|
মুসলিম বিশ্বে সেকুলারিজম
মুসলিম বিশ্বে সেকুলারিজম ফরীদ আহমদ রেজা ল্যাটিন saeculum থেকে সেকুলার শব্দটি এসেছে যা দীর্ঘ সময় বা একটি যুগ বোঝাবার অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি ভাষায় বিভিন্নভাবে এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থনীতিতে যখন বলা হয় 'ইট ইজ ডান অন এ সেকুলার বেসিস, এর অর্থ দাঁড়ায় এটা দীর্ঘ সময়ের জন্যে করা হয়েছে, কোনো সাময়িক ব্যাপার নয়। আধুনিক বিশ্বের অনেকের কাছে দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেকুলারিজম 'প্রফেট অব মডার্নিটি' হিসেবে চিহ্নিত। শুরুতে যে কোনো নন-রিলিজিয়াস বা ইহলৌকিক তৎপরতাকে সেকুলার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর মানে ধর্মহীনতা বা ধর্মকে অস্বীকার করা নয়। পরবর্তীতে সেকুলারিজমের প্রবক্তারা এর সীমানাকে অনেক সম্প্রসারিত করে ফেলেছেন। সেকুলারিজমের সর্বসম্মত কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায়, যে রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে অনুসরণ করে পরিচালিত হয়না সে রাষ্ট্রকেই সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচনা করা হয়। পাশ্চাত্য সেকুলারদের মতে, রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা, নৈতিকতা ইত্যাদিকে ধর্মের আওতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। যারা এ মতের বিরোধী তারা সেকুলারদের মতে পশ্চাদপদ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অনগ্রসর চিন্তার অধিকারী। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সেকুলারিজম মানে ধর্মনিরপেক্ষতা বা ইহলৌকিকতা। এর মাধ্যমে তারা সকল ধর্মের সমান অধিকার এবং পরমতসহিষ্ণুতা বোঝান। পাশ্চাত্যে চার্চের সাথে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ থেকে সেকুলারিজম একটি আন্দোলন হিসেবে জেগে উঠে। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল চার্চের কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করা। খ্রিস্টধর্মে মানুষের সামাজিক বা রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের বিধি-বিধান নেই। রাষ্ট্র ও জনগণের উপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্যে খ্রিস্টীয় চার্চ এক সময় মনগড়াভাবে নানা বিধি-নিষেধ জারি করে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে এবং সাধারণ মানুষের উপর নানা রকম জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ায় রাষ্ট্র ও চার্চ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে এর যৌক্তিকতা আজকের যুগেও অস্বীকার করার উপায় নেই। বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের জন্যে সেকুলারিজম একটি চমৎকার রাষ্ট্রীয় পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সকল ধর্ম সমান অধিকার ভোগ করতে পারে এবং রাষ্ট্র কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত বা হস্তôক্ষেপ করতে পারেনা। নন-রিলিজিয়াস বা ইহলৌকিকতা বোঝানোর জন্যে তৈরী নির্দোষ শব্দটি পরবর্তীতে ফ্রয়েড, মার্কস, নিট্শে প্রমুখ দার্শনিকের চিন্তাধারার প্রভাবে ধর্মবিরোধী রূপ ধারণ করে। ফ্রান্সের লেইসিজমকে ইংরেজি সেকুলারিজমের সমার্থক মনে করা হলেও তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দার্শনিক হলিওকের বন্ধু চার্লস ব্র্যাডলাফ সেকুলারিজমকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন এর বাস্তবরূপ হচ্ছে ফ্রান্সের লেইসিজম। এ মতবাদের সমর্থকদের মতে, ধর্মবিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে পদানত না করতে পারলে কোনো সমাজের পক্ষে বৈষয়িক উন্নতি অর্জন অসম্ভব ব্যাপার। এ জন্যেই ফ্রান্সের সেকুলার শক্তিকে ধর্মের বিরুদ্ধে উগ্র ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। অপর দিকে বৃটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রীয়ভাবে সেকুলার হলেও মার্কিন ডলারে ইন গড উই ট্রাস্ট কথাটি লেখা রয়েছে। বৃটেনের রাজাকে এংলিকান চার্চের অনুসারী হতে হয় এবং খ্রিস্টান বিশপদের জন্য হাউস অব লর্ডস-এ ২০টি আসন সংরক্ষিত আছে। তাই থিওরী হিসেবে সেকুলারিজমকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে বৃটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরণের প্র্যাকটিসকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বৃটিশ দার্শনিক George Jacob Holyoake ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত English Secularism গ্রন্থে তিনটি নীতিকে সেকুলারিজমের মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়
Its essential principles are three: (1) the improvement of this life by material means, (2) that science is the available Providence of man, (3) that it is good to do well. Whether there is other good or not, the good of the present life is good, and it is good to seek that good.
হলিওকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেকুলারিজমের অস্তিত্ব পাশ্চাত্যের কোথাও আছে কি না তাও বিবেচনার বিষয়। তা ছাড়া এভাবে জীবন-যাপনের মাধ্যমে মানব সমাজ একদল স্বার্থপর পশুর পর্যায়ে নেমে যেতে বাধ্য যা কোনো বিবেকবান সমাজ সমর্থন করতে পারেনা। বিলাতের লেবার বা টোরি পার্টি নীতিগতভাবে সেকুলার হলেও হলিওক বা ব্র্যাডলাফের সেকুলারিজম সেখানে আছে কি নেই তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তুরস্কের মোস্তôফা কামাল পাশা সর্বপ্রথম মুসলিম বিশ্বে সেকুলারিজমকে আমদানী করেন এবং সেটা প্রকৃতির দিক দিয়ে ফ্রান্সের উগ্র বা হিংস্র সেকুলারিজমের মতো। মোস্তফা কামালের সেকুলারিজমকে ইহলৌকিকতা না বলে ধর্মবিদ্বেষ, বিশেষ করে ইসলাম-বিদ্বেষ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তুরস্ক ছাড়া আর যে সব দেশে উগ্র সেকুলার চিন্তাধারা বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, তিউনিসিয়া, বাংলাদেশ, ভারত প্রভৃতি। উগ্র ও হিংস্র সেকুলারিজমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেখানে পরমতসহিষ্ণুতা নেই এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। স্বাধীনভাবে ধর্ম-চর্চার অনুকূল পরিবেশ সেখানে বজায় থাকেনা। তুরস্ক এবং ফ্রান্স মুসলিম মহিলাদের মাথায় ছোট্ট এক টুকরা কাপড় রাখার উপর পর্যন্ত বিধি-নিষেধ আরোপ করে চরম ধর্মবিদ্বেষের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিউনিসিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাবিব বরগুইবা সরকারী কর্মচারীদের রোজা ভাঙার নির্দেশ, কোরআন সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য, প্রকাশ্যে নিজের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের ব্যাপারে গর্ব প্রকাশ, জয়তুন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে সেকুলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার হাস্যকর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ঐতিহাসিক বিচারে মুসলিম বিশ্ব তিনটি সময় মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হয়েছে। এ তিনটি ক্রান্তিôকাল হচ্ছে ক্রুসেড, মোঙ্গল আক্রমণ এবং পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিকতা। ক্রুসেডের লক্ষ্য ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং তা মুসলিম বিশ্ব সহজেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। মোঙ্গল আক্রমণ মুসলমান সভ্যতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে তছনছ করে দিলেও পরবর্তীতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ওসমানীয় সাম্রাজ্য, ইরানে সাফাভী রাজবংশ, মধ্যএশিয়ায় উজবেক রাজত্ব এবং ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য গঠনের মধ্যদিয়ে মুসলিম বিশ্ব নতুন করে জেগে উঠার প্রয়াস পেয়েছে। এ দুটো আক্রমণই ছিল সামরিক হুমকি এবং তা মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতির জন্য হুমকি হতে পারেনি। কিন্তু উপনিবেশিক সময়ে সবচেয়ে বড় আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে মুসলমানদের চিন্তার জগতে। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন এবং এর উপর গড়ে উঠা শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি-অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজ-চিন্তা মুসলিম বিশ্বের যারা নিছক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের চিন্তার জগতে এক বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মকে বিসর্জন দেয়ার দর্শন পাশ্চাত্যে যে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করেছে তা এখন মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশী দেখা যায়। খ্রিস্টধর্মের মধ্যে ঐতিহাসিক পরম্পরার অভাব, মানবিক সমস্যা সমস্যা সমাধানে অক্ষমতা এবং গতিশীলতা না থাকায় পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান সমাজে সেকুলারিজম প্রসার লাভ করেছে। দার্শনিক বিচারে মুসলিম