Home | Articles | About | Contact
সন্ত্রাস এবং আমাদের দায়

- ফরীদ আহমদ রেজা

নয় সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ধ্বংস এবং সাত জুলাই লন্ডনে বোমা হামলা সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্যে অত্যন্তô গুরুত্বপূর্ণ এবং বেদনাদায়ক দুটো দিন। এর ফলে বিশ্ব-শান্তিôর বার্তাবাহক মহানবী (সঃ)-এর অনুসারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যদিও মুসলিম বিশ্বের সবাই দুটো ঘটনাকেই বর্বরোচিত কাজ হিসেবে নিন্দা করেছে এবং এতে আহত ও নিহতদের মধ্যে অনেক মুসলমানও রয়েছেন। উভয় ঘটনার কারণ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত আছে এবং তা বিশ্লেষণ করে দেশে দেশে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আমি এখানে কারণ বিশ্লেষণে না গিয়ে মুসলিম উম্মাহ্‌র এক নগন্য সদস্য হিসেবে বিলাতের মুসলমানদের জন্যে আত্মসমালোচনার আকারে কিছু কথা পেশ করার চেষ্টা করবো।
এক.
বিলাতে আমি প্রথম আসি ভিজিটর হিসেবে, ৮৫ সালে। এখানে পা দিয়েই আমি অনুধাবন করেছি, বিলাতে মুসলমানদের স্থায়ীভাবে এবং ইজ্জত-সম্মানের সাথে বসবাস করতে হলে এ দেশকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হবে। এ দেশকে এবং এ দেশের মানুষকে ভালবাসতে হবে। সে সময় আমি ব্রাডফোর্ড মদীনাতুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্রদের বার্ষিক পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে পরিবেশনের জন্যে একটি গান লিখে দেই। সে গানের প্রথম দু লাইন ছিল, দিস আইল ইজ আওয়ার, বি ব্রাইট ইট্‌স ফিউচার - এই দ্বীপ বা এই দেশ আমাদের, উজ্জল হোক এর ভবিষ্যত। পরে যখন   ৯১ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে এ দেশে আসি তখন থেকে সেই ৮৫ সালে লিখিত গানের বানীকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে তা সববেত কন্ঠে গাওয়ার চেষ্টা করছি। তখন দেখেছি আমার মতো আরো অনেকেই এ মতের অনুসারী। কিন্তু আমরা যারা সমস্বরে এ বানী উচ্চারণ করছি তাদের তুলনায় মুষ্টিমেয় যে ক'জন ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায় তারা এতোটা উচ্চকন্ঠ যে বৃহত্তর কমিউনিটিতে আমাদের ক্ষীণ আওয়াজ তেমন শ্রুত হচ্ছেনা। লন্ডনে বোমা হামলা এবং এর পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের কারণে আমার সে গান সম্পর্কে আজ নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এ দেশে বর্তমানে আড়াই মিলিয়ন মুসলমান আছেন। এর সিংহভাগ এসেছেন গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে। মরোক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্তô মুসলিম প্রধান দেশগুলো থেকে অনেক মুসলমান এ দেশে আসার জন্যে এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজ মাতৃভূমির রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থা বেঁচে থাকা বা শান্তিôতে জীবন যাপনের উপযোগী না হওয়ার কারণেই আমরা অধিকাংশ মুসলমান এ দেশে এসেছি এবং পরিবার পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। বহু মুসলিম প্রধান দেশের তুলনায় এ দেশে অনেক বেশি শান্তিô ও নিরাপত্তা রয়েছে। তাই আমরা এ দেশে আছি এবং এ দেশের সরকার প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু এ দেশ এবং এ দেশের মানুষের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী কি রকম? আমরা কি এ দেশকে ভালবাসি? এ দেশের উন্নয়নের জন্যে আমরা কতটুকু উদগ্রীব? এ দেশের রাজনীতি ও সমাজিক কাজকর্মের সাথে আমরা কতটুকু জড়িত? আমাদের নীতি ও মূল্যবোধ এ দেশের জন্যে কতটুকু উপযোগী? এ সকল প্রশ্ন আমার নয়, এ দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর। তাদের মনে এমনিতেই এ সব প্রশ্ন ছিল। সাতই জুলাই বোমা হামলার পর তা নতুন মাত্রা পেয়েছে মাত্র।
বলাবাহুল্য এ দেশের ব্যাপারে আমাদের মনোভাব তৈরি ও তা লালনে আমাদের আলেম সমাজ এবং এখানে বসবাসকারী দেশকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। দেশকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদরা ছেড়ে আসা দেশীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের এতোই ব্যস্তô করে রাখেন যে বিলাতের রাজনীতি নিয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করতে পারিনা। যে দেশ আপনাকে রাখতে পারেনি বা তাড়িয়ে দিয়েছে তার প্রতি আপনি প্রেম নিবেদন করবেন এবং যে দেশ আপনাকে আশ্রয় দিয়েছে তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করবেন তা হতে পারেনা। যুক্তি ও বিশ্বস্তôতার দাবি হচ্ছে, আমরা