Home | Articles | About | Contact
রাষ্ট্রভাষা বাংলা থেকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র

- ফরীদ আহমদ রেজা

ফেব্রুয়ারী মাস বাংলাদেশে উৎসবের মাস হিসেবে চিহ্নিত। শুধু বাংলাদেশী বাঙালী নয়, পশ্চিম বঙ্গ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাঙালী জনগোষ্ঠীর কাছে মাসটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এ মাসে গোটা বাংলাদেশ উৎসবে মেতে উঠে। এ উৎসব ভাষার লড়াইয়ে বিজয়ের উৎসব। ভাষার লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট ও বিশ্ব মানচিত্রে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দেশের বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগণ যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে তা আজ আন্তôর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সম্মানের সাথে অধিষ্ঠিত। বাঙালীর ২১ ফেব্রয়ারী জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী এখন পৃথিবীর দেশে দেশে আন্তôর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা হিসেবে এটা আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কম শ্লাঘার বিষয় নয়।

ফেব্রুয়ারী মাস এলে স্বাভাবিক কারণেই আমরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করি। ভাষার লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার বা স্মৃতিকথা আমরা উপভোগ করি। আমাদের আলোচনায় তারাই বেশি আসেন যারা ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বেনিফিশিয়ারী। এমন অনেক লোক আছেন যারা ভাষা আন্দোলনের তকমা গলায় ঝুলিয়ে কোন বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেননি। ভাষা আন্দোলনের গোড়া পত্তনে অসাধারণ ভূমিকা রাখার পরও তারা এর দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করেননি। সত্যিকথা বলতে কি তারাই সত্যিকার মাতৃভাষা প্রেমিক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন হঠাৎ করে ৫২ সালে শুরু হয়ে যায়নি। ‘পাকিস্তôান’ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের সচেতন লেখক ও বুদ্ধিজীবী মহল রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বক্তব্য রেখে বাংলাভাষার অবস্থান সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। দুঃখের বিষয় রাজনৈতিক ডামাঢোল এবং চাপাবাজির কারণে সে সকল লেখক ও বুদ্ধিজীবীর অবদান আজকের প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত থেকে গেছে। ভাষার লড়াইয়ে যারা জীবন দিয়েছে তাদের আত্মত্যাগই সবচেয়ে বেশী। ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ পাঁচ জন; সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত এবং সফিউর। পার্থিব জীবনে কোন কিছু লাভ করার অনেক উর্ধে তাদের অবস্থান। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল এবং জানাশোনা খুবই সীমিত। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। এর বাইরে রয়েছেন অসংখ্য জানা-অজানা ভাষা সৈনিক যারা ভাষার লড়াইয়ে অংশ নেয়ার অপরাধে দৈহিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে নিগ্রহ ভোগ করেছেন। আজ ২০০৮ সালে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

ক· আসলে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যুগ যুগ থেকে লড়াই করছে। এক সময় এ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ ছিল আর্যরা, অন্য সময় ইংরেজরা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তôানীরা। বাঙালীর হাজার বছর ব্যাপী এ সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। বাংলার আদি বাসিন্দাদের দ্রাবিড় নামে চিহ্নিত করা হয়। সুদূর অতীতে উপমহাদেশের সর্বত্র দ্রাবিড় জাতির শাসন ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রত্নতত্তবিদ অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর মতে ‘বাংগালাহ’ বলতে এক সময় এ দেশের শতকরা নিরান্নব্বই ভাগ মানুষকে বুঝাতো। পাঠান আমলে সর্বপ্রথম বর্তমান বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত ভূখন্ড বাংলা নাম ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে। শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘চৌদ্দ শতকের বাংলার স্বাধীন মুসলিম সুলতান হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ প্রথমবারের মতো গংগা ও ব্রহ্মপুত্রের নিম্ন অববাহিকার ব্যাপকতর এলাকাকে ‘বাংগালাহ’ নামে অভিহিত করেন। লাখনৌতি (উত্তর বঙ্গ) ও বাংগালাকে তিনিই স্বাধীন সুলতানী শাসনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন।’ (বাংলার ইতিহাসের দু’শ বছর, স্বাধীন সুলতানদের আমল, পৃষ্ঠা ২০) বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমা প্রসংগে ডক্টর নীহার রঞ্জন রায়-এর মন্তôব্য হচ্ছে, ‘যে বংগ ছিল আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ঘৃণিত ও অবজ্ঞাত, যা ছিল পাল ও সেনদের আমলে কম গৌরবের ও কম আদরের - সেই বংগ নামেই শেষ পর্যন্তô তথাকথিত পাঠান আমলে বাংলার সমস্তô জনপদ ঐক্যবদ্ধ হল।’ (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব)

