটি বিষয় আমার দৃষ্টিতে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কিছুদিন আগে ‘বিলাতের সমসাময়িক কবি ও কবিতা’ শীর্ষক এক আলোচনায় আমি সে বিষয়টি উল্লেখ করেছি। আমি সেখানে বলেছি, - ‘নন্দিত কবি ও কথাশিল্পী সালেহা চৌধুরী লেখালেখির জগতে তুলনামূলক ভাবে অধিকতর সক্রিয়। অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় সাহিত্যের সাথে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ব্যক্তি সালেহা চৌধুরীর মতো তার কবিতাও রুচি এবং নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে।‘ আমার মনে হয় তার কবিতার সাথে যাদের পরিচয় আছে এবং যারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেন তাদের কেউ আমার এ মন্তôব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন না। কবি সালেহা চৌধুরীর সাথে আমার যোগযোগের সুত্রপাত কবিতা বিষয়ক সাময়িকী ‘কবিতা’কে কেন্দ্র করে। দু হাজার দু সালে কবিতাপত্রের জন্যে লেখা আহ্বান করে বিলাতের বাংলা কাগজে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। সে বিজ্ঞাপন পাঠ করে বিলাতের অনেকেই কবিতা পাঠান। তবে প্রতিষ্ঠিত কবিদের কোন লেখা বিজ্ঞাপন সুত্রে আমার কাছে আসেনি, ব্যক্তিগত যোগযোগের মাধ্যমে তাদের লেখা সংগ্রহ করতে হয়। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সালেহা চৌধুরী। তিনি ডাকযোগে একটি ছোট্ট কবিতা এবং এর সাথে একখানা উৎসাহব্যঞ্জক চিরকুট পাঠান। আমার দৃষ্টিতে এর মাধ্যমে তিনি কবিতার প্রতি তার ভালবাসা এবং নিরহঙ্কার মনের প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। এই সুত্রধরে তার সাথে কবিতা বিষয়ক ভাবের আদান-প্রদান শুরু হয় এবং আস্তেô আস্তেô ঘনিষ্টতা গড়ে ওঠে। জাপানী হাইকু সালেহা চৌধুরীর একটি অত্যন্তô প্রিয় প্রকাশ মাধ্যম। তিনি বেশ স তার এ ব্যাপারে একটি চমৎকার সুখমিশ্রিত স্মৃতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে তিনি নিছক কৌতুহল বশতঃ ইংরেজী খবরের কাগজ ‘ইনডিপেনডেন্ট’ এর অফিসে যান। সেখানে তার পরিচিত কেউ ছিল না। তাদের তিনি বলেন, কাগজ-কলম এবং টেবিল-চেয়ার দিলে সেখানে বসেই তাদের পত্রিকার জন্যে কয়েকটি হাইকু লিখে দিতে পারেন। চাহিদামত সব কিছু পেয়ে সালেহা চৌধুরী ইংরেজী ভাষায় ১০টি হাইকু লিখে দেন। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ হাইকুগুলো পরবর্তী সাহিত্য পাতায় প্রকাশ করেন এবং তা লন্ডনে সালেহা চৌধুরীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। আমার সাথে তার প্রথম যোগাযোগের এক বছর পর, দু হাজার সালের ফেব্রুয়ারীতে, তার কাব্যগ্রন্থ ‘হাইকু’ প্রকাশিত হয় এবং তা তিনি ৫ জনের নামে উৎসর্গ করেন। এ পাঁচজনের মধ্যে চারজন হাইকু সাহিত্যের প্রয়াত দিকপাল মাতশুয়ো বাশো, ইয়াসো বুশোন, কোবাইশি ইশি ও মাশাওকা শিকি, এবং ৫ম ব্যক্তি আমি ফরীদ আহমদ রেজা। হাইকু সাহিত্যের চার দিকপালের সাথে যুক্তকরে তিনি আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন তা আমি এ সুযোগে আত্যন্তô কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। প্রথম সংখ্যা কবিতাপত্রের জন্যে সালেহা চৌধুরী যে কবিতা পাঠান এর শিরোনাম ছিল ‘যে জীবন দোয়েলের ফড়িং এর’। সেখানে তিনি বলেন, - ‘অরিয়েন্ট এপ্রেসে / আমার একটি উপন্যাস শেষ হলো, নায়িকাকে হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছি / আলোকিত জীবনে। রান্নাঘর, বসার ঘর, শোবার ঘর / আমার যাতায়াত, আছে এক চিলতে মেঘের জানালা। ঈশ্বরের কার্পণ্যে আমার বিরোধ / তাই কলমে ঐশ্বর্য, যে জীবন দোয়েলের ফড়িং এর / আমার না হোক / আমার সব কটি নায়িকার সাথে / তাদের হয়ে যাক দেখা।’ আমার মতে সালেহা চৌধুরীর কাব্যভাবনা এবং কবিতার শরীরের সকল অলিগলি এই ছোট্ট কবিতাটিতে মূর্ত হয়ে ওঠেছে। দোয়েল আর ফড়িং এর গীতিময় জীবনের হাতছানি তার কবি মনকে প্রলুব্ধ করে। আটপৌরে ঘরকন্নার মধ্যে বসবাস করলেও তার চিন্তôা-চেতনা দিগন্তô প্রসারিত। উন্মুক্ত গবাক্ষপথে পৃথিবীর সকল রূপ-রস তিনি আস্বাদন করেন। মেঘের ভেলায় চড়ে তিনি প্রদক্ষিণ করেন আলোকিত পৃথিবীর সকল অলিন্দ। দোয়েল আর ফড়িং প্রসঙ্গ আমাদের অরুন্ধতি রায়ের ‘গড্স অব স্মল থিংকস’ উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। সকল নান্দনিক মনই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সহজাত জীবনের সাথে সখ্যতা অনুভব করে, অরুন্ধতি বা সালেহা চৌধুরী অথবা জীবনানন্দ কোন ব্যতিক্রম নয়। সালেহা চৌধুরীর মতে কবিতা হচ্ছে আত্মার দায়ভার। আধুনিক বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে এক আলোচনায় জাকারিয়া শিরাজীকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘কবিতা এমন জিনিস যার মধ্যে এক ফোঁটা আত্মা আবিষ্কারের চিহ্ন লেগে থাকে।’ আসলে মননের বেসাতি যারা করেন তাদের বাইরের খোলস নিয়ে ভাবার সময় নেই, সেটা তাদের জন্য মানানসইও নয়। বস্তুবাদী ব্যবসায়ীদের কাছে বাইরের রঙ-চঙ বা এর বস্তুগত মূল্যই বড়। সালেহা চৌধুরীর কাছে এগুলো বাদামের খোসার মতো। কবিতা খোসা নয়, পাঠকদের আত্মার ধারাবিবরণ প্রদান করে। এমনকি তিনি যখন গাছের ভেতর দিয়ে পথ চলেন তখনও গাছের ফিসফাস কানাকানি শুনতে পান, কেউ মাথা দুলিয়ে বলে ভালোবাসি। তার কবিতা পাঠ করলে আমরা সেখানে সতেজ ও প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর একটি আত্মার সন্ধান পাই। ভাবের দ্যোতনা এবং পরিমিত শব্দ প্রয়োগের কারণে গদ্যভঙ্গিতে লেখা হলেও সালেহা চৌধুরীর কবিতা পাঠকদের মনে ভিন্নমাত্রার একটি দোলা সৃষ্টি করে। বাংলার প্রকৃতির সাথে তুলনা করলে সেখানে চৈত্রের দাবদাহ যেমন নেই, তেমনি নেই বৈশাখী ঝড়। সর্বত্র সেখানে শরৎ বা বসন্তôকালের সোনাঝরা নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ সতত প্রবহমান। তার কবিতায় ভালবাসার কথা যেমন আছে, তেমনি আছে যন্ত্রণা এবং অসুন্দরের কথাও। কিন্তু যন্ত্রণা বা অসুন্দরকে তিনি সৌন্দর্যমন্ডিত করে প্রকাশ করেন। তিনি যখন ঘৃণা বা বেদনার কথা তখন সেখানেও থাকে প্রেমের হার্দিক প্রলেপ। আবিদ আজাদের ভাষায় ‘সালেহা চৌধুরীর কবিতা সংবেদনশীল উদি্ভদের নরম ও ভীরু সবুজ পাতার মতো স্পন্দমান। তার ভাষার মধ্যে পাতার শিরা-উপশিরার ভিতর লুকিয়ে থাকা নিসর্গ-প্রকৃতির গোপন রসায়নের মতোই এক যাদুর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।’ সালেহা চৌধুরীর কবিতা উদি্ভদের কচি পাতার মতো ছোট ছোট বাক্যে এবং সহজ-সরল শব্দ দিয়ে তৈরি, এর মাধ্যমেই তার জীবনবোধ এবং আত্মজিজ্ঞাসা উচ্চারিত হয়েছে। তার কবিতায় নিসর্গ এসেছে, দর্শন এসেছে, এসেছে মানবিক আর্তনাদ। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে নিজেকে অন্বেষণের আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। কবি যখন আত্মপরিচয় খোঁজেন তখন তার লেখা হয়ে উঠে কালজয়ী এবং তার হৃদয়-স্পন্দনের সাথে পাঠক একাত্মতা বোধ করেন। একজন কবি এর মাধ্যমে নিজেকে করে তুলেন পরিপূর্ণ, মননশীল এবং পরিশুদ্ধ। সালেহা চৌধুরীর কবিতায় এ সকল লক্ষণ আছে বলেই তিনি আজ পাঠক-নন্দিত। লন্ডন ২০ জানুয়ারী ২০০৯
|