যে দেশের আলো-বাতাসে বাস করবো সে দেশের প্রতি আমাদের ভালবাসা থাকবে এবং এর উন্নয়নে ভূমিকা রাখবো। বৃটেন আমাদের জন্যে দারুল হরব নয় - দারুল আমান। আমাদের জন্যে এটা মহানবী (সঃ)-এর যুগের খৃষ্টান শাসক নাজ্জাশির আবিসিনিয়ার মতো । এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্তô বা এদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে এ দেশের মানুষকে আমাদের ইয়া কাওমী  বা হে আমার জাতির লোকেরা  বলে সম্বোধন করতে হবে। কোন দেশ বা জনগোষ্ঠীর প্রতি কারো ভালবাসা থাকলেই তাদের কল্যাণের জন্যে সে কাজ করতে সচেষ্ট হয় এবং সে দেশের নিরীহ অধিবাসীর উপর বোমা হামলা প্রতিরোধে জীবন পণ করে এগিয়ে আসে। আমাদের দেশ বা দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসার কথা শুধু মুখে বললে হবেনা, এ দেশের রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিয়ে এর প্রমাণ দিতে হবে। নবী ইউসুফ (আঃ) যে ভাবে মিশরের অমুসলিম শাসক এবং বাসিন্দাদের দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক সে ভাবে এ দেশের কল্যাণের জন্যে আমাদের কাজ করতে হবে।
পৃথিবীর সব ক'টি মুসলিম দেশের সাথে বৃটেনের বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি রয়েছে। সে হিসেবে বৃটেন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। বন্ধুরাষ্ট্র ও এর জনগণের মান-মর্যদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ধন-সম্পদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। যারা বৃটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন তাদের দায়িত্ব আরো এক ধাপ এগিয়ে আছে। তারা ব্যক্তিগত ভাবে এ দেশের আইন মেনে চলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এবং দেশের নাগরিক হিসেবে এর স্বার্থবিরোধী কোন তৎপরতায় তারা নীতিগত ভাবে জড়িত হতে পারেন না। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এর ব্যতিক্রম করলে ইসলামী বিধান অনুযায়ী তিনি বা তারা চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হবেন।
বর্তমান যুগে রাজনীতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিব্যপ্ত। জীবনের প্রায় সব কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই এ দেশের একজন অতি সাধারণ মানুষও রাজনীতি নিয়ে চিন্তôা-ভাবনা করে এবং প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যে কাজের সাথে আমরা নিজেরা সহ এ দেশের সকল মানুষের সুখ-দুঃখ জড়িত সে কাজের ব্যাপারে আমরা নীতিগত ভাবে উদাসীন থাকতে পারিনা। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট যে এ ব্যাপারে আমাদের উদসীনতা ও উন্নাসিকতা এ কথা উচ্চকন্ঠে ঘোষণা দিচ্ছে যে এ দেশকে আমরা আপন করে নিতে পারিনি, আমরা এখনো নিজেদের বহিরাগত বা অতিথি হিসেবে বিবেচনা করছি।

দুই.                                                                                                                                                     এ দেশে যারা ইসলামের বানী প্রচার করেন তাদের শতকরা ৯৯ জন এসেছেন বাংলাদেশ, পাকিস্তôান, মিশর, সউদি আরব প্রভৃতি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা থেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা যখন ইসলামের কথা বলেন তখন তারা যে দেশে বড় হয়ে এসেছেন সে দেশে লালিত ধ্যান-ধারণার উর্ধে উঠতে পারেন না। তাদের একপেশে এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তৃতা-বিবৃতি অমুসলমান তো দুরের কথা, এ দেশে বসবাসকারী মুসলমানদেরই আকৃষ্ট করতে পারেনা।
মহানবী (সঃ) ও তাঁর নিজ হাতে গড়া সাহাবাদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা আমাদের ত্রুটিগুলো বুঝতে পারবো। স্থানীয় অধিবাসীদের মানসিকতা বিচার করে কথা বলা এবং সমসাময়িক পরিস্থিতির আলোকে অগ্রাধিকার নির্ধারণকে কুরআন অত্যন্তô গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী(সঃ) এবং তাঁর সহাবাগণ সে ভাবেই তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন। মহানবী (সঃ) মক্কার অমুসলিম সমাজে কাজ শুরু করেন এবং মুসলমানরা যখন আবিসিনিয়া হিজরাত করেন তখন সেটা ছিল একটি খৃস্টান সমাজ। মহানবী (সঃ) মদীনায় হিজরতের পূর্বে অনেক সাহাবী মদীনায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানেও তারা অমুসলিম সমাজে কাজ করেছেন। ইসলামের এ তিনটি পর্যায় বিলাতের মুসলমানদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সাথে মহানবী (সঃ) এবং সহাবীদের জীবনের এ তিনটি অধ্যায়ের সাযুজ্য থাকায় তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এর আলোকে বিলাতের মুসলমানদের প্রয়োজন সামনে রেখে কথা বলার মতো ইসলামী ব্যক্তিত্ব কোথায়? শুধু তাই নয়, অনেক বছর আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তôান, মিশর অথবা ভারতের পরিস্থিতি সামনে রেখে যে বই লেখা হয়েছে সে বইয়ের বাস্তôব উপযোগিতা কতটুকু তা বিবেচনা না করেই আমরা এ সকল বই প্রকাশ, বিতরন এবং মাদ্রাসা সমূহের সিলেবাসের অন্তôর্ভূক্ত করছি। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। আমাদের সবকিছু একটি লেজে-গোবরে অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে।
