Home | Articles | About | Contact
বিলাতের কবিতাঃ পাঁচ রাজকুমারের গল্প

 - ফরীদ আহমদ রেজা

আমি তাদের রাজকুমারই বলতে চাই, কারণ ওরা আমার চোখে বিলেতের বাংলা কবিতার রাজকুমার। বিষয়ী দর্পণে তারা কতটুকু রাজপুত্র সেটা আমি জানিনা এবং তা জানার প্রয়োজন আছে বলেও আমি মনে করিনা। তারা রবীন্দ্রনাথের মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেননি। পদ্মার বুকে ভাসমান বজরায় বসে ‘অলৌকিক সৌন্দর্যের ভার’ তারা বহন করছেননা। জীবিকার তাগিদে তারা সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এ দেশে এসেছেন। তাদের চারপাশে যারা বসবাস করছেন তাদের অধিকাংশের কাছে মন বা মননের তেমন কোন মূল্য নেই, নগদ নারায়ণই তাদের জীবনের লক্ষ্য। এমনি পরিবেশে মন ও মননের বেসাতি করে তারা তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করছেন। তাদের রাজকুমার ছাড়া আর কি নামে অভিহিত করবো? তাদের মানস সুন্দরী কবিতা নামক রাজকন্যা। তাদের জানা আছে, স্বপ্নের রাজকুমারীকে সাত শ’ সাপ পাহারা দিচ্ছে। দেও-দানো তাকে ঘিরে রেখেছে। এক পাশে সোনার কাঠি এবং ওপর পাশে রূপোর কাঠি নিয়ে রাজকুমারী গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। সে রাজকুমারীকে উদ্ধারের আশায় পঙ্খিরাজে চড়ে তারা মহাশূণ্যের পথে যাত্রা শুরু করেছেন।

এ দেশে যারা কবিতা সুন্দরীর সাধনা করছেন তাদের সংখ্যা কম নয়। প্রবীনদের নিয়ে অনেকে আলোচনা করেছেন, আগামীতে হয়তো আরো আলোচনা হবে। আজকের আলোচনা পাঁচজন তরুণ কবির কবিতা নিয়ে। এ পাঁচ তরুণ মুজিব ইরম, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, ফারুক আহমদ রনি, সুমন সুপান্থ এবং শাহ্‌ সোহেল। সময় সুযোগ হলে ভবিষ্যতে অন্যান্যদের নিয়ে আলোচনা করা যাবে। তবে মনে রাখতে হবে এটা কোন সামগ্রিক আলোচনা নয়। কারণ, এ পাঁচ তরুণ কবির সবগুলো কবিতা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হয়নি।


মুজিব ইরমঃ দুলদুল আরোহী

‘দেখা হলে পঙ্খিরাজ ঘোড়া চাবো। তার লেজে বেঁধে দেবো আগুনের ভাষা। কই সেই কুমারী সকাল, সোনার পালঙ্কে বসে চুল রাখে রূপোর আলনায়? টিকটিকি গেয়ে ওঠে অশুভ পয়ার। তাকে বলো, আর কতো ঝুলে থাকা। অভিমানে ভেঙে গ্যালো ভোর। কার কাছে ডেকে বলি ‘শু’ না ‘ভূ’? টুকরো হওয়া ইচ্ছে হতে ছিটকে আসে জরা। নিয়ে এসো পিতা দুলদুল ঘোড়া।’

মুজিব ইরম-এর ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান’ কবিতা গ্রন্থের উপকথা-১ কবিতাটি এ ভাবে শুরম্ন হয়েছে। মুজিব ইরম বাংলাদেশের সাড়া জাগানো তরম্নণ কবিদের একজন। ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান’র জন্যে তিনি বাংলা একাডেমীর তরম্নণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার পেয়েছেন। সম্প্রতি তিনি স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে বিলাতে এসেছেন। এ দেশে এসে তার কলম থমকে দাঁড়ায়নি, প্রচুর লিখছেন। তার লেখা প্রথম দিন পড়েই আমি চমকে ওঠেছি। সহজ সরল আটপৌরে গ্রামীন শব্দ তার হাতে পড়ে সতেজ ও উজ্জল হয়ে ওঠেছে। এ ভাষা আমাদের বাউল ও মরমী কবিদের ভাষা। মুজিব ইরম সে ভাষায় গণ-সঙ্গীত বা মরমী গান লিখেননি, লিখছেন কবিতা। তার অধিকাংশ কবিতাই টানা গদ্যে লেখা। সে গদ্যের কোন কোন স্তôবকের প্রতিটি পংক্তিই এক একটি উজ্জল কবিতা

‘আমার সকালগুলো এইরূপ রোদরাঙা মুখ হয়ে ছিলো। সে মুখে এখনো আমি চন্দন মাখাই।’ ( ইরমকথার পরের কথাঃ উৎসর্গ পত্র) ‘আমার বুবুরা যেনো স্নেহবতী মেঘ, প্রচন্ড গরমে যারা ঝরায় শীতল। তারা সব নৃত্যরত মায়াবী ময়ূর, রঙিন পালকে পরায় ঘুমের চন্দন।’ (ইরমকথার পরেরকথাঃ হুরুকাল নির্ণয় অথবা জন্মগীতির বর্ধিত কলেবর)