ভারতে আর্যদের আগমন শুরু হয় খৃষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে। সে সময় থেকেই এখানে ভাষা ও জাতিগত দ্বন্দের সুচনা হয়। রাখালদাস বন্দোপধ্যায় বাঙ্গালার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ‘আর্যোপনিবেশের পূর্বে যে প্রাচীন জাতি ভূমধ্যসাগর হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্তô স্বীয় অধিকার বিস্তôার করিয়া ছিল তাহারাই বোধ হয় ঋগ্বেদের দস্যু এবং তাহারাই ঐতরেয় অরণ্যকে বিজেতৃগণ কর্তৃক পক্ষী নামে অভিহিত হইয়াছে। এই প্রাচীন দ্রাবিড় জাতিই বংগ মগধের আদিম অধিবাসী।’ বাংলার এই আদি জনগোষ্ঠী নিজেদের ভূখন্ড, সংস্কৃতি ও ভাষাকে আর্যদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু ‘বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে মন্তôব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘সমস্তô উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সর্বমস্তôক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইল।’ সদানীরার (করতোয়া) তীরে এসে আর্যদের বিজয় অভিযান দ্রাবিড়দের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হওয়ার করণেই অর্য ধর্মগ্রন্থ মনু সংহিতায় বিধান দেয়া হয়,

অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গেষু সৌরাষ্ট্রমগধেষু চ

তীর্থযাত্রাং বিনা গচ্ছন্‌ পুনঃসংস্কারমর্হতি।

অর্থাৎ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌরাষ্ট্র ও মগধ দেশে কেবলমাত্র তীর্থযাত্রা ছাড়া অন্য কারণে কেউ গেলে সে পতিত বলে গণ্য হবে এবং পূনরায় প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া জাতে ঠাঁই পাবেনা।

আর্য ব্রাহ্মণদের হাতেই ভারতবর্ষে লিখিত ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন হয়। কিন্তু সংস্কৃত কখনো সাধারণ মানুষের ভাষা ছিলনা। কালিদাসের নাটকে আমরা দেখি সেখানে উচ্চশ্রেণীর লোকদের মুখে সংস্কৃত ভাষা উচ্চারিত হলেও বিদূষক, জেলে, মাহিলা প্রভৃতি শ্রেণীর সংলাপে প্রাকৃত ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। এই আদিম প্রাকৃত ভাষা থেকেই বাংলাভাষার বর্তমান ক্রমবিকাশ সাধিত হয়েছে। বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে হয়েছে বলে অনেকের ভুল ধারণা আছে। এ রকম ধারণার পেছনে কোন ঐতিহাসিক কার্যকারণ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সর্বজন শ্রদ্ধেয় পন্ডিত ডক্টর মুহাম্মদ শহীল্লাহ ‘ভাষার উৎপত্তি’ প্রবন্ধে বলেন, ‘পৃথিবীতে ২৭৯৬টি ভাষা আছে। তবে এই সকল মূল ভাষা নয়। যেমন ধরুন বাংলা, আসামী, উড়িয়া, বিহারী, মারাঠী, হিন্দী, উর্দু, গুজরাটী, নেপালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, কাশ্মীরী, সিংহলী এগুলি একটি মূল ভাষা থেকে জন্মেছে। সেই মূল ভাষাকে আমরা আদিম প্রাকৃত ভাষা বা কথ্য প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা বলতে পারি।’ অন্যত্র তিনি সংস্কৃত ভাষার সাথে বাংলা ভাষার সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে বলেন, ‘বাংলার উৎপত্তি গৌড় অপভ্রংশ থেকে। সংস্কৃতের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অতি দূরের।’

দ্রাবিড়ীয় সভ্যতার সহনশীল আবহে তদানীন্তôন বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। সে সময় জনগণের মুখের ভাষা ছিল প্রাকৃত ভাষা। আর্যরা শক্তির বলে বাংলা অঞ্চল দখলে ব্যর্থ হবার পর বেদান্তô দর্শন প্রচারের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রী হিসেবে এ এলাকায় আগমন শুরু করে। আর্য ক্ষত্রিয়দের সামরিক শক্তির তুলনায় ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় প্রচারণা অধিক কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়। পরমত সহিষ্ণুতা ও সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতার মনোভাব বাংলা অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে ব্রাহ্মণরা সেখানে বিনা উপদ্রবে বেদান্তô দর্শন প্রচারের সুযোগ লাভ করেন। বাংলাদেশে এ ভাবেই বৈদিক দর্শন এবং সংস্কৃত ভাষার আগমন ঘটে যা পরবর্তীতে অর্য ক্ষত্রিয়দের আগমনের পথ প্রশস্তô করে। খৃষ্টপূর্ব চার শতকে মৌর্য এবং তারপর গুপ্ত রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর আগে বাংলায় আর্যধর্ম বা সংস্কৃত ভাষার কোন প্রভাব ছিলনা। রাজশক্তি অর্জনের পর বৈদিক সংস্কৃতি এ দেশে সহনশীলতার পরিবর্তে পরমতের প্রতি আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে। আর্য ব্রহ্মণদের জার্মান নাৎসীদের অনুরূপ দাবি করে যে তারা দেবতার আশ্রিত ও আশীর্বাদপুষ্ট। জনগণের ভাষায় তারা কথা বলতোনা। জনগণের ভাষাকে তারা বলতো ‘অপভাষা’ বা ‘অসুরের ভাষা’। তারা বলতো, ‘ন ম্লেছ ভাষা শিক্ষেত’ - ম্লেছদের ভাষা শিক্ষা করোনা।

