|
আমিনা ওয়াদুদ কেনো পুরুষের মতো হতে চান?
আমিনা ওয়াদুদ কেনো পুরুষের মতো হতে চান?
ফরীদ আহমদ রেজা
নও মুসলিম আমিনা ওয়াদুদ দু হাজার পাঁচ সালে নিউ ইয়র্কে জুমার নামাজে ইমামতি করে সংবাদ শিরোনাম হন। তিনি অন্যত্রও জুমার নামাজে ইমামতি করেছেন। কমপক্ষে একবার স্পেনে এবং একবার দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু তার সে সকল ইমামতি মিডিয়া কাভারেজ পায়নি। তাই হয়তো এবার তিনি বিলাতে ছুটে এসেছেন। লন্ডনের অদূরে অবস্থিত অফোর্ড শহরে চারজন মানুষের এক সমাবেশে জুমার নামাজে ইমামতি করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। মিডিয়া কাভারেজ যদি তার টার্গেট হয়ে থাকে তা হলে বলতে হয় তার বিলাত সফর সফল হয়েছে। আমিনা ওয়াদুদ কেন জুমার নামাজে ইমামতি করতে চান? এটা নামাজ, রোজা, সাদাকাহ ইত্যাদির মতো বিশেষ সওয়াবের কাজ বলেই কি তিনি ইমাম হতে চান? তিনি একজন পন্ডিত মহিলা। আল-আজহার, কায়রো, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া প্রভৃতি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াশোনা করেছেন। মিশিগান থেকে আরবী এবং ইসলামিক স্টাডিজে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেছেন। মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর তিনি অধ্যাপনাও করেছেন। কুরআন-হাদীস এবং ইসলামের ইতিহাস তিনি ভালো-ভাবে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি কি জানেন না আরবী ভাষায় ‘ইমাম’ শব্দের কোন স্ত্রীলিঙ্গ নেই? এই শব্দটিই বলে দিচ্ছে এ কাজটা পুরুষদের জন্যে নির্দিষ্ট। প্রশ্ন হতে পারে এটা কি লিঙ্গ-বৈষম্য নয়? আপনার দৃষ্টিতে হতে পারে লিঙ্গবৈষম্য, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে নয়। আপনি সন্তান ধারণ করতে পারেন, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। কিন্তু আমি পুরুষ তাই আমি এর কোনটাই করতে করতে পারিনা। আপনার পায়ের নিচে আপনার সন্তানের জান্নাত। আমার পায়ের নিচে নয়, আমার স্ত্রীর পায়ের নিচে আমার সন্তানের জান্নাত। আমি তো এটাকে লিঙ্গ বৈষম্য বলছিনা। শেরি জোনস-এর সমর্থক মিস্ নোমানি এবং আপনার অন্যান্য নারীবাদী বন্ধুরা আসলে আপনাকে বিভ্রান্ত করছে। আপনারা পুরুষদের শ্রেষ্টত্বের মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিয়ে তাদের সাথে নিজেদের সব সময় তুলনা করেন। পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের চিন্তার আসল বিভ্রান্তি এখান থেকে শুরু। আল্লাহ নারীজাতিকে সম্মানিত করেছেন আল্লাহ্ার সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে, পুরুষের সাথে তুলনা করে নয়। পাশ্চাত্য নারীবাদীরা খোদাকে সরিয়ে নিয়ে পুরুষের সাথে তুলনা করে মেয়েদের দেখছে। তাদের দৃষ্টিতে পুরুষরা যা করে তাই উত্তম। পুরুষরা তাদের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। এ জন্যেই তারা মনে করছে পুরুষরা যা করে এর সবগুলো না করলে পরিপূর্ণ নারী বা মানুষ হওয়া যাবেনা। যেমন ছেলেরা ছোট করে চুল কাটে, এটা মেয়েদের করতে হবে। পুরুষরা অফিস-আদালতে কাজ করে, নারীদেরও কাজ করতে হবে। ছেলেরা সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয়, এখন মেয়েদেরও সেখানে যেতে হবে। পুরুষরা ইমামতি করে, তাই এখন মেয়েদেরও ইমামতি করতে হবে। মুসলিম নারী হিসেবে এটা কোন বিষয় নয় যে কে ইমামতি