মুজিব ইরম মৃদুভাষী কবি। এ যেন সেই নদী যার যাত্রা শুরম্ন হয়েছে শৈলচুড়া থেকে প্রবল বেগে, কিন্তু সমুদ্র-মোহনায় পৌঁছার আগে ধীর ও শান্তô হয়ে পড়েছে। এর সাথে আশ্বিন-কার্তিক মাসের মনু নদীর তুলনাও করা যায়। কবি অত্যন্তô শান্তôভাবে কথা বললেও তা সাবলীল ও গভীর প্রত্যয়ে বলিষ্ঠ। ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে তিনি নিজের মত করে কথা বলেন। এ যেন সরোদের অন্তôরঙ্গ সংলাপ। এ ভাবে সংলাপের মাধ্যমে তিনি আমাদের টেনে নিয়ে যান বহুদূরে, অনুভবের বাইরে এক ভিন্ন জগতে এবং তা এক সময় সবার কথা হয়ে পাঠকের মনে অনুরনিত হয়।

‘আমি মণিপুরী কিষাণীর চাষের কৌশল দেখে হেঁটে গেছি পাড়ায় পাড়ায়। আমার কবিতা তাই ফর্সা উরম্নতে লাগা মণিপুরী রমণীর মায়াবতী পেঁক। থকথকে লুদ। ·····মায়ের হাতে যে নারিকেলের পাতা ছিড়ে তৈরি করা শলাকার ঝাড়ণ্ড, ভাদ্রের উঠান জুড়ে গোবরের লেপামোছা  ৈশুকাতে দেবেন ধান। সেই ঝাড়ণ্ডর আগায় লেগে থাকা গোবরের ফুল। তার স্পর্শে আমার কবিতার শব্দরাজি নতুন ধানের সাথে মায়ের নিকানো উঠানে কেবলি আজ গড়াড়ড়ি যায়।’ (ইরমকথার পরেরকথাঃ ইরম যখন ইরম কথা কয়)

মুজিব ইরম এর কবিতার ভুবন জুড়ে লোকজ চিত্রকল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঘাস, পাখি, মাছ, ধানখেত, ফড়িং প্রভৃতি তার কবিতায় এসেছে নিজস্ব ভঙিমায়। ‘ধানসিঁড়িটির তীরে’ ‘শঙ্খচিল শালিখের বেশে’ নয়, মুজিব ইরম তার শৈশবের নালিহুরী গ্রামে ফিরতে চান মানুষ হয়ে। পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্মলাভ করে তিনি পরিতৃপ্ত। কবিতার অবয়ব ও ভাষা নিয়ে মুজিব ইরম অনবরত পরীড়্গা-নিরীড়্গা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলা সাহিত্যের মরমী কবিকুল এবং আধুনিক কবি জীবনানন্দ ও আল মাহমুদ-এর ছায়া সেখানে সততই চোখে পড়ে। তাই বলে এ কথা বলার অবকাশ নেই যে মুজিব ইরম তাদের প্রতিচ্ছায়া। কবিতার শরীর, ইমেজ ও বাক ভঙিমার বিচারে তিনি তার নিজস্ব পথে চলছেন।

মুজিব ইরম-এর কবিতার ভাষা বহুস্বরিক এবং বাক-ভঙিমা অনেকার্থদ্যোতক। দৃষ্টান্তô হিসেবে তার বিলাতের জীবনে লেখা পদ্যকগুচ্ছক নিয়ে আলোচনা করা যায়। তিনি সেখানে বলেন

‘ডেফোডিলের মাঠকে ক্যানো রাইশস্য ভাবো? ও মন, ছুদুরভুদুর ছাড়ো। পেঠেভাতে খাটো বেগার পরের বাড়ি, নিজের বাড়ি থইয়া। কী ধন লইয়া ফিরবায় ঘরে মনে মনে ভাবো। পুংটামি সব রাখো। অবতরি রইলায় ইরম চেংরা বয়স ঘিরে। পুঞ্জিপাত্তা সব হারাইয়া ফিরবায়নিরে ঘরে? টিবেটাবে ভাবো। ও মন, ভাওতাবাজি ছাড়ো।’ প্রথমে মনে হতে পারে এখানে কবি বিলাতের জীবনকে পরদেশে বসবাস বলে মনে করছেন। কিন্তু একটু চিন্তôা করলেই বোঝা যায় যে এ পৃথিবীকে অথবা আরো ব্যাপক অর্থে বৈষয়িক জীবনকেই তিনি পরবাস বলে চিত্রিত করছেন। সবশেষে তিনি যখন উচ্চারণ করেন,‘এ ইরমের ইচ্ছে ছিলো ঘরছাড়া এক সন্তô বাউল হবার’ তখন সাথে আমাদের মনে হয় আমরা আধুনিক যুগের এক মারফতি গান শুনছি। আমাদের মনে পড়ে যায় সে-ই গান যেখানে এক অখ্যাত বাউল বলেন, ‘ আমি ফকির হইয়া যাব গো নামের মালা লইয়া গলে।’


দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুঃ লালন পাখির অন্বেষায়

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু বিলাতের বাংলা কাব্য জগতের প্রতিশ্রম্নতিশীল কবি। জন্মভূমি বাংলাদেশ তার অনুভবের পরতে পরতে মিশে আছে। কিন্তু তার কবিতার কেন্দ্রবিন্দু বা আলোচ্য বিষয় নিছক বাংলাদেশ নয়, গেস্নাবাল ভিলেজের বাসিন্দা হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রসঙ্গ তার কবিতায় এসেছে। দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিতা পড়লেই মনে হয় তিনি একজন পরিশ্রমী কবি। তার অনুভবের সীমানা বহুমাত্রিক। আধুনিক কবিতার ইতিহাস চেতনা এবং যুগযন্ত্রণার উপস্থিতি তার কবিতায় চোখে পড়ার মত।