গুপ্তযুগের আর্যীকরণ প্রক্রিয়া শশাংকের হাতে এসে রুদ্র রূপ ধারণ করে। চরম মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ এ রাজা নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং অন্য ধর্মের অনুসারীদের নিষ্ঠুর ভাবে নির্মূল করেন। ৬৩০ সালে ভারতে আগত চীনা পরিব্রাজক হিউয়ান সাঙ শশাংক কর্তৃক প্রজা নির্যাতনের কিছুটা বিবরণ দিয়েছেন। রামাই পন্ডিতের শূন্য পূরাণেও এর বিবরণ রয়েছে। রাজা শশাংক নির্দেশ দেন,

আ-সেতোর আতুষারাদ্রের বৌদ্ধানাং বৃদ্ধবালকান।

যো ন হন্থি স হন্তôব্যো ভৃত্যান্‌ ইত্যশিষন্‌ নৃপঃ

অর্থাৎ সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্তô যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্তô যে হত্যা না করিবে সে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হইবে - রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ। (শ্রী চারু বন্দোপধ্যায়ঃরামাই পন্ডিতের শূণ্য পূরাণ, পৃ ১২৪) উগ্র মৌলবাদী শশাংকের বৈদিক সহিংসতার কাছে বৌদ্ধ সাধকদের নৃশংস মৃত্যু প্রকারান্তôরে এ দেশের মানুষের মুখের ভাষা প্রচলনের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। কারণ সমসাময়িক কালে বৌদ্ধ পন্ডিত ও সাধকরাই ছিলেন মূলতঃ দেশীয় ভাষার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

৭৫০ খৃষ্টাব্দে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গোপাল নামক এক ব্যক্তি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। বাংলায় পাল বংশের শাসন এ ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। পাল বংশের চারশ’ বছর বাংলা ভাষা ও লিপির ক্রমবিকাশ এবং উৎকর্ষ সাধনের যুগ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত। পাল বংশের পতনের পর সেন রাজবংশ ক্ষমতাসীন হয়। প্রায় দেড়শ’ বছরের সেন-বর্মন-এর শাসনামল ছিল বাংলাভাষার জন্যে ঘোরতর দুর্যোগকাল। এ সময় বাংলাভাষার অবস্থা কোন্‌ পর্যায়ে ছিল তা ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন অত্যন্তô সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ‘ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে পন্ডিতমন্ডলী ‘দূর দূর’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন, বঙ্গভাষা তেমনি সুধীজনের অপাংক্তেয় ছিল, তেমনি ঘৃণার, অনাদরের ও উপেক্ষার পাত্র ছিল।’ (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫) সেন-বর্মন শাসকরা সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার নামে বিকাশমান বাংলাভাষাকে শাস রুদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছেন। তারা নির্দেশ জারী করেন,

অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ

ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।

অর্থাৎ অষ্টাদশ পূরাণ ও রামায়ন-মহাভারত যে ব্যক্তি মানুষের মুখের ভাষায় শ্রবণ করবে তার ঠাই হবে ভয়াবহ রৌরব নরকে।

