Home | Articles | About | Contact
সিলেটঃ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ফরীদ আহমদ রেজা

সিলেটঃ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

 

সিলেট একটি অত্যন্ত প্রাচীন জনপদসিলেটের ভূমির গঠন, তাম্রশাসন, শিলালিপি, চীনা পরিব্রাজক হিউ এন-সাঙ, ইবনে বতুতার ভ্রমন বৃত্তান্ত ইত্যাদি থেকে এর নিদর্শন পাওয়া যায়কিন্তু এর প্রচীনত্ব কতটুকু তা আজো নিশ্চিত ভাবে নির্ণয় করা যায়নিসিলেটের ইতিহাস নিয়ে বহু বই-পুস্তক রচিত হয়েছেকিন্তু ইতিহাস নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কোন গবেষণাকর্ম পরিচালিত হয়নিঅধ্যাপক অসাদ্দর আলীর মতে, এ পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে মানব বসতির ব্যাপারে বৃহত্তর সিলেট বা জালালাবাদকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রাচীনতম ভূমি হিসেবে গন্য করা হয়······  উত্তর বঙ্গের ভূমির প্রাচীনত্ব যেখানে লক্ষ বছর সে জায়গায় সিলেট ভূমির প্রাচীনত্ব কোটি বছর বলে স্বীকৃতসুতরাং উত্তর বঙ্গের চেয়ে নিরান্নব্বই লক্ষ বছরের বেশী পুরাতন হলো প্রাচীনতম সিলেট ভূমি (ময়মনসিংহ গীতিকা বনাম সিলেট গীতিকামুহাম্মদ আসাদ্দর আলী) অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদের ভাষায়, বাংলাদেশের তিন ধরণের ভূ-প্রকৃতির মধ্যে পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ী অঞ্চল প্রায় এক কোটি বছর আগে টার শিয়ারী যুগের শেষের দিকে সৃষ্টি হয়” (বাংলাদেশ আদি থেকে অধুনাঅধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ)

সিলেট এক সময় কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল বলে পন্ডিতগণ অনুমান করেনকামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মণ চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙকে দাওয়াত করে নিয়ে আসেনহিউয়েন সাঙ ৬৪০ খ্রীষ্টাব্দে জাহাজ যোগে শিলিচাতোলনামক স্থানে এসে উপস্থিত হনঐতিহাসিক ক্যনিংহাম তার এনশিয়েন্ট জিয়োগ্রাফী অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে শিলিচাতোলকে সিলেট বলে চিহ্নিত করেছেন। (জালালাবাদের কথা দেওয়ান নুরম্নল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী) জনাব শামসুল আলম সি এস পির মতে, ভাস্কর বর্মণের কামরূপ রাজ্য করতোয়া নদী থেকে পূর্ব দিকে বিস্তৃত ছিলমণিপুর, জৈন্তিয়া, কাছাড়, পূর্ব আসাম, ময়মনসিংহ এবং সিলেটের অংশবিশেষ তার রাজ্যের অন্তর্গত ছিলহিউয়েন সাঙের শিলিচাতোল ছিল  সিলেটের সমুদ্রতীরবর্তী একটি স্থান। (হযরত শায়খ জালাল শামসুল আলম সি এস পি)

প্রাক-ইসলাম যুগ থেকে চীনের সাথে আরবদের যোগাযোগ ছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃতআরবরা সমুদ্রপথে চীনে যাতায়াত করতো এবং যাওয়া আসার পথে সিলেটকে তারা যাত্রাবিরতির বন্দর হিসেবে ব্যবহার করতোএ প্রসঙ্গে আল্লামা সৈয়দ সোলায়মান নদভী বলেন, আরবরা কাসাবাতে আসতো পারস্য উপসাগরের উপকূল ধরে ···· এবং তারপরে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতোএখানে তাদের কেন্দ্র ছিল সিলেট - একে তারা বলতো সিলাহাততারপর তারা যেতো চট্রগ্রাম, একে তারা বলতো সাদজামএখান থেকে শ্যাম হয়ে চীন সাগরে প্রবেশ করতো। (আরব নৌবহর সৈয়দ সোলায়মান নদভী, অনুবাদ - হুমায়ূন খান)

