Home | Articles | About | Contact
কাদের মাহমুদের চন্দ্রলোকের অন্বেষা

- ফরীদ আহমদ রেজা

আমি যে কাদের মাহমুদকে জানি তিনি কবি কাদের মাহমুদ। বিলাত প্রবাসী প্রবীন বাঙালি কবিদের মধ্যে যারা উভয় বাংলায় কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি তাদের অন্যতম। কবিতার প্রতি তার অনুরাগ এবং অঙ্গীকার কোন অংশে কম না হলেও সফল উপন্যাস এবং গল্প লিখেও তিনি সুনাম আর্জন করেছেন। কিশোরগঞ্জের মানুষ কাদের মাহমুদের জন্ম ১৯৪৩ সালে নেত্রকোনার কুমারী গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং এমএ করেন। রাজধানী ঢাকায় বেশ কিছু সময় সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত থেকে ১৯৭৩ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগে যোগ দিতে লন্ডনে পাড়ি জমান। এর পর থেকে লন্ডনে আছেন। এখান থেকে প্রকাশিত প্রচীনতম বাংলা সাপ্তাহিক জনমতে কাজ করেছেন দীর্ঘ এগারো বছর। এ সময় বাংলা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে লন্ডনের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সচল এবং মুখর রাখার ব্যাপারে গুরত্বপূর্ণ আবদান রাখেন।

২০০৯ সালের বই মেলায় প্রকাশিত কাদের মাহমুদের কাব্যগ্রন্থ ভূতলে নৌযাত্রা’য় তার প্রকাশিত বইয়ের একটি তালিকা রয়েছে। সে তালিকা অনুযায়ী এ পর্যন্তô তার ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫টি উপন্যাস-অহিনকুল, উড়নচন্ডী, শহরে ফানুস, কচ্ছপ, ঘরের নাম বাসনা এবং পরকপক্ষীর বিভূঁইবাস; ২টি গল্পসংকলন-কমল রাক্ষসের উপাখ্যান এবং স্বল্পগল্প; ৩টি কাব্যগ্রন্থ-এক ধরনের শেস্নাক, বাসর আলাপের নান্দীপাঠ, ভূতলে নৌযাত্রা এবং কালের মোড়। এ ছাড়া তিনি একটি ভ্রমণ কাহিনী এবং ২টি শিশুসাহিত্য গ্রন্থও লিখেছেন।

‘এক ধরনের শেস্নাক’ কাদের মাহমুদের প্রথম কবিতার বই। এ বইয়ে ৯৩টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ভেতরের কভারে কাদের মাহমুদের কবিতা সম্পর্কে পাঠকদের একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘কবিতা মনের কথা। মনের কথাই কবিতা। কবিতা নিজের অন্তôরের ছবির মতো। এক ধরণের শেস্নাক তেমনি একটি শব্দ ছবি। এখানে আছে নানান তন্ময়তা, সচেতনতা, স্থান ও প্রেম নিয়ে বিবিধ তন্ময়। দেশ, সমাজ, লোক-লোকালয়, প্রকৃতি, নীতি, বোধ, স্মৃতি, পরদেশ, প্রেম-এই সবে তাড়িত কাদের মাহমুদ ও তার কবিতা।’

কাদের মাহমুদ গভীর অন্তôর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক সমাজ সচেতন কবি। কবির দৃষ্টিতে মনের কথা-ই কবিতা এবং তা শব্দ দিয়ে অংকিত তন্ময়তার ছবি। একাগ্রচিত্তে কবির উচ্চারিত ভাবনার শব্দরপ ছবি হচ্ছে কবিতা। ‘এক ধরনের শেস্নাক’ কাব্যগ্রন্থে তিনি নিজেই তার কবিতাকে চেতনা তন্ময়, স্থান তন্ময় এবং প্রেম তন্ময়-এ তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। বোধী সংগীত দিয়ে কাব্যগ্রন্থটি শুরম্ন হয়েছে এবং আমার মতে সেখানে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। কবিতার অনুসঙ্গ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রাণী হিসেবে তিনি তার চেতনাকে সেখানে সংক্ষিপ্ত অথচ বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