‘উজাড় আমাদের বাগান বাড়ি/ ঘাসফুল; অদ্যকায় মিলিয়েছে/ গৃহস্থ সংসার, সুনসান সানের ঘাট। / আমাদের বাঁধনে বাঁধা আছে/ বোধির ব্যবধান মানুষে পশুতে/ ব্যবধান মানুষে মানুষে। / ফের আমরা গুহাবদ্ধ হবো, তাই/ ফুলের বাগানে ঝগড়া লেগেছে। (পশ্চাদপসরণঃ ইস্পাতের গোলাপ)

মানব সমাজে বিরাজমান বিবাদ ও বিভেদ দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুকে ব্যথিত করে এবং তিনি এমন এক সমাজের কল্পণা করেন যেখানে দেশে দেশে কোন সীমানা থাকবেনা

‘সোনালী নুড়ির দেশে পাখিদের ঘর। পাখিদের বুকে/ কেন যে বসাও বারবার সীমান্তô পিলার!/ অনন্তô নড়্গত্র ছুঁয়ে যায় মানুষের কবর/ তুমি আজন্ম কেন কবরের মতো উদার নও!/ পাখিদের ঠোঁটের উপরে উড়ে চলে মেঘ; একপ্রস্থ মেঘ/ আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে চলে গেল/ তুমি অত কেন বাড়ির সীমানা নিয়ে ভাবো!’ (পাখিরা বৈকুক্তে যায়ঃ ইস্পাতের গোলাপ)

মঞ্জুর কবিতায় আমরা পাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কাব্যিক রূপায়ন এবং তার আন্তôর্লোকে বিরাজমান আলো-আঁধারের দ্বন্দ সংঘাতের হার্দিক বিশেস্নষণ। তাঁর ব্যক্তিগত অবলোকন রূপে-রসে-মননে মিশ্রিত হয়ে জন্ম দিয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ পংক্তিমালা। তার কবিতার পাঠকমাত্রই তা অনুভব করবেন এবং আন্দোলিত হবেন।

‘ছায়ায় দাঁড়াতে ভয় আমার/ ভয় আর ভ্রম/ মুখোশের মানুষ/ কতকাল ছায়া দেখিনি নিজের। (টুকরো কবিতাঃইস্পাতের গোলাপ)

জীবন বিরোধী আধুনিক সভ্যতার প্রতি তীব্র ঘৃণা অগ্রজ আধুনিক কবিদের মতো দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিতায়ও এসেছে। কিন্তু সকল হিংস্রতা, বিষন্নতা ও হাহাকারের মধ্যেও মঞ্জু ধীর ও শান্তô। অসঙ্গতি ও অসুয়ার মাঝখানে বসবাস করলেও তিনি তার জন্যে নিরাপদ আশ্রয়স্থল খুঁজে পেয়েছেন মানবতাবাদী মরমী কবিদের মধ্যে।

আঁকু পাকু আঁধার/ কেউ কি জোসনা ভাঙে/ হৃদয় হৃদয়হীন/ মানুষেরা মানুষ ভাঙে।/ যান্ত্রিক শহর/ অরণ্য নেই, ছুঁতে নেই নাকি আরণ্যিক আদর! / নিয়ত এইখানে গলে মানুষ ও বারম্নদ পাশাপাশি/ এইখানে/ মানুষের দেশে অস্ত্রের ত্রিমুখি প্রসব/ জখমি মাটি, মানুষ হরণের মানুষী দাগ।/ মেরম্নবদ্ধ মানুষ/ মানুষ কি শুধু মানচিত্রের মানুষ! (মানুষ মানচিত্রঃ ইস্পাতের গোলাপ)

কিন্তু সাথে সাথে তিনি সাহসের সাথে বলে উঠেন

‘নিরাগ মজির-সকালে লালনপাখি হাসন হাসন বলে/ উড়ে যায় শাহনুরের বিলে। সংসার সন্তôানেরা হারায়/ বাজারে বাজারে।/ মানুষের দুখ্‌ বেশী/ মানুষের কৃষ্ণগান গেয়েছিল মজিরের গৌড় হৃদয়।/ তর্কবিদল বণিক বিহারে/ সুখের দাড়কিনা মাছ কতদিন বাঁচে! পৃথিবী মরিয়া যায়/ পৃথিবীর ধড় রাখিয়া দিও লালনের বুকে।’ (প্রাণপদ্যঃ কবিতা, ১ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০০২)

মঞ্জুর কবিতায় বাংলা সাহিত্যের মরমী কবিদের প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। মরমী কবিদের জীবন জিজ্ঞাসা তাকেও বিচলিত করেছে এবং তাদের নিয়ে তিনি বিভিন্ন চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন। বাউল বন্দনা’ কবিতায় তিনি বলেন