আমরা জানি, ইসলামের কথা বলতে হবে সুন্দর ভাবে, প্রজ্ঞার সাথে। মসজিদে নববীতে এক বেদুইন এসে প্রশ্রাব করে ফেলে। সাহাবারা তাকে মারতে গেলে মহানবী (সঃ) তাদের বিরত করে বলেন, এক বালতি পানি ঢেলে জায়গাটা সাফ করে ফেলো। মানুষের জন্যে সহজ করো, কঠিন করোনা; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিরক্ত করোনা। কুরআন আমাদের অমুসলিমদের দেব-দেবীর ব্যাপারে কটুকথা বলতে নির্দেশ দিয়েছে। ফেরাউনের মতো খোদাদ্রোহীর ব্যাপারে নবী মুসা ও হারুন (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহ্‌র নির্দেশ ছিল, তোমরা ফেরাউনের সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু আমরা নরম ভাষায় কথা-ই বলতে পারিনা। বজ্রকন্ঠ বাংলাদেশ বা পাকিস্তôানের জন্যে উপযোগী হতে পারে, কিন্তু বিলাতের জন্যে তা সম্পূর্ণ বেমানান।
আমাদের এক শ্রেনীর আলেম এ দেশে পা দিয়েই বলেন, ‘এটা কাফিরদের দেশ।  তাই যদি হয় তা হলে এ দেশে কেন এসেছেন? কেউ কি আপনাকে গ্রেফতার করে এখানে নিয়ে এসেছে? এর আরেকটি দিক রয়েছে। নীতিগত ভাবে আমরা এ দেশকে কাফিরদের দেশ বলতে পারিনা। এটা ঠিক যে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ কাগজে কলমে অমুসলমান অর্থাৎ খৃষ্টান। কুরআনে খৃষ্টানদের কাফির না বলে আহলে কিতাব বলে সম্বোধন করা হয়েছে। মুসলমানরা যে আল্লাহর ইবাদত করেন তিনি যাদের সম্মান দিয়ে আহলে কিতাব বলে ডাক দিয়েছেন, আমরা তাদের কাফির বলে সম্বোধন করার কারণ কি? যেখানে অমুসলমানরা কাফির  শব্দটিকে গালি হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে অমুসলিম অধ্যুষিত দেশে আহলে কিতাবদের কাফির হিসেবে অভিহিত করা কতটুকু সঙ্গত? এটা কি অজ্ঞতা না ঘৃণা? এর কোন্‌ কারণটি ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের জন্যে গৌরবের? আপনি তো তাঁর প্রতিনিধি যাকে বিশ্ব জাহানের জন্যে রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। আপনার মুখ থেকে উচ্চারিত হবে ঘৃণা নয়, ভালবাসার বানী। আপনারা কি জানেন, আপনাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এ কাফির অভিধার পরিণতি কি হচ্ছে ? ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মা-বাবার মুখ থেকে তা আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়ের কাছে সংক্রামিত হচ্ছে এবং তারা বেপরোয়া ভাবে যত্র-তত্র তা ব্যবহার করছে।
আরেকটি অত্যন্তô গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার। ইসলাম কি শুধু মুসলমানদের জন্যে এসেছে? কুরআন কি শুধু মুসলমানদের জন্যে হেদায়াত? মুসলমানরা কি শুধু মুসলমানদের কল্যাণের জন্যে কাজ করবে? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কেউ যদি আমাদের তৎপরতা পর্যালোচনা করে তা হলে কি বুঝবে? ইসলাম সমগ্র মানবতার সম্পদ। সে সম্পদকে মুসলমানদের জন্যে সীমাবদ্ধ করার দায়ে কে প্রকৃত অপরাধী? বাঙালি বা পাকিস্তôানী কমিউনিটি আয়োজিত মুসলমানদের কোন সমাবেশে কি এ দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের জন্যে কোন আবেদন থাকে? ফিলিস্তিôন, ইরাক বা গুজরাটের ব্যাপারে আমরা ক্রন্দন করি; কিন্তু রুয়ান্ডা, জিম্বাবুয়ে, লুজিয়ানা বা সিংহলের মানুষ কি আমাদের ক্রন্দনের হকদার নয়? ইসলাম পৃথিবীর সকল নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবগোষ্ঠীর জন্যে মুক্তির আবেহায়াত। শুধু মানুষ নয়, গাছ-পালা এবং পশু-পাখির নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বও মুসলমানদের উপর বর্তায়। কিন্তু মুসলমানদের আচরণ দেখে আমরা তা কতটুকু বুঝতেপারি? মানবতার যে সকল মহান বানী আমরা আজকাল শুনতে পাই এ সব কথা ১৪শ  বছর আগে ইসলাম অনেক কঠোর ভাষায় উচ্চারণ করেছে। কিন্তু এ দেশের মান ষের কাছে তা জানা নেই। বাস্তôব দৃষ্টান্তেôর মাধ্যমে তা তাদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব প্রত্যেকটি মুসলমানের। সে দায়িত্ব আমরা কতটুকু পালন করছি?