বিশ্বে চিন্তার ক্ষেত্রে এ ধরণের কোনো সমস্যা ছিলনা। খ্রিস্টান ধর্ম শুধু নয়, ব্যাপক ও বাস্তব অর্থে ইসলাম ছাড়া কোনো ধর্মেই সামগ্রিক জীবন পরিচালনার বিধান নেই। সেকুলারিজমকে ইহলৌকিকতা এবং সকল ধর্মের সমান অধিকার প্রদানের মতবাদ হিসেবে বিবেচনা করলে ইসলাম সে অধিকার নিশ্চিত করেছে। অনেকে বলেন যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা বা মতামত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ইত্যাদি সেকুলার চিন্তার ফসল। পাশ্চাত্যের জন্যে এ কথা প্রযোজ্য হলেও মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে তা মোটেই প্রযোজ্য নয়। বিজ্ঞানমনস্কতা, সকল ধর্মের সমান অধিকার, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতির ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বে ইসলাম যে দৃষ্টান্ত রেখেছে তা অনন্য। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থার কারণে মুসলিম বিশ্বে সেকুলার চিন্তার প্রসার ঘটেছে। সমসাময়িক মুসলিম শাসকরা আধুনিক যুগে রাষ্ট্রকে বৈষয়িক উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়ার একটি আবশ্যিক মাধ্যম মনে করেই সেকুলার নীতি অনুসরণ করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা উগ্র সেকুলারিজমে পরিণত হয়েছে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্র জনসমর্থন ও পাশ্চাত্য চিন্তার সাথে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করেছে। সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক দল, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের সেকুলার রাষ্ট্রের আদর্শ তারা অনুসরণ করছে। অবশ্য ধর্মকে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের কেন্দ্রে না আনলেও তারা রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করেনি। রাষ্ট্রপ্রধান মুসলমান হওয়ার বিধান, মসজিদ বা ওয়াক্ফ সম্পত্তি রক্ষার ব্যবস্থা, ইসলামের পারিবারিক বিধান কার্যকর রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে তারা জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তারা ইসলামের সেবক। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসীন ব্যক্তিবর্গ বিশ্বাসের দিক থেকে মুসলমান হলেও আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে তারা সন্দেহমুক্ত নন। অপর দিকে সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, সেকুলার শিক্ষার বৈশিষ্ট্য এই যে, সে শিক্ষা ধর্মের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কথা না বললেও শিক্ষার্থীদের মন-মগজকে এমনভাবে তৈরি করে যে তারা জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামকে বৈষয়িক অগ্রগতির পথে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৭৮ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লব শুধু মুসলিম বিশ্বের চিন্তা-জগতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, এ বিপ্লব পাশ্চাত্য সেকুলার চিন্তাবিদদের মনেও যুগপৎ প্রশ্ন ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পর মুসলিম বিশ্বে এ রকম যুগান্তকারী ঘটনা আর ঘটেনি। মুসলিম শাসকদের ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মবিরোধী আচরণ স্বত্ত্বেও দেশে দেশে ইসলামকে জীবন্ত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এমনিতেই চলছিল। ইরান বিপ্লব এর মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। আলজেরিয়া, তুরস্ক, ফিলিস্তিন এবং মিশরের নির্বাচনে ইসলামী আদর্শের দাবিদারদের সাফল্য এর জ্বলন্ত উদাহরণ। লেবানন, তিউনিসিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, তুরস্ক, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে তরুণদের মধ্যে ইসলামী জাগরণ সেকুলার দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত পাশ্চাত্য সভ্যতার সমর্থকদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে। মুসলিম তরুণদের এ জাগরণ ঠেকানোর জন্যেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের স্বঘোষিত দাবিদারগণ কোথাও প্রিএমটিভ আক্রমণ করছে এবং কোথাও সামরিক শাসন বা স্বৈরতন্ত্রকে সহায়তা দিচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য স্থানের সাথে অনেক দিক দিয়ে বাংলাদেশের মিল থাকলেও এর পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিয়ে এবং অসংখ্য প্রাণ ও মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী জুলুম ও স্বৈরশাসনের মাধ্যমে নিজেরাই রাষ্ট্রটি ভেঙে ফেলার পথ প্রশস্ত করে। বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠী চিন্তার দিক থেকে কখনো সেকুলার ছিলোনা এবং এখনো নয়। তবু তারা একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের পতন কামনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিশ্বাসের দিক দিয়ে মুসলমান ছিল এবং বাংলাদেশের জন্যে তারা যুদ্ধ করতে গিয়ে ইসলামকে বিসর্জন দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী বিজয় লাভের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমেই আল্লাহ্র উপর গভীর বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সাথে বাঙালি মুসলমানদের বিরোধে ধর্মকে ব্যবহার করা হলেও এটা ছিল নিছক রাজনৈতিক বিরোধ এবং সত্য এটাই যে, সেই স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীও ছিল চিন্তা-চেতনায় সেকুলার। শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত কৌশলে ধর্মকে সেখানে টেনে এনেছে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে সমসাময়িক ইসলামী নেতৃত্বকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। তাই বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে সেখানকার ইসলামী নেতৃত্ব কোনো ভূমিকা রাখেনি, বরং জালিম ও লম্পট পাকিস্তানী সৈন্যদের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে পৃথিবীর কোথাও এ রকম দৃষ্টান্ত আছে বলে আমার জানা নেই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর মুক্তিযুদ্ধের সেকুলার ও কমিউনিস্ট নেতৃত্ব এ পটভূমিকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক তরফাভাবে প্রচারণা চালিয়ে জনগণ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার চেষ্টা করেছে। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ৭০-এর নির্বাচনী ইশতেহারে সেকুলারিজম বা সমাজতন্ত্রের কথা ছিলনা, শুধু ছয় দফার কথা ছিল। সেকুলারিজম এবং সমাজতন্ত্র পরে সংযোগ করা হয়েছে এবং এর প্রেক্ষিতও ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ৭০-এর নির্বাচনী ওয়াদা ছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। নীতিগতভাবে তিনি সেকুলারিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তা ফ্রান্স বা তিউনিসিয়ার মতো উগ্র সেকুলারিজম ছিল না। তার দৃষ্টিতে সেকুলারিজম মানে ছিল সকল ধর্মের সমান অধিকার। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সঙ্গত কারণেই ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যারা দেখতেন তাদের অনেককে পাক-বাহিনীর সাথে সহযোগিতার অপরাধে কারাগারে অথবা আত্মগোপনে যেতে হয়। জিয়াউর রহমান কর্তৃক বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তারা সর্বপ্রথম দলীয়ভাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পান। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বও যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক গতিশীল এবং প্রভাবশালী, গত কয়েকটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটা সুস্পষ্ট যে পাকিস্তানে বা পাকিস্তান যুগে কোনো ইসলামী রাজনৈতিক দলের এ রকম সাফল্য দেখা যায়নি। বাংলাদেশে ইসলামী শক্তির এ সাফল্যের মানে এ নয় যে সেখানকার সেকুলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। আসলে প্রচলিত সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেখানে সেকুলার শক্তির আসল উৎস। লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিকদের একটা বড় অংশ সেকুলার ঘরানার