Home | Articles | About | Contact
একজন মুক্তিযোদ্ধা আলেমের গল্প

একজন মুক্তিযোদ্ধা আলেমের গল্প
ফরীদ আহমদ রেজা

বর্তমানে আমরা এমন একটি সময় অতিক্রম করছি যখন বাংলাদেশের একদল স্বঘোষিত বুদ্ধিরবেপারী এবং তাদের বংশীবাদক কতিপয় পত্র-পত্রিকা অত্যন্তô উৎসাহের সাথে আলেম সমাজের চরিত্র হননের কাজে নিয়োজিত আছেন। আলেম সমাজ এবং আলেম তৈরির প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসাসমূহ সম্পর্কে তারা অনেক ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তô করার চেষ্টা করছেন। বতর্মান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের তৎপরতায় নতুন গতি সঞ্চারিত হয়েছে। আমরা জানি এ সকল বুদ্ধিজীবীর নিজেদের কোন গণভিত্তি নেই। পরের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে তারা চলেন এবং অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার ব্যাপারে তাদের জুড়ি নেই। কিন্তু তাদের জানা দরকার বাংলাদেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা জনগণের সমর্থন এবং অর্থসাহায্যে পরিচালিত হয়। কোন কোন মাদ্রাসা সরকারী সাহায্য পেলেও অধিকাংশ মাদ্রাসা সরকারী সাহায্য পায় না। শুধু পায় না বললে ভুল হবে, বলতে হবে তারা সরকারী সাহায্যের জন্য লালায়িত নয়। বরং সরকারী সাহায্যের বিরুদ্ধে সেখানে রীতিমত ক্যাম্পেইন চলে। যে সকল ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারী সাহায্যে চলে তারা অনেক সময় সরকারের আর্থিক অনুদান অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে নিজেদের স্বধীনতা বিকিয়ে দেয় যা কোনভাবেই একজন আলেমের কাম্য হতে পারে না। আলস্নামা ইকবালের কবিতার ভাষায়, ‘আয় তায়িরে লাহুতি, উছ রিজ্‌ক ছে মওত আচ্চি যিছ রিজ্‌ক ছে আতি হ্যায় পরওয়াজ মেঁ কুতাহি।’ অর্থা‌ৎ, হে খোদার পথে উড্ডয়নকামী পথিক, সেই খাবারের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় যে খাবার তোমাকে স্বাধীনভাবে উড্ডয়নের পথে বিঘ্ন সৃশ্টি করে। মরহুম মাওলানা ইমদাদুল হক আড়াইহাজারী ছিলেন অকুতোভয় স্বাধীনচেতা আলেম এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের যে সকল মাদ্রাসা সরকারী সাহায্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে তিনি সে ধরণের একটি মাদ্রাসা থেকে কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করেছেন।
মরহুম মাওলানা ইমদাদুল হক আড়াইহাজারীকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শুরম্নতেই একটি হাদীস বর্ণনা করতে চাই। হাদীসটি বুখারী শরীফে সন্নিবেশিত হয়েছে। মহানবী (সঃ) বলেন,  ‘তোমাদের দ্বীনের জ্ঞান প্রদানের পর আলস্নাহ রাব্বুল আলামীন তা উঠিয়ে নিবেন না, বরং  দ্বীনি জ্ঞানসহ আলেমদের উঠিয়ে নিবেন। শেষ পর্যন্তô শুধু মুর্খরা বেঁচে থাকবে এবং মানুষ মুর্খদের কাছে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করবে। তখন মুর্খরা মনগড়া ফতোয়া দিয়ে মানুষকে বিপথগামী করবে এবং নিজেরাও ভুল পথে চলবে।’
হাদীসে আলেমদের ব্যাপারে এ ধরণের সতর্কীকরণের জন্যেই একজন আলেমের মৃত্যুকে মানবতার মৃত্যু হিসেব চিহ্নিত করা হয়। আবার সে আলেম যদি কর্মমুখর কোন আলেম হন তা হলে তো কোন কথাই নেই। আমরা জানি, নিছক কুরআন-হাদীস পড়লে বা আরবী ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের কারণে কাউকে আলেম বলা যায় না। সত্যিকার অর্থে তারাই প্রকৃত আলেম যারা নিজেরা কুরআন-হাদীস মেনে চলেন এবং অন্যদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। মাওলানা আড়াইহাজারী প্রকৃত আলেমের এ সকল গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। তাই তার ইন্তেôকাল বাংলা ভাষাভাষী জনগণের জন্যে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। মহান প্রভূর কাছে আমাদের মুনাজাত, তিনি যেন আলেমদের দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে মুর্খদের সৃষ্ট ফিত্‌নার মধ্যে আমাদের নিক্ষেপ না করেন। আলস্নাহ রাব্বুল আলামীন মাওলানা আড়াইহাজারীকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করম্নন এবং আমাদের সবাইকে জান্নাতের পথে চলার তওফিক দিন।
মাওলানা আড়াইহাজারীর সাথে আমার পরিচয় আশির দশকের শেষের দিকে। তখন আমি ঢাকায় ছিলাম।  বৃটেনে আসার পর তার সাথে আমার দু বার দেখা হয়েছে। একবার আমাদের বাড়িতে এবং আরেকবার আমার এক আত্মিয়ের বাড়িতে। আমাদের মধ্যে খুবই আন্তôরিক সখ্যতা ছিল। তাকে আমি জানতাম একজন আলেম, ব্যবসায়ী এবং দায়ী ইলালস্নাহ হিসেবে। যখন দেখা হতো অত্যন্তô বিনয় এবং আন্তôরিকতার সাথে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। তার  ব্যবহার সহজেই মানুষকে আকর্ষণ করতো। বৈঠকী আলচনায় কোনরকম কূট-কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতেন। দৈনন্দিন জীবনে খুব সহজ এবং সাদামাটা মানুষটি ওয়াজ মাহফিলে ছিলেন এক তেজস্বী পুরম্নষ। তিনি নিজে যা পালন করতেন সে নসীহতই মানুষকে করতেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তার ওয়াজের খুব কদর ছিল। আধুনিক মানুষের উপযোগী করে এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় তিনি ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারতেন। তার ব্যক্তি জীবন এবং ব্যবহারিক জীবন ইসলামের বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং আভ্যন্তôরীন সৌরভে সমৃদ্ধ ছিল। শুধু আলেম নয়, মানুষ হিসেবেও তিনি অনেক বড় ছিলেন।
আমাদের দেশের অন্যান্য আলেমদের তুলনায় মাওলানা আড়াইহাজারী নানা দিক দিয়ে একজন ব্যতিক্রমধর্মী আলেম ছিলেন। যারা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতে চান তারা সাধারণতঃ ইবতেদায়ী বা প্রথমিক স্তôরেই মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হন। কিন্তু মাওলানা আড়াইহাজারী এসএসসি পাশ করার পর মাদ্রাসায় পড়তে যান। অর্থাৎ পরিবারের চাপে নয়, সচেতনভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তেôর ভিত্তিতে তিনি দ্বীনি ইলম অর্জনের পথে অগ্রসর হন। নারয়ণগঞ্জ জেলার অন্তôর্গত সোনারগাঁও সদাসদি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে তিনি প্রথমে স্থানীয় এক কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় গিয়ে শায়খুল হাদীস আলস্নামা আজিজুল হকের কাছে তিনি দওরায়ে হাদীস শেষ করেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত করার পর মাওলানা আড়াইহাজারী কোন মসজিদ-মাদ্রাসায় চাকরি না নিয়ে জীবিকার পথ হিসেবে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরম্ন করেন। এখানেও তিনি পরিচিত পথ পরিহার করে ব্যতিক্রম পথে অগ্রস হন। নারায়ণগঞ্জে কাপড়ের ব্যবসার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরম্ন হয়। পরে হজ্জ লাইসেন্স নিয়ে ট্র্যাভেল ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তার কাছে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার জন্যে দাওয়াত আসতে থাকে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বত্র তিনি হৃদয়গ্রাহী এবং যুক্তিবাদী বক্তা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হন। ইসলামী দাওয়াতের মিশন নিয়ে তিনি ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বৃটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশ সফর করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়া এমন যে কোন আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এ রকম কোন সংবাদ শোনার জন্য আমাদের কান অভ্যস্তô নয়। একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলাম এবং ইসলামের সাথে সম্পর্কিত সকল কিছুর গায়ে স্বাধীনতা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধী লেবেল দেয়ার চেষ্টা করছে। যার কারণে আমরা ভুলে যেতে বসেছি যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অন্যান্য পেশার লোকদের পাশাপাশি বহু আলেমও অংশ নিয়েছেন। তাদের অনেকে রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করেছেন এবং অনেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাথে দেশের অভ্যন্তôরে থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছেন।
দৈনিক যুগান্তôরের প্রাক্তন সাংবাদিক শাকের হোসেইন শিবলি ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’ শিরোনামে ৯১২ পৃষ্ঠার একখানা ঢাউস বই লিখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আলেমদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি শতাধিক আলেম মুক্তিযোদ্ধাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন এবং তাদের অনেকের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। এ জন্যে আমরা শাকের হোসেইন শিবলির কাছে কৃতজ্ঞ। উলেস্নখ্য যে আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা শাকের দিয়েছেন, এর বাইরে আরো অনেক আলেম মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তাদের মধ্যে লন্ডনপ্রবাসী বিশিষ্ট আলেম মাওলানা মুমিনুল ইসলাম ফারম্নকী অন্যতম।
শাকের হোসেন শিবলি তার ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’ শীর্ষক বইয়ে মরহুম মওলানা ইমদাদুল হক আড়াইহাজারীকে আলোচনায় এনেছেন। সেখানে তাঁর একটি সাক্ষাতকারও রয়েছে। মওলানা আড়াইহাজারী তার সাক্ষাতকারে কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সে বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
সেখানে তিনি বলেন, অত্যাচারী দখলদারদের বিরম্নদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনে শরিক ছিলেন, এটা তার জন্য গর্বের বিষয়। তিনি আরো বলেন, তার মতো আরো অনেক আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কাজী মুতাসিম বিলস্নাহ, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ এবং তারকাকান্দির পীর মাওলানা আব্দুল হালিম হোসাইনির কথা তিনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
তিনি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হলেন এ প্রশ্নের জবাবে মাওলানা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি লালবাগ মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছিলেন। যুদ্ধের কারণে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি মাওলানা মুহাম্মদ উলস্নাহ হাফেজ্জি হুজুরের ভক্ত ছিলেন। অনেক ছাত্র তখন ট্রেনিং নিচ্ছিল। তিনি এ ব্যাপারে হাফেজ্জী হুজুরের পরামর্শ চান। জবাবে হাফেজ্জি হুজুর বলেন, ‘পাকিন্তôানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করছে। সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম কখনো এক হতে পারে না। তুমি যদি খাঁটি মুসলমান হও, ইসলাম মানো, তা হলে পাকিস্তôানিদের পক্ষে যাবে কীভাবে? এটা তো ইসলামের সঙ্গে কুফরের যুদ্ধ নয়, বরং এটা হলো জালেমের বিরম্নদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। বাঙালিরা মজলুম, সুতরাং বাঙালির পক্ষে কাজ করো।’ মাওলানা আড়াইহাজারী বলেন, হাফেজ্জি হুজুরের এ বক্তব্যই ছিল তার মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পেছনে মূল শক্তি ও প্রেরণা।
লন্ডন ১০ মে ২০০৯