হালাল খাবার, মসজিদ বা কমিউনিটি সেন্টার নিয়ে আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে হাজারো দেন-দরবার করি। ঢাকায় বা মিশরে বোমা হামলা হলে রাস্তôায় মিছিল নিয়ে নেমে পড়ি। এ দেশের হাউজিং সমস্যা, ড্রাগ্‌স, আইন-শৃংখলার অবনতি, টিউশন ফি, পরিবারে ভাঙন ইত্যাদি সমস্যা কি ইসলামী সমস্যা নয়? আমরা জানি, রাস্তôা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা ঈমানের অংশ। মানুষের দুঃখ-কষ্টের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো মহানবী (সঃ)-এর একটা বড় সুন্নাত। দাঁড়ির দৈর্ঘ্য, মহানবী (সঃ) নুরের তৈরি না মাটির তৈরি, নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার যথেষ্ট সময় আমাদের আছে। কিন্তু টাওয়ার হ্যামলেটস্‌ বরার মাদক সমস্যা প্রতিরোধে সপ্তাহে একটা দিন ব্যয় করতে পারিনা।
মুসলমানদের মধ্যে এমন লোকের অভাব নেই যারা মনে করেন বর্তমান যুগে ইসলাম অচল। ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো শুধু মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের নাম। আধুনিক মানুষের বহুমুখি জটিল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান সেখানে অন্বেষণ করা বাতুলতা মাত্র। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণেই তাদের মধ্যে এ ধরণের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে এ ধরণের ভুল ধারণার জন্যে পাশ্চাত্যকে দায়ী করার একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এ জন্যে আমরা যারা নিজেদের ইসলামের ধারক ও বাহক মনে করি তারা কি কম দায়ী? আধুনিক মানসকে আকৃষ্ট করার মতো আকর্ষণীয় ভাবে কি আমরা ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারছি? যে আদর্শ বাস্তôব জীবনে চলার পথে কোন দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ তার প্রতি মানুষ কেন আকর্ষণ অনুভব করবে? এ দেশে যারা ইসলাম গ্রহণ করছে তারা আমাদের কথা শোনে বা কাজ দেখে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছেনা। তারা নিজেদের অনুসন্ধিৎসু মনের কারণে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করে ইসলাম গ্রহণ করছে।
তিন.                                                                                                                                                     মহানবী (সঃ) তরুণদের বিভিন্ন ভাবে প্রশংসা করে তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার তাগিদ দিয়েছেন। রাসুলের প্রাথমিক যুগের সঙ্গী-সাথীদের প্রায় সবাই, শুধু মনের দিক থেকে নয়, বয়সের বিচারে তরুণ ছিলেন। কিন্তু বিলাতের তরুণদের জন্যে এখান মসজিদের দ্বার অবারিত নয়। লন্ডনে বোমা হামলার কারণে অভিযুক্ত সবাই বয়সে তরুণ। নেশা সমগ্রীই বলুন আর ক্ষোভ বা ক্রোধই বলুন, এ গুলো তরুণদের সহজেই প্রভাবিত করে। আমাদের বিভিন্ন মসজিদে যা আলোচিত হয় এর বিষয়বস্তুর সাথে তরুণরা নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেনা। সেখানে প্রদত্ত খুতবা বা আলোচনার ভাষা তাদের বোধগম্য নয়। তা হলে তারা সেখানে কেন যাবে? রাসুলের যুগে তরুণরা মসজিদে নববীতে লাঠি খেলা ও মল্লযুদ্ধ করেছে। মুসলিম তরুণরা পাবে গিয়ে স্নুকার খেলে, টেবিল টেনিস খেলে, রেস্টুরেন্টে গিয়ে আড্ডা দেয়, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু মসজিদ তাদের আকর্ষণ করতে পারে না। কেন তারা সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা? এ দায় কি তাদের না আমাদের? তারুণ্যের ঔৎসক্য ও এডভ্যাঞ্চারিজমের কারণে ভালো জিনিসের অভাবে তারা বিভ্রান্তô হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অধিকাংশ মসজিদ তরুণদের যে ভাবে অবহেলা করছে তাতে মনে হয় আমরা তাদের নাম খরচের খাতায় লিখে ফেলেছি।