সেন রাজাদের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী ব্রাহ্মণদের সহিংসতার মুখে বাংলা ভাষার চরম দুর্গতির বিবরণ দিয়েছেন অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘পাল বংশের পর এতোদ্দেশে সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চিন্তôা অতিশয় ব্যাপক হইয়া উঠে ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহ বিশুষ্ক হইয়া পড়ে। সেন বংশের রাজারা সবাই ব্রাহ্মণ্যধর্মী, তাদের রাজত্বকালে বহু ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসিয়া বসতি স্থাপন করে ও অধিকাংশ প্রজাবৃন্দ তাহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। এ ভাবে রাজা ও রাষ্ট্র উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ হইলে বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি পার্বত্য দেশে গিয়া আশ্রয গ্রহণ করে। বাঙ্গালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যোজাত বাঙ্গালা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোও তাহাদের সঙ্গে বাঙ্গালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাঙ্গালা গ্রন্থ নিতান্তô দুষ্প্রাপ্য।’ (প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস, অধ্যাপক দেবেন্দ্র কুমার ঘোষ, পৃ ৯-১০) সেন রাজাদের অত্যাচারে দেশান্তôরিত বাঙালী কবিদের লেখা চারখানা পুথি ১৯০৭ সালে ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। চর্যাপদ নামক এ চারখানা পুথিকে বাংলাভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বিস্ময়ের বিষয় যে সেন রাজাদের বাংলা বিরোধী সর্বাত্মক অভিযানের মধ্যেও কিছু লোক বাংলাভাষার চর্চা অব্যাহত রেখেছে। তারা কারা - এর একটু ইঙ্গিত দিয়েছেন ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়। তিনি বলেন, ‘ইসলামের প্রভাবে প্রভাবান্বিত কিছু লোক বোধহয় বাংলার কোথাও কোথাও সেই প্রাকৃতধর্মী বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধারা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন; ‘সেক শুভোদয়া’ গ্রন্থের ভাষায় তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।’ (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃষ্ঠা ১৭৬) এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে তখনো মুসলিম বিজয় সম্পন্ন না হলেও মুসলমানদের আগমন শুরু হয়ে গেছে এবং তারা দেশীয় ভাষা বাংলার চর্চা করা শুরু করে দিয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষী, বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়কে বাংলার সাধারণ মানুষ জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে মজলুমের বিজয় হিসেবে দেখেছে। বর্ণবাদী সেন রাজাদের অত্যাচার থেকে মুক্তির আশায় বাংলার জনগণ মুসলিম শাসকদের স্বাগতঃ জানিয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে রামাই পন্ডিতের লেখা ‘শূন্য পুরাণ’, আধুনিক গবেষক ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন সহ অনেক লেখকের বর্ণনায় এ দিকটা আলোচিত হয়েছে। ডক্টর সেন বলেন, ‘বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্যবাদী নির্মূল অভিযানের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলার মুসলিম বিজয়কে দু’ বাহু বাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল।’ (বৃহৎবঙ্গ, পৃষ্ঠা ৩৩৩) বাংলাভাষা সম্পর্কে তার মন্তôব্য হচ্ছে, ‘বঙ্গভাষা মুসলমান সম্রাটদের কৃপায় দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করিয়া দ্বিজের ন্যায় সম্মান লাভ করিল।’

সুলতানী আমল সম্পর্কে শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় লিখেন, ‘আলোচ্য পর্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে এই পর্বে বাংলাদেশ একটানা দুশো বছর ধরে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। এই সুদীর্ঘ কাল ধরে বাংলাদেশের সম্পদ বাংলার ভিতরেই ছিল -বাইরে যায়নি। তা ছাড়া এই পর্বের অধিকাংশ সময় বাঙালীরাই বাংলাদেশ শাসন করেছেন বলা যায়। ··· ··· এই পর্বে বাংলা সাহিত্যের লক্ষণীয় বিকাশ ঘটে। কয়েকজন দিকপাল কবি এই পর্বে আবির্ভূত হয়ে বাংলা সাহিত্যকে সুগঠিত ও সমৃদ্ধিসম্পন্ন করেন। তাদের অনেকেই বাংলার রাজা ও রাজকর্মচারীদের কাছে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। কাজেই বাংলার ইতিহাসে আলোচ্য এই পর্বটি সবদিক দিয়েই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই পর্বে যে সব সুলতান বাংলাদেশের শাসন করেছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই অসাধারণ ছিলেন।’ (বাংলার ইতিহাসের দুশো বছরঃসুখময় মুখোপাধ্যায়)

বাংলায় মুসলিম শাসন সম্পর্কে আরেকটি কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। আমরা জানি ’৫২ সালে ভাষার লড়াইয়ে বিজয়ের পরও ’৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্তô অফিস আদালতে বাংলার প্রচলন হয়নি। কিন্তু এটা আমাদের অনেকের অজানা যে বৃটিশ-পূর্ব মুসলিম শাসনামলে কোন আন্দোলন ছাড়াই বাংলা অঞ্চলের সরকারী কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। একটা প্রচারণা রয়েছে যে বৃটিশ-পূর্ব সময়ে মুসলমান শিক্ষিত শ্রেণী চিরকাল বাংলাকে ঘৃণা করে এসেছে এবং তারা বাংলা ভাষার পরিবর্তে ফার্সী বা উর্দুকে নিজের ভাষা হিসেবে গণ্য করতো। বাংলা ভাষা সম্পর্কে মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর এ মনোভাব ছিল বলে যারা প্রচারণা করেন তারা সঠিক কথা বলছেন না। এর পেছনে কোন সত্যতা নেই এবং তা তথ্যভিত্তিক প্রমাণিত নয়। এটা ঠিক যে মুসলিম শাসকরা উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় কাজে ফার্সী এবং কোন কোন স্থানে আরবী ভাষা ব্যবহার করেছেন। এর পাশা পাশি তারা শুধু বাংলাভাষা চর্চায় উৎসাহ দিয়ে ক্ষান্তô হননি, এর সাথে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে অফিস-আদালতের বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর এস এম লুৎফর রহমান ১৭১০ সাল থেকে সরকারী ভাবে বাংলা ব্যবহারের প্রায় পঞ্চাশটি নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এ সকল নমুনা থেকে দেখা যায় সে সময় প্রশাসনিক কাজকর্ম, বিচারালয়ে আর্জি পেশ ও হুকুমনামা জারি ইত্যাদি কাজে বাংলাভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। নবাব শায়েস্তôা খানের সময় সরকারী সিলমোহরযুক্ত এ রকম একটি অনুমতি পত্র বাংলায় লেখা হয়েছে এবং সেখানে বাংলা সন-তারিখ ‘১ আষাঢ় ১০৭৪ সন’ ব্যবহৃত হয়েছে। সংগৃহীত আরেকটি নমুনা মূলতঃ আদালতের পরওয়ানা বা হুকুমনামা। সেখানে তারিখ দেয়া হয়েছে ৮ মাঘ, ১১১৩ সন। সময়টা মুর্শিদকুলি খানের রাজত্বের সময়। হুকুমনামায় শিকদারদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের জান-মাল হেফাজতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সকল দৃষ্টান্তô থেকে এ কথা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় যে বৃটিশ-পূর্ব মুসলিম শাসনে বাংলার রাষ্ট্রভাষা ছিল দুটি, ফার্সী এবং বাংলা। কোন রকম আন্দোলন ছাড়াই বাংলার মুসলিম শাসকরা রাজকার্যে বাংলাভাষা চালু করেন।

