![]() |
Home | Articles | About | Contact |
|
মউজদীনের প্রতি ভালোবাসা
মউজদীনের প্রতি ভালোবাসাফরীদ আহমদ রেজা ‘যে দিকে তাকাই দেখি সারাটি ভূবনময় আলো আর মৃত্তিকার বুকের ভেতর তোমার দু চোখ সুরভিত শস্যময় দু চোখ কখনো বৈশাখ আসে সোমত্ত ঝড়ের চিঠি নিয়ে আবার ফাল্গুন এলে একগুচ্ছ কুমারীর কলহাস্য ঝরে পড়ে শহরের আনাচে কানাচে মৃত্যুক্ষুধা ভালোবাসা খেলা করে উত্তর হাওয়ায়।’ (মুমিনুল মউজদীন - ভালোবাসার শহরঃ এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়) কবি মুমিনুল মউজদীন তার ‘ভালবাসার শহর’ সুনামগঞ্জকে এ ভাবেই চিত্রায়িত করেছেন। একদিন যার উচ্চারণ ছিল ‘এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়’, তাকে শেষ পর্যন্তô যন্ত্রদানবের নিষ্ঠুর আক্রমণের শিকার হয়ে শুধু তার ভালোবাসার শহর নয়, পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তার মৃত্যুতে তার ভালোবাসার শহর সুনামগঞ্জে বিলাপ চলছে। দেশে-বিদেশে যারা তার সংশ্রবে এসেছেন তারা সবাই তার জন্যে ক্রন্দন করছেন। গানের দেশ এবং ধানের দেশ হিসেবে সুনামগঞ্জের পরিচিতি সর্বজন বিধিত। এক সময় মরমী কবিদের পদচারণায় সমগ্র জনপদ মুখরিত ছিল। সেই জনপদের এক সম্ভাবনাময় কবি ও সমাজ সেবকের নাম মুমিনুল মউজদীন। তার পৌরসভার চেয়ারম্যান পরিচয় বড় ছিল, না কি কবি পরিচয় বড় ছিল সে প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনের ইতিহাস প্রদান করবে। তবে আমরা নিশ্চিত জানি, যে সব মানুষের সাথে তার উঠাবসা ছিল তাদের নিখাদ ভালোবাসা পেয়ে তিনি ধন্য হয়েছেন। একজন মানুষের জন্যে এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। কবি ও জননন্দিত পৌর-চেয়ারম্যান হিসেবে তার সুনাম নিজ শহরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের সবাই তাকে এক নামে চিনতো এবং যেখানে তিনি গিয়েছেন সেখানেই ভালোবাসা ও মর্যাদা দিয়ে মানুষ তাকে বরণ করেছে। বিশেষভাবে তরণদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল রীতিমত ঈর্ষণীয়। দেশে থাকতে তাকে চিনতাম, তার কবিতার সাথে পরিচিত ছিলাম। ছোটভাই হাবিবের (যুগান্তôরের সাংবাদিক) বন্ধু হবার কারণে তার সাথে বেশি ঘনিষ্টতার সুযোগ ছিলনা। যতটুকু মনে পড়ে আমার সাথে তার সর্বশেষ দেখা হয় ২০০৩ সালে বন্ধুবর শাহগীর বখ্ত ফারুকের বাসায়। দেশের কথা, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, পৌরসভার রাজনীতি এবং সাহিত্য বিষয়ক টুকটাক কিছু কথা হয়। আমাকে তখন অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলাদেশের সাহিত্যপাতার জন্যে একটি কবিতা দেন। বৃটেনের কবিদের সাথে মিলিত হবারও আগ্রহ প্রকাশ করেন। কথা ছিল, কোন্ দিন তিনি বসতে পারবেন তা ফোন করে আমাকে জানাবেন। কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর হয়ে ওঠেনি। সময়ের অভাবটা হয়েছিল প্রধানতঃ পৌর-রাজনীতির কারণে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হবার কারণে তাকে গণসংযোগে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে। তার কাব্যপ্রতিভার ব্যাপারে আমি খুব আশাবাদী ছিলাম। এ জন্যে কাব্যসাধনা শিকেয় তুলে পৌর-রাজনীতি নিয়ে তার আতিরিক্ত ব্যস্তôতাকে আমি ভালো চোখে দেখতে পারিনি। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তাকে আমি বলে দিয়েছি, রাজনৈতিক ব্যস্তôতার কারণে কবিতার প্রতি তার অঙ্গীকার ক্ষতিগ্রস্থÿ হোক তা আমাদের কাম্য নয়। যে যন্ত্রদানবের নিষ্ঠুর আঘাতে তাকে জীবন দিতে হয়েছে সেটা ‘শুয়োর মুখো’ ট্রাক নয়, শ্যামলী পরিবহনের ঢাকাগামী কোচ। মৃতের জন্যে শোক প্রকাশের সাথে সাথে একজন প্রাণবন্তô ও সম্ভাবনাময় কবিকে কেন এ ভাবে কোচ চালকের বেপরোয়া ড্রাইভিং-এর জন্যে জীবন দিতে হলো সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের অবশ্যই অন্বেষণ করতে হবে। আমরা আশা করি মউজদীনের আত্মীয় এবং শুভানুধ্যায়ীরা ব্যাপারটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিবেন না। মুমিনুল মউজদীন কবিতা ও গান দিয়ে সুনামগঞ্জকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। পুর্ণিমার রাতে শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে শহরবাসীকে চাঁদের আলো উপভোগ করতে উদ্বুদ্ধ করে তিনি গোটা দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছেন। একজন কবিকে মানুষ ভালোবাসে, শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু তাকে কেউ মেম্বার-চেয়ারম্যান বা এমপি হিসেবে কল্পণা করেনা। বৈষয়িক বিচার-বুদ্ধির দিক দিয়ে কবিরা তেমন চৌকস থাকেন না, সঙ্গত কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মউজদীন ছিলেন এর ব্যতিক্রম। এ দিক দিয়ে তাকে হাসন রাজার সার্থক উত্তরসুরী বলা যায়। আমরা জানি, হাসন রাজা অসংখ্য গান লেখার সাথে সাথে জমিদারীও দেখাশোনা করেছেন। কবি মউজদীন ছিলেন সুনামগঞ্জ শহরের তিনবার নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান। ইতোপূর্বে কোন কবিকে নিজ এলাকার জনগণ এ ভাবে তিনবার চেয়ারম্যান হিসেবে বরণ করে নিয়ে নিজেদের ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছে বলে আমরা জানিনা। একজন কবির এ ধরণের বিরল সম্মান অবশ্যই একটা ঈর্ষণীয় বিষয়। মউজদীন রাজনীতির সাথে কিছুটা সংশ্লিষ্ট ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে অন্ধ দলপ্রীতি ছিলনা। তার পৌর-চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হবার পেছনে সংশ্লিষ্ট দলের কোন অবদান ছিলনা। কারণ সুনামগঞ্জ শহরে সে দলের তেমন কর্মী বা জনসমর্থন ছিলনা। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি প্রথমবার বিজয়ী হয়েছেন। প্রথমবার নির্বাচিত হবার পর নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়েছেন বিধায় মানুষ বার বার তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। লেবাননের কবি খলিল জিবরানের কবিতার প্রতি মউজদীনের তীব্র অনুরাগ ছিল। তিনি এ কবির নামানুসারে নিজের বড় ছেলের নাম রাখেন খলিল জিবরান। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পরিবারের সবাই মৃত্যু বরণ করলেও ভাগ্যক্রমে জিবরান বেঁচে আছে। তার জন্যে রইলো আমাদের আন্তôরিক ভালোবাসা ও শুভকামনা। আদিকাল থেকে অনেক কবি মৃত্যু সম্পর্কে বহু চমৎকার কথা বলেছেন। মুমিনুল মউজদীনের প্রিয় কবি খলিল জিবরানও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে তার একটি উদ্ধৃতি দিয়ে মউজদীনের প্রতি আমার ভালোবাসা নিবেদন করছি। খলিল জিবরান বলেন, ‘এসো হে মোহনীয় মরন, এসো। আমার হৃদয় তোমার প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে। এসো আমার কাছে এবং জীবনের শিকল খুলে দাও। আমি এতো দুর্বল যে এটা খোলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। হে মোহনীয় মৃত্যু, এসো, আমার পাড়া-প্রতিবেশীর হাত থেকে আমাকে মুক্ত করো। তাদের দৃষ্টিতে আমি এক অপরিচিত ব্যক্তি, ফেরেশ্তার ভাষায় কথা বলি। জলদি আসো, হে শান্তিôর মৃত্যু!’ ‘তুমি মরণের গূঢ় রহস্য তখনই জানতে পারবে যখন জীবন থেকে তা অন্বেষণ করবে। রাতের অন্ধকারে আবদ্ধ পেচক আলোকোজ্জল দিনের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনা। মৃত্যুর প্রাণ-শক্তি ধারণ করতে হলে মনের দরোজাকে জীবনের সামনে উন্মূক্ত করে দিতে হবে। নদী এবং সমুদ্রের মতোই জীবন এবং মৃত্যু একই জিনিসের নাম।’ লন্ডন ২৮ নভেম্বর ২০০৭ |
|