জনাব শামসুল আলম সি এস পি আরো বলেন, রামায়ন- মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে সিলেটের উল্লেখ আছেরামায়নের যুগেও সিলেটভূমি সম্মানিত ছিলবাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে সিলেট ধর্মীয় মর্যাদায় অধিকতর উন্নত ছিলরামায়ন যুগে আর্যরা বাংলাদেশকে বাসের যোগ্য মনে করেননিতারা বাংলাদেশ অতিক্রম করে সিলেটে বসতি স্থাপন করেনউত্তর বঙ্গের এক অংশ তখন পুন্ড্র নামে কথিত হতো····· আর্যরা পুন্ড্র ভূমিতে বসতি স্থাপন না করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় এবং পরবর্তীকালে কামরূপ নামে কথিত রাজ্যে বসতি স্থাপন করেচন্দ্রবংশীয় রাজা অমুর্তজা সিলেট ভূমিতে প্রাগজ্যোতিষ নামে এক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন (হযরত শায়খ জালালশামসুল আলম সি এস পি)

ভারবর্ষে আর্যদের আগমনের পর বৌদ্ধরা সিলেটে এসে আশ্রয় নিয়েছেনতাদের পিছু পিছু আর্যরাও এসেছেনপরবর্তী পর্যায়ে এসেছেন পাঠান ও মোঘলএসেছেন দরবেশ শাহজালাল এবং তাঁর সঙ্গী তিনশষাট আওলিয়াদরবেশ শাহ জালালের সাথে অসংখ্য সৈনিকও সিলেট আসেনদেশ জয়, রাজনৈতিক আশ্রয়, ভাগ্যান্বেষ বা ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এ ভাবে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ সিলেটে এসেছেনকেউ কেউ স্বদেশে বা অন্যত্র চলে গেলেও অধিকাংশই সিলেটের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যানএ ভাবে সিলেট অঞ্চল এশিয়ার নানা জাতি, ধর্ম ও বর্ণের লোকের সমন্বয়ে গঠিত এক বৈচিত্রময় জনপদে পরিণত হয়েছে

সিলেট বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি সীমান্ত অঞ্চলঅঞ্চলটি বর্তমানে সিলেট, মৌলবীবাজার , সুনামগঞ্জ এবং হবিগঞ্জ এ চারটি জেলায় বিভক্তসিলেটের উত্তরে খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়, পূর্বে কাছাড়, ক্ষিণে ত্রিপুরা এবং পশ্চিমে কুমিল্লা ও মোমেনশাহীএর বর্তমান আয়তন ১২ হাজার ৫শ৯৬ বর্গমাইল১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে লোকসংখ্যা ৭১ লড়্গ ৪৭ হাজারমোট থানা ৩৫টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৩২২টিশিক্ষার হার শতকরা ২৭·৮৫

এক সময় সিলেট অঞ্চল গৌড়, জৈন্তিয়া, লাউড়, তরপ, বনিয়াচঙ, ইটা, জগন্নাথপুর ইত্যাদি রাজ্যে বিভক্ত ছিলসুদূর অতীত কাল থেকে এর সীমানা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়ে আসছেবৃটিশ আমলে সিলেট জেলার সীমানা আরো বিস্তৃত ছিলোতখন কুমিল্লা ও মোমনেশাহীর কতিপয় এলাকা এবং ভারতের করিমগঞ্জ মহকুমা সিলেট জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিলো

বৃটিশ শাসনের প্রথম দিকে সিলেট ঢাকা বিভাগের অধীনে ছিল  ১৮৭৪ সালে সিলেটকে আসামের সাথে সংযুক্ত করা হয়১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ নামক স্বতন্ত্র প্রদেশ সৃষ্টি হলে সিলেট পূর্ববঙ্গের সাথে চলে আসে১৯১১ সালে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ ভেঙে দেয়া হয় এবং সিলেট পূনরায় আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়  ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট ভারতের আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তনে যোগ দেয়

সিলেট একটি অভিজাত জনপদসিলেটর আভিজাত্য সম্পর্কে দেশে-বিদেশে বহু কাহিনী প্রচলিত আছেপ্রকৃতিগতভাবে সিলেটের লোক শরীফ মেজাজেরপ্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজাত শ্রেনীর লোকদের সাথে সিলেটবাসীর যোগসূত্র রয়েছেঅপর দিকে বৌদ্ধ, হিন্দু  এবং মুসলিম সাধকদের পদচারনায়  সিলেট অঞ্চল ধন্য হয়েছেউন্নত শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে সৃষ্ট এ আভিজাত্য সিলেটবাসীকে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছেএ আভিজাত্য অর্থ-বিত্ত দিয়ে অর্জন করা যায়নাঅতীতে শিক্ষিত ও মহ মানুষের সাহচর্যের মাধ্যমে সিলেটবাসী তা হাসিল করেছঅবশ্য মক্কায় যেমন গাধা আছে তেমনি সিলেটেও চোর-ডাকাত এবং খারাপ লোক আছে। তবে কিছু অস ও নীচমনা লোকদের কারণে সিলেটের এ আভিজাত্য কলঙ্কিত হয়নি বা বিনষ্ট হয়ে যায়নিযারা দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সিলেটবাসীর সংস্পর্শে এসেছেন তারা এ সত্য অস্বীকার করতে পারেন না 

রাজনৈতিক দিক দিয়ে সিলেট অঞ্চল স্থানীয় শাসকদের অধীনে শাসিত হয়েছেঅবশ্য কোন কোন কালে এর কিছু অংশ অন্যান্য রাজাদের অধীনে থাকার প্রমাণও রয়েছেবাংলার স্বাধীন সুলতানদের সময় সিলেট পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলোবারো ভূইয়ার সময় সিলেট বিভিন্ন সরদারদের শাসনাধীনে ছিলোউড়িষ্যা দখলের ৮০ বছর পর সিলেট মোঘলদের দখলে আসে১৭৬৫ সালে বাংলাদেশে ইংরাজ রাজত্বের সূচনা হয়এর মাত্র ১৭ বছরের মধ্যে সিলেটের সৈয়দ হাদী, সৈয়দ মাহদি এবং ইমাম শেখ ফরিদ ইংরাজের বিরদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়ে শাহাদত বরণ করেনবৃটিশের বিরদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলন ও সংগ্রামে বিশেষ ভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং পাকিস্তন আন্দোলনে সিলেটের সংগ্রামী অবদান রয়েছেসিলেটের দেশ প্রেমিক বিদ্রোহীদের ধরে ধরে বৃটিশ সরকার গাছের ডালে ঝুলিয়ে ফাসি দিয়েছে, স্বরাজ ও স্বাধীনতার কথা বলার অপরাধে আমাদের নেতৃবৃন্দ জেল, জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু মাথা নত করেননিতাদের মধ্যে অনেকে সর্বভারতীয় নেতৃত্বও প্রদান করেছেনবাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি যুদ্ধে সিলেটের জনগণ এবং বিলাতপ্রবাসী সিলেটবাসীর অবদান অপরিসীমমুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী, চীফ অব ষ্টাফ মেজর জেনারেল এ রব, ডিপুটি চিফ অব ষ্টাফ কর্ণেল এ আর চৌধুরী প্রমুখ সিলেটেরই কৃতিসন্তবিলাতে অবস্থানরত সিলেটবাসী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে এবং অর্থ সংগ্রহে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন

আর্থিক দিক দিয়ে সিলেট প্রাচীনকাল থেকেই একটি সমৃদ্ধ অঞ্চলবাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সেখানে দিনমজুরের সংখ্যা অনেক কমইংরেজ ডিপুটি কমিশনার এলেন তার রিপোর্টে ১৯০৫ সালের সিলেট সম্পর্কে বেশ কিছু গুরত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেনতার বিবরণ থেকে সিলেটের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আভাস পাওয়া যায়তিনি লিখেন, “দুর্ভিক্ষের আশংকাযুক্ত ভারতের অন্যান্যস্থানের তুলনায় সিলেটের লোকেরা নিসন্দেহে অধিকতর স্বচ্ছল বাসরিক বৃষ্টি কখনো বন্ধ হয়নাযদিও প্রায়ই একটা অতিবন্যা শষ্যের ক্ষতি করেফসলের ফলন নিশ্চিত ও প্রচুরঅতিরিক্ত শস্য কোন মধ্যসত্বভোগী ছাড়াই সোজাসুজি প্রতিটি এলাকায় নৌকাযোগে আগত বাংলার অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি হয়

সিলেট শহর সম্পর্কে তিনি বলেন, “এখানে বহু রাস্তা-ঘাট রয়েছেএর অধিকাংশই পাকা এবং পাকা পুল সংযুক্তজনবসতি শূণ্য পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি এদের অতীত গৌরবের সাক্ষ্য দেয়প্রত্যেক এলাকায়ই ছোট মসজিদ ও মুসলমান দরবেশদের কবর দেখা যায়

বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে সিলেট বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেসিলেটের চা, আনারস, গ্যাস, শুকনামাছ, চুনা, সিমেন্ট প্রভৃতি বিদেশে রফতানী হচ্ছেঅফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সিলেট অঞ্চলের লক্ষ ক্ষ লোক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছেনবৃটেন, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গেলে দেখা যায় এ সকল দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের অধিকাংশই বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল থেকে এসেছেনতাদের অর্জিত বৈদেশিক মূদ্রা বাংলাদেশে প্রেরণ করে তারা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেনএকই সাথে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পতাকা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখছেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে সিলেটবাসীর অবদান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঈর্ষনীয় পর্যায়ের বললেও অত্যুক্তি হবে নাবাংলা সাহিত্যের অগ্রগতি ও শ্রীবৃদ্ধিতে সিলেটের কবি-সাহিত্যিকগণ যে অবদান রেখেছেন তা আরো দশটি অঞ্চলের মিলিত অবদান থেকেও অনেক বেশীবাংলাদেশ এবং পশ্চিম বঙ্গ মিলিয়ে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য নিদর্শন হচ্ছে চর্যাপদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তকালীন বাংলাবিভাগের প্রধান হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল থেকে তা সংগ্রহ করেনপন্ডিতদের কাছে শুধু বাংলা ভাষা নয় সমগ্র পূর্ব ভারতের নতুন ভাষার ইতিহাসে চর্যাপদ প্রথম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিতচর্যাপদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর কবিকুল বাংলাদেশের কোন্‌ অঞ্চলের লোক তা নিয়ে পন্ডিতগণ গবেষণা শুরু করেনঅধ্যাপক আসাদ্দর আলী দীর্ঘদিন থেকে এ বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছেনসাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদএবং চর্যাপদে সিলেটী ভাষা’ - এ দুটি গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে চর্যাপদের কবিগণ সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেনতিনি শুধু কথার কথা হিসেবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেননিবরং চর্যাপদের কবিদের ভাষার সাথে কোন্‌ কোন্‌ শব্দের সাথে কি ভাবে সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত ভাষার মিল রয়েছে তা তিনি যুক্তি-প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেনতাঁর এ দুটি গ্রন্থ প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ নিয়ে অনেক সংশয়ের নিরসন হয়েছেচর্যাপদের কবিকুল বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার লোক বলে পন্ডিতদের মধ্যে যারা দাবি করছিলেন তারা আসাদ্দর আলীর বলিষ্ঠ যুক্তির সামনে নিশ্চুপ হয়ে গেছেনমধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি বলিষ্ঠ শাখা হচ্ছে বৈষ্ণব সাহিত্যএ সাহিত্যের মূল প্রেরণাদানকারী গুর হচ্ছেন চৈতন্যদেব এবং তিনি সিলেটের সন্তমধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সৈয়দ সুলতান, দৌলতকাজী, কোরেশী মাগন ঠাকুর, মোহাম্মদ কবির, মোহাম্মদ ছগির, সাধক কবি শেখ চান্দ প্রমুখ কবির অবদানে সমৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশ গর্ববোধ করেএ সকল কবি যে সিলেটেরই সন্তন ছিলেন তা নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে

লোক সাহিত্য বাংলাসাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখাএ ব্যাপারে সিলেটের অবস্থান বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষস্থানেময়মনসিংহ গীতিকার দশটি গীতিকার মধ্যে কমপক্ষে সাতটি গীতিকা সিলেট অঞ্চলের, যদিও অবস্থার ফেরে এর নাম দেয়া হয়েছে ময়মনসিংহ গীতিকাএ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, শুধুমাত্র সিলেট অঞ্চলে যতগুলো বারমাসী, গীতিকা, লোকসঙ্গীত, ধাঁ ধাঁ ও প্রবাদ পাওয়া যায় এর পরিমাণ সামষ্টিক ভাবে সমগ্র বাংলাদেশে প্রাপ্ত পরিমানের চেয়ে অনেক বেশীবাংলাভাষায় মহাভারতের প্রথম অনুবাদক মহাকবি সঞ্জয় সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত লাউড় এলাকার লোক বলে সর্বশেষ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছেভারতীয় প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে তিনিই সর্ব প্রথম মহাভারত অনুবাদ করেছেনমঙ্গলকাব্য রচয়িতার মধ্যে নারায়ন দেব এবং ষষ্ঠীবরও সিলেটের কৃতিসন্ত

বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার কবি সাহিত্যিকগণ যেখানে শুধুমাত্র বাংলাভাষায় সাহিত্য সাধনা করেছেন সেখানে সিলেটের কবি সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজী, নাগরী, সংস্কৃত, সিলেটি নাগরী, আরবী, ফারসী এবং উর্দূ লিপি বা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে অনন্য বৈশিষ্টের স্বাক্ষর রেখেছেনকলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরবীন্দ্র কুমার সিদ্ধার্থ শাস্ত্রী তার শ্রীভূমির সন্তনদের সংস্কৃত সাধনাশীর্ষক প্রবন্ধে ১০১ জন সিলেটবাসীর ৩৫৯ খানা সংস্কৃত গ্রন্থের নাম উলেস্নখ করেছেনএমনি ভাবে ফারসী, আরবী এবং উর্দূ ভাষায়ও অসংখ্য কবি সাহিত্যিক নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন

সিলেটের ভাষার সাথে মিল রেখেই তৈরি হয়েছে নাগরী লিপিপ্রাসঙ্গিক ভাবে এ সম্পর্কে প্রশ্ন আসে, সিলেটী ভাষা বলে কি কোন ভাষা আদৌ আছে? সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস এ ব্যাপারে কি বলে? এ সম্পর্কে সিলেটের ভাষাবিজ্ঞানীদের অভিমত কি? সিলেটী ভাষা বলে কোন ভাষা আছে কি নেই এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যেতে হবে মানুষের কাছে, পন্ডিতদের কাছে নয়ভাষা পন্ডিতরা সৃষ্টি করেন না, ভাষা সৃষ্টি হয় মানুষের মুখ থেকেপন্ডিতরা ভাষার লিখিত ব্যাকরণ তৈরি করেন এবং এর লিখিত রূপ দান করেনসিলেটী মানুষের কাছে গেলেই বোঝা যায় তারা যে ভাষায় কথা বলেন তা বাংলা নয়যারা জোর করে বলেন সিলেটী ভাষা বাংলারই কথ্য রূপ বা বিকৃত রূপ তাদের দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়বাংলাদেশের সিলেটের ভাষা এবং কুমিল্লা বা ময়মনসিংহের ভাষার তুলনামূলক আলোচনা করলে এ সত্য দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায় যে সিলেটীদের ব্যবহৃত ভাষা বাংলার বিকৃত রূপ নয়, বরং এটা একটা আলাদা ভাষাবহুভাষাবিদ ড·সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে সিলেটী একটি ভাষা এবং বহু দিক দিয়ে এ ভাষা অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদারসিলেটে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির অষ্টম জাতীয় ইতিহাস সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত ও বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক আসাদ্দর আলী সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ সিলেট দর্পণে এ সম্পর্কে ড· আলীর একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে।

সিলেটবাসীর নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা সিলেটবাসীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ এবং সিলেটী নাগরী লিপি সিলেটের এক অমূল্য সম্পদগবেষণা করলে দেখা যাবে সিলেটী নাগরী একটি বিজ্ঞান সম্মত লিপি এবং যারা তা উদ্ভাবন করেছেন, এ লিপি তাদের বিরল প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করছেঅধ্যাপক শিব প্রসাদ লাহিড়ীর মতে এ লিপি উর্দূ লিপির চেয়ে অনেক প্রাচীনতিনটি অক্ষর ছাড়া সেখানে কোন যুক্ত অক্ষর নেই এবং সবর্মোট ৩২টি অক্ষর মাত্র

সিলেট অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকগণ বাংলা সাহিত্যের সেবা করার সাথে সাথে নাগরী লিপির মাধ্যমে সিলেটী ভাষার চর্চাও অব্যাহত রেখেছেনউল্লেখ্য যে শুধু বাংলা নয়, আরবী, ফার্সী ও উর্দু সাহিত্যও সিলেটবাসীর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছেনাগরী লিপি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অধ্যাপক আসাদ্দর আলী বলেন, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীকে সিলেটে এই লিপির প্রচলনকাল বলে অনুমান করেনআমাদের বিবেচনায় শুধু চতুর্দশ শতাব্দীতে নয়, চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই লিপিমালাটি জন্মলাভের পর এর মাধ্যমে মুসলমানদের সাহিত্য সাধনার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিলতবে ১৫৪৯ খৃষ্টাব্দে রচিত গোলাম হুছনের তালিব হুছননামের তত্ত্বগ্রন্থ ছাড়া এর আগে রচিত কোন গ্রন্থের নিদর্শন এখন আর পাওয়া যাচ্ছেনাবেশীর ভাগ মুসলমান সিলটী নাগরী হরফএর সাহায্যে সাহিত্য সাধনা করলেও বাংলা লিপিকে এক দম বাদ দেননিভিন্ন ভিন্ন সুত্র থেকে এ পর্যন্তসিলটী নাগরী হরফ’-এ লেখা ১৪০ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছেএটা কম সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়সিলেটী নাগরীলিপি, ভাষা ও সাহিত্যনিয়ে গবেষণার পর জনাব গোলাম কাদির ১৯৮৩ খৃষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেনএকই বাংলা ভাষায় দুইটি আলাদা আলাদা লিপির মাধ্যমে সাহিত্য সাধনার এমন নিদর্শন নজিরবিহীনপৃথিবীর ইতিহাসে এমনটি আর কোথাও নেই