মুসলিম কমিউনিটিতে মহিলাদের অধিকার সংরক্ষিত নয় বলেও একটা প্রচারণা বাজারে চালু আছে। এর কতটুকু ঘটনা এবং কতটুকু রটনা তা নিয়ে তর্কযুদ্ধ হতে পারে। কিন্তু বাস্তôবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। মহানবী (সঃ) মহিলাদের অধিকারের ব্যাপারে আমাদের কঠোরভাবে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি একথাও বলেছেন যে তোমরা তোমাদের মহিলাদের মসজিদে যেতে বাঁধা দিওনা। অথচ আমাদের অধিকাংশ মসজিদ মহিলাদের জন্যে উন্মুক্ত নয়। রাসুল (সঃ)-এর জীবদ্দশায় মসজিদে নববীতে মহিলারা স্বাধীন ভাবে যেতে পারতেন। তারা সেখানে প্রধান হলেই নামাজ পড়তেন, তাদের জন্যে দেয়ালঘেরা আলাদা কামরা ছিলনা। খলিফা উমরের সময় মহিলারা মসজিদে উপস্থিত হয়ে খলিফার সাথে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। একটি ঘটনা আমাদের অনেকের জানা আছে। একবার জুমআর খুতবায় খলিফা উমর (রাঃ) বিয়েতে মহিলারা আজকাল অতিরিক্ত মোহরানা দাবি করছে বলে অভিযোগ করে বলেন, বিয়েতে ৪শ  দিরহামের বেশি মোহরানা দাবি করা ঠিক নয়। উমর (রঃ) মিম্বর থেকে নামার সাথে সাথে এক মহিলা তাঁর উদ্দেশ্যে বলেন, কুরআনে বিপুল অঙ্কের মোহরানার ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তôব্য করা হয়েছে এবং আল্লাহ্‌র রাসুল (সঃ) মোহরানার পরিমান নির্ধারণ করে দেননি। সেখানে আপনি কিসের ভিত্তিতে মোরানাকে ৪শ  দিহরামে সীমাবদ্ধ করছেন? জবাবে খলিফা উমর কোন কথা না বলে আবার মিম্বরে উঠে আসেন এবং বলেন, মোহরানার ব্যাপারে আমি যে কথা বলেছি তা ঠিক নয়, ঐ মহিলা যা বলছেন সেটাই ঠিক। এ ঘটনা থেকে প্রথমতঃ আমরা বুঝতে পারি যে মদীনার মহিলাদের বিয়ের সময় মোহরনার ব্যাপারে দর কষাকষি করার অধিকার স্বীকৃত ছিল। দ্বিতীয়তঃ মদীনার মহিলারা মসজিদে নববীতে ইমামের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারতেন। এতে কেউ ইসলাম চলে যাচ্ছে বলে মনে করতো না । তৃতীয়তঃ তারা এতোটা সহসী ছিলেন যে পুরুষদের মধ্যে দাঁড়িয়ে জুমআর খুতবায় প্রদত্ত খলিফার বক্তব্যের সমালোচনা করতেও তারা ভীত ছিলেন না। এর সাথে বর্তমান মুসলিম সমাজের মহিলাদের অবস্থার কি কোন তুলনা হয়? আমরা মহিলাদের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে রেখে মনে করি ইসলামের বিরাট সেবা করছি। হাদীস অনুসারে যেখানে মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে-ই সিদ্ধ হয়না, সেখানে বৃটিশ সরকারকে প্রধানতঃ মুসলিম মেয়েদের অধিকার রক্ষার জন্যেই ফোর্স ম্যারেজের বিরুদ্ধে আইন প্রনয়ন করতে হয়েছে। ভাগ্যের পরিহাস আর কাকে বলে?
চার.
বৃটেন একটি মাল্টি কালচারাল, মাল্টি এথনিক এবং মাল্টি রিলিজিয়াস দেশ। এর বৈচিত্রময় সৌন্দর্য ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি দেশের অনেকের কাছে বিস্ময় ও প্রশ্নের। বিলাতের বর্ণবাদী গোষ্ঠী যে কোন খোঁড়া অজুহাতে এ দেশের মাল্টি কালচারাল নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেষ্টা করে এবং মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে নিজেদের বর্ণবাদী খেলায় মেতে উঠতে তাদের দেখা যায়। কিন্তু এর জন্যে কোন ভাবেই এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। সাতই জুলাই লন্ডনে বোমা হামলার পর একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, বৃটেনের মাল্টি কালচারাল নীতি ব্যর্থ হয়েছে, তাই এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। মুসলমান বলে পরিচিত কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গৃহীত সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা চরমপন্থার কারণে যদি মাল্টি কালচারাল নীতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলে তা হলে এর দায় মুসলমানদেরই বহন করতে হবে।
বহুমত, বহু ভাষা এবং বহুবর্ণে তৈরি বৈচিত্রময় এ পৃথিবী আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন, শয়তান সৃষ্টি করেনি। মানুষে মানুষে ভাষা এবং রঙের পার্থক্যকে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সে হিসেবে সমগ্র পৃথিবীটাই যেন একটি মাল্টি কালচারাল সমাজ। কুরআন মজিদে আল্লাহ্‌ বলেন, আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত বা জাতি হিসেবে সৃষ্টি করতে পারতেন। (৫:৪৮) আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে পৃথিবীর বুকে যারা আছে সবাই এক সাথে ঈমানদার হয়ে যেতো। তুমি কি ঈমান গ্রহণের জন্যে মানুষের উপর জবরদস্তি করবে? (১০:৯৯)  আমি তোমাদের এক পুরুষ এবং এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।  (৪৯:১৩) মহানবী(সঃ) নিজের কথা এবং কাজের মাধ্যমে মাল্টি কালচারাল সমাজের বাস্তôব নমুনা স্থাপন করেছিলেন। কুরআনের এক জায়গায় আল্লাহ্‌ খৃষ্টানদের গীর্জা এবং ইহুদীদের সিনাগগ রক্ষার পরোক্ষ ব্যবস্থা করেন বলেও ইঙ্গিত করেছেন। কুরআন বলে,  আল্লাহ্‌ যদি মানব জাতির একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তা হলে গীর্জা, ইবাদতখানা, সিনাগগ এবং মসজিদসমূহ ধ্বংস হয়ে যেতো।  (২২:৪০) সে হিসেবে বহু মত ও পথের মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি বৃটেনের মাল্টি কালচারাল সমাজের যথার্থ কারিগর হিসেবে মুসলমানদের যোগ্যতার পরিচয় দেয়ার কথা। মাল্টি কালচারাল সমাজের প্রতিষ্ঠিত নীতি বা মূল্যবোধ ক্ষুুন্ন হয় এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্যে শোভা পায়না।