খ· ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তôাব গৃহীত হয় এবং মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন থেকে দানা বাঁধতে শুরু করে। এর অনেক পূর্ব থেকেই অর্থাৎ বিশের দশকেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। শুধু বাংলাদেশ ছাড়া তখন গোটা ভারতবর্ষের সকল মুসলমান উর্দুর পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায় হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে জনমত গঠন শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে সময় ভারতের একমাত্র এবং সদ্য নবেল বিজয়ী কবি। তিনি পর্যন্তô ১৯১৮ সালে হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে মোহনচান্দ করমচান্দ গান্ধীর কাছে লিখিত ভাবে দাবি উত্থাপন করেন। কংগ্রেস এবং হিন্দু সমাজের দাবির সাথে কন্ঠ মিলিয়ে গান্ধীজীর ঘোষণা ছিল, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে ‘হিন্দি-হিন্দুস্থানী।’ অপর দিকে একই বছর অর্থাৎ ১৯১৮ সালে বিশ্ব- ভারতীতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি আরো ঘোষণা দেন, ‘শুধু ভারত কেন সমস্তô এশিয়া মহাদেশেই বাংলার স্থান হবে সর্বোচ্চ। ভাবসম্পদ ও সাহিত্যগুণে বাংলাভাষা এশিয়ার ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে অদ্বিতীয়।’ আমাদের জানামতে এটাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সর্বপ্রথম দাবি।

ডক্টর শহীদুল্লাহ্‌র পর বাংলাভাষার স্বপক্ষে দাবি উত্থাপনের কৃতিত্ব পূর্ব-বাংলার জননন্দিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ১৯২১ সালে বৃটিশ সরকারের কাছে এ মর্মে দাবি জানান যে, ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা যা-ই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলাকে।’ পাকিস্তôান-পূর্ব এবং পাকিস্তôান-উত্তর ভাষা আন্দোলন যাদের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে এবং গতি পেয়েছে তাদের মধ্যে দৈনিক আজাদ সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁ অন্যতম। বৃটিশ ভারতে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উর্দু এবং হিন্দির মধ্যে সৃষ্ট বিতর্কে তিনি বাংলাভাষার দাবি নিয়ে বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৭ সালের ২৩ এপ্রিল দৈনিক আজাদে প্রকাশিত দীর্ঘ সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘সাহিত্যের মধ্যে বাংলা সমস্তô প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ট। বাংলা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশের উপযোগী শব্দের সংখ্যা বেশী। অতএব বাংলা সব দিক দিয়াই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হইবার দাবি করিতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর কংগ্রেস হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করিবার প্রস্তôাব করিয়াছে বটে, কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাভাষার চেয়ে হিন্দির যোগ্যতা কোন দিক দিয়াই বেশী নহে।’

ইংরেজদের ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে উর্দু এবং হিন্দির বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন বাংলা ভাষাভাষী অনেকে উর্দুর পক্ষে ওকালতি করেছেন। তাদের উর্দুপ্রীতিকে ব্যঙ্গ করে কবি ফররুখ আহমদ ১৯৪২ সালে মাওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদতে একটি কালজয়ী সনেট লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘দুইশ পচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন / বাংলাকে তালাক দিয়ে উর্দুকে করিয়াছি নিকা / বাপান্তô শ্রমের ফলে উড়িছে আশার চামচিকা / উর্দু নীল আভিজাত্যে (জানে তা নিকট বন্ধুগণ)!’ এর দু বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৪ সালে আশ্বিন সংখ্যা মাসিক সওগাতে প্রকাশিত ‘পাকিস্তôানঃরাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে কবি ফররুখ আহমদ বলেন, পাকিস্তôানের অন্তôতঃ পূর্ব পাকিস্তôানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদী সম্মত হলেও আমাদের কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলাভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীন মত প্রকাশ করেছেন যা নিতান্তôই লজ্জাজনক। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপান্তôরিত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাদের অভিমত। কী কুৎসিত পরাজয়ী মনেবৃত্তি এর পেছনে কাজ করছে এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি।’