প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন। অসংখ্য সেকুলার এনজিও বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে কাজ করছে এবং একসময়ের এনজিও বিরোধী বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এ সকল এনজিও-কে বুদ্ধি ও জনশক্তি দিয়ে সহযোগিতা দিচ্ছেন। বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গান, নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম ইত্যাদির মাধ্যমে সেখানে সেকুলার শক্তির পক্ষে বলিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ঐতিহাসিক কারণে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত উলামাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অবস্থান ইসলামী আন্দোলনের বিপক্ষে। সেকুলার সরকারের সাথে সহযোগিতা বিশেষ করে একটি দলের প্রধান দু নেতৃত্বের মন্ত্রীত্ব গ্রহণের ফলাফল ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে গিয়েছে না বিপক্ষে গিয়েছে সে প্রশ্নও উপেক্ষার বিষয় নয়। এমনি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যারা আদর্শ ইসলামী সমাজের বাস্তব নমুনা দেখতে চান তাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষের পেটের সমস্যার সমাধান করা এবং সাধারণ মানুষের নৈতিক মানোন্নয়ন করা। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ ইসলামী আদল বা ইনসাফের মৌলিক দাবি। আল্লাহ্র আইনের কথা যারা বলেন তারা এ দিকটির প্রতি গুরুত্ব দেন বলে অন্ততঃ আপামর জনতার কাছে তা পরিষ্কার নয়। মানুষের নৈতিক মানোন্নয়ন যে কোনো কল্যাণ রাষ্ট্রের আবশ্যিক পূর্বশর্ত। মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নৈতিক মান ছিল দৃষ্টান্তমূলক। এ দুটো কাজের কথা বলা সহজ কিন্তু করা খুবই কঠিন ব্যাপার। তবে কোনো সুসংগঠিত দল অগ্রাধিকার দিয়ে এ কাজে আত্মনিয়োগ করলে আজকের যুগেও এর সফলতা পাওয়া যাবে। তুরস্কে ইসলামপন্থীদের সাম্প্রতিক সাফল্য এর বড় প্রমাণ। বাংলাদেশে যারা ইসলামী রাজনীতি করেন তারা এটা বুঝেন না যে নির্বাচেনর সময় মানুষ ইমাম নির্বাচন করার জন্য ভোট দেয় না, ভোট দেয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে। যারা তাদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা রাখেন বলে তারা মনে করে তাদেরই জনগণ ভোট দেয়। ঢাকা শহরের মানুষ পানি, জানজট, মশা ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে প্রতি নিয়ত বিব্রত।নিছক এগুলো সমাধানের কর্মসূচী হাতে নেয়ার মাধ্যমে একটি দল ঢাকা শহর দখল করে নিতে পারে। কিন্তু ইসলামী বা সেকুলার কোন দলের মাথায় কি এ চিন্তা আছে? সেকুলার আদর্শকে তাত্ত্বিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে কোনো দার্শনিক কাজ বাংলাদেশে তেমন হচ্ছে বলে আমার জানা নেই। মুসলিম বিশ্বে রিফা আল তাহতাওয়ী (১৮০১-১৮৭৩) খায়েরুদ্দীন আল তিউনিসী (১৮০১-১৮৯৯), জামাল উদ্দীন আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭), আব্দেল রহমান আল কাওয়াকিবী (১৮৬৪-১৯০২), মুহাম্মদ আব্দুহু (১৮৪৯-১৯০৫), রাশিদ রিদা (১৮৬৫-১৯৩৫), কাসিম আমিন (১৮৬৫-১৯০৮), আহমাদ লুৎফী আল সায়ীদ (১৮৭২-১৯৬৩) সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী (১৯০৩-১৯৭৯), সাইয়েদ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬) প্রমুখ এক সময় বিভিন্ন পাশ্চাত্য আদর্শের সাথে ইসলামী আদর্শের দ্বন্দ্ব এবং এ ব্যাপারে মুসলমানদের দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা করেছেন। তবে তারা এক শ্রেনীর মাথামোটা লোকদের মতো 'গণতন্ত্র কুফরী মতবাদ',