এটা ঠিক যে নানা কারণে মার্কিন ও বৃটিশ সরকারের উপর মুসলমানরা ক্ষুব্ধ। কিন্তু এ অজুহাতে বৃটিশ বা আমেরিকার জনগণের উপর আক্রমণকে বৈধতা দেয়া যায়না। ইসলামের দৃষ্টিতে একজনের অপরাধে অন্যজনকে শাস্তিô দেয়া অবৈধ এবং আত্মঘাতি বোমা হামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হত্যা করাকে ইসলাম মোটেই অনুমোদন করেনা। কুরআন শরীফে আল্লাহ্‌ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যারা তোমাদের মসজিদে হারামে যেতে বাধা প্রদান করেছে তাদের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সীমা লঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকর্ম এবং খোদাভীতিতে একে অপরের সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনে একে অপরের সহায়তা করোনা।  (সুরা মায়েদা - আয়াত ২) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকো এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে ইনসাফের পথ পরিত্যাগ করোনা।  (সুরা মায়েদা - আয়াত ৮)  ভালো কাজ ও মন্দ কাজকে সমান মনে করোনা। ভালো কাজ দিয়ে মন্দ কাজকে প্রতিহত করো। তা হলে যার সাথে তোমার শত্রুতা সে তোমার ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে যাবে।  (হা-মিম সাজদাহ - আয়াত ৩৪) নিজের এবং নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গেলেও মুসলমানকে ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। এ ব্যাপারে কুরআনের বর্ণনায় কোন অস্পষ্টতা নেই। আমার প্রতি কেউ অন্যায় আচরণ করলে ন্যায়নীতির মাধ্যমে এর জবাব দিতে হবে। অন্যায়ের জবাব অন্যায় পন্থায় দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মোটেই বৈধ নয়। কুরআন এখানে মুসলমানদের সে নির্দেশই প্রদান করছে। কিন্তু কুরআনের এই সুস্পষ্ট নির্দেশ সম্পর্কে আমরা নিজেরা কতটুকু জানি এবং আমাদের বিক্ষুব্ধ তরুণদের আমরা কতটুকু অবহিত করতে পেরেছি? হাদীস অনুযায়ী আমার ভাই যদি অত্যাচারী হয় তা হলে তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখতে হবে। দ্বীনি ভাই হিসেবে তাকে এ ভাবে সাহায্য করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। আমাদের অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করতে হবে। বোবা শয়তানের মতো নিরব বসে থাকার কোন সুযোগ ইসলামে নেই।

পাঁচ.
বৃটেন বা ইউরোপ কোন সময়ই নিরপেক্ষ ভাবে ইসলামকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার পরিবেশ পায়নি। মুসলমানরা যখন বিজয়ী ছিলেন তখন ইউরোপ তাদের শত্রু মনে করেছে। আবার যখন মুসলমানরা পরাজিত হয়ে পড়েন তখন ইউরোপ তাদের মূল্যায়ন করেছে অধীনস্থ লোক হিসেবে। ইউরোপীয় লেখক-চিন্তôাবিদগণ মুসলমানদের কখনো সঠিক ভাবে চিত্রিত করেননি। তাদের ভাষায়, মুসলমান মানে বর্বর এবং অমার্জিত এক দল লোক। মুসলমানরা এক হাতে খোলা তরবারী এবং ওপর হাতে কুরআন নিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, এখনি ইসলাম কবুল কর, নতুবা গর্দান থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেব। আমরা জানি ইসলাম তরবারীর জোরে প্রচারিত হয়নি। কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ, ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর খাটানো যাবেনা। কিন্তু কোন সম্প্রদায় বা আদর্শ সম্পর্কে এ ধরণের নেতিবাচক কথা চালু হয়ে গেলে তাদের সাথে কি ধরণের আচরণ করা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই সাধারণ ভাবে ইউরোপের জনগণ ইসলামকে গ্রহণযোগ্য আদর্শ বলে মনে করেনি। বর্তমানে বিলাতের অমুসলিম জনগোষ্ঠী মুসলমানদের কাছে থেকে দেখছে, তাদের সাথে লেনদেন এবং ব্যবসা-বানিজ্য করছে। মুসলমানদের এখন কাজের মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হবে যে ওরিয়েন্টালিস্টরা মুসলমানদের যে চিত্র অংকন করেছে তা ঠিক নয়। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারছি?
মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ব্যাপারে এ দেশের গৌরবজনক ঐতিহ্য রয়েছে। পরমত সহিষ্ণুতার উজ্জল দৃষ্টান্তô আমাদের চোখের সামনে থাকার পরও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ব্যাপারে এ দেশের মুসলমানরা অনুসরনীয় নমুনা পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি, ঝগড়া-বিবাদ ও কোন্দল করে বার বার এ দেশের পুলিশের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি, স্থানীয় এমপি বা কাউন্সিলারদের নিকট সাহায্য চাই অথবা আদালতের শরণাপন্ন হই। সবচেয়ে টাটকা দৃষ্টান্তô হচ্ছে গত নির্বাচনের সময় এমসিবি’র সভায় একদল বিক্ষুব্ধ মুসলিম তরুণ হামলা চালিয়েছে। জর্জ গ্যালওয়ের সভায়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা আমরা বাংলাদেশ, পাকিস্তôান, মিশর, প্রভৃতি মুসলিম প্রধান দেশ থেকে নিয়ে এসেছি। এ সকল দেশে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মত পার্থক্যকে কেন্দ্র করে রক্তারক্তির ঘটনা সর্বদাই ঘটছে। এ দেশের যে কোন নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিই সর্ব প্রথম বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দিত করে। কিন্তু মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে নির্বাচনের পর প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি বা দলের মধ্যে মুখ দেখাদেখি পর্যন্তô বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের এ চরিত্র দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এখন কোন গোপন ব্যাপার নয়। এটা ইসলামী চরিত্র না হলেও মুসলমানদের মধ্যে এ দোষ থাকার কারণে অমুসলিমরা ভাবতে বাধ্য যে এটা ইসলাম অনুমোদন করে। আমাদের কাজের মাধ্যমে তাদের এ ভুল ধারণা অপনোদন করতে হবে।
চরম পন্থাকে ইসলাম কখনো অনুমোদন করেনি। যারা ইসলামের নাম নিয়ে চরমপন্থার আশ্রয় নেয় তাদের পথ মহানবী (সঃ) প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তôাকিম নয়, বরং বাঁকা পথ। সন্ত্রাস ফেতনা-ফাসাদের আরেক নাম। কুরআনের ভাষায় ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা খুন-খারাবির চেয়েও মারাত্মক অপরাধ। যারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে তাদের ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্য অত্যন্তô স্পষ্ট। সুরা মায়েদার ৩২ আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন, খুন বা ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টির অপরাধে অপরাধী নয় এমন কাউকে যে হত্যা করবে সে যেন প্রকারান্তôরে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করলো। আবার কেউ কারো জীবন রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে গোটা মানব জাতির জীবন রক্ষা করা। মুসলমানদের মধ্যমপন্থী উম্মাহ্‌ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে ধর্ম নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করে বা চরমপন্থার আশ্রয় নেয় তাদের ব্যাপারে কুরআন সাবধানবানী উচ্চারণ করেছে। আল্লাহ বলেন, বলুন, হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের ধর্ম নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি করোনা এবং সে সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করোনা যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে।  (মায়েদাঃ৭৭) এ আয়াতে আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে হলেও এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে।
কুরআনের পাশাপাশি মহানবী (সঃ) কথা এবং মহৎ দৃষ্টান্তেôর মাধ্যমে আমাদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। আহমদ, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ্‌-এর একটি হাদীস এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে মহানবী (সঃ) বলেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে সতর্ক থাকো। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।  মুসলিম শরীফের আরেকটি হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেন,  যারা সীমা লঙ্ঘন করে তাদের ধ্বংস অনিবার্য।  তিনি কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন। ইমাম নববীর মতে এখানে সীমা লঙ্ঘন বলতে মহানবী (সঃ) কথা ও কাজ উভয় অর্থে সীমা লঙ্ঘনের কথা বুঝিয়েছেন। মহানবী (সঃ)-এর নির্দেশ হচ্ছে, কাজের সাথে সাথে কথাবার্তার ক্ষেত্রেও মুসলমানদের বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। বাড়াবাড়ির কারণে অনেক মুসলমান পর্যন্তô ভাবতে বাধ্য হন যে ইসলামের বিধান বর্তমান যুগের জন্যে উপযোগী নয়। কিছু লোকের মধ্যে পাশ্চাত্যের সব কিছুকে নিন্দা এবং আধুনিক মানেই ইসলাম বিরোধী বলে মনে করার প্রবণতা দেখা যায। ট্রাউজার পরিধান করা, বৃটিশ টয়লেট ব্যবহার করা, চেয়ার-টেবিলে বসে লেখাপড়া করা, গায়ে হলুদ দেয়া, মেয়েদের কলেজে যাওয়া, জন্মদিন পালন ইত্যাদিকে ইসলাম বিরোধী কাজ বলে অভিহিত করা হয়। মহানবী (সঃ)-এর কাজ ছিল মানুষকে আল্লাহ্‌র দাসত্বের দিকে আহ্বান করা। কিন্তু আমাদের কোন কোন মহল মানুষকে আল্লাহ্‌র দাসত্ব থেকে খারিজ করে দেয়ার ব্যাপারে বেশী আগ্রহী বলে মনে হয়। একদল লোককে বেদআত  ও কুফর  শব্দ ব্যবহারে খুব পারঙ্গম দেখা যায়। ছোট-বড়, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কুফর ও বেদআত শব্দ প্রয়োগের ফলে বহুধা বিভক্ত মুসলিম সমাজে নতুন নতুন ফেত্‌নার সৃষ্টি হচ্ছে। আমার মতে যে সমাজে ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান বা বিশ্বাসের অভাব সে সমাজে কুফর আর বেদআত শব্দের তেমন উপযোগিতা নেই।
ছয়.