কৃষক লাঙল হাতে আসুক, কারখানার

সিটি আনুক মিছিল কর্মী যোদ্ধা সেনা জীবনের,

উৎপন্ন ফসল পণ্যে, সমবায়ী নয়, সমভাগী

মহোৎসবে আমরা রবো কলেস্নালে জাগবোই সবে

- এ বোধী সংগীত হোক প্রত্যহ মানববানীর বাঙময় বীণার সুরে।


নিরন্তôর না নয়, দেশজ মৃতের লাশ

বয়ে বেড়ানোও নয়, বিশ্বের অধীত প্রজ্ঞা

পরমের সব নির্যাস পথের আলোক দেবে

তমিস্রা ধূসর হবে কর্ম পাবকে পুড়ে

- এ বোধী পাথেয় হোক আমাদের দীর্ঘ অভিযানে।

কাদের মাহমুদ কবিতার আকারে অন্তôরের যে ছবি অঙ্কন করেছেন সেখানে আমরা আমাদের জীবন-যন্ত্রণার রখাচিত্র দেখতে পাই। একজন আধুনিক কবির মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, নস্টালজিয়া, স্বদেশেপ্রম, মানবিক প্রেম-ভালবাসা প্রভৃতি তাকে আলোড়িত করেছে। সমাজ সচেতন কবির উচ্চারণঃ

‘বেদনা বেদনা জ্বালা’ এ আর্তরব কেবলি শুনি নিশিদিন আমাদের

শ্যামল বাংলার ঘরে। অতিপলিজমা নদী, বিগতযৌবনা মাঠ, জল

পুকুর, হেঁসেল, হাট, মানিব্যাগ, ট্যাক আর হৃষ্ট হাসি, ঘাম, নৌকা, জাল

লাঙল সকলি ভেজা গরলেতেঃ আবরুদ্ধ যভ্রণায় সবি নীল অবসিত।

রহমান! রহমান! শুনি, অথচ রহম নেই, চারিদিকে উষরতা দেখি।

(অনেক আলাপ শুধু)


কাদের মাহমুদের কবিতায় বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য অন্তôর্মুখি হৃদয়াবেগ নিছক অন্তôর্মুখি হয়ে থাকেনি। ইতিহাস চেতনা, ঐতিহ্য এবং কালকে ধারণ করে তা সকলের হয়ে উঠেছে। আবেগের সাথে বুদ্ধিবৃত্তির অসাধারণ সংমিশ্রণে তার কবিতা হয়ে উঠেছে কালোত্তীর্ণ। দৃষ্টান্তô হিসেবে আমরা তার যুদ্ধ ঘোষণা শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটির কথা বলতে পারি। কবিতাটি সাত ভাগে বিভক্ত যেখানে তিনি বাংলাদেশের পটভূমি সামনে রেখে সমগ্র মানবগোষ্ঠীর চিরন্তôন দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং আকাঙ্খার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তিনি সেখানে অতীতকে ধারণ করে বতর্মান যুগ-যন্ত্রণার শৈল্পিক চিত্র অংকন করার সাথে সাথে অত্যন্তô অলক্ষ্যে থেকে রূপময় আলোর মিছিল বা মুক্তবুদ্ধির স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি যুদ্ধ চান না, যুদ্ধবাজদের ধ্বংস কামনা করেন। তবু তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তবে তার যুদ্ধ বেঁচে থাকার যুদ্ধ-মানুষের জয় সুনিশ্চিত করার যুদ্ধ। আসলে মানুষের বোধশক্তিকে সচেতন ও শানিত করে মানব জাতিকে অদৃশ্য কারাগার থেকে মুক্তির এ যুদ্ধ যুগ যুগ থেকে চলে আসছে। কবির আহবানঃ

বন্ধুগণ, নাগরিক, পলস্নীবাসী, পুরবাসী-

অদৃশ্য এ কারাগারে আজন্ম বন্দী ভাই ও বোনেরা আমার!