দেশ বিভাগের পর বাংলাকে পাকিস্তôানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন এবং এর দাবিতে জনমত গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সংগঠন হিসেবে তমদ্দুন মজলিস এবং ব্যক্তি হিসেবে এর কর্নধার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তরুণ শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম। ভাষা সৈনিক ও প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা’র ভাষায়, ‘বাংলাকে পাকিস্তôানের রাষ্ট্রভাষা করা যায় কি না এ নিয়ে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রথম চিন্তôার সূত্রপাত করে তমদ্দুন মজলিস। এই তমদ্দুন মজলিস ছিল ইসলামিক আদর্শে প্রভাবিত আধারাজনৈতিক এবং আধা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথমভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও শিক্ষকের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। রশিদ বিল্ডিং-এর পাশে সুরুজ্জামান মেসের একটি পুরাতন দালানের উপরের তলায় তমদ্দুন মজলিসের অফিস স্থাপিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানই প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠায় এবং ভাষা আন্দোলনের পথ উন্মোচন করে। পরবর্তী পর্যায়ে ছাত্ররা একে সামগ্রিক রূপ প্রদান করে।’ ( সাক্ষাতকার - মোহাম্মদ তোয়াহা / ঢাকা ডাইজেস্ট, মার্চ ১৯৭৮) মোহাম্মদ তোয়াহা অন্যত্র বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সাথে সাথেই ভাষার প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়। ··· ··· ভাষা সম্পর্কে আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ তেমন চিন্তôা করতেন না। তমদ্দুন মজলিস নামে একটি আধা-রাজনৈতিক আধাসাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছিল। তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িত ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম।··· ··· ’ (স্মৃতিচারণ, একুশের সংকলন ১৯৮১, বাংলা একাডেমী) ঘটনা পরম্পরায় বাঙালীর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র দাবি শেষ পর্যন্তô ‘বাংলা ভাষার রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পরিণত হয়। যে সকল বুদ্ধিজীবী ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন তারা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তôান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী যদি পূর্ব পাকিস্তôানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ অব্যাহত রাখে তা হলে বাঙালীর পক্ষে পাকিস্তôানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ১৯৪৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিস প্রকাশিত ‘পাকিস্তôানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু না বাংলা’ শীর্ষক পুস্তিôকায় সাবধান বানী উচ্চারণ করে বলা হয়, ‘বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালী হিন্দু-মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষারূপে চালাবার চেষ্টা হয় তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধূমায়িত অসন্তেôাষ বেশী দিন চাপা থাকতে পারেনা। তা হলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হবার আশংকা আছে।’

গ· অত্যন্তô পরিতাপের বিষয় যে স্বাধীনতার পূর্বে বা পরে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার জন্যে সরকারী বা বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাপক কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এ সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভাষা আন্দোলনের কৃতিত্ব দলীয়ভাবে কুক্ষিগত করার প্রয়াস চালিয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীনতা উত্তরকালে কোন কোন রাজনৈতিক নেতার নিকট থেকে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে। অনেকটা রাজনৈতিক গলাবাজির কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ সকল তথ্য এবং তত্ত্বের মধ্যে কোন্‌টা সঠিক এবং কোন্‌টা ভূয়া তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমসাময়িক পত্র-পত্রিকার মধ্যে ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রতিষ্ঠিত এবং আবুল কালাম শামসুদ্দীন সম্পাদিত দৈনিক আজাদ এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নও বেলাল - এ তিনটি পত্রিকাই ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সব চেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। এ সকল পত্রিকার পুরানো সংখ্যা কারো কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদে এর অনেকগুলো কপি সংরক্ষিত আছে। যারা ভাষা আন্দোলনের সঠিক তথ্য জানতে আগ্রহী তারা গলাবাজি না করে সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরীতে কিছু ঘাটাঘাটি করলেই সঠিক তথ্যের সন্ধান পেয়ে যাবেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে এ যাবত অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বই মিথ্যাচার ও আত্মপ্রশংসায় পরিপূর্ণ এবং কিছু বই নিছক চর্বিত চর্বণ। ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে মরহুম মোস্‌তফা কামাল সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সেখানে ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট উল্লেখযোগ্য জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের সাক্ষাতকার সন্নিবেশিত হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষাতকার নেয়ার সময় মরহুম মোসতফা কামাল বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় উত্থাপন করে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বইখানা আরো উপভোগ্য ও সমৃদ্ধ হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সঠিক চিত্র পেতে চাইলে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রকাশিত এ বইখানা পড়ে দেখতে আমি অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের অনুরোধ করছি।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে এখানে দুটো প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। ’৪৮ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত কনভোকেশনে জিন্নাহ্‌ সাহেব যখন ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তôানের রাষ্ট্রভাষা তখন ছাত্রদের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদে ‘নো নো’ আওয়াজ উঠেছিল। আওয়ামী ঘরানার বক্তব্য হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রতিবাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। স্বাধীনতা উত্তর কালে এসে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে কথাটা অত্যন্তô দৃঢ়তার সাথে বার বার উচ্চারিত হতে দেখা যায়। অথচ এর পেছনে সত্যতার লেশমাত্র নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তদানীন্তôন আহ্বায়ক আব্দুল মতিন এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট নন। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কনভোকেশনে তার উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠেনা। শেখ মুজিব কার্জন হলে জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন এ সব মনগড়া কাহিনী মাত্র।’ (সাক্ষাতকার - আব্দুল মতিন, ভাষাআন্দোলনঃসাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন) ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত আরো অনেকে অনুরূপ কথা বলেছেন। কিন্তু যারা তা বলছেন তাদের আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক প্লাটফরম বা প্রচার মাধ্যম না থাকায় তা জনসমক্ষে আসছেনা। একই ভাবে বাম ঘরানার কিছু বুদ্ধিজীবীর ভাবসাব দেখে আমাদের মনে হতে পারে, তারা মনে হয় ভাষা আন্দোলনের আসল সৈনিক। অথচ সত্যিকথা হচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল সে সময় আন্দোলনের বিপক্ষে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারী তারিখে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তô উপেক্ষা করে ছাত্রসমাজ কর্তৃক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘটনাকে একটি মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি এর বিরোধিতা করেছে এবং তাদের যুব সংগঠন এর বিপক্ষে বক্তব্য রেখেছে।