‘ও ভাই, দিওনারে আমারে রক্তজবা দা/ নড়্গত্র রোদে/ হালিচারা নাচে, বাঁধাকপি বন মিশে পৌর বিতানে/ নাচে সৈয়দ শাহনূরের নাও।/ ও ভাই ফোরাতের জলে আমি কেন ধুব সীমারের হাত/ আমি নাচে, সুরম্নজ নাচে/ মজির উদ্দীনের ‘ভেদজহুর’ নাচে তারেক নদীতে।/ সবাই উঠিলা কাঙ্খে, আমি থাকি ধূলায়/ নিমাই নিমাই বলে করা বাঁধে ঘর; নাচিল পাকনা ধান/ শিতালং দেশের ধূলা।/ ও ভাই, দিওনারে আমারে রক্তজবা দা/ এ হাত ভিজাবোনা গাছের লউয়ে; নাচে/ গাছের গুঁড়িতে লতায় পাতায় রাধারমনের গান।’

শব্দ নিয়ে খেলা করা কবিদের বৈশিষ্ট্য এবং আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ নিয়ে খেলা করতে মঞ্জু আনন্দ পান। ‘ইস্পাতের গোলাপ’ কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা ‘ আমি ’। এ কবিতায় মঞ্জু আঞ্চলিক শব্দকে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করেছেন এবং তা কবিতাটিকে অধিকতর প্রাঞ্জল ও শানিত করে তুলেছে। যাদের কাছে এ সকল শব্দের সঠিক তাৎপর্য পরিষ্কার আছে তাদের কাছে কবিতাটি একটা উন্নতমানের রচনা বলে সমাদৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস। ‘আমি’ কবিতার বিভিন্ন স্তôবক ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা হয়েছে এবং সমগ্র কবিতাটি যেন বিশাল ক্যানভাসে আঁকা কবির মানস-রাজ্যে এবং আমাদের মানুষের পৃথিবীতে চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাতের এক জীবন্তô এলবাম। এ কবিতার ভূমিকায় তিনি নিজের কথা এভাবে বলেন, ‘উদলা গতরে পৃথিবীর কোন দোষী মাটিতে দাঁড়িয়েছি আউয়া, আমার সব সারকথা গিলে খেয়েছে চিল আর কাউয়া। বহু কথা ভুলে গেছি আখল কম বলে; হুরম্নবেলা দাঁড়িয়েছি তেতইয়ের তলে। কিছু কথা লুকিয়েছে গ্রামের দীঘিতে, কিছু কথা উড়ে গেছে উত্তরে নৈঋতে। কিছু কথা ড়্গয় হল প্রেমে আর কামে, কিছু কথা নাই হল সোনালী গ্রামে। বাদবাকি লিখে যাব, কিছু যাব গাইয়া; শুনবেনা অনেকে জানি, কেননা আমি উনারাইয়া।’ তারপর নিজের কথা বলতে বলতে তিনি লন্ডনিয়ামে ‘আখালুকি’ হাওরের টেংরা-পুঁটি অন্বেষণ থেকে শুরম্ন করে বোদলেয়ার, পীর মজির, রাধারমনকে টেনে আনেন এক অপূর্ব বাক-ভঙিমায় এবং উচ্চারণ করেন

‘ইতা আমার কপালের লেখা/ এতো পথ হাঁটা ধাতব পা জোড়া অবশ হল ঘুমের ভেতরে/ আমার পায়ে কি গেঁথেছে মরা শামুকের খোলস/ আমার পায়ে কি লেগে আছে পৃথিবীর যকৃতের পুঁজ?/ ইতা আমার কপালের লেখা/ ইতাতো ইডিপাসের নিয়তি।’


ফারুক আহমদ রনিঃ ইলাপুস্পের প্রেমিক

‘আমাকে ফাঁসির বদলে নির্বাসন দেয়া হয়েছে/ আমি আজ নির্বাসিত এক অজানা দ্বীপে।/ সারাড়্গণ আকাশ ও সমুদ্রের গর্জন শুনি,/ পাখিদের সাথে কথা বলি। আমার ঘুম আসেনা;/গভীর অন্ধকারে পশু হয়ে পশুর সাথে খেলা করি।’

ফারম্নক আহমদ রনি’র দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘জ্বলছি অলিক অনলে’ এ ভাবেই শুরম্ন হয়েছে। রনি লিখছেন দীর্ঘ দিন থেকে এবং এক সময় প্রচুর লিখেছেন। ৯৩ সালে তার প্রথম গ্রন্থ ‘আমি এক নষ্ট যুবক’ প্রকাশিত হয় এবং পাঠক মহলে সাড়া জাগায়। তিনি দীর্ঘদিন যাবত বিলাতে বসবাস করলেও তার সমগ্র স্বত্তা পড়ে রয়েছে বাংলাদেশে।

‘আমি আমার পাঁচটি আঙুল লাটিমের সুতোর বৃত্তে পেছিয়ে/ দ্রম্নত লাটিম দিয়ে মাটির বুকে আঁচড় দিয়েছি,/ আর কলমের নিভ জিহ্বায় চেটে চেটে কাগজে/ মানচিত্র এঁকেছি, শব্দের পর শব্দ দিয়ে লিখেছি একটি নাম/ বাংলাদেশ।’ (মাটি ও মানুষের কাছাকাছিঃ জ্বলছি অলিক অনলে)