'ভোট দেয়া হারাম' বা 'সেকুলারিজম কুফ্র' বলে চিৎকার করেননি। তাদের বিশ্লেষণ ছিল একাডেমিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের উপস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের সামনে এক সাথে নতুন অভিজ্ঞতা ও ভিন্নধর্মী চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হয়েছে। এর আলোকে বিশ্ব পরিস্থিতি এবং পাশ্চাত্য দর্শন-মতাদর্শ নিয়ে নতুন করে গবেষণা হওয়া দরকার। বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ এর চমৎকার ক্ষেত্র হতে পারে। মাওলানা আব্দুর রহীমের পর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোনো ইসলামী রিসার্চ স্কলার সৃষ্টি হয়নি। অনুগত ও মুখলিস কর্মী তৈরির চেয়ে এক ঝাঁক মৌলিক গবেষক ও গতিশীল তরুণ নেতৃত্ব তৈরির প্রতি দৃষ্টি দেয়া বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের জন্যে সময়ের বড় প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। উল্লেখ্য যে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ যেমন সঠিক বা শোভন নয়, তেমনি পাশ্চাত্যের সব কিছু খারাপ ভাবাও ঠিক নয়। তাছাড়া আদর্শ বা মতবাদ পদার্থের মতো কোনো জিনিষ নয় যে চিনি বা লবণের মতো সব সময় তা থেকে একই ধরণের ফলাফল পাওয়া যাবে। গান, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য প্রভৃতি অঙ্গনকে ইসলামী আন্দোলন সব সময় উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখে থাকে। অথচ জনমানস গঠনে এগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইসলামী ঘরানার কোনো কোনো গোষ্ঠী যে সকল গান পরিবেশন করে এর বেশিরভাগকেই বোদ্ধা সমঝদাররা নকলনবিশী বলে অভিহিত করেন এবং তা করার যথার্থতা রয়েছে। সেবামূলক কার্যক্রম বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় প্রয়োজন। সেকুলার এনজিও সেবাও দিচ্ছে, জনমানস গঠনও করছে। অথচ ইসলামী আন্দোলন শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্য নীতিগতভাবে খোদাদ্রোহী নয়। এর অধিকাংশই ইসলামী অথবা ইহলৌকিক। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন এগুলোকে হারাম বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। ফকির বিদ্রোহ, পয়লা বৈশাখ এবং হাসন রাজা বা লালনের গানের কথাই ধরা যাক। এগুলোর সাথে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সংযোগ। কিন্তু ইসলামপন্থীদের কাছে এ গুলোর কোন গুরুত্ব নেই। আমরা জানি মহানবী (সঃ) মক্কার ঐতিহ্য অনুসরন করে সাফা পর্বতে উঠে চিৎকার দিয়ে মানুষকে ডেকেছেন, মেলাকে দাওয়াতী কাজে ব্যবহার করেছেন, মদীনার বিবাহ অনুষ্ঠানে গানের প্রচলনকে বৈধতা দিয়েছেন, এবং আরবে আগে থেকে প্রচলিত সাফা-মারওয়া প্রদক্ষিণের রীতিকে কুরআন সওয়াবের কাজ বলে অভিহিত করেছে। আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত পরিবেশে ইসলামী জীবনযাপন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ সকল বিষয় নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। নিছক অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে টোপঘেরা মন নিয়ে চলে ইসলামকে বিজয়ী করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। জনগণকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। বৃটিশ-ভারতে মুসলিম লীগ বহু ভালো কাজ করলেও ইসলামকে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনের পরিবেশ তৈরিতে তাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনকে মুসলিম লীগের সে দায় স্বেচ্ছায় এবং অনিচ্ছায় আজো বহন করতে হচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ইসলামের উদারতা এবং অসাম্প্রাদায়িক দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখেন না। কুরআন খ্রিস্টানদের খানকা, গীর্জা এবং ইহুদিদের উপাসনালয় রক্ষাকে আল্লাহ্র ব্যবস্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, এ সকল স্থানে বেশি বেশি করে আলল্লাহ্র নাম নেয়া হয়। মহানবী (সঃ) নাজারানের খ্রিস্টানদের মসজিদে নববীতে উপাসনা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো মসজিদে অমুসলমানদের প্রবেশাধিকার নেই। সেকুলারিজম মানে যদি ইহলৌকিকতা হয় তা হলে ইসলাম একমাত্র ইহলৌকিক ধর্ম। বৈরাগ্যবাদ ইসলামে নেই এবং বিজ্ঞানমনস্কতা ইসলামের সৌন্দর্য। জ্ঞানের যে কোনো বিষয় মুসলমানদের কাছে নিজেদের হারানো সম্পদের অনুরূপ। যেখানে তা পাওয়া যাবে সেখান থেকেই তা গ্রহণ করার নির্দেশ ইসলাম তার অনুসারীদের দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের আচার-আচরণ এবং বক্তব্য থেকে এর প্রমাণ পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের সেকুলার শক্তির একটা বড় শ্লোগান হচ্ছে ইসলাম একটি সাম্প্রদায়িক ধর্ম এবং তারা সকল ধর্মের সমান অধিকার চায় বলেই সেকুলারিজমের পক্ষে কাজ করছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো খ্রিস্টান এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের অত্যাচার-নির্যাতন করার কলঙ্কজনক ইতিহাস রয়েছে। অথচ প্রচারণার জোরে তারা, বিশেষ করে খ্রিস্টানরা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক জাতি। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনকে এ দৃষ্টান্ত সামনে রাখা দরকার। সেকুলার অর্থ যদি অসাম্প্রদায়িকতা এবং সকল ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করা বোঝায় তাহলে পৃথিবীতে ইসলাম একমাত্র ধর্ম যাকে সেকুলার বলে অভিহিত করা যায়। এ কথা শুধু নিজে জানলে বা শ্লোগান হিসেবে বললে হবেনা, কার্যক্রমের মাধ্যমে এর বাস্তব প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামে নারীর অধিকার একটি গুরত্বপূর্ণ ইস্যু। মদীনায় মহিলাদের কার্যক্রম জানা থাকা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনে নারীদের তেমন গুরুত্ব নেই। ইরান বিপ্লবে মহিলাদের ভূমিকার কথা আমাদের জানা আছে। বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এ ব্যাপারে অনেক এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের ইসলামী নেতৃত্ব সে বিষয়টিকে কতোটুকু অগ্রাধিকার দিচ্ছে? বেগম রোকেয়ার আন্দোলন ছিল অবরোধের বিরুদ্ধে, পর্দার বিরুদ্ধে নয়। সেই রোকেয়াকে নিয়ে সেকুলাররা সিরিজ প্রোগ্রাম করে, কিন্তু ইসলামের দাবীদাররা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। মহানবীর উপস্থিতিতে মহিলারা মসজিদে নববীতে গিয়েছেন, মাঝখানে কোনো পর্দা ছাড়াই তারা সেখানে নামাজ পড়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদে মহিলাদের প্রবেশাধিকারই নেই। এমনি অবস্থায় সেকুলাররা যদি বলে ইসলাম মানে মহিলাদের বন্দী করে রাখা তা হলে সে জন্যে আমরা কাকে দায়ী করবো? মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে বাংলাদেশের অধুনিক প্রজন্মের সাথে ইসলামী আন্দোলনের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এরও একটা সমাধান হওয়া দরকার। শুধু বিজয় স্মৃতিস্তম্ভে ফুলদান করে সে দূরত্ব দূর করা যাবেনা। মরহুম খুররম মুরাদ তরজমানুল কুরআনে (জানুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১৫-১৬) প্রকাশিত তার জীবনের সর্বশেষ লেখায় এ প্রসঙ্গ খুব সুন্দরভাবে অবতারণা করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, জনগণের সাথে এবং জনগণের জন্য যারা কাজ করেন তাদের উচিত নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল কাজ গোপন না করে অথবা এর ভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রকাশ্যে জনগণের সামনে ভুলের স্বীকৃতি দেয়া। এর ফলে জনগণের সামনে তাদের সম্মান হ্রাস না পেয়ে আরো বৃদ্ধি পাবে। আমার মতে, পাক-বাহিনীর সাথে সহযোগিতার বিষয়টি ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন ফোরামে পর্যালোচনা হওয়া সময়ের দাবি এবং সে পর্যালোচনা জনসমক্ষে আসা দরকার। মহানবীর (সঃ) সমসাময়িক কোনো কোনো কাজের পর্যালোচনা কোরআনে খোলাখুলিভাবে এসেছে এবং তা কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। এতে মহানবী (সঃ) বা সাহাবাদের মর্যাদা কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি। এখানে বিচ্ছিন্নভাবে যে সকল কথার অবতারণা করা হয়েছে সবগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এগুলোর সাথে সবাই একমত হবেন সে আশা আমি করিনা। বর্তমান মুসলিম বিশ্বে সেকুলারিজম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এবং এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা ও ব্যাপক বিতর্ক হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। লন্ডন, ১৮ জুলাই ২০০৯
|