সিলেটের সন্তন চর্যাপদের কবিকূল, মধ্যযুগের কবিকুল এবং মরমীকবিদের বাদ দিলে ইতিহাসে বাংলা সাহিত্যের জন্যে গর্ব করার মত তেমন কিছু আর বাকি থাকেনাসিলেটের আরেক সাহসী সন্তন জনাব আব্দুল হামিদ চৌধুরী ১৯২৭ সালে  অর্থা বৃটিশ আমলে আসাম ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করে বাংলা ভাষা আন্দোলনের পথিকৃতের আসন দখল করে আছেনযে বছর পাকিস্তন প্রতিষ্ঠিত হয় সে বছরই জনাব মুসলিম চৌধুরী মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্লাটফরম থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার আওয়াজ তুলেনকিন্তু আমাদের এ সকল গৌরবময় অবদানের কথা আমরা ভুলে যেতে বসেছিওপর দিকে আমরা যখন ইতিহাসে আমাদের যথাযোগ্য সম্মানের কথা বলি, আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের কথা বলি তখন এক দল লোক সেখানে আঞ্চলিকতার গন্ধ আবিষ্কার করেনবাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা, বাংলাদেশ আমাদের দেশভাষার জন্যে এবং দেশের জন্যে সিলেটবাসী যা করেছে তা সোনার হরফে লিখে রাখার মতকিন্তু তাই বলে কি আমরা আমাদের গরবোজ্জল অতীত ইতিহাস আমরা ভুলে যাব? আমাদের ন্যায্য পাওনা এবং অধিকারের কথা আমরা বলবোনা? পাকিস্তন আমলে একই কায়দায় বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছেইতিহাস সাক্ষী, এর ফলাফল শুভ হয়নিইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া দরকারসাথে সাথে আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে, কান্দে ফুতে বুনি খায়যে ছেলে ক্রন্দন করে মা তার মুখেই স্তন তুলে দেয়। আপনার ইতিহাস আপনাকেই তুলে ধরতে হবে, আপনার অধিকারের কথা আপনাকেই বলতে হবে 

হিউয়েন সাঙ, আলবেরুনী, ইবনে বতুতা প্রমুখের বর্ণনা মতে সিলেট একটি সমৃদ্ধ ও সুন্দর জনপদ ছিলোহিন্দু পুরাণ মতে সিলেট মহাশক্তির পীঠস্থান রূপে পূণ্যতীর্থ বলে গণ্যরবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

                মমতাবিহীন কালস্রোতে

                বাংলার প্রান্তসীমা হতে

                নির্বাসিতা তুমি 

                সুন্দরী শ্রীভূমি

                ভারতী আপন পূন্যহাতে

                বাংগালীর হৃদয়ের সাথে

                বাণীমাল্য দিয়া

                বাঁধে তব হিয়া

                সে বাঁধনে চিরদিন তরে

                তব কাছে

                বাংলার আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে

ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত কাশ্মীরের রাজধানীকে যেমন শ্রীনগর নাম দেয়া হয়েছে ঠিক তেমনি বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটকে এক সময় শ্রীভূমি বলা হতোগণমানুষের কবি দিলওয়ার বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতার উক্তি উল্লেখ করে একবার লেখে, “কাশ্মীর পৃথিবীর সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং সিলেট তার হৃপিন্ড ল্লীকবি জসীম উদ্দীন সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেন, “সিলেটের প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করিয়াছেএখানকার গাছ-গাছড়া, নদ-নদী সবই যেন কবিত্বময়ইচ্ছা হয় এখানে বসিয়া যুগ যুগ ধরিয়া সাধনা করিএমন সুরম্য দেশে কবি-সাহিত্যিকের উদ্ভব না হইয়া পারেনাতাই দেখিতে পাই, সিলেট বাংলা সাহিত্যে  এক বিশিষ্ট আসন দখল করিয়া বসিয়া আছেসিলেটের প্রতিভা অসাধারণসাহিত্য ক্ষেত্রে সিলেট জেলা শীর্ষস্থানীয়