এদেশের আঙুর-আপেল তার কাছে বিস্বাদ লাগে, তার মন পড়ে আছে ভাইয়ার হাওর আর কুশিয়ারার স্রোতে ভাসমান আছিরগঞ্জ নামক এক বাজারে। বুভুড়্গ ফেরারী বাউলের মত অজস্র তালি দেয়া স্মৃতির ঝুলি নিয়ে তার স্বদেশের স্মৃতিকে অন্বেষণ করেন। এটা কোন বানানো গল্প নয়, এটা তার ‘আত্মার পঞ্চতন্ত্রে প্রলোভিত বেগবান স্মৃতির আড়ত।’ আরাম-আয়েশের বিলাতী জীবন পেছনে রেখে তিনি ফিরে যেতে চান ‘কলমির নিকুঞ্জে’। তিনি পপলার, ডকল্যান্ড আর ব্রিকলেনের বৈষম্য থেকে পালিয়ে গিয়ে ঢাকাদড়্গিণের সবুজাভ নির্জন মাঠে হারিয়ে যেতে চান।

‘ফের আমাকে আকর্ষণ করে/ দুধ-ভাত, চিড়ে-কলা আর চোঙা পিঠার স্বাদ।/ দড়্গিণা বায়, হেমন্তেôর বাড়ায় তাগিদ - / আঙুর-আপেল তেতো ঠেকে, রোচেনা স্বাদে/ আমলকির ঘ্রাণ দুরন্তô করে।/ হিসেব কষে মেলেনা হিসেব/ দায়বদ্ধতা ফেলে থমকে যায় উড়োউড়ি মন। (নষ্টালজিয়াঃ জ্বলছি অলিক অনলে)

আধুনিক কবিদের নাগরিক যন্ত্রণা এবং নিঃসঙ্গতা ফারম্নক আহমদ রনির কাব্যেও মুর্ত হয়ে ওঠেছে। রাতের অন্ধকারে পুলিশ যে ভাবে চোরাচালান সার্চ করে বেড়ায় ঠিক তেমনি রনি স্মৃতিময় ভালবাসার চোরাচালান সার্চ করে ফিরছেন। বন্ধুত্বের অঙ্গীকার বুকে নিয়ে বন্ধু খোঁজ করে বেড়াচ্ছেন, তবু তিনি নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ।

‘আমার হৃদয়ের চৌহদ্দি ঘিরে অগ্নিঝলক বেপরোয়া বজ্রকাঁপ/ হাঙর-কুমিরের তাড়া আত্মায়, অন্তôহীন ছুটে ফিরি/ নগ্ন, অনাবৃত শহরজুড়ে। আমার সুখ হয়না।/ হাওয়া ও জলের শুভ্র সুন্দর দৃশ্য আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয় বিদ্বেষে,/ আমি আমার হৃদয় আন্দোলিত তৃষ্ণায়।/ ······ আমি এখন একা! এই শহরে এখন দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা,/ বিভৎস এই শহরে রক্তের নেশা আছে, কামের জৌলুস আছে, বান্ধবহীন আমার মুঠোভরে অস্ত্রের শীতল স্পর্শ ছাড়া/ কিছু নেই। (এই শহরে নিঃস্ব আমিঃজ্বলছি অলীক অনলে)

বিলাতের বাঙালী জীবন ধারার সাথে বৃকলেন অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। যারা লন্ডনের বাইরে বাস করেন তারা লন্ডনে এলে বৃকলেনে এক চক্কর না দিলে তৃপ্তি পান না। এক সময় কবির কাছে বৃকলেন ছিল খুব প্রাণবন্তô। এখনো তিনি অন্যদের মত এখানে আসেন। কিন্তু বৃকলেন তার কাছে এখন কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনা। ‘চেনাশোনা পথ-ঘাট, প্রাণহীন নীরব ব্রিকলেনকেও মাঝে মাঝে খুউব অচেনা মনে হয়।’ ‘সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে নিস্তেôজ আড্ডাহীন শবযাত্রা’ তার ভাল লাগেনা। একজন আধুনিক কবির মতই রনি নিজের আধুনিক যুগের যন্ত্রণাময় পরিবেশ সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন এবং তিনি তার আশে পাশে যা দেখছেন তা মেনে নিতে পারেননি। আধুনিক সভ্যতার বিরম্নদ্ধে চিৎকার দিয়ে এক সময় জীবনান্দ প্রশ্ন রেখেছেন, এ আগুন এত রক্ত মধ্যযুগ দেখেছে কখনো? শক্তি চট্রোপাধ্যায় আরো এগিয়ে গোটা মানব জাতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,‘মানুষের সঙ্গে আর মেলামেশা সঙ্গতও নয়-/ মনে হয়, এর চেয়ে কুকুরের শেস্নষাও মধুর।’ রনির কাছে লন্ডনের পরিবেশ হচ্ছে, ‘বিষ্ময়ের অনেক কিছুই এখানে নেই,/ কেবলই বন্যশুকর কীর্তন হয় অর্থনীতির উঠতি মেলায়।’

নস্টালজিয়া আক্রান্তô রনি শুধু নিজের এবং দেশ ও জাতির অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে ড়্গান্তô হননি, ভবিষ্যতের সুখ-স্বপ্ন নিয়েও তিনি উচ্চকক্ত। তার বেশ কিছু কবিতায় এর প্রমাণ উপস্থিত। ক্যানারি ওয়ার্ফের পাদদেশে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছেন তিনি ‘আতুড় ঘরে বিধবা রমনীর ভবিষ্যৎ অন্বেষা’। তিনি ‘আড়াই শত বছরের গোলামীর নষ্ট বীর্যের ভাইরাস ছুড়ে’ দিয়ে সবকিছুকে গুড়িয়ে দিতে চান। অবশেষে স্বপ্ন দেখেন