১৯৭৩ সালে এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবং ভাষা সৈনিক আব্দুস সামাদ আজাদ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এমন একটি তথ্য প্রদান করেন যা ইতোপূর্বে কোথাও শোনা যায়নি। তিনি বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের জানালা দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাকে ২১ ফেব্রুয়ারীতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে বিশিষ্ট সাংবাদিক কে জি মোস্তôফাও আব্দুস সামাদ আজাদের কথার প্রতিধ্বনি করেন। আব্দুস সামাদ আজাদ অথবা অন্য কেউ স্বাধীনতার পূর্বে এ ধরণের কোন বক্তব্য রেখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। ৫২-এর ২১ ফেব্রয়ারী আমতলার ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশের সভাপতি ছিলেন গাজীউল হক। সভাপতি হিসেবে তিনি সেখানে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে চেতনাদীপ্ত ভাষণ দেন। এ ব্যাপারে শেখ মুজিবর রহমানের ভূমিকা কি ছিল এবং আব্দুস সামাদ আজাদের বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা কি করে সম্ভব! ২০ ফেব্রুয়ারী বিকেল ৩টায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। শেখ মুজিব এর পূর্বেই ফরিদপুর জেলে স্থানান্তôরিত হন। সামাদ সাহেব কি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জানালা দিয়ে শেখ মুজিবের মৌখিক নির্দেশ পেলেন! এটা আমার বোধগম্য হচ্ছেনা। এ সম্পূর্ণ অবাস্তôব কথা।’

উল্লেখ্য যে ২১ ফেব্রুয়ারীর অনেক আগে থেকেই তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কারাগারে আটক ছিলেন। ঢাকা জেলে থাকা অবস্থায় তিনি নিজ মুক্তির দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারী থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারী তাকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারী তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাস্থ্যগত কারণে কিছুদিন ফরিদপুর নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন। (ইত্তেফাক ৫ মার্চ, ১৯৫২)

সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইচ্ছে থাকলেও বাস্তôব অবস্থার কারণে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারীতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশ দেয়া সম্ভব নয়। জনাব গাজীউল হকের সাক্ষ্য এবং ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর থেকে সামাদ আজাদ প্রদত্ত বক্তব্য কতটুকু বাস্তôব সম্মত তা সহজেই বোঝা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরণের মিথ্যাচারের কারণ কি? বঙ্গবন্ধু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের কেউ ছিলেন না। তা ছাড়া মাওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমীন, আতাউর রহমান খান প্রমুখ তখনো জীবিত। তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান তখনো অনেক নীচে ছিল। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার নির্দেশ যদি বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে না আসে তা হলে কি তার মর্যাদা কমে যাবে? না কি মিথ্যা ইতিহাস রচনার মাধ্যমে তার সম্মান কিছু বাড়বে? বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম বেঁচে থাকবে, তোষামোদ বা চাটুকারিতা করে তাকে বাঁচাতে হবেনা। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কেউ লিখতে পারবেনা। কেউ লিখতে চাইলে সেটা একজন শিশুর চোখেও ধরা পড়ে যাবে। ১৪৪ ধারা ভাঙার নির্দেশ বা জিন্নাহর বক্তৃতার প্রতিবাদ ছাড়াই বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মাঝ পথে মিথ্যাচারের মাধ্যমে যারা তাকে খাটো করতে চাইবে প্রকারান্তôরে তারা নিজেরাই ইতিহাসে খাটো হয়ে থাকবে।