সময় ফুরায়ে যায়।


শোকের বিলাস যাও ভুলে একেবারে।


এসো দ্রম্নত ক্ষীপ্র দীপ্ত এসো বেগে জেগে জেগে

সমবেত হও সবে এইখানে ঠিক এখানে

এই সকলের সাথে, এই সকলের মাঝে

যেখানে নিয়ত জ্বলে

আণবিক থেকে ঢের অধিক শক্তির

মানবিক চুলিস্ন।


করো আয়োজন করো, যুদ্ধ হোক শুরম্ন।


কাদের মাহমুদের এ ধরণের কবিতা পাঠের পর আমাদের স্মরণে চলে আসেন নজরম্নল, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং সুকান্তô। অবশ্য নজরম্নল বা সুকান্তেôর চেয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথেই কাদের মাহমুদের কবিতার বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন সুভাষ মুখোপধ্যায়ের কবিতায় আমরা পাইঃ

ক· প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

খ· ছত্রভঙ্গ রৌদ্র হয় ফিকে/ উদ্যত সঙ্গীন দিকে দিকে

গ· আমাকে সৈনিক করো তোমাদের কুরম্নক্ষেত্রে ভাই

ঘ· আনো দিন হাতুড়ির/ আনো দিন কাস্তেôর/ খাদ্যের শিলের শিক্ষার স্বাস্থ্যের

ওপর দিকে কাদের মাহমুদের কন্ঠে আমরা শুনিঃ

ক· রাখুন সবে রাখুন/ হাতের কাছে আগুন/ বোমা কিম্বা গুলি। শুনছি নয়া বুলি।

খ· এখন ঘোষণা শোন/ যুদ্ধ শুরম্ন হয়ে গেছে!

গ· ফড়িয়া আর দালালদের ঝোলাও শিকায়

ঘ· বারম্নদ! বারম্নদ! গোলা!!!/ সবকিছু ছিন্নভিন্ন করার মতোন আছে মজুদ।

আমরা যারা একটা পরিণত বয়সে এসে প্রবাস জীবন গ্রহণ করেছি তাদের লেখায় বিভিন্নভাবে স্বদেশ প্রসঙ্গ আসে, এটাই স্বাভাবিক। ৭৩ সালে কাদের মাহমুদ লন্ডনে আসেন, তখন তিনি ৩০ বছর বয়সী যুবক। স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশের গ্রাম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রাজনৈতিক অস্তিôরতা, প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদি প্রসঙ্গ তার কবিতায় বার বার এসেছে। বাংলাদেশের কোন এক স্মৃতিময় গ্রামকে নিয়ে লেখা কাদের মাহমুদের এ রকম একটি কবিতা ‘মৌরম্নসী গ্রাম’। তার নস্টালজিক বর্ণনা আমাদের সবাইকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজ নিজ স্মৃতিঘেরা গ্রামে নিয়ে যায়। আমাদের অনেকের মতো বিলাতে বসবাস করেও তিনি কামনা করেন-

‘অবারো কখনো যাবো ফিরে সেই পলস্নীক্রোড়ে’ এই ভেবে মনে

সেই গ্রামে যাই সেই বনে মাঠে ঘরে আর মায়ার ভেতরে

ঘুরে ফিরি দিন রাত সকাল বিকাল সন্ধ্যা কাটিয়ে বেড়াই

নদীর ঘাটেতে বসে বউ চোরা নৌকা খুঁজি কখনো দু হাতে

ছুঁয়ে ক্ষেতের ফসল উঠোনে চামেলী জুঁই নিশির আলোকে

রজনীগন্ধা অথবা নিজেকে কুড়াই, ছেঁড়া ফুলের পাপড়ি।

বৃটেন প্রবাসী বাঙালির স্বদেশ কি বাংলাদেশ না বৃটেন, এ প্রশ্ন কেউ না করলেও এ নিয়ে প্রবাসীরা অস্বস্তিôতে রয়েছেন এবং কাদের মাহমুদও এর অংশীদার। এ কারণেই তিনি বলতে পারেন, ‘বিদেশ মাটি বিভূঁই বলে/ আপন তাকে মানতে দ্বিধা/ চিনতে দ্বিধা; তাকে কেবল/ প্রবাস বলে তুচ্ছ করি। ভিন দেশেতে বসত করে/ কোনটা স্বদেশ বুঝতে নারি।’

প্রবাসীদের স্বদেশ ভাবনাকে কাদের মাহমুদ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার টুটিংয়ে রূপসী বাংলা কবিতায়। আবার বোনের মতো স্বদেশ কবিতায় তিনি বৃটেনকে পরভূমি না বলে স্বদেশেরই বোনের মতো এক দেশ হিসেবে সম্বোধন করেছেন।