‘শেষ পর্যন্তô ক্যানারি ওয়ার্ফের পাদদেশেই/ ভেড়াবো আমার বিশাল ঐতিহ্যের জাহাজ/ যে কেবল এই সভ্যতার নাড়িতেই নোঙর করবে,/ যে কেবল সংস্কৃতির অজস্র কঠিন পাথর বহন করবে।/ শেষ পর্যন্তô মানব অস্তিôত্বের অঙ্গীকারে ইংলিশ চ্যানেলেই জেগে উঠবে/ আমার ঐতিহ্যের লাল সূর্য।’ (ক্যানারি ওয়ার্ফের পাদদেশেঃ জ্বলছি অলীক অনলে)

তার নিঃশব্দ খেয়াল কবিতায় আমরা তাকে এ বিষয়ে আরো বেশী সোচ্চার হিসেবে দেখি। সেখানে তিনি বিশ্বাসের নদী পাড়ি দিয়ে রাঙা প্রভাত দেখেছেন এবং রক্তিম অঙ্গীকারে ইচ্ছের ফসল বুনেছেন। বার বার বর্গীদের আক্রমণে ড়্গত বিড়্গত হয়েও কবি পরাজয় মানতে রাজী নন।

‘ হে আমার জরাজীর্ণ খেয়াল তুমি এক খন্ড মেঘ হও/ সতত বর্ষিত হও খরায় খরায় ধাবমান আষাঢ়ের মতো। / কারবালার সখিনার মেহদী রঙে রঙধনু হয়ে / মানুষের বিশ্বস্তô আকাশ সুষমা মন্ডিত করো / আর চির সবুজ ভালোবাসায় গ্রন্থিত হোক / আমার ধ্যানের উঠোন।

‘ইলা,একজন অলিক মিত্র’ রনির একটা প্রতীকধর্মী কবিতা এবং এ কবিতায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সংগ্রামী ইলা মিত্রের নাম ব্যবহার করে কবি এখানে একটা আবহ তৈরি করেছেন এবং তারপর নিজের কল্পণার রঙ দিয়ে তাকে অংকন করেছেন। ইলা তার মিত্রের নাম, ইলা তার কাছে এক শক্তির নাম যে কিনা রক্ত সঞ্চালনে উত্তাপ দেয়। সব শেষে তিনি ইলা মিত্রকে ফুলের সাথে তুলনা করে বলেন

‘·····আজ থেকে তাকে/ একটি ফুলের নামে পুরস্কৃত করবো। / ইলা ফুটুক সর্বত্র, মানুষ ও পরিবেশের/ পরিপূরক হয়ে বন্ধুত্বের সৌরভ নিয়ে / সুনন্দিত হৃদয় মাঠে।’

ফারম্নক আহমদ রনি আপাদমস্তôক বাঙালী কবি, বাংলাদেশের কবি। তার কবিতার ইমেজ ও অনুসঙ্গ বাংলাদেশকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। স্বদেশের প্রতি অফুরন্তô ভালবাসা বুকে ধারণ করে একটি সুখী সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি কবিতা লিখেন। আমরা তার কবিতায় বিলাতে বসবাসকারী লড়্গ লড়্গ বাংলাদেশী মানুষের মনের গভীরে লালিত আশা-আকাঙ্খার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।


সুমন সুপান্থঃ চম্পক নগরের অভিযাত্রী

‘আরো দূরে, চম্পক নগরে দ্রৌপদী কথার বধূ/ একা একেলা রাত্রির গভীরতা মাপে···/ আহা নাগর! কেতকী ফুল পুড়ে সূর্য তাপে/ এবার এসো শ্রাবণের নদী ······পদ্মাচরের ধূ ধূ······।’ (এবার এসো শ্রাবণের নদীঃ সুমন সুপান্থ) সুমন সুপান্থ এভাবেই তার আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করেন। সুমন লিখছেন অনেক দিন থেকে , এদেশে এসেছেন বেশীদিন হয়নি। তিনি কম লিখেন, কিন্তু ভালো লিখেন। তার লেখায় পরিশ্রমের চিহ্ন সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এখানে চম্পক নগর, দ্রৌপদী বধূ, নাগর, কেতকী ফুল, সূর্য তাপ, শ্রাবণের নদী, পদ্মাচর ইত্যাদি বলে তিনি একটা বিশেষ আবহ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। চম্পক নগর রূপকথার চম্পক নগর না হলেও পাঠককে কবি রূপকথার দিকে টেনে নিয়ে যান। ‘চম্পক নগর’ চম্পকমালা হিসেবে পরিচিত বিশেষ একটা ছন্দকেও বোঝাতে পারে এবং তা হলে এর মাধ্যমে ব্যাপক অর্থে কাব্যকথার দিকে ইঙ্গিতটা চলে যায়। চাঁপা, কেতকী প্রভৃতি বর্ষা মওসুম, আরো বিশেষ ভাবে মধুমাস হিসেবে চিহ্নিত জৈষ্ঠ-আষাঢ়ের ফুল। দ্রপদ কন্যা দ্রৌপদী মহাভারতের গল্পে পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী। কিন্তু সুমন সে দ্রৌপদীর কথা বলেননি, তিনি বলছেন ‘দ্রৌপদী কথার বধূ’ সম্পর্কে। তার দ্রৌপদী কথার বধূ পঞ্চপান্ডবকে নিয়ে রাত্রি যাপন করছেনা, সে একাকী রাত্রির গভীরতা মাপছে। প্রখর সূর্যতাপে মধুমাসের কেতকী ফুল পুড়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বাস বা আস্থার পৃথিবীতে পদ্মানদীর মতো ধূ ধূ চর পড়ে গেছে। এমনি প্রাণহীন অবস্থায় কবি অঝোর বর্ষণে প্রকৃতিকে সিক্ত করে দেয়ার জন্যে শ্রাবণের নদীর প্রতি আকুতি জানাচ্ছেন।