ঘ· ভাষা বহতা নদীর মতো নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। নিছক আইন করে কোন ভাষাকে গতিশীল বা সমৃদ্ধ করা যায় না। তবে রাষ্ট্রীয় আইন এবং আনুকুল্য সেখানে সহযোগীর ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বাংলাভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনগত কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। সেখানে বাংলা চর্চা এবং এর উৎকর্ষ সাধনের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মানসিকতা। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রাজনীতি করার জন্যে আমরা যে পরিমান মেধা ও শ্রম ব্যয় করেছি এর সিকিভাগ মেধা ও শ্রম ভাষার বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের পথে ব্যয় করলে বাংলাভাষা আজ আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতো।

জনগণ যখন কোন ভাষাকে নিজের ভাব প্রকাশ এবং দৈনন্দিন কর্ম সম্পাদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে তখন জনগণ বার বার ও বিভিন্ন ভাবে সে ভাষাকে ব্যবহার করে। এ ভাবেই একটি ভাষা পরিপুষ্ট ও গতিশীল হয়। প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকরা জনগণের ব্যবহৃত ভাষাকে অধিকতর অর্থবহ ও সৌন্দর্যমন্ডিত করেন। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল, আমাদের এ দু’জন কবি মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় রূপান্তôরের ব্যাপারে কালজয়ী অবদান রেখেছেন। বর্তমান কবি-সাহিত্যিকরাও ভাষাকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু তাদের অবদানকে আমরা রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনা। এ কারণেই কবি বা সাহিত্যিকের চেয়ে সিনেমার অভিনেত্রী, সরকারী আমলা বা রাজনীতিবিদ আমাদের কাছে অধিক মর্যাদা পান।

সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনের জন্যে যারা বাংলায় সংবাদ তৈরি করেন তারাও বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে অবদান রাখছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার যে খবর এবং সাহিত্য এক জিনিস নয়। একই ভাবে যারা খবরের কাগজে রাজনৈতিক কলাম লেখেন তারা পন্ডিত হতে পারেন, তবে তারা সাহিত্যচর্চা করছেন না। রাজনৈতিক কলাম এবং সাহিত্যচর্চার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য রয়েছে। অনেক সময় এ পার্থক্য আমাদের মনে না থাকার কারণে সংবাদকর্মীকে সাহিত্যিকের মর্যাদায় অভিষিক্ত করি এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত লেখাকে ভাষার মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ করে নেই।

বাংলা ভাষার জন্যে আমরা লড়াই করেছি, আমরা জীবন দিয়েছি। কিন্তু আমাদের বাস্তôব জীবনে বাংলা ভাষাকে কতটুকু মর্যাদা দিচ্ছি? আমরা জানি, বর্তমান বাংলাদেশে অসংখ্য ইংরেজী মাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কোন প্রকার সরকারী অনুদান ছাড়া নিছক ছাত্রবেতন দিয়ে এ সকল স্কুল চলছে। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে যারা শিক্ষকতা করেন তাদের বেতন-ভাতা সরকারী স্কুল থেকে অনেক বেশি। এ থেকেই বোঝা যায় বাংলাভাষার ব্যাপারে আমাদের মানসিকতা কোন্‌ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আন্তôর্জাতিক ভাষা হিসেবে আমাদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা অর্জন করছে, এটা অবশ্যই একটি উৎসাহের বিষয়। কিন্তু বাংলাভাষাকে বাদ দিয়ে ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা অর্জন মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা অনেকে মনে করি, বাংলা আমাদের নিজের ভাষা, তাই যেনতেন ভাবে লিখলেই বাংলা হয়ে যায়। এর বানান বা বাক্যগঠন সম্পর্কে আমাদের মোটেই ভাবনা নেই। অথচ ইংরেজী ভাষায় কোন কিছু লিখতে গিয়ে আমরা বানান এবং বাক্যগঠনকে খুবই গুরুত্ব দেই। ইংরেজী বানান ভুল হলে আমরা লজ্জা পাই, কিন্তু বাংলা বানান ভুল হলো না শুদ্ধ হলো সে বিষয়ে মোটেই পরোয়া করিনা। বাংলা শিক্ষা, চর্চা এবং অনুশীলনের প্রতি আমাদের বিরাগ বা অনীহা জাতি হিসেবে খুবই লজ্জার বিষয়।

তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই শেষ হলেও সর্বস্তôরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ এবং ভাষা হিসেবে এর উৎকর্ষ সাধনের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। সঠিক রাষ্ট্রীয় আনুকুল্য এবং কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ ব্যঞ্জক অংশ গ্রহণের মাধ্যমে সে লড়াই আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। ২০০৮ সালের ভাষা দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লন্ডন ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৮