মুসলমানরা এ দেশে আসার সময় তাদের সাথে ইসলামকে যেমন নিয়ে এসেছেন তেমনি নিজেদের দেশজ অনেক রীতি-নীতিও এনেছেন। আমরা অনেক সময় দেশজ রীতিকে ইসলামের সাথে মিশ্রিত করে ইসলামের দেহাই দিয়ে চালু করে দেই। বাঙালি, পাকিস্তôানী, তুর্কী বা আরবীয় জীবনযাপনের সাথে ইসলামের শাশ্বত মূলনীতিকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। আমরা গুলিয়ে ফেলেছি বলেই এ দেশে বাঙালি মসজিদ, পাকিস্তôানী মসজিদ, আরব মসজিদ, গুজরাটি মসজিদ অনেক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ্‌র বা বৃটিশ মসজিদ কোথাও দেখা যাচ্ছেনা। কুরআনে আল্লাহ্‌ বলেছেন, আল্লাহ্‌ যখন কোন জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন তাঁকে সে জাতির ভাষা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমরা যদি নিজেদের বৃটেনে ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে মনে করি তা হলে এ দেশের ভাষা হতে হবে আমাদের ভাষা। এ দেশের সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি, জীবন ধারণ পদ্ধতি, ধ্যান-ধারণা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির সাথে পরিচিত হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নতুন পরিবেশ ও সংস্কৃতির যে সকল বিষয় ইসলামের মৌল বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সে গুলোকে নিজের মত করে গ্রহণ করতে ইসলাম আমাদের নিষেধ করছেনা। প্রাচীন আরবের সামাজিক রীতিনীতিকে ইসলাম এক কথায় অনৈসলামিক বলে উড়িয়ে দেয়নি। ইসলাম তাদের অনেক জিনিস গ্রহণ করেছে, অনেক রীতি সংশোধন করেছে এবং অনেক জিনিস বাতিল করে দিয়েছে। ইসলাম এক সময় আরব ভূখন্ড পার হয়ে আফ্রিকা, ইরান, ভারতবর্ষ, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে গিয়েছে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার পথে এবং নতুন ভৌগলিক ও সামাজিক অবস্থানে যাওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে অনেক বিদেশী রীতিনীতির অনুপ্রবেশ সেখানে ঘটেছে। এ কারণে মৌলিক বিষয়ে বিশ্বমুসলিমের মধ্যে মিল থাকলেও রীতিনীতির ক্ষেত্রে দেশে দেশে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এ পার্থক্য বা বৈসাদৃশ্য ইসলামের মৌল নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হলে এটাকে একটা সৌন্দর্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ইসলামী অনুশাসন ও নিয়মনীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে বৃটিশ মুসলমানদের এ দিকটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এখানে এক দেহে লীন হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও বৃটিশ নাগরিক হিসেবে আমরা দায়িত্ব পালন করতে পারি।
আসলে বৃটিশ সমাজে মুসলমানদের ব্যাপারে এক ধরণের ভীতি এবং সন্দেহ বিরাজ করছে। এ দেশের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে ইসলামের মৌলিক বিরোধ রয়েছে বলে তাদের ধারণা। মুসলিম বিশ্বে স্বৈরশাসকদের সংখ্যাধিক্য এবং প্রতিটি নির্বাচনের সময় বিক্ষুব্ধ মুসলিম তরুণদের গণতন্ত্র কুফর  এবং ভোট দেয়া হারাম  শ্লোগান তাদের সে ধারণাকে পাকা-পোক্ত করছে। লন্ডনে বোমা হামলার পর আমাদের ব্যাপারে সন্দেহ ও অনাস্থা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলমানদের কথাবার্তা বলার কৌশল, চলাফেরা এবং জীবনযাপন প্রণালীকে বৃটিশ সমাজ সহজভাবে নিতে পারেনা। তাদের মতে, মুসলমানরা বৃটিশ সমাজের সাথে মিশতে চায়না, আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে চায়। সন্দেহ-সংশয় মিশ্রিত এ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় মুসলমানদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এখানে এমন একটা পরিবেশ তৈরির পক্ষে কাজ করা দরকার যাতে করে এ দেশের আদি বাসিন্দাদের সাথে আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের মন থেকে মুসলমানদের ব্যাপারে ভুল ধারণা দূর এবং এ দেশে ইজ্জত-সম্মানের সাথে বসবাস করতে এ ধরণের আলোচনা ও মতবিনিময়ের কোন বিকল্প নেই।
লন্ডন ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৫