সুমন তার কবিতার শরীর নির্মাণ এবং শব্দপ্রয়োগের সচেতন এবং হিসাবী। ‘স্মৃতি বিষয়ক হলদে খাম -০১’ তার টানা গদ্যে লেখা একটি ছোট্র কবিতা। সেখানে তিনি স্মৃতির জাবর কাটতে গিয়ে বলেন

‘আর আমাদের ভবঘুরে স্বপ্নেরা নগরে এসে হোঁচট খেলে, বাউন্ডেলে বাতাস কানের কাছে শিষ দিয়ে গ্যাছে - মিছে এ জীবন। আজ পুড়ে যাই - কেন যে সেদিন বিলিয়েছি অমন অরম্ননাড়্গ দিন। যদি ফলাফল চান; দেখবেন - ঘাসেদের কাছে কিছু নীল ফুল; তার কাছে পড়ে আছে আমাদের অব্যয় পৌরাণীকি! কে তারে স্পর্শিল বিরহী সম্পূরকে! জানা হবেনা এ জন্মে। জানা হবেনা আমাদের শস্যময় প্রান্তôর কেন অধিকন্তু শস্যহীন···। আমরা কি তবে বাতিল বান্ধব, এই প্রাবৃষ্য বেলা!’ মনের বেদনা এবং হাহাকারকে সুমন কারম্নকার্যময় ভাষায় সাজিয়ে প্রকাশ করেছেন। বাউন্ডেলে বাতাস ‘শিস’্‌ দিয়ে তাকে হতাশার কথা বলে যায়। এটা কি সেই ‘অপার বেদনা’ যা ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বহনকারী সকল কবিকে বহন করতে হয়? সুমনের কাছে তা ‘অব্যয় পৌরাণীকি’ যা লিঙ্গ, বচন বা বিভক্তিযোগে পরিবর্তিত হয়না এবং সে অর্থে শাশ্বত। এখানে একই কবিতায় রৌদ্র এবং বৃষ্টি এ দু বিপরীত প্রাকৃতিক বিষয়কে অত্যন্তô শৈল্পিক ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘অরম্ননাড়্গ’ বা রৌদ্রময় দিন তার কাছে উজ্জলতার প্রতীক এবং ‘প্রার্বষ্য বেলা’ বা বৃষ্টির দিন তার কাছে সজীবতার চিহ্ন। তিনি ‘অরম্ননাড়্গ দিন’ বিলিয়ে দেয়ার কথা ভেবে দুঃখে কাতর এবং ‘প্রাবৃষ্য বেলায়’ কেন তার শস্যময় প্রান্তôর শস্যহীন সে প্রশ্নে তিনি উদ্বিগ্ন।

অবশ্য বৃষ্টি প্রসঙ্গ সুমনের অন্যান্য কবিতায়ও এসেছে। রবীন্দ্রনাথের মতো বর্ষার কবি নয়, বৃষ্টিকে তিনি ব্যবহার করেছেন প্রতীকি অর্থে। সন্ধ্যায় বৃষ্টি এলে কবিতায় তিনি বলেন

‘সন্ধ্যায় সামান্য বৃষ্টি··· বৃষ্টি খেলতে শহরে এসেছেন বাল্মীকি/ বিভঙ্গ চৈতন্যের কাব্য হবে এবার, এ সন্ধ্যায় আমরা কি লিখি!/ ········তবু/ সন্ধ্যায় বৃষ্টি এলে, আমরা দাহ্য হতে নামি পথে/ সন্ধ্যায় বৃষ্টি এলে, নিজেকে বাঁচাই কোন মতে/ সন্ধ্যায় বৃষ্টি এলে, ভাসে বিষন্ন অত্মার গান/ সন্ধ্যায় বৃষ্টি এলে, বুনি নাভিতে সবুজ ধান।

সুমন সুপান্থের কবিতা শৈল্পিক দিক দিয়ে সুষমা মন্ডিত এবং ভাষা বা বাক-ভঙিমা ধীর ও শান্তô। দড়্গ শব্দ সৈনিকের মতো তিনি বার বার জোড়া শব্দ ব্যবহার করেন এবং প্রতীকি অর্থে তা চমৎকার ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। কবিতার কচি পাতা ও পেলব উপত্যকার প্রতি তার আকর্ষণ রয়েছে এবং সে উদ্দেশ্যে বৃষ্টি বর্ষণকারী মেঘ মেয়ের আহ্বানের প্রতীড়্গায় তিনি অপেড়্গমান।


শাহ্‌ সোহেলঃ দ্রোহী উড়োপাখি

শাহ্‌ সোহেল এ প্রজন্মের এক সম্ভাবনাময় তরম্নণ কবির নাম। শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে’ এবং শাহ্‌ সোহেল ঘোষণা দিয়েছেন,‘কবে যেন দেশদ্রোহী হয়ে যাই।’ একটি নয়, বহুবিধ কারণ এর পেছনে কাজ করছে।