এটা ঠিক যে কালজয়ী কবিদের দশকের বৃত্তে আটকে রাখার সুযোগ নেই। তাদের লেখা স্থান-কালের উর্ধে উঠে সকল যুগের সকল মানুষের হয়ে উঠে। তবে যুগকে জানলে কবিদের বুঝতে সহজ হয়, এ জন্যেই দশক হিসেবে বিভাজন করা হয়। কাদের মাহমুদের কবিতায় ৭০ দশকের কবিদের ক্ষরণ, অবসাদ, দ্রোহ, দুঃখবোধ, হতাশা, যুগযন্ত্রণা, রাজনীতি, মানবপ্রেম ইত্যাদি লক্ষ্য করে আমরা খুব সহজেই তার কবিতার কাল নির্ণয় করে নিতে পারি। ‘কখনো আমরা’ কবিতায় তিনি বলেন-

আমরা পরাভূত আজ; নিজস্ব আদল ভেঙে ফেলে

নগর বাসের যাত্রী, বাদুড় কিংবা যেমন থাকে কন্ঠলগ্না যতসব নাগরের নষ্ট বণিতা

আমাদের যৌন অঙ্গে সিফিলিস চিরস্থায়ী

আমাদের মননেও বিকারের প্রাদুর্ভাব।

সম্বৎসরের ছবি কবিতায় একই কথা বলা হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকেঃ

আমাদের বদ্ধ ঘরের ভেতরে অতিশয়

ভালোবাসাহীন প্রণয়বিহীন প্রেম

নারীদের বলৎকারে পুরম্নষের ঘাম-ভ্যাপসা গন্ধ

আর মন্দ অন্ধ হাওয়া ভরে আছে

ভরে থাকে সম্বৎসর।


‘দুরূহ খোঁজ’ কাদের মাহমুদের টানা গদ্যে লেখা একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা। এখানে কবি তার আজন্ম অন্বেষার কথা বলেছেন, বর্ণনা করেছেন তার চিন্তôার দার্শনিক পটভূমি, ছবি এঁকেছেন মানবিক বিপর্যয় এবং অমানবিক সমাজ-সংসারের। তিনি বলেন -

বেসামাল কোন পাখি বুকের গহনে পুষে; একাকী আদিগন্তô আকাশ পাতাল সুকাল অকাল ধরে আজন্ম খুঁজি আমিঃ ধুরন্দর মেধাবী। পাবো পাবো বলে হাঁটি, করি পায়চারী, ছুটি, করি ছোটাছুটি, লম্প ঝম্প দিই, সজোরে সবলে-ঘর্মাক্ত বদনে। ঘর ছেড়ে ঘর আর দেশ থেকে দেশে যাইঃ দু’পায়ে জমিনে, জাহাজের কন্দরে উতরোল পানিপথে, মেঘের মতোন ভেসে পেস্ননের ভেতরে। অপরূপ পৃথিবীর লীলাখেলা দেখে শুনে, তবু অবুঝ মনে, ফিরে আসি; কখনো বা ঠায় থাকি বসে; ধ্যানে আর পাঠে যায় অমা-আলো উবেঃ অশেষ প্রহর। লোপ পায় ক্ষুধা তৃষা দেহের তাগিদ যতো; দৃষ্টিশক্তি বাকশক্তি শ্রুতিও কখনো বেভুল হয়।

কবি এখানে কিসের অন্বেষার কথা বলছেন? কি জন্যে তিনি উদ্বিগ্ন এবং উদ্বেলিত? কি পাওয়া এবং না পাওয়ার দ্বন্দ্বে কবির হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত? মানবিক চেতনার চিরচেনা ভূগোল এবং বিপর্যন্তô ইতিহাস বর্ণনার পর শেষ স্তôবকে এসে কবির উচারণ-

চাই হৃষ্ট হৃদয়, মুক্ত মনের সুধা, আপন জ্ঞানের ফল, দেহ থেকে চাই নিটোল শ্রমের রস, চাই প্রেম, চাই সৃজনের গূঢ় কথা, দৃঢ় পথ! কোটি আর এক হাতে গড়বো পৃথিবী, ফুটাবো নতুন ভোর, মানুষের বুভুক্ষা মেটাবো অশেষ মসলিনের জামায় কারুকর্মে সাজাবো নারী ও পুরুষ সব-শিশুও তেমন রোদ হাওয়া আর চন্দ্রালোক ছড়াবো প্রশস্তô ঘর আর বিতান উঠান।

