Home | Articles | About | Contact
শাহ্‌ নূর ভাইয়ের স্মৃতি

শাহ্‌ নূর ভাইয়ের স্মৃতি
ফরীদ আহমদ রেজা

সাইয়েদ শাহ্‌ নূর চৌধুরীর সাথে আমার সম্পর্ক কী ছিল তা এক কথায় বলা কঠিন। বহু কথায় বলার পরও তা নির্ণয় করা যাবে কি না সন্দেহের বিষয়। তার সাথে আমার অনেক রকম আত্মীয়তা ছিল। সে আত্মীয়তাকে আমরা কেউ কখনো বড় করে বিবেচনা করিনি। তার ক্ষেত্রে মনের বা হৃদয়ের আত্মীয়তাই বড় ছিল। ছোটবেলা তাকে ডাকতাম ‘বড় মিয়া ভাইসাব’ এবং বড় হওয়ার পর তা শাহ্‌ নূর ভাইয়ে রূপান্তôরিত হয়।
শাহ্‌ নূর চৌধুরীর সাথে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি খুব স্পষ্ট নয়। ছোটবেলা তাদের বাড়ি অর্থাৎ চৌধুরী বাড়িতে যাওয়ার নানা উপলক্ষ ছিল। সৈয়দ শাহ কামাল চৌধুরী ওরফে জমরুত আর আমি এক সাথে মডেল প্রাইমারী স্কুলে পড়েছি। তাদের বাড়ির পেছনের কামরাঙা গাছের প্রতি মডেল স্কুলের সকল ছাত্রের ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ। এ রকম মিস্টি কামরাঙা সাধারণতঃ পাওয়া যায় না। সময় সুযোগ পেলেই আমরা প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা দল বেঁধে কামরাঙা গাছে হানা দিতাম। আমার দাদীর সাথেও ছোটবেলা চৌধুরী বাড়িতে গিয়েছি। তোতা চাচাদের বাড়ি ছিল দাদীর বাপের বাড়ি। সে বাড়ি এবং চৌধুরী বাড়ি এক বাড়ি না হলেও দু’বাড়ির মধ্যে ব্যবধান শুধুমাত্র ছিল একটি পায়ে চলার সরু পথ। দাদী সে বাড়িতে যেতেন এবং হাঁটতে হাঁটতে চৌধুরী বাড়ির বিভিন্ন ঘরকন্না দেখতেন। তার সাথে মাঝে মাঝে আমি আর আমার বড় আপাও যেতাম। সে অবশ্য অনেক ছোটবেলার কথা। আরবী পড়ার উদ্দেশ্যেও চৌধুরী বাড়ি গিয়েছি। আমাদের দূর সম্পর্কে নানী সৈয়দ মওসুফ আহমদ চৌধুরীর মা তাদের ঘরে ছোট ছেলেমেয়েদের আরবী পড়াতেন। বাড়িতে আম্মার কাছে প্রথমে কায়দা ও আমপারা পড়েছি। তারপর আরো শুদ্ধ করে আরবী শেখার জন্যে বড় আপার সাথে কিছুদিন নানির কাছে গিয়েছি। দেশ বিখ্যাত আলেম ও বাগ্মী কাজী সৈয়দ আব্দুর রউফের মেয়ে হিসেবে শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। নানা উপল্‌েক্ষ এভাবে শাহ্‌ নূর ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়া। কিন্তু কখন কোথায় তার সাথে প্রথম আলাপ হয় তা এখন কিছুই মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে তাকে প্রথম দেখি তার আব্বা সাবেক সরপঞ্চ ইসহাক মিয়া চৌধুরী মারা যাওয়ার সময়। কিন্তু তখন তার সাথে কোনো কথা হয়েছে বলে মনে হয় না।
সৈয়দপুর মডেল প্রাইমারী স্কুল শেষ করার পর আমি সুনামগঞ্জ এইচএমপি হাই স্কুলে ক্লাস সিে ভর্তি হই। সুনামগঞ্জে অনেক আত্মীয় স্বজন থাকলেও আম্মার ফুফাতো বোন আঙ্গুর খালার বাসায় থাকতে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি। এর একটা কারণ ছিল খালাতো ভাই জুবের আহমদ ওরফে রবি ভাইসাবকে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে যায়। তাদের বাসা ছিল ষোলঘরে সুরমা নদীর পার ঘেঁষে। তাদের বাসায় অবস্থানকালে খুব ভোরে নদীর ঘাটে যাওয়ার স্মৃতি এখনো আমাকে আন্দোলিত করে। এ সময় আব্বা সুনামগঞ্জে আমাদের যত আত্মীয়-স্বজন