সোহেল সম্প্রতি বৃটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। বোধগম্য কারণে তার লেখায় ঘুরে ঘুরে ফিরে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসবে। তার মত আমরা যারা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছি তাদের মনে স্বদেশের জন্যে ঘৃণা না ভালোবাসা প্রবল তা আমাদের কারো অজানা নেই। বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে সোহেল তার অনুভূতিকে এ ভাবে প্রকাশ করেন

আমি এখন উড়ো পাখি/ নীল খামেতে বন্দী/ উড়ছি আমি ঘুরছি ওগো/ জীবন গড়ার সন্ধি।/ ছাড়ছি তোমায়; ছাড়ছি ওগো/ মন-মাধবী বাংলা/ একি তোমার ভালোবাসা/ কিংবা দ্রোহ মামলা। (আমি এখন উড়ো পাখি)

প্রাচীন সভ্যতার লীলাভুমি হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন দেশের প্রসঙ্গ এনে সোহেল মাতৃভূমির প্রতি তার প্রগাঢ় ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করেন

‘সুইডেন-প্যারিস-বেবিলন-প্রাচীন গ্রীক/ সভ্যতার খোলসে ঘুরতে··· ঘুরতে····/ দেখলাম···দেখলাম; / বাবার সাথে ছেলে - মায়ের সাথে মেয়ে - ভাইয়ের সাথে ভাই; / যেন এরা সভ্যতার ক্লাসিকাল রিল্যাে বন্দী/ ভালো লাগলোনা; মোটেও ভালো লাগলোনা। আমার বুকে মধ্যাহ্নের স্তুপকৃত বারম্নদ নেভাতে/ আবারও ঘুরতে শুরম্ন করলাম; ঘুরতে··· ঘুরতে··· / নায়াগ্রার জলপ্রপাতে অবগাহন করে/ শীতলতার উষ্ণ অনুভব নিয়ে ফিরে আসি/ জন্মভূমি; কাঁদা-মাটি-কৃষাণ আর মেঠো পথের দেশ/ প্রিয় বাংলাদেশ···’ (নষ্ট সংসারের গল্প)

কিন্তু যে কবি গোটা পৃথিবীর কোথাও শান্তিô না পেয়ে প্রিয় বাংলাদেশের কোলে এসে আশ্রয় নেন তিনি আবার এক সময় দেশদ্রোহী হবার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। সীমাহীন ত্যাগ আর কুরবানীর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা পঞ্চভুতে মিলে নষ্ট করে দিচ্ছে দেখে তিনি বিড়্গুব্ধ। রাষ্ট্রের সেবকদের ভন্ডামী দেখে তার সহ্য হচ্ছেনা, তাই তিনি ঘোষনা দেন

‘তাই,/ কখনো সখনো মনে হয় ···যে হাতে অস্ত্র ধরে স্বাধীনতা এনেছিলাম/ ঠিক সে হাতে গোলাপ ধরে····স্বাধীনতা বিলিয়ে দেবো···/ দেশদ্রোহী হয়ে যাব··· স্বাধীনতা বিলিয়ে দেব!’

আমাদের জানা পৃথিবীর চারপাশে ঘটমান বিভিন্ন বিষয় একজন সংবেদনশীল কবিতা কর্মী হিসেবে সোহেলকে বিচলিত করে। মানবিক সুখ-দুঃখের গল্প তিনি বলেন। সে গল্প কোন কোন সময় বিলাপের মতো তার কবিতায় ফুটে ওঠতে দেখা যায়। এ সকল বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন প্রেড়্গাপটে এবং নিজের অনুভবের রঙ মিশ্রিত করে তিনি বর্ণনা করেছেন ৈ

‘আমার / অসময়ে সাপের সাথে নেউল খেলা করে······/ মহিষ মাঠে বাঘের সাধে/ বেলাজ/ নাগর/ রঙ-রূপে কুঁচ বরণ কন্যা খোঁজে/ আমার বড় দুঃসময়/ একলা/ কাটে; পিয়াইন নদীর পাথর চেপে।’ (দুঃসময় ২১ শ্রাবণ, এমসি কলেজ হোস্টেলে প্রথম রাত)

অন্যত্র তিনি সব হারিয়ে বেপরোয়া হয়ে বলেন-

গেলো কাল; ব্যক্তিগত ঝর্ণা ছিলো, ঝর্ণার স্রোত ছিল/ বারান্দায় লুবনা ছিল, লুবনার লাবণ্য ছিল/ মনে প্রেম ছিলো- প্রেমে ঢেউ ছিলো/ ঢেউয়ে ছন্দ ছিলো - ঝুমুর ছিলো/ গুণ ও ভাগের জটিলতায় তাও গেলো;/ অতঃপর কিছুই আসে যায়না আমার। (আশার ভেতর ঘর ছিলো)

হ্যাঁ, বুঝতে পারলে এতে কারো কিছু যায় আসেনা, বরং তা আরো কিছু মহৎ কবিতার জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর অধিকাংশ মহৎ সৃষ্টি-ই দুঃখ-বেদনার ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে এসেছে। এ দামী কথাটা সোহেল যেহেতেু বুঝতে পেরেছেন তাই তার কাছে আমরা আরো উন্নত কবিতা আশা করতে পারি।


লন্ডন ১৯ জুলাই ২০০২