বাসর আলাপের নান্দীপাঠ গ্রন্থে রয়েছে ২৯টি কবিতা । এ বইয়ের নামকরণ থেকে এ কথা মনে করার কারণ নেই যে এখানে শুধু নরনারীর হৃদয়ঘটিত বিষয় স্থান পেয়েছে। এখানে হৃদয়ে অতিথি, বাসর, সঙ্গম, ১০৯৫০ দিনরাত্রি শীর্ষক কবিতার পাশপাশি সু-হিয়া সুফিয়া কামাল, হুলিয়া কবি, দ্বীপাংশে উইপিং উইলো, নদী ওগো নদী, বৃত্তি, রক্তগণ প্রভৃতি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাও স্থান পেয়েছে।

ভূতলে নৌযাত্রা কাব্যগ্রন্থের নামকরণ হয়েছে লন্ডনের পাতাল রেলে ভ্রমণের স্মৃতিকে ধারণ করে। কবির ভাষ্য অনুযায়ী বিলাতে বসবাসের ছত্রিশ বছরের মধ্যে ২৫ বছর তিনি প্রতি বছর এগারো মাস সপ্তাহে পাঁচদিন পাতাল রেলে যতায়াত করেছেন। দৈহিকভাবে তিনি বিলাতে ভ্রমণ করলেও মানসিক ভাবে তিনি নদ-নদীবহুল বাংলাদেশে নৌযাত্রা করেছেন। নাম কবিতা ভূতলে নৌযাত্রায় সে আকাঙ্খা-ই তিনি ব্যক্ত করেছেন। ৮৯টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত এ গ্রন্থে বিশ্ব-সমাজের সাথে সাথে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষ এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বাস করেও তিনি কামনা করেন চিরায়ত বাংলার সেই সব মমতাময়ী নারীদের যারা মাটি দিয়ে মৃৎপাত্র তৈরি করে, গোবর দিয়ে ঘুটি বানায় এবং কাঠালের মচি আর তেতুল দিয়ে ভর্তা বানিয়ে মজা করে খায়। স্কার্ট বা গাউন পরিহীতা রমনী নয়, বাংলা ভাষার অমর কবি জীবনানন্দের মতো নীল শাড়ি আর নকশি কাঁথায় তার মন বাঁধা রয়েছে।

কালের মোড় কাব্যগ্রন্থে কাদের মাহমুদ কালের কথা বলেছেন, বলেছেন অতীত, বর্তমান এবং তার কল্পণা বা স্বপ্নরাজ্যের ভবিষ্যত কালের কথা। এ বইয়ে মোট ৪৮টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি হচ্ছে তার ভাষায় সাবালক ছড়া। তার সাবালক ছড়াগুলোর একটি হচ্ছে সবুর কর। সেখানে তিনি বলেন,

আজ কি-না কাল করিস না

ঘর-উঠানে ছুটিস না

উচাটনে মরিস না

পুকুর জলে ডুবটা দে

সুরুৎ সুরুৎ পানি খা

দেখতে পাবি আমীর খাঁ।।

আমীর খা তো অন্ধ জন

তবু বলে লাগবে পণ

ফর্সা লাগবে বউয়ের রঙ

পুরুষ বেটা করছে ঢঙ।

আরেকটি সাবালক ছড়ার শিরোনাম উক্তি। ছয় লাইনের এ ছড়ায় গ্রামবাংলার কৃষকদের আর্থিক টানাপোড়েন চিত্রিত রয়েছেঃ

হেই কিৎ কিৎ

হেই কিৎ কিৎ

হালের বলদ যা

পেটে কিছু

না থাকলে

আমার মাথা খা।।

কালের মোড়ে অন্তôভূêক্ত কবিতাগুলোর মূল সুরের সাথে তার অন্যান্য কবিতার মিল থাকলেও কবিকে এখানে বিষয় নির্বাচনে বহুমাত্রিক এবং শব্দ চয়নে অধিকতর চৌকস হতে দেখা যায়। এ গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতার শিরোনাম নির্মীয়মাণ। এটা একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা। কবি এখানে শেস্নষ এবং ক্ষোভ মিশিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সমাজিক চিত্র অংকন করেছেন। এ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজপতিদের ভন্ডামি এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা বাঙময় হয়ে উঠেছে। কবির উচ্চারণ,