করলো। ছেলেরা করছে বলে কি কাজটা শ্রেষ্ঠ হয়ে গেলো? কুরআনে এ রকম কোন আয়াত বা হাদীসে এ রকম কোন বর্ণনা নেই যে যারা ইমামতি করবে তারা তোমাদের বা আল্লাহ্র কাছে সম্মানিত। বরং হাদীসে এটা আছে তোমাদের মায়েরা তোমাদের কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান। মহানবী (সঃ) মায়েদের ব্যাপারে তিনবার বলার পর চতুর্থবার পিতার কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেছে, দুটি মেয়েকে যে লালন-পালন করে বড় করবে তার স্থান জান্নাতে। কিন্তু ছেলেদের ব্যাপারে এ রকম কোন কথা নেই। তা হলে এটাকেও কি আমরা লিঙ্গবৈষম্য বলবো? আল্লাহ মহিলাদের সম্মানিত করেছেন নারীবিষয়ক ব্যাপারে, পুরুষের সাথে তুলনা করে নয়। পুরুষকে আমরা যদি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করি তা হলে আমরা কখনো সন্তুষ্ট হতে পারবোনা। মহিলাদের রুজি-রোজগার করতে ইসলাম নিষেধ করেনি, অনুমতি দিয়েছে। মদীনার মহিলারাও বাইরে কাজ করেছেন, আয়-উপার্জন করেছেন। কিন্তু বিষয়টাকে স্বতন্ত্র ভাবে বিচার করতে হবে, পুরুষদের সাথে তুলনা করে নয়। সুযোগ বা প্রয়োজন পড়লে স্বামীর পরিবর্তে যদি স্ত্রী আয়-উপার্জন করে তাতেও কোন দোষ নেই। কে পুরুষ এবং কে নারী সে বিচার না করে সুযোগ এবং প্রয়োজন সামনে রেখে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জুমার নামাজে ইমামতিকে যদি আমরা রাজনৈতিক দিক দিয়ে গ্রহণ করি তা হলে তা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হবে এবং তা কখনো শেষ হবেনা। মহানবী তো এটাও বলেছেন, নামাজে মহিলাদের জন্যে শ্রেষ্ঠ কাতার হচ্ছে শেষ কাতার। মনে হচ্ছে, আমিনা ওয়াদুদ এবং তার বন্ধুরা ভবিষ্যতে এ নিয়েও ঝগড়া বাক-বিতন্ডা করবেন। হয়তো বলবেন, আমরা মহিলারা কেন পেছনের কাতারে দাঁড়াবো? আমরা কোন দিক দিয়ে সামনের কাতারে দাঁড়াবার অযোগ্য? কিন্তু আসলে এটার সাথে রাজনৈতিক অধিকার বা মর্যাদার কোন দূরতম সম্পর্কও নেই। যারা নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তোষ চান তাদের অবশ্যই মহানবী প্রদর্শিত পন্থায়ই নামাজ আদায় করতে হবে। যার যখন যে ভাবে ইচ্ছা সে ভাবে নামাজ পড়লে চলবেনা। নামাজে ইমামতি করা একটি ধর্মীয় ইবাদত, এটা কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক কাজ নয়। ধর্মীয় কাজের সাথে কুরআন, হাদীস, ইজমা এবং কিয়াসের সম্পর্ক। কুরআন হাদীসের রেফারেন্স ছাড়া কোন ইবাদত করলে ইসলামের দৃষ্টিতে সেটা আর ইবাদত থাকেনা। শরিয়তের পরিভাষায় এর নাম বেদাত বা নব্য আবিষ্কার। আলেমদের মধ্যে অসংখ্য বিরোধ থাকলেও এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। সকল মত ও পথের আলেম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে ইবাদতে নতুন সকল সংযোজন সুস্পষ্ট বেদাত। তারা সবাই এ ব্যাপারেও একমত যে সকল বেদাতই বিভ্রান্তির পথ এবং বিভ্রান্তি মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে বৈষয়িক কাজের ব্যাপারে ইসলাম অনেক উদার। সেখানে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি এবং বিবেচনা প্রয়োগের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। ইসলাম আমাদের সে সুযোগ কাজে লাগাতে উৎসাহ দেয়। নামাজ যেহেতেু একটি ইবাদত সেহেতু মহিলারা নামাজে ইমামতি করতে পারেন কি না এ ব্যাপারে জানতে হলে আমাদের কুরআন হাদীসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমিনা ওয়াদুদ ঠিকই বলেছেন, ক*রআনে এ ব্যাপারে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোন কথাই নেই। শুনেছি তিনি এটাও বলেছেন যে হাদীসে এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কথাটা আসলে ঠিক নয়। হাদীসে এ ব্যাপারে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় প্রকার কথা আছে। ইতিবাচক কথা শুধুমাত্র মহিলাদের ক্ষে(েড) প্রযোজ্য। যে সমাবেশে শুধু মহিলারা উস্থিত আছেন সেখানে একজন মহিলা তাদের নামাজে ইমামতি করতে পারেন। হাদীসে নেতিবাচক কথা সরাসরি যেমন আছে, তেমনি আছে পরোক্ষ অনেক ইঙ্গিত। আবু দাউদ এবং তিরমিজিতে হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন, মহানবী (সঃ) মহিলাদের পুরুষদের ইমামতি করতে নিষেধ করেছেন। মহানবী (সঃ) আরো বলেছেন, তোমরা আমাকে যে ভাবে নামাজ পড়তে দেখছো, ঠিক সে ভাবে নামাজ পড়ো। তিনি কি মহিলাদের পেছনে নামাজ পড়েছেন, নাকি কোন মহিলাকে মসজিদে নববীতে ইমামতি করতে দিয়েছেন? রাসুলের যুগে তো নয়-ই, কোন যুগে কোথাও মহিলাদের জুমার নামাজে ইমামতির দৃষ্টান্ত নেই। কুরআন-হাদীসের পর ইসলামী শরিয়তের চতুর্থ উৎস হচ্ছে ইজমা বা সর্বসম্মত অভিমত। রাসুল (সঃ) এর হাতে গড়া সঙ্গী-সাথী সাহাবদের যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে জুমার নামাজের ইমামতি পুরুষদের জন্যে নির্দিষ্ট। ইসলামের প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেনি। ইতোপূর্বে কোন মহিলা জুমার নামাজে ইমামতি করার জন্যে গোঁ ধরেননি। ইসলামের ইতিহাসে আমিনা ওয়াদদু প্রথম মহিলা যিনি ইমামতি করেই ক্ষান্ত দেননি, ইমামতি করার জন্যে আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, স্পেন এবং বিলাত সফর করেছেন। কুরআন-হাদীসে ইমামের জন্যে কোন বিশেষ মর্যাদা নির্দিষ্ট নেই। যারা ইমামতি করেন তারা আল্লাহ্র কাছে অধিক প্রিয় এমন কোন কথা কুরআন-হাদীসে আছে বলে আমরা জানিনা। আল্লাহ্র কাছে প্রিয় লোকেরা শুধু ইমাম হতে পারবে, অথবা ইমমিতি বেহেশতে যাবার গ্যারান্টি - এমন কোন কথা কুরআন, হাদীস তথা ইসলামে থাকলে হযরত আয়শা, হযরত খাদিজা, হযরত ফাতিমা প্রমুখ সম্মানিত মহিলারা কোন না কোন ভাবে ইমামতি করতেন। আমরা জানি মহিলা সাহাবাদের মধ্যে হযরত আয়শা এবং উম্মে ওয়ারাকা ইমামতি করেছেন। মহানবী (সঃ) উম্মে ওয়ারাকাকে শুধু তার পরিবারের লোকদের নিয়ে, জুমা নয়, পাঞ্জেগানার নামাজে ইমামতির অনুমতি দিয়েছিলেন। ইসলামী পন্ডিতদের মতে এটা ছিল বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অনুমতি। এর ভিত্তিতে গত দেড় হাজার বছরের মধ্যে কেউ জুমার নামাজ পড়াবার আব্দার তুলেনি। হযরত আয়শার হুজরায় যে সকল মহিলা জমায়েত হতেন তাদের নামাজে তিনি ইমামতি করতেন, অবশ্যই তা জুমার নামাজ ছিলনা। আমিনা ওয়াদুদ একজন যোগ্য মুসলিম মহিলা। তার কাছ থেকে আমরা জুমার নামাজে ইমামতির চেয়ে অনেক বেশি খেদমত প্রত্যাশা করি। ইসলামে নারীর মর্যাদা নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। আল্লাহ তাকে আরো অনেক কিছু লেখার যোগ্যতা দিয়েছেন। তিনি সে দিকে মনোনিবেশ করলে আমরা উপকৃত হবো। আমরা আশা করবো, যে বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে কোন বিরোধ নেই সে বিষয় নিয়ে যেন অযথা বিরোধ সৃষ্টি করে নতুন ফেত্নার জন্ম না দেন। লন্ডন ৩০ অক্টোবর ২০০৮
|