আছেন সকলের বাসায় নিয়ে যান এবং তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তখন শাহ নূর ভাই সুনামগঞ্জ বুলচান্দ হাই স্কুলের ছাত্র। তিনি ষোলঘরে তার চাচার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতেন। হতে পারে সেখানেই তার সাথে আমার প্রথম আলাপ হয়। যতদূর মনে পড়ে তখন তিনি ক্লাস নাইনের ছাত্র। বয়সের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি কারণে প্রথম সাক্ষাতেই তার সাথে আমার ঘনিষ্টতা বাড়ে। পাঠ্যবহির্ভূত বা ‘আউট বই’র প্রতি উভয়ের সমান আগ্রহ ছিল এবং এই একটি বিষয়ই আমাদের পরস্পরকে ঘনিষ্ট করে দেয়। উল্লেখ্য যে, আমার আব্বার ছিল পাঠ্যবহির্ভূত বইয়ের এক বিরাট সংগ্রহ। প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার পর আব্বা তার ব্যক্তিগত পাঠাগারের চাবি আমার হাতে তুলে দেন। সেখানে উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনী, কবিতা, অনুবাদ সাহিত্য প্রভৃতির বিপুল সমাহার ছিল। আরো ছিল কোলকাতা, ঢাকা এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্য মাসিক ও সাময়িকী। পরীক্ষার পর হাতে ছিল অফুরন্তô সময়। আব্বা-আম্মার অতিরিক্ত স্নেহের কারণে আমাকে সাংসারিক কোনো কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে হতোনা। পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ার সময়ই দাদা এবং আব্বার পথ ধরে লেখালেখি করার নেশা পেয়ে বসে। সুনামগঞ্জ এইচএমপি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্তô বাড়িতে বসে আব্বার পাঠাগারের বই ও পত্র-পত্রিকা গোগ্রাসে গিলেছি এবং গল্প-কবিতা লেখার কসরত করেছি। নজিবর রহমান, মীর মোশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ, নজরম্নল, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, তারাশঙ্কর প্রমুখের সাথে এভাবেই ছোট বেলায় পরিচয় ঘটে। সে সময় আমার মতো এক ইঁচড়ে পাকা কিশোরের সাথে আলাপচারিতা থেকে শাহ্‌ নূর ভাই কী পেয়েছিলেন তা জানিনা। তবে এ ভেবে সান্তô্বনা পেয়েছি যে সুনামগঞ্জে বসবাসের কারণে আব্বার ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকে দূরে থাকার বেদনা কিছুটা হলেও শাহ্‌ নূর ভাই পূরণ করতে পারবেন। এ সময় আমি আবিষ্কার করি যে শাহ্‌ নূর ভাইয়ের চাচাতো বোন জয়তুন বুবু এবং অপর চাচাতো বোন ফজলি আপারও গল্প-উপন্যাস পড়ার প্রতি একই রকম আগ্রহ রয়েছে। জয়তুন বুবু তখন তিনসন্তôানের জননী এবং ফজলি আপা হাইস্কুলের ছাত্রী। গল্প-উপন্যাসের প্রতি আকর্ষণের কারণে একসময় তাদেরও কাছাকাছি পৌঁছে যাই।
তখন সৈয়দপুর গ্রামের অনেকে সুনামগঞ্জে থেকে লেখাপড়া করতেন। তাদের মধ্যে সৈয়দ মুরছালিন আহমদ, সৈয়দ মওসুফ আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ কবির আহমদ (জাসদ নেতা), সৈয়দ আতাউর রহমান (আওয়ামী লীগ নেতা), আজমল হোসেন কোরেশী প্রমুখের কথা এ মুহুর্তে মনে পড়ছে। এক সময় সুনামগঞ্জ শহরে বসবাসকারী সৈয়দপুরের ছাত্রদের নিয়ে বয়েজ ক্লাব নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এর স্বাপ্নিক এবং প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সৈয়দ মুরছালিন আহমদ। বয়েজ ক্লাবের তৎপরতা শুধুমাত্র সৈয়দপুর কেন্দ্রিক এবং ছুটির সময়ের সাথে সীমাবদ্ধ ছিল। বন্ধের সময় বাড়িতে এলে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। শাহ্‌ নূর ভাই এবং আমি শুরু থেকে এর সাথে জড়িত ছিলাম। বয়েজ ক্লাবের সূত্র ধরে সৈয়দপুরের আরো অনেকের সাথে আমার মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং এর মাধ্যমে শাহ নূর ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক আরো গাঢ় হতে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বয়েজ ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্টতার ফলে সৈয়দ মুরছালিন আহমদের কাব্যচর্চা সম্পর্কে আমি অবহিত হই। কবিতার প্রতি আমার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনি খুবই উৎসাহিত করেন। ইতোপূর্বে বাংলা ছন্দের ব্যাপারে আমার ধারণা ছিল খুবই হালকা এবং অসম্পূর্ণ। সৈয়দ মুরছালিন আহমদের সাথে আলপচারিতার ফলে ছন্দ সম্পর্কে অনেক কিছু জানার অবকাশ পাই। তিনি সে সময় তার নিজের সংগ্রহ থেকে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ছান্দোসিকি’ বইটি আমাকে পড়তে দেন। এর মাধ্যমে আমি বাংলা ছন্দ সম্পর্কে প্রথমিক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হই। এ জন্যে অবশ্যই আমি তার কাছে ঋণী হয়ে আছি।
কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এবং কিছুটা অন্য কারণে এক সময় বয়েজ ক্লাবের পরিচালকদের সাথে শাহ নূর ভাইয়ের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। ফলে বয়েজ ক্লাবের কর্মকর্তারা শাহ্‌ নূর ভাইকে এবং তার সাথে আমাকেও ক্লাবের কার্যকরী পরিষদ থেকে বাদ দিয়ে দেন। এ সময় শাহ্‌ নূর ভাই সুনামগঞ্জ থাকলেও আমি সৈয়দপুর আলীয়া মাদ্রাসায় এসে ভর্তি হয়েছি। সুনামগঞ্জ থেকে চলে এলেও এবং বয়েজ ক্লাবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও শাহ্‌ নূর ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক বহাল থাকে। ছুটির সময় তিনি সুনামগঞ্জ থেকে বাড়ি আসার সময় ব্যাগ ভর্তি করে গল্পের বই নিয়ে আসতেন। বই নিতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং আমিও বই আনার জন্য তাদের বাড়িতে যেতাম। সে সময় পর্যন্তô আমাদের আসা-যাওয়া এবং আলাপচারিতার সুত্র বই ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না।
সৈয়দপুর আলীয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময় একবার আমার মাথায় হাতে লিখে একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন বের করার ঝোঁক চাপে। এর প্রথম সংখ্যা একা একা-ই বের করি এবং এর নাম দেই আল-হেলাল। সহকারী সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আলী আহমদ এবং নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ছিলেন সৈয়দ মওসুফ আহমদ চৌধুরী। কিন্তু শাহ্‌ নুর ভাইকে কোথায় স্থান দেব ভেবে পাইনা। শেষ পর্যন্তô ‘আল হেলাল’ শিরোনামে শাহ্‌ নূর ভাই’র একটি কবিতা প্রকাশ করি । আমার মনে আছে, চৌধুরী বাড়ির আশরাফ আলী নানার কাছে এর প্রচ্ছদ অংকন করার আব্দার নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি সে আব্দার রেখে খুব পছন্দসই একটি প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালের মধ্যভাগে সিলেট আলীয়ায় গিয়ে ভর্তি হই এবং সে সময়ই ইসলামী আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়ার সুযোগ আসে। তখন আবিষ্কার করি যে শাহ্‌ নুর ভাই ইসলামী আন্দোলনের সাথে শুধু জড়িত আছেন তা নয়, সুনামগঞ্জে তিনি এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তখন থেকে আমাদের সম্পর্ক আউট-বইয়ের সীমানা অতিক্রম করে আন্দোলনের সাথে জড়িত ভাইয়ের সম্পর্কে রূপান্তôরিত হয়। আমরা পরস্পর সে সম্পর্ককে সব সময় সম্মান দিয়েছি। তার সাথে অসংখ্য ব্যাপারে আমার মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে কোনদিন আমাদের সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হয়নি।
শাহ্‌ নুর ভাই তার পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তôান ছিলেন। তার চার বোনের এক বোন আশিয়া বুবুর সাথে তিনি একই বাড়িতে থাকতেন। তার অপর তিন বোনের মধ্যে নয়া বুবু বাহাদুরপুর, দয়া বুবু কুলঞ্জ এবং সকল ছোট বোন হুসনা লন্ডন প্রবাসী। একমাত্র ভাই হিসেবে বোধগম্য কারণেই বোনদের কাছে তিনি সব সময় অতিরিক্ত আদর, ভালোবাসা এবং প্রশ্রয় পেয়েছেন। শাহ নুর ভাইয়ের সাথে বিশেষ ঘনিষ্টতার কারণে তার বোনদের কাছে আমিও ভাইয়ের মর্যাদায় আদর ও সম্মান পেয়েছি। আশিয়া বুবুর হাতের রান্না কি পরিমান খেয়েছি এর কোনো হিসাব নেই। শাহ নুর ভাইয়ের বিয়ের সময় কনে খোঁজার দায়িত্ব প্রধানতঃ আশিয়া বুবুই পালন করেছেন। আশিয়া বুবুর অনুরোধে আমাকেও দুয়েক জায়গায় খোঁজ-খবর নিতে হয়েছে। অনেক যাচাই-বাছাইর পর সব শেষে চাচাতো বোন ফয়জি ভাবীর সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। সে সময়ের একটি ঘটনা আমি ভুলতে পারবোনা। বিয়ের সময় মানুষ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে আপ্লূত থাকে। সে আনন্দ-উচ্ছ্বাস শাহনুর ভাইয়ের মধ্যেও ছিল। কিন্তôু বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘কবুল’ বলার পর হঠাৎ তিনি কেঁদে উঠেন। আমি তার পাশে গিয়ে পিঠে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে থাকাই। তিনি হাতের রম্নমাল দিয়ে চোখ মুছেন এবং মাথা নেড়ে বলেন, ও কিছু না। পরে জেনেছি, মা-বাপ হারা শাহনুর ভাইয়ের বিয়ের মজলিসে হঠাৎ করে নিজের আব্বা-আম্মার কথা মনে পড়ে যায়। তাই তিনি একটু বেশি আবেগ-আপস্নূত হয়ে পড়েছিলেন।
শাহনুর ভাইয়ের বিয়ের পর তাদের নতুন সংসারে আমি ছিলাম নিয়মিত উপদ্রব। সকাল-বিকাল সেখানে হাজিরা দেয়া আমার অভ্যাসে পরিণত হয়। শাহনুর ভাইয়ের সাথে হৃদ্যতা না ফয়জি ভাবীর অতিরিক্ত আদর-আপ্যায়ন সে অভ্যাস তৈরি করেছিল তা বলা মুস্কিল। তবে তখন থেকে আমাকে চা-নাস্তôা বা খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব আশিয়া বুবু বা তার মেয়ে হনুফার হাত থেকে ফয়জি ভাবী নিজ হাতে তুলে নেন। এক সময় তাদের সংসারে নতুন অতিথির আগমন ঘটে। ভাবী নিজের পছন্দে প্রথম সন্তôানের নাম রাখেন পলি। মেয়েটি মাত্র কয়েকমাস বেঁচেছিল। পলির মৃত্যু এবং দাফন-কাফনের সময় শাহনুর ভাইয়ের পাশেই ছিলাম। প্রথম সন্তôানের মৃত্যুতে তাঁকে সান্তô্বনা দেয়ার পরিবর্তে স্বার্থপরের মতো আমিও তার সাথে ক্রন্দন করেছি। পলি দৈহিকভাবে না বাঁচলেও মানসিকভাবে এখনো বেঁচে আছে। কারণ ফয়জি ভাবী এখনো পলির মা পরিচয় ধারণ করছেন।