ঘরে ঘরে চলে শিশুদের বালক বালিকাদের দাসত্ব-পীড়া;

শহরময় বস্তিô বাড়ে ফুটপাতে নিরাশ্রয় মানুষের অগনন নিদ্রা;

মিছিলের শাড়িপরা মহিলাকে ধরে হেচড়ে নিয়ে যায় পুলিশ-

ক্যামেরা অবিকল ধরে রাখে আধুনিক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পালা;

পত্রিকা ওয়ালারা রাহাজানি ছিনতাই হত্যা ধর্ষণের খবর আর

চিৎ-কৃত-বিকৃত ছবি ছেপে ফেঁপে ওঠে;

·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ··

ঘুষ দিই নি বলে কেউ করে না বাহাদুরী,

ঘুষ নিই না বলেও কারো নেই অহঙ্কার;

তাহলে তারা কারা যে ঘুষ খায়?

কালো টাকায় গড়ে আকাশচুম্বী দালান, বস্তিôর ধারে,

পথে পথে ঘোরে কোটি টাকার গাড়ি, রিার পাশে?

কারা উড়ে যায় সিঙ্গাপুরে করতে সদাই,

বিয়ের বাজার করতে কোলকাতা বা দিলস্নী?

বিলেতে আমেরিকায় কারা কিনে রাখে

অসময়ে আশ্রয় গোঁজার নিরাপদ ঠাই?

তারা কারা? আমি বা আমারি কেউ

- কেউ তা করে না স্বীকার


এ গ্রন্থের বৃক্ষ শিরোনামে লিখিত কবিতার জিজ্ঞাসা বিজ্ঞানাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হলেও এটা একটা ছল মাত্র। প্রশ্নটা তিনি আমাদের সবাইকে করছেন। সবাই বলতে এখানে সমগ্র মানবজাতি।

তবে কি মানুষের মতো বাঁচতে পারে বৃক্ষ?

তবে কি আমাদের মতো হাসতে পারে বৃক্ষ?

মানুষের মতো ব্যথা পায়? কাটলে পরে তারও

রক্ত ঝরে? আর্তনাদ করে ওঠে বৃক্ষ

অস্বাভাবিক পতন বা মৃত্যুর আগে?

হ্যাঁ, আমাদের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর-ই ইতিবাচক। গাছের একটা পাতা যখন আমরা খেলার ছলে ছিড়ে ফেলি তখন সে আর্তস্বরে চিৎকার দেয়। পশুর ভাষা আমরা না বুঝলেও তার চিৎকার আমরা শুনতে পাই। পশুর আনন্দ বা বেদনার অভিব্যক্তি আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিন্তôু বৃক্ষ যেহেতু কোন প্রকার সাড়া বা ইঙ্গিত দিতে পারে না, তাই তাদের আনন্দ-বেদনা আমাদের কাছে অজ্ঞাত রয়ে গেছে। জগদীশ বাবু বলার আগে, অনেক অনেক পূর্ব থেকে আমরা বিশ্বাস করতাম গাছের প্রাণ আছে। যদিও কারো কারো মতে সেটা ছিল আমাদের কুসংস্কার। কারণ আমাদের বিশ্বাসের পেছনে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তেôর আশীর্বাদ ছিল না। জগদীশবাবু সে আশীর্বাদ আমাদের দিয়েছেন। হিংস্র প্রাণী থেকে আত্মরক্ষার নানাবিধ কৌশল আধুনিক মানুষ রপ্ত করেছে। কিন্তôু মানুষের হাত থেকে পরিত্রানের কৌশল এখনো আমাদের নাগালের বাইরে। মানুষ মানুষকে হত্যার জন্য আনবিক বোমা বানায়, যে বোমা একজন দু’জন নয়, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষকে এক মুহূর্তে হত্যা করে। মানুষ যেখানে ব্যর্থ সেখানে অচল প্রাণী বৃক্ষ কীভাবে মানুষের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করবে? মানবসমাজকতৃক বেপরোয়া বৃক্ষনিধনে বিক্ষুব্ধ কবি তবু উচ্চারণ করেন-

