Home | Articles | About | Contact
ফয়েজ আহমদ ফয়েজ-এর কবিতা

অনুবাদঃ ফরীদ আহমদ রেজা

(উর্দু ভাষায় কবিতা লিখে যারা আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ (১৯১১-১৯৮৪) অন্যতম। বাঙালি পাঠকদের কাছে তিনি ইকবাল, গালিব, হালি প্রমুখের মতো পরিচিত না হলেও সবাই তাঁকে এক নামে চিনে। ১৯১১ সালে বৃটিশ ভারতের শিয়ালকোটে তার জন্ম। দার্শনিক ও কবি ড. মুহাম্মদ ইকবালের তিনি সরাসরি ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং দৈনিক পাকিস্তান টাইমসের সম্পাদক হিসেবে বামধারার রাজনীতিকে পাকিস্তানে পরিচিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে লেনিন শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে। এ ছাড়া তিনি পাবলো নেরুদা পুরস্কার এবং নেলসন ম্যান্ডেলা পুরস্কারও লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে নোবেল পুরস্কারের জন্যে মনোনীত করা হয়।)


এক. বাংলাদেশ - দুই


এ ভাবেই আমার দুঃখগুলো দৃশ্যমান হয়েছে

বছর বছর ধরে এর ধূলো বুকের উপর পলেস্তরা ফেলে

এখন তা চোখের সামনে উপস্থিত।


আমার মর্মবেদনা খুবই স্পষ্ট

বন্ধু যখন বলে, রক্ত দিয়ে তোমার চোখগুলো মুছে নাও

তার কথাকে আমি উপেক্ষা করতে পারিনা।


অকস্মাৎ সব কিছু রক্তাক্ত হয়ে পড়েছে

প্রতিটি মুখ, প্রতিটি প্রতীক - সর্বত্র শুধু লাল আর লাল,

সোনালী রঙ পাল্টে সূর্যটাও এখন রক্তিম।


রক্তিম অগ্নুৎপাতে চন্দ্রের রূপালী রং বিলীন

আকাশে রক্তাক্ত ভোরের অঙ্গীকার

রাতের ক্রন্দন থেকে রক্ত ঝরছে।

গাছগুলো রক্তিম থামের মতো

ফুলের চোখ থেকে ফোটা ফোটা রক্তাক্ত অশ্রু

এবং প্রত্যেকটি দৃষ্টি যেন এক একটি তীর

যে দিকে তাকায় সেখানেই রক্তের ছবি।

এই রক্তনদী শহীদদের জন্যে ক্রন্দনরত

অনেক আকাঙ্খা ধারণ করে সতত প্রবহমান

তার বুক ভরা দুঃখ, ক্রোধ এবং ভালোবাসা।


নদীকে প্রবাহিত হতে দাও, এর গতিপথে বাঁধ দিওনা;

তাহলে মৃত্যুর চাঁদরআবৃত ঘৃণা-ই শুধু বেঁচে থাকবে।

বন্ধু সাধান, সেটা যেন কখনো না হয়।

এর বদলে আমার সকল অশ্রু ফিরিয়ে দাও

আসুক প্রবল বন্যা

ধুলিকনাভর্তি চোখদুটো বিশুদ্ধ হোক

চোখের রক্ত চিরদিনের জন্যে ধুয়েমুছে নিয়ে যাক।

 

দুই. বলো এখন কি করি

আমরা যখন দুঃখের নদীতে যাত্রা শুরু করি

আমাদের বাহু ছিল মজবুত, রক্ত ছিল গাঢ় লাল

ভাবছিলাম একটু হাতপা সঞ্চালন করলেই

দুঃখের সকল সীমানা পার হয়ে পৌঁছে যাব গন্তব্যে।

কিন্তু তা হয়নি

প্রতিটি নিরব তরঙ্গমাঝে আমরা অদৃশ্য স্রোত প্রত্যক্ষ করেছি

আমাদের মাঝিমাল্লারা ছিল অদক্ষ

দাঁড়বৈঠাগুলোও ভালো ভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।

বিষয়টাকে যে ভাবে চাও খুঁজেপেতে দেখো

যার ঘাড়ে যত খুশি দায় চাপাও

এর ফলে দুঃখের নদী একটুও বদলাবে না

নৌকাটাও একই রকম থাকবে।

তুমিই বলো আমরা এখন কি করি

কি ভাবে আমরা কূলের নাগাল পাই।


স্বদেশের ক্ষত আমাদের ত্বকে এখন ভাসমান

চিকিৎসকদের প্রতিটি কথায় আমরা আস্থা রেখেছি

অনেক ওষুধের কথা আমাদের মনে পড়ছে

শুধু ভাবছি মুহুর্তেই সকল অশান্তি দূর হয়ে যাবে

প্রতিটি ক্ষত শুকিয়ে যাবে।


কিন্তু তা হয়নিঃ

আমাদের অসুস্থতা অনেক, অনেক গভীর

সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভুল প্রমানিত হয়েছে

কোন দাওয়াই আামাদের কাজে লাগছে না।

এখন যা ইচ্ছা তাই করো, প্রতিটি সূত্র অন্বেষণ করো

যার ঘাড়ে যত ইচ্ছা দোষ চাপাও

আমাদের দেহ একই রকম থাকবে এবং

আমাদের সবগুলো ক্ষত হা করে আছে।


এখন বলে দাও আমাদের কি কর্তব্য

তুমি বলে দাও কি করে এ ক্ষত শুকাই?