শাহ্‌ নূর ভাইয়ের কথা বলতে হলে ১৯৭১ একাত্তর সালের কথাও বলতে হবে। ২৪ মার্চ সিলেট থেকে বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং সে রাতেই পাকিস্তôানী সেনাবাহিনী বাঙালিদের উপর অত্যাচার শুরু করে। এ সময় শহরে অবস্থানকারী অন্যান্যদের মতো জীবন রক্ষার তাগিদে আমিও গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য হই। সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে জুন পর্যন্তô এক কম্পিত শঙ্কার মাঝে গ্রামের বাড়িতে দিন কাটিয়েছি। শাহ্‌ নুর ভাই তখন গ্রামেই বসবাস করতেন। তখন প্রধানতঃ তার বাড়িতেই আমার সময় কাটতো। আমাদের বাড়িতে কোনো রেডিও ছিলনা। শাহ নূর ভাইয়ের একটি পুরানো বড় রেডিও ছিল। খাওয়া-দাওয়া এবং নামাজ ছাড়া বলতে গেলে বাকি সময় আমরা রেডিও শুনেই সময় কাটাতাম। এ সময় আমাদের উভয়ের অন্তôরঙ্গ বন্ধু অকাল প্রয়াত ডাক্তার দবিরও আমাদের সাথে থাকতেন। আল্লাহ ডাঃ দবিরকে জান্নাতবাসী করুন। তখন দেশী-বিদেশী সংবাদ শোনার সাথে সাথে বিভিন্ন সংবাদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হতো। আমরা প্রধানতঃ ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র, রেডিও পাকিস্তôান, কোলকাতা বেতার প্রভৃতি শুনতাম। কোলকাতা বেতার বা রেডিও পাকিস্তôানের চেয়ে বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকা ছিল আমাদের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য। আমার মনে আছে, রেডিও পাকিস্তôান যেদিন সামরিক বাহিনীর সমর্থনে জামাতে ইসলামীর বিবৃতি প্রকাশ করে সেদিন আমাদের মধ্যে বিরাট এক প্রশ্ন তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের সাথে আমাদের রাজনৈতিক পার্থক্য থাকলেও তদানীন্তôন পাকিস্তôানের সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তôান্তôর করা হোক  ৈএটাই ছিল আমাদের সকলের দাবি। কিন্তু সে দাবিকে উপেক্ষা করে পূর্ব পাকিস্তôানের জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দেয়া হয়। আমরা খবর পাচ্ছিলাম ঢাকা এবং সিলেটসহ তদানীন্তôন পূর্ব পাকিস্তôানের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তôানী সেনা বাহিনী সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। আমাদের আশা ছিল একটি আদর্শবাদী দল হিসেবে জামাতে ইসলামী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু এর পরিবর্তে জামাতের পক্ষ থেকে আর্মি একশনের সমর্থনে বিবৃতি আসছে। এ খবর শুনে সে দিন আমাদের দু’জনকেই হতাশ করেছিল।
২৫ মার্চের পর সৈয়দপুরের যারা ঢাকা বা সিলেট শহরে বাস করতেন তারা একে একে গ্রামের বাড়িতে আসতে থাকেন। শহর থেকে কেউ এলেই আমরা তার বাড়িতে যেতাম, তার নিকট থেকে শহরের এবং দেশের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতাম। একদিন দেখলাম শাহ্‌ নূর ভাইয়ের ভাগ্নি রাহেনা তার স্বামী ন্যাপনেতা গোলজার আহমদকে নিয়ে নদীর ওপারে এসে পৌঁছেছেন। তারা নদী পার হয়ে এলে তাদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা রাহেনাদের বাড়ি অর্থাৎ বড় মৌলবী সাবের বাড়ি পর্যন্তô যাই। গোলজার আহমদ সারা দেশে পাকিস্তôানী সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কাহিনী বলার সাথে সাথে খবর দেন যে মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করছে। এ সময় সৈয়দ আব্দুল হান্নান, সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ফখরুল প্রমুখের প্রচেষ্টায় গ্রামে বেশ কয়েকটি গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্যে ছিল গ্রামের মানুষকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা। শাহ্‌ নূর ভাই এবং আমি এ সকল গণজমায়েতে নিয়মিত উপস্থিত থেকে দেশের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতাম।
যতটুকু মনে পড়ে জুলাই মাসের দিকে আমি সিলেট শহরে যাই। শহরে যাওয়ার পর খবর পাই আমাদের গ্রামের একজন উজ্জল মানুষ চৌধুরী বাড়ির সাইয়েদ শাহজামাল চৌধুরীকে সামরিক বাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে। তার ঢাকার বন্ধুমহল এবং অত্মীয়-স্বজন অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ বের করতে পারেননি। শাহজামাল চৌধুরী এক অর্থে ছিলেন আমি এবং শাহনুর ভাইয়ের রূহানী শিক্ষক। প্রধানতঃ তার চেষ্টায়ই আমরা দুজন ইসলামী আন্দোলনের আলো লাভ করি। তিনি বয়সে আমার অনেক বড় এবং সম্পর্কের দিক দিয়ে চাচা হলেও তার সাথে আমার হার্দিক সম্পর্ক ছিল। তার মৃত্যু আমাদের দুজনকে খুবই মর্মাহত করে এবং আমরা দিকহীন নৌকার মতো ভাসতে থাকি। যে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পাকিস্তôানের অখন্ডত্ব বজার রাখার পক্ষে কাজ করছেন সেই সংগঠনের ছাত্রশাখার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি। শাহজামাল চৌধুরী সে সময় জামাতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ঢাকা মহানগরীর সভাপতি ছিলেন। তাকে কেন পাক-বাহিনী ধরে নিয়ে যায় সে কাহিনী এখনো রহস্যাবৃত। তিনি পাক-বাহিনীর জন্যে বিপজ্জনক ছিলেন বলেই তাকে জীবন দিতে হয়েছে বলে একটি কথা জনমনে চালু আছে। ২৫ মার্চের পর আমাদের গ্রামের সৈয়দ আমীরম্নল ইসলাম ওরফে ফখরুল ভাই (ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক জেলা সভাপতি) ঢাকা প্রবাসী অত্মীয়-স্বজনের অবস্থা জানার জন্যে পায়ে হেঁটে ঢাকা গিয়েছিলেন। তখন তার সাথে সাইয়েদ শাহজামাল চৌধুরীর সাক্ষাত হয়েছিল। শাহজামাল চৌধুরী তখন তাকে বলেছেন, তারা শাঁখের করাতের মধ্যে রয়েছেন। কারণ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া বা পাক বাহিনীকে সমর্থন করা দুটোই তাদের জন্যে সমান বিপজ্জনক।
গোটা বাংলাদেশের মানুষের মতো আমাদের গ্রামের লোকেরাও এ সময় অত্যন্তô উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়েছেন। গ্রামটি শহর থেকে অনেক দূরে হলেও গ্রামবাসীর রাজনৈতিক সচেনতা কারো কাছে অজানা ছিলনা। তাই যে কোন সময় সেখানে পাকিস্তôানী মিলিটারি আগমনের আশঙ্কা ছিল। আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমাদের এলাকায় দুটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। পাকিস্তôানী সেনাবাহিনী সিরামিশি এবং রানীগঞ্জে হামলা চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সিরামিশিতে পাক-বাহিনী যাদের হত্যা করে তাদের মধ্যে আমার বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র সিরামিশি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছাদ উদ্দীনও ছিলেন। আমার শিক্ষক মাস্টার আব্দুল মতিনের মাধ্যমে তার সাথে আমার পরিচয় হয়। ছাদ উদ্দীন ভাই ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্তô খোদাভীরু এবং সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। জানা যায়, সিরামিশি এবং রানীগঞ্জে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সেনাবাহিনী সৈয়দপুর বাজারে এসে উপস্থিত হয়। দু’দুটি অপারেশনের পর পাক-সেনাদের মেজাজ ছিল তখন খুবই উগ্র। গ্রামের তৎকালীন মুরব্বীদের সাহসী ভূমিকার কারণে সে যাত্রা পাক-বাহিনীর নির্যাতন থেকে আমাদের গ্রামটি রক্ষা পায়। গ্রামের মুরব্বীদের সাথে সেখানে শাহ নুর ভাইয়ের মতো কিছু তরুণও উপস্থিত ছিলেন।
শাহ নুর ভাইয়ের ইন্তেôকালে তার পরিবার অনেক কিছু হারিয়েছে। তার সহধর্মীনী, চার বোন এবং ছেলেমেয়েদের সান্তô্বনা দেয়ার ভাষা আমার নেই। আল্লাহ তাদের ছবর করার তওফিক দিয়েছেন, এটাই সবচেয়ে বড় সান্তô্বনা। তার ইন্তেôকালে আমি হারিয়েছি একজন অন্তôরঙ্গ সুহৃদ এবং গ্রামবাসী হারিয়েছে একজন ভালো মানুষ। আমার সাংগঠনিক জীবনের অনেক অকথিত ব্যথা-বেদনার তিনি ছিলেন বিশ্বস্তô আমানতদার। বিশেষভাবে ’৮২ সালে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনে ঘটে যাওয়া অনেক কথা আমি কাউকে না বললেও শাহ নুর ভাইকে বলেছিলাম।
শাহ নুর ভাই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন বা নামাজী ছিলেন এ কারণে আমি তাকে ভালো মানুষ বলছিনা। তার অব্বা সৈয়দ ইসহাক মিয়া চৌধুরী সরপঞ্চ ছিলেন এবং তার মা চৌধুরী ও সৈয়দবংশের লোক হওয়ার কারণেও আমি তাকে ভালো মানুষের অভিধা দিচ্ছিনা। ভালো মানুষের সংজ্ঞা আমার কাছে ভিন্ন। সজ্জন এবং বিশ্বস্তô লোকদের আমি ভালো মানুষ বলি। বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার মধ্যেও একজন ভালো মানুষ স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দেয়। সে হিসেবেই আমি তাকে ভালো মানুষ বলছি।
শাহ নুর ভাই ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন নেতা বা বিত্ত-সম্পদের মালিক হওয়ার জন্যে নয়। আল্লাহ্‌র আনুগত্য এবং জনগণের সেবা ছিল তার মুখ্য উদ্দেশ্য। ইসলামী আন্দোলনের কারণে তাকে অনেক নির্যাতন এবং দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তিনি তা হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন। বৈষয়িক স্বার্থ বা পার্থিব কারণে তার সাথে কারো শত্রুতা, মনোমালিন্য বা ঝগড়া-ঝাটি হয়েছে বলে আমি জানিনা। সারল্য এবং উদারতা ছিল তার বৈশিষ্ট্য। আন্দোলনের কারণে যারা তাকে ভিন্ন চোখে দেখতো তাদের সাথেও তিনি সখ্যতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য তার ছিলনা, কিন্তু আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মানবোধ খুব প্রবল ছিল। সংসার পরিচালনার জন্যে তিনি চাকরি করেছেন, ব্যবসা করেছেন  ৈকিন্তু বলতে গেলে কোনটাই ধরে রাখতে পারেননি। তাই বলে তাকে কখনো হতাশ হতে বা নিজেকে ছোট করতে দেখিনি।
কারো সাথে মতপার্থক্য হলেও তিনি তার সাথে চমৎকার মানিয়ে চলতে পারতেন। গ্রামের মুরব্বীদের মধ্যে যারা তার মতের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতেন না তাদেরও তিনি যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন। আলেমদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ ছিল অসাধারণ। ভুল বোঝাবুঝির কারণে আলেমদের যারা ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করেন তাদের ব্যাপারে কোনোদিন তাকে কোনো কটুকথা বলতে শুনিনি। মতপার্থক্যের কারণে যখন মাওলানা আব্দুর রহীম জামাতে ইসলামী ত্যাগ করেন তখন শাহনুর ভাই খুব মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ হন। তার প্রশ্ন ছিল, মাওলানা আব্দুর রহীমের মতো একজন বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী চিন্তôাবিদকে জামাত কেন নিজেদের বলয়ে ধরে রাখতে ব্যর্থ হলো?  আমার সাথে আলাপচারিতার সময় তিনি অনেকবার সে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মাওলানা আব্দুর রহীমের ইন্তেôকালে তাকে শিশুর মতো ক্রন্দন করতে দেখেছি। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘নেতা সহজে পাওয়া যায়, কিন্তু আলেম পওয়া সহজ নয়। মাওলানা আব্দুর রহীমের মতো একজন আলেম বাংলাদেশে আর জন্ম হবে কি না সন্দেহ আছে।’
শাহ নুর ভাইয়ের ইন্তেôকালের সপ্তাহ দুয়েক পর স্বপ্নে তার সাথে আমার সাক্ষাত হয়। স্বপ্নের মধ্যে এক ইসলামী মাহফিলে আমি উপস্থিত হয়েছি। হঠাৎ দেখি শাহ নুর ভাই সেখানে এসে হাজির হয়েছেন। আমি ভাবলাম, তিনি তো ইন্তেôকাল করেছেন, সুতরাং নিশ্চয়ই পরকাল থেকে এখানে এসেছেন। আমি তার সাথে কোলাকুলি এবং হাল-জিজ্ঞাসা করে বললাম, ‘আচ্ছা বলুন তো শাহ নুর ভাই, আল্লাহর নিকট থেকে আপনি কি রকম ব্যবহার পেয়েছেন? তিনি জবাবে মুচকি হেসে বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে মাফ করে দিয়েছেন।’ উপস্থিত সবাই তার জবাবে খুবই আনন্দিত হলেন এবং বললেন, তাহলে আসুন আপনাকে সাথে নিয়ে আমরাও আল্লাহ্‌র কাছে মাগফেরাত কামনা করি। এরপর আমি দোয়ার জন্যে হাত তুললাম এবং শাহ নুর ভাইসহ সবাই আমিন আমিন বললেন। দোয়ার সময় হঠাৎ করে আমার হজরত আলী (রাঃ) কর্তৃক লিখিত একটি কবিতার দুটি লাইন মনে পড়ে যায়। অন্যান্য দোয়া পড়ার পর এ দুটি লাইন আমি বার বার পড়তে থাকি এবং এ অবস্থায়ই আমার ঘুম ভেঙে যায়। লাইন দুটি হচ্ছে ৈ‘আনা অবদুম মুক্বিররুন বিকুল্লি জাব্বিন, আন্‌তা সাইয়েদুস্‌ সামাদুল গাফুর।’
দোয়া করি আল্লাহ যেন শাহ নুর ভাইসহ আমাদের সবাইকে মাফ করে দেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।

লন্ডন, ২৮ আগষ্ট ২০০৬