বৃক্ষের ছায়া চাঁদোয়ায় আমরা তো আছিই সর্বক্ষণ, আবার

আমাদের বৃষ্টির ধারক বৃক্ষ, আগুনের উপকরন বৃক্ষ

বৃক্ষ কখনো মহীরূহ, কভু তৃণ বা লতা, ঘাস অথবা গুল্ম

··· ··· ··· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ·· ···

দিনের বেলায় বৃক্ষের নিঃশ্বাস খেয়ে বাঁচি আমরা, আবার রাতে আমাদের নিঃশ্বাস খেয়ে বৃক্ষ ঠেকায় মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের এমন স্বজনপ্রাণ বৃক্ষ!

কী করে তাকে চিনতে শিখবো আমরা?

আমরা মানুষ?

মেকী অহংকারে গর্বিত ও মদমত্ত আধুনিক যুগের মানুষের প্রতি কবির এ জিজ্ঞাসা কি আমাদের সকলের নয়? গাছের মতো উপকারী সৃষ্টিকে যারা বিনা প্রয়োজনে বা নিছক চিত্তবিনোদনের জন্য বেপরোয়া ভাবে নিধন করে তারা কি সত্যি মানুষ? না-কি অন্যকোন হিংস্র প্রাণী? নিজের ভাবনা যখন সকলের হয়ে যায় এবং তা কাব্যিক সুষমায় প্রকাশিত হয় তখনই কবি পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটেন, সার্থক হয়ে উঠেন।

একই গ্রন্থের সভ্যতা যজ্ঞ কবিতার অনুসঙ্গ বুশ প্রশাসনের যুদ্ধংদেহি মনোভাব। মানবসভ্যতা ধ্বংসের জন্য মার্কিন প্রশাসন এবং তার মিত্রদের বেপরোয়া মানসিকতা প্রত্যক্ষ করে কবি ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ। কাদের মাহমুদ এখানে েক্ষাভ, বিদ্রম্নপ, ঘৃণা ইত্যাদির মাধ্যমে যুদ্ধ-বিধ্বস্তô বতর্মান পৃথিবীর একটি কাব্যিক চিত্র তুলে ধরেছনঃ

কাবুল! আফগানিস্তôানের কথা ভুলে গেছি সকলে আমরা

সংবাদ পাঠক দেয়না করিয়ে স্মরণ আর ইদানিং

সেখানে কী করে আজো মৃত্যু আসে মৃত্যু আসে

প্রতিদিন মানুষের চোখে, তার দেহে দেহে

মেয়েদের পোড়া লাশ আজো বয় না কোন বেগানা পুরুষ।

রাশিয়ায় শিশুদের পাঠশালা ঘরে ফেটেছে মরণ; মরণ ছুটেছে

সিলেটের ধর্মঘরে ঢাকায় সভার স্থলে ভারতে ও পাকিস্তôানে

যত্রতত্র ইজরায়েল চেচনিয়া সর্বত্র ছোটে

মৃত্যু কতো না রকম। কতো না রকম মৃত্যু। এবং

যারা যুদ্ধ করতে যায় কিম্বা আসে তারাই তো ডেকে আনে মৃত্যু

অথচ নিজেও হয়ে পড়ে কখন যমের শিকার, বুঝে না তারা-

কেন কামান বন্দুক গুলী শিরস্ত্রাণ কোন কিছু পারে না ঠেকাতে

তাদের মরণ।

কেউ বলে ক্ষতি কিবা শহীদ তো হলো, যাবে স্বর্গে নির্ঘাৎ

কেউ বলে দুঃখ নেই দেশের সুনাম হলো, জাতির মান বাঁচোয়া!

স্মৃতির মিনার গড়ে দেবো আমরা পুষ্প অর্ঘø।

কবি কাদের মাহমুদ আজ বয়সের ভারে নত হলেও হৃষ্ট হৃদয় আর মুক্ত মনের অন্বেষায় এখনো পৃথিবীর পথে হাঁটছেন যুবকের সাহস বুকে ধারণ করে, আমাদের আশ্বস্তô করছেন মানুষের মেধা ও মননের আঙিনায় রোদ-হাওয়া আর চন্দ্রালোক সৃষ্টির সাহসী উচ্চারণে।

লন্ডন